Skip to main content

Full text of "Bangali Jibane Ramani"

See other formats


নাগালী জীবনে লসণা 


আবির্ভাব 


্ীনীব্রদ্জ্ছ চৌুন্রী 


শছ০ ঢা] 215/29,55 ৮101 01219 1092701, 86108110৩ 
2770, 60 12391176211 61915 ০95155%, 
15 57000989 17) 1116.” 
8১257 


জিত্র ও €ঘাষ 
১০ শ্ডামাচরণ দে স্ট্রীট, কলিকাতা ৯২ 


প্রথম প্রকাশ, চৈত্র ১৩৬৪ 


প্রচ্ছদপট £ 
অহ্কন-_প্রীআশু বন্দ্যোপাধ্যায় 
মুদ্রণ রিপ্রোডাকশন সিগ্িকেট 


8 


মিত্র ও ঘোষ, ১০ শ্যামাচরণ দে দ্রীট, কলিকাতা ১২ হইতে এস. এন. বায় কতৃ ক প্রকাশিত 
ও গ্রজয়ন্ত বাকৃচি কর্তৃক পি. এম. বাকৃচি আযাণ্ড কোম্পানি প্রাইতেট লিমিটেড 
১৯ গুলু ওস্তাগর লেন, কলিকাতা! ৬ হইতে মুক্রিত 


ভালবাসার কাহিনী 
এই বই-এ লিখিলাঁম 


এই বইখানা 
ভৎ্সঙ্গী ও 


আনীরদচজ্ত্র চৌধুরী 


প্রথম পরিচ্ছেদ 
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ 
তৃতীয় পরিচ্ছেদ 
চতুর্থ পরিচ্ছেদ 
পঞ্চম পরিচ্ছেদ 
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ 
উপসংহার 

স্চী 


পরিচ্ছেদ বিভাগ 


বিষয়টা! কি? 
কাম ও প্রেম 
দেশাচার 
বাংলার দৃশ্ঠ ও বাঙালীর ভালবাসা 
বাঙালী সমাজ ও নৃতন ভালবাসা 
বাঙালীর মন ও ভালবাসা 
ন্তষটা বন্িম 
প্রেম--সাহিত্যে ও জীবনে 


৪৯ 
৬১ 
১০৭ 
১৪২ 
১৭৩ 


২৩১ 


৪৯৭ 


পাঠক-পাঠিকার প্রতি নিবেদন 
আমার বইটা পড়িবার সময় একটি দেশী ও একটি বিদেশী উক্তি মনে 
রাখিতে বলিব। দেশীটি এই__ 
'নায়মাত্মা প্রবচনেন লভ্যো 
ন মেধয়৷ ন বন্তনা শ্রুতেন। 
যমেবৈষ বৃথুতে তেন লভ্য-_ 
স্তম্তৈষ আত্মা বিবৃণুতে তনুং স্বাম্‌॥৮ 
আত্মার সম্বন্ধে যাহা বলা যায় যে কোনও বিষয়ে সত্য আবিষ্ষার 
সম্বন্ধে তাহাই বলা চলে- শুধু বুদ্ধি ও তর্কের দ্বারা সত্যের সন্ধান 
পাওয়া যায় না। বাঙালী শিক্ষিত সমাজের সব চেয়ে বড় দৈম্য উষর 
তর্কপ্রবণতা, হৃদয়হীনতা । 
দ্বিতীয় কথাটি হৃদয় ও বুদ্ধির সম্পর্ক সম্বন্ধে। উহা! প্যান্কালের 
উক্তি 


1, ০061] চে 965 12150159) (008 19. 12,150 


[0 2012112,10 190111 7 010 1 3216 61) 17)1116 01)0565, 

( হৃদয়ের যুক্তি আছে কিন্তু তাহা যুক্তির একেবারে অগোচর। ইহা 
সহত্র ব্যাপার হইতে জানা যায়। ) 

স্থতরাং বাংলাদেশে ধাঁহারা পণ্ডিত বলিয়া খ্যাত আমার বই 
তাহাদের জন্য নয়, যে-বাঙালীর এখনও হৃদয় আছে তাহারই অন্যু। 
আশা! করি এত দুঃখকষ্টেও বাঙালীর হৃদয় একেবারে শুকাইয়! যায় 
নাই। 

কিন্তু তাই বলিয়৷ বই লিখিবার অধিকার আছে তাহ! জোর করিয়া 
বলিব না। বাংলাতে বই লিখিবার কারণ আমার দ্িক হইতে সরল 
ভাবে জানাইতেছি । 

এ পর্যন্ত আমি বাংলা বই লিখি নাই, এই আমার প্রথম বই। পঞ্চাশ 


১০ বাঙালী জীবনে রমণী 


ব্সর বয়সে ইংরাজীতে প্রথম বই লিখিতে আরম্ভ করিয়াছিলাম, সম্তর 
ব্সর বয়সে বাংলায় লিখিলাম। ইংরেজীর বেলাতেই দেরি হুইয়৷ 
গিয়াছে মনে করিয়াছিলাম, সুতরাং বাংলার ক্ষেত্রে আরও কত দেরি যে 
হইয়া গিয়াছে তাহা মনে করিতেও ভীতি হইতেছে। 

ইহার চেয়েও ভয়ের কথা ১৯৪৩ সন হইতে ১৯৬৬ সন পর্যন্ত দুই 
একটা অত্যন্ত তুচ্ছ রচন৷ ছাড় বাংলাতে কিছুই লিখি নাই। এক সময়ে 
আমি যে বাংলা ভাষাতেও লেখক ছিলাম তাহা লোকে প্রায় ভুলিয়া 
গিয়াছিল। স্বামী বারো বসর নিরুদ্দেশ হইবার পর স্ত্রীও যখন বিবাহ 
করিতে পারে, তখন লোকের ভুলিয়া যাওয়া অবিচার মৌটেই নয়। 
১৯৬৬ সনের মাঝামাঝি আবার বাংলাতে লিখিতে আরম্ভ করিয়াছি । 
উহার ফলে বাঙালী পাঠক সমাজে বাংলায় লেখক হিসাবে স্বীকৃত 
হইয়াছি কিনা বলিতে পারি না। 

নৃতন করিয়! বাংলা লেখার মুলে বন্ধুবর গজেন্দ্রকুমার মিত্র। তিনি 
গীড়াগীড়ি না করিলে আবার বাংলা লিখিবার ধারণাও আমার মাথায় 
আমিত না। পঁচিশ বদর দিল্লীতে আছি, এখানকার বাঙালী সমাজের 
সহিত সেদিন পর্যন্ত কোনও পরিচয়ই ছিল না, এখনও বিশেষ নাই-_- 
তাই বাঙালীর সাহচর্য হইতেও যে বাংলা লেখার ঝোঁক আসিবে তাহারও 
সম্ভাবন! ছিল না। 

কেহ কখনও বাংলা লিখিতে বলিলে একটা বড় বাধার কথা বলিতাম। 
সেটা এই-_ আমি আধুনিক বাংলা লিখিতে পারি না, প্রয়োজনও হয় না, 
কারণ ইংরেজীতেও লিখি বলিয়া আমার ইংরেজীতে লেখার স্পৃহা 
ইংরেজীগন্ধী বাংল! লিখিয়! তৃপ্ত করিবার কোনও মানসিক তাগিদ আসে 
না। সত্য কথা বলিতে কি, আমি আজিকার বাংলা বুবিতেও পারি না। 

ইহ! সাধুভাষা ও কথিত ভাষার পার্থক্যের জন্য নয়। আমি বাংলা 
সাধু এবং কথিত ছুই ভাষাই বুঝি। কিন্তু আধুনিক বাংলা গগ্ভ না 
আগেকার সাধু না আজিকার মৌখিক ভাষা, এই দুইটার কোনটাই নয় । 
উহা সম্পূর্ণ নৃতন ভাষা । কথিত ভাষার ক্রিয়াপদের রূপ বা তিওফ্- 


পৃঠিক-পাঠিকার প্রতি নিবেদন ১১ 


প্রকরণ ভিন্ন ইহাতে স্বাভাবিক কিছুই নাই। বাংলা গছ্ের ষে অপূর্ব 
প্রাঞ্জলতা ও তীক্ষ ধার ১৯১০ পর্যন্ত গড়িয়া উঠিয়াছিল আজ তাহা আর 
দেখা যায় না। এখন একটা নব্য গৌড়ী রীতি গড়িয়া উঠিয়াছে। ইহার 
“মাধ্যমে” লিখিবার সাধ্য আমার নাই, নীচু গলায় বলিব_ ইচ্ছাও নাই। 
আমি যখন বাংলা লিখি তখন বোধ্য বাংলায় লিখি, অথচ ইহাতে যে বিপদ 
আছে তাহাও পরিক্ষার । আমার কথা বোঝা! যায় বলিয়া বোঝামাত্র 
প্রবল আপপ্ডতি আরন্ত হয় । ধাহারা অবোধ্য ভাষায় লেখেন, তাহাদের 
এই ফ্যাসাদ বা বালাই নাই--তীহারা দিবা লেখক বলিয়া খ্াতি পান, 
আমার ভাগ্যে সাধারণত নিন্দাই জোটে । 

ভাষাগত আপত্তি ছাড়াও বাংলা লেখা সম্বন্ধে আমার উদাসীনতার 
আর একট! কারণও ছিল । ১৯২৭ সনে প্রথম বাংল। লিখিতে আরম্ভ 
করিবার মাস কয়েকের মধোই আমাব বিশেষ নিরুৎসাহ আসে একটা 
জিনিস উপলব্ধি করিয়া । সেটা এই যে, লিখিয়া পাঠক সমাজের কাছ 
হইতে কোনও সাড়া পাওয়া যায় না। এই নিরুৎসাহের কথা আমি 
তখনই মোহিতলাল মজুমদার মহাশয়কে বলিয়াছিলাম। তিনি আমাকে 
এই নিরুতসাহ কাটাইয়। উঠিতে বলেন । কিন্তু নিরুত্সাহ কোনদিনই 
কাটে নাই। 

যাহার মধ্যে সত্যকার লেখকধর্ম আছে সে কখনও শুধু নাম বা 
প্রতিষ্ঠার জন্য লিখিতে পারে না। যে বান্তি কেবল এই ছুইটির জন্য 
লেখে তাহার অপেক্ষা নিন্স্তরের লেখক হইতে পারে না। অবশ্টা 
জীবিকার জন্য অনেক সময়ে অন্য উপায় না থাকিলে বাধ্য হইয়া লিখিতে 
হয়। কিন্তু হাতে লেখার কোনও উত্সাহ থাকে না, পরে লেখা প্রাণ- 
হীন হইয়া পড়ে। আমার ইংরেজী বা বাংলায় লব্ধপ্রতিষ্ঠ বিখ্যাত 
সাহিত্যিক হইবার আকাঙ্ক্ষা কোনকালেই ছিল না। আমি চাহিতাম শুধু 
আমার আইডিয়া প্রচার করিতে । সুতরাং সাড়া ন! পাইয়া মনে 
হইয়াছিল বাংলাদেশে লেখকবৃত্তি নিক্ষল। খ্যাতির কুমীর ধাহারা হইতে 
চান, তাহারা তাই হউন, তাহাদের সহিত আমি টেকা দিতে যাইব না। 


১২ বাঙালী জীবনে রমণী 


আশ্চর্ষের বিষয় এই, রবীন্দ্রনাথ প্রথম জীবনেই বাঙালী সাহিত্যিকের 
এই ব্যর্থতা অনুভব করিয়াছিলেন। গেটের জীবনী পড়িবার সময়ে 
জার্মানীর সাহিত্যরসিক সমাজের সহিত বাংলাদেশের পাঠক সমাজের 
পার্থক্য অনুভব করিয়া তিনি ১৮৯৪ সনের ১২ই আগষ্ট তারিখে ইন্দিরা 
দেবীকে লিখিয়াছিলেন-_ 

“আমরা হতভাগ্য বাঙালী লেখকের! মানুষের ভিতরকার সেই প্রাণের 
অভাব একান্তমনে অনুভব করি-_ আমরা আমাদের কল্পনাকে সর্বদাই 
সত্যের খোরাক দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে পারি নে, নিজের মনের সঙ্গে 
বাইরের মনের একটা সংঘাত হয় না বলে আমাদের রচনাকার্য অনেকটা 
পরিমাণে আনন্দবিহীন হয়। আমাদের দেশের লোক এত যে ইংরাজি 
সাহিত্য পড়েছে, কিন্তু তাদের অস্থিমজ্জার মধ্যে ভাবের প্রভাব প্রবেশ 
করতে পারে নি- তাদের ভাবের ক্ষুধাই জন্মায় নি, তাদের জড় শরীরের 
মধ্যে একটা মানস শরীর এখনো গঠিত হয়ে ওঠে নি, সেইজন্যে তাদের 
মানসিক আবশ্বাক বলে একটা আবশ্ক বোধ নিতান্তই কম--অথচ 
মুখের কথায় সেটা বোঝবার জো! নেই, কেননা বোঁলচাল সমস্তই ইংরাজী 
থেকে শিখে নিয়েছে । এরা খুব অল্প অনুভব করে, অল্প চিন্তা করে 
এবং অল্পই কাজ করে- সেইজন্যে এদের সংসর্গে মনের কোনো স্থখ 
নেই। গেটের পক্ষেও শিলারের বন্ধুত্ব আবশ্যক ছিল, তাহলে আমাদের 
মতে! লোকের পক্ষে একজন যথার্থ খাটি ভাবুকের প্রাণসধগারক সঙ্গ যে 
কত অত্যাবশ্যক তা আর কি করে বোঝাব। আমাদের সমস্ত জীবনের 
সফলতাট। যে জায়গায় সেইখানে একট! প্রেমের স্পর্শ, একটা মনুষ্যু- 
সঙ্গের উত্তাপ সর্বদা পাওয়া আবশ্যক-_নইলে তার ফুলফলে যথেষ্ট বর্ণ 
গন্ধ এবং রস সঞ্চারিত হয় না” 

এই কথাগুলি তখন ন! পড়িলেও, এই নিরুণুসাহ আমিও অনুভব 
করিয়াছিলাম। 

ইহার উপরও আবার বাঙালী জাতি ও বাঙালীর সভ্যতা সম্বন্ধে 
একটা নিরাশ আমাকে আচ্ছন্ন করিয়াছিল। এই দুই-এর কোনও 


পাঁঠক-পাঠিকার প্রতি নিবেদন ১৩ 


ভবিষ্যৎ ভরসা আছে তাহা বিশ্বাস করা আমার পক্ষে প্রায় অসম্ভব 
হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। বাংল! ভাগ হইবার পর এই বিশ্বাস একেবারে 
দু হইয়! গিয়াছিল। তাই ভাবিতাম যে-জাতির ম্ৃস্যু বা অধোগতি 
অবশ্যন্তাবী তাহার জন্য পরিশ্রম করা কেন? 

তবে আবার বাংলা লিখিতে আরম্ত করিলাম কি কারণে, এই 
কৈফিয়ত চাহিতে পারেন। বলিব, কারণটা একটা উপলক্ষ হইতে 
দেখা দিল। গজেনবাবু বরাবরই আমাকে ম্বৃত বন্ধু বিভূতিভূষণ 
বন্দ্যোপাধ্যায় সম্বন্ধে 'লিখিতে বলিতেন। আমি নানারকম স্তোকবাক্যে 
তাহাকে ঠেকাইয়া রাখিতাম। কিন্তু ১৯৬৬ সনে নন্দলাল বন্থর মৃস্থযর 
পর যখন তিনি আমাকে “কথাসাহিত্যে'র জন্য কিছু লিখিতে বলিলেন, 
তখন নন্দবাবুর উপর অপরিসীম শ্রদ্ধা থাকাতে একটা প্রবন্ধ 
লিখিলাম। 

লিখিবার সময়ে দেখিলাম, বাংলা লেখার অভাস একেবারে 
হারাই নাই। সুতরাং যে একটা মনোভাব কিছুদিন আগে হইতে 
অস্পফীভাবে জাগিতেছিল, তাহা! জোর পাইল । নৃতন তাগিদটা এই 
প্রকার । 

আমার ইংরেজী বই মুখ্যত ইংরেজী-ভাষা-ভাষী সমাজের জন্য লিখিত 
ও প্রকাশিত হইলেও আমি জানিতাম ভারতবর্ষে বা বাংলাদেশে ইংরেজী 
জান! পাঠকেরা উহা পড়িবেন। আমার আলোচ্য বিষয় যখন আমাদের 
ইতিহাস, আমাদের জীবন, সমাজ ও সভ্যতা এবং এই সব সম্বন্ধে বিশেষ 
মত প্রচার করাই যখন আমার উদ্দেশ্য, তখন ভারতবর্ষের লোকের কাছে 
উহা না পৌছিলে আমার লেখা অনেক অংশে বুখাই হইত। 
তাবিয়াছিলাম, ইংরেজীতে লিখিয়াই এদেশের পাঠকসাধারণের সম্মুখে 
দাড়াইতে পারিব। এই আশা খানিকটা পুর্ণ হইয়াছে, কিন্তু অন্যদিকে 
নিশ্ষলও হইয়াছে । 

আমি বুঝিয়াছি ইংরেজী ভাষায় লিখিয়া আজিকার বাঙালী শিক্ষিত 
সাধারণের কাছে পৌছিতে পারিব না। প্রথমত, তাহার! ইংরেজী 


১৪ বাঙালী জীবনে রমণী 


পড়িবার অভ্যাস হারাইয়াছে, স্থতরাং কোনও রকম ইংরেজী পড়িতেই 
আয়াস অনুভব করে, রস ত পায়ই না। দ্বিতীয়ত, যে-ইংরেজীতে 
লিখিলে বই বিলাতি প্রকাশক গ্রহণ করিবে, সেই ইংরেজী বুঝিবার ক্ষমতা 
বেশীর ভাগ বাঙালী পাঠকের গিয়াছে। অর্থের অক হয়ত তাহারা 
বুঝিতে পারে, কিন্তু বাকী অধেক ও ব্যঞ্জনা তাহাদের মনে প্রবেশ করে 
না। কেউ যদি সঙ্গীত শুনিবার সময় বেশ খাদের দিক ( অর্থাৎ ১৫০ 
স্পন্দনের নীচেকার ধ্বনি) ও বেশ চড়ার দ্রিক (অর্থাৎ ৪০০০ স্পন্দনের 
উপরের ধ্বনি ) শুনিতে না পায়, তাহার সঙ্গীত শোনা যে কি প্রকার 
তাহা সকলেই বুঝিতে পারিবেন। বিলাতে যে ইংরেজী গ্রাহা তাহার 
বেশীর ভাগ সাধারণ পাঠক এই রূপে অংশত মাত্র নিতে পারে । স্ৃতরাং 
ইংরেজীতে বাঙালী সাধারণের জন্য লেখা কেন? অথচ বাংলা দেশ ও 
বাঙালীর যে অবস্থা দাড়াইয়াছে, তাহাতে কাহারও যদি কিছু বলিবার 
থাকে উহা বাঙালীর বোধ্য.ভাষায় বলা উচিত। 

এইভাবে চিন্তা করিতেছি, এমন সময়ে নন্দবাবু সম্বন্ধে লিখিবার 
অনুরোধ আসিল এবং এই লেখার ফলে অনেক দিন ধরিয়া! বাংলা লেখার 
সম্বন্ধে যে সঙ্কোচ ছিল তাহ! কাটিল, বাংলা লেখা সম্বন্ধে আড়ষ্টতাও 
খানিকটা গেল। তাহার ফলে ভাবিলাম, বাংলাতে লেখা চালাইলে 
হয়না? আরও একটু সাহস করিয়া তখন 'দেশে'র জন্য একটা প্রবন্ধ 
পাঠাইলাম। উহার ভাব ও ভাষ৷ ছুইএর সম্বন্ধেই প্রবল সমালোচন৷ 
হওয়া সত্বেও কলিকাতার সম্পাদকমণ্ডলীর কাছ হইতে ভরসা পাইলাম। 
স্বৃতরাং বাংলাতে আরও কয়েকটি প্রবন্ধ লিখিলাম। পরে যখন 
গজেনবাবু বই লিখিতে বলিলেন, উহাতেও একটু ভরসা করিয়া সম্মত 
হইলাম। এই হুইল বইটা লিখিবার ইতিহাস । এই বিষয় লইয়া 
ইংরেজীতে বই লিখিবার ধারণা অনেক দিন হইতেই ছিল, স্থতরাং বিষয় 
সম্বন্ধে ভাবনায় পড়ি নাই। 

এই কৈফিয়ত হইতে পাঠক বুঝিতে পারিবেন যে, আমি বাংলা 
সাহিত্যে স্থান পাইবার জন্য বা বাঙালী সমাজে সাহিত্যিক বলিয়া 


পঠিক-পাঠিকার প্রতি নিবেদন ১৫ 


প্রতিষ্ঠা লাভ করিবার জন্য বই লিখিতে বসি নাই। আরও বই 
লিখিব, কিন্তু উদ্দেশ্য হইবে একান্তই বাঁডালীর সহিত বাঙালী জীবনের 
ইতিহাস ও ধর্ম লইয়া কথাবার্তা চালানো । যতক্ষণ পাঠক-পাঠিকা 
আমার কথা শুনিবেন ( অর্থাৎ পড়িবেন ) ততক্ষণ আমি নিশ্চিন্ত থাকিব, 
বাংলাতে সাহিত্যিক হইলাম কি হইলাম না এই প্রশ্ন ভুলিব না । 


শ্রীনীরদচক্ চৌধুরী 


কৃতজ্ঞতাজ্ঞাপন 
এই বই-এ “দেশ' ও “কথাসাহিত্যে? প্রকাশিত কয়েকটি প্রবন্ধ অদলবদল 
করিয়! সন্িবিষ্ট করিয়াছি। এই ছুই পত্রিকার সম্পাদক ও স্বত্বাধি- 
কারীরা আমাকে প্রবন্ধগুলি এইভাবে ব্যবহার করিতে দিয়াছেন, এইজন্ট 
আমি তাহাদের নিকট খণী। 


ভক্িকগ 
বিষয়টা কি? 


'বাডালী জীবনে রমণী” শুধু এই নাম হইতে বই-এর বিষয়বস্তু সম্বন্ধে 
নানারকমের ধারণাই জন্মিতে পারে । তাই আমি কি বিষয়ে লিখিতে, 
যাইতেছি তাহা গোড়াতেই পরিক্ষার করিয়া লইতে চাই। আমরা 
বাঁডালীরা ধাতে নৈয়ায়িক, ন্যায়ের ফক্কিকা তোলা আমাদের 
কথাবার্তা ও লেখার একট! বড় আনন্দ। আমার কাছে কিন্তু এই 
কচকচি অত্যন্ত খারাপ লাগে । তাই তর্কের কোনও অবকাশ বই 
খুলিবামাত্রই দিতে ঢাই না। 

প্রথমত, বইটা পুরুষ ও নারীর দৈহিক সম্পর্কের আলোচনা নয়। 
উহ! জৈব ব্যাপার । ইহাতে বাডালী-অবাডালীর প্রভেদ দুরে থাকুক, 
মূলত মানুষে এবং পশুতেও কোনও তারতম্য নাই। সুতরাং এই 
জিনিসটাই যদি প্রসঙ্গ হয় তাহা হইলে উহাকে বাংলা দেশ ও বাঙালী 
সমাজের মধো আবদ্ধ করিবার কোনও অর্থ হয় না। এই দেহধর্মের 
যতটুকু নৈসগিক তাহার সম্বন্ধে কেবলমাত্র জ্ঞানমার্গে থাকিতে হইলে 
জীবতত্ব ও দেহতত্বের বৈজ্ঞ!নিক বই পড়াই যথেষ্ট । অবশ্য ইহা সত্য 
যে, মানুষ এই জৈব ব্যাপারের কর্মকাণ্ডকে পুরাপুরি জৈব রাখে নাই, 
উহার উপর এক ধরনের মনুষ্যত্ব বা ইনসানিয়, চাপাইয়াছে। কিন্তু 
এই জৈববৃণ্তির নিসর্গোন্তর পরিতৃপ্তির জন্য পুরাতন কামসূত্র বা নূতন 
“যৌনবিজ্ঞান” পড়িলেই চলে । আমি বেনামীতে এই পুরাতন শান্তর 
বা নূতন বিজ্ঞান লিখিতে বসি নাই । 

ইহার পর আর একটা কথাও বল! আবশ্বক। আমি বাঙালী 
নরনারীর সামাজিক এবং পারিবারিক সম্পর্কের আলোচনাও করিব না। 
উহা! সমীজতত্বের বিষয় । আমার কারবার একান্তই ব্যক্তিগত মানসিক 
জীবন লইয়া । স্থতরাং ব্যক্তি হিসাবে নরনারীর মধ্যে যে নিবিড় ও 


১৮ বাঙালী জীবনে রমণী 


বিশিষ্ট মানসিক সম্পর্ক প্রতিঠিত হয় তাহার পরিধিই আমার 
আলোচনারও গণ্ডী। তবে এই সম্পর্কও বিশ্বজনীন এবং সর্বকালীন। 
স্থতরাং আমার বিষয়বস্তুকে দেশে ও কালে আরও নির্দিষ্ট করিতে 
হইবে। সোজা কথায় বাঙালী জীবনের একটা বিশেষ যুগে পুরুষ ও 
নারীর সম্পর্ক যে বিশিষ্ট রূপ ধরিয়াছিল তাহার একটা বিবরণ দেওয়াই 
আমার উদ্দেশ্য | 

আমলে বইটার বিষয়বস্তু বাঙালী জাতির মানসিক ইতিহাসে 
আধুনিক কালের মধ্যে আবদ্ধ। এই কাল বিগত দেড়শত বতসর। 
এই যুগটা আবার আমাদের জাতীয় ও ব্যক্তিগত জীবনে পাশ্চাত্য 
সভ্যতার প্রভাবের কাল। সুতরাং আর এক দিক হইতে বইটাকে 
বাঙালী জীবনে ইউরোপীয় প্রভাবের ইতিহাসের একটা পরিচ্ছেদ বলা 
যাইতে পারে। 

উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিক হইতে আমাদের জীবন ও কার্ষ- 
কলাপের উপর ইউরোপীয় জীবনধারা ও সভ্যতার ধাক্কা লাগিতে 
আরম্ত হয় 'ও পঞ্চাশ বৎসরের মধ্যে এই প্রভাব একটা বন্যার মত 
হইয়৷ প্াড়ায়। ইহার ফলে নব্য বাংল! সাহিত্যের স্টি যে হয়, 
সম্পূর্ণ নৃতন ধরনের ধর্মানুভূতি ও ধর্মান্দোলন দেখা দেয়, সমাজ- 
সংস্কারের প্রচেষ্টা চলিতে থাকে, অবশেষে জাতীয়তাবোধ জাগে ও 
স্বাধীনতার জন্য রাজনৈতিক আন্দোলনের উদ্ভব হয়, তাহা সকলেরই 
জানা আছে। ইংরেজী ভাষার মারফতে পাশ্চাত্য চিন্ত৷ বাংলা দেশে 
না আসিলে এ-সবের প্রবর্তন যে হইত নাঃ উহাও বলার অপেক্ষা রাখে 
না। 

কিন্তু পাশ্চাত্য জীবনধারা, চিন্তা ও ভাব আমাদের মানসিক 
জীবন ও অনুভূতিতে কি নৃতনত্ব আনিয়াছিল তাহার আলোচনা হয় 
নাই বলিলেই চলে। অথচ ইউরোপীয় সভ্যতার সংস্পর্শে আসিবার 
পর বাঙালীর মন যে আর আগেকার বাঙালী মন থাকে নাই তাহা 
পরবর্তী যুগের কার্যকলাপের যেকোনও একটার বিশ্লেষণ করিলেই 


বিষয়টা কি? ১৯ 


ধরা পড়িবে, দেখা যাইবে যে এই কার্কলাপের পিছনে যেসব ধ্যানধারণ। 
ৰা ঝৌক ছিল তাহার প্রায় সবটুকুই বিদেশী, শুধু দেশী ছাচে নৃতন করিয়া 
ঢালা । 

এই মানসিক পরিবর্তনের প্রধান সাক্ষী ভাষা । তাহা হওয়াই 
স্বাভাবিক, কেননা ভাষাই মানসিক জীবনের আধার ও অবলম্বন 
__ভাষায় ব্যক্ত না হওয়া পর্যন্ত মানসিক জীবনের ক্রিয়া ও অভিজ্ঞতা 
প্রত্যক্ষ হয় না, এমন কি মনের যে অস্তিত্ব আছে তাহারও উপলব্ধি 
হয় না। সেজন্য মানসিক জীবনের প্রসার ও শক্তি যত বেশী হয়, 
ভাষারও ততই উন্নতি হইতে থাকে । মানসিক জীবনের প্রসার বা 
পরিবর্তন হইতে পারে ছুই ভাবে--কোনও জাতির এবং তাহার 
সভ্যতার আভ্যন্তরীণ পরিণতির ফলে; তাহার পর বাহিরের কোনও 
জাতি বা সভ্যতার সংস্পর্শে । সাধারণত উহার পিছনে এই দুইটা কারণই 
একই সঙ্গে বর্তমান থাকে। 

বাংলা দেশে ভাষাবিবতনের প্রধান কারণ কিন্তু ইউরোপীয় চিন্তা 
ও ভাবের সংঘাত । সুতরাং যাই এই ধাক্কা লাগিল তখনই বাংলা ভাষার 
পরিবত'ন হইতে আরন্ত করিল, উহার অতিরিক্ত বাঙালীর মধ্যে ভাষাগত 
একট দ্বিত্বও দ্রেখা দিল, অর্থাৎ শিক্ষিত বাঙালী বাংল! ও ইংরেজী ছুই 
ভাষাই ব্যবহার করিতে আরন্ত করিল। ইহার ফলে যে দ্বন্দ ও সমস্যার 
সৃষ্টি হইল তাহা আজও চলিয়াছে। 


তবে যেটা নৃতন যুগের সর্বাপেক্ষা বড় লক্ষণ হইয়৷ দীড়াইল তাহা 
ইংরেজীর প্রাধান্য । এ বিষয়ে বঙ্কিমচন্দ্রের উক্তি চরম প্রমাণ । ১৮৭২ 
সনে “বঙ্গদর্শনে'র সূচনায় তিনি লিখিয়াছিলেন £-- 


“লেখাপড়ার কথা দূরে থাক্‌, এখন নব্য সম্প্রদায়ের মধ্যে কোন কাজই 
বাঙ্গালায় হয় না। বিগ্ভালোচনা ইংরাজিতে। সাধারণের কার্য, 
মিটিং লেক্চর্, এড্রেদ, প্রোসিডিংল, সমুদয় ইংরাঁজিতে । যদি উভয় 
পক্ষ ইংরাজি জানেন, তবে কথোপকখনও ইংরাজিতেই হয়, কখন ষোল 
আনা, কখন বার আনা ইংরাজি। কথোপকথন ষাহাই হউক পত্র লেখা 


২০ বাঙালী জীবনে রমণী 


কখনই বাঁংলায় হয় না। আমরা কখন দেখি নাই যে যেখানে উভয়পক্ষ 
ইংরাজির কিছু জানেন, সেখানে বাঙ্গালায় পত্র লেখা”হইয়াছে। আমাদিগের 
এমনও ভরসা আছে যে, অগৌণে ছুর্গোৎ্সবের মন্ত্রাদি ইংরাঁজিতে পঠিত 
হইবে ।” 
ইংরেজীর প্রতি এই পক্ষপাতের কারণ দেখাইতে গিয়৷ বঙ্কিমচন্দ্র 
একটু বিন্রপও করিয়াছিলেন। তিনি লিখিয়াছিলেন £ 
“ইহাতে কিছুই বিস্ময়ের বিষয় নাই। ইংরাজি একে রাঁজভাষা, 
অর্থোপাজ্জনের ভাষা, তাহাতে আবার বনু বিদ্যার আধার, এক্ষণে আমাদের 
জ্ঞানোপাজ্জনের একমাত্র সোঁপাঁন); এবং বাঙ্গালীর তাহার আশৈশব 
অন্কুশীলন করিয়! দ্বিতীয় মাতৃভাষার স্থলতুক্ত করিয়াছেন । বিশেষ, 
ইংরাজিতে না বলিলে ইংরাঁজে বুঝে না; ইংরাঁজে না বুঝিলে ইংরাঁজের 
নিকট মান মর্যাদা হয় না; ইংরাঁজের কাছে মান মর্য্যাদী না থাকিলে 
কোথাও থাকে না অথবা থাকা না থাকা সমান | ইংরাজ যাহা ন! শুনিল, 
সে অরণ্যে রোদন; ইংরাজ যাহা না! দেখিল তাহা ভন্মে ঘৃত।” 
এইবার বাংলা বই সম্বন্ধে মন্তব্য £ 
“সুতরাং বাঙ্গীল! গ্রন্থাদি এক্ষণে কেবল নম্মাল স্কুলের ছাত্র, গ্রাম্য বিষ্ভালয়ের 
পণ্ডিত, অপ্রাপ্তবয়: পৌর-কন্া, এবং কোঁন কোন নিক্ষন্মণ রসিকতা-ব্যবসাঁয়ী 
পুরুষের কাছেই আদর পাঁয়। কদাচিৎ ছুই এক জন কৃতবিগ্ভ সদাশয় 
মহাত্মা! বাঙ্গাল! গ্রন্থের বিজ্ঞাপন বা ভূমিকা পর্যন্ত পাঠ করিয়া বিদ্যোত্সাহী 
বলিয়া খ্যাতি লাভ করেন ।” 
ব্যাপারটা বিসদৃশ এবং কতকটা ব্যঙ্গের যোগ্য হইলেও একথা বলা 
দরকার যে, ইংরেজী ভাষ! ব্যবহারের পিছনে একটা ছুনিবার শক্তি ছিল, 
স্থতরাং ব্যবহার না করিবার উপায় ছিল না। যেসব নৃতন চিন্তা, ভাব 
ও জীবনযাত্রার ধারণা বাঙালা সে-যুগে অত্যন্ত ভ্রতবেগে ও বহুল 
পরিমাণে গ্রহণ করিতেছিল, বাংলা ভাষার এত ক্ষমতা ছিল না যে 
সেগুলিকে সম্পূর্ণভাবে, এমন কি অংশতও প্রকাশ করিতে পারে। 
স্থতরাং প্রশ্ন দাড়াইল এই-_বাংলা ভাষার উপযুক্ত প্রসার না হওয়া 
পর্যন্ত এসব ভাব ও চিন্তাকে ঠেকাইয়া রাখা, না তখনকার মত অর্থাৎ 
সাময়িকভাবে এইসব চিন্তা ও ভাবের মৌলিক ভাষা যাহ! তাহাকে, 





বিষয়টা কি? ২১ 


অর্থাৎ ইংরেজীকেই অবলম্বন করা। সে-যুগের বাঙালী নূতন মানসিক 
জীবনকে প্রত্যাখ্যান করিতে স্বীকৃত না হওয়ায়, পরিশ্রম এড়াইবার 
কবোঁকে ইংরেজীই ধরিয়াছিল। 

এই জিনিসটা যে কেবলমাত্র বাংলা দেশেই ঘটিয়াছে তাহা 
নয়, অন্যাত্রও দ্রেখা গিয়াছে । রোমানদের উপর গ্রীক সভ্যতার প্রভাব 
পড়িবার পর তাহারা কতকগুলি ব্যাপারে, বিশেষ করিয়া দার্শনিক 
আলোচনায় গ্রীক ভাঁষা ব্যবহার করিতে আরম্ত করিল। সম্ত্রাট মার্কাস 
অরেলিয়াসের দার্শনিক চিন্তা গ্রীকে লেখ তিনি রাজকার্য অবশ্য ল্যাটিন 
ভাষাতেই চালাইতেন। আধুনিক ইউরোপেও এই ধারার ব্যতিক্রম 
হয় নাই। ফরাসী সভ্যতার প্রভাব ইউরোপের অন্যত্র বিস্তৃত হইবার 
পর জার্মেনিতে ও রুশিয়ায় ফরাসী ভাষা ব্যাপকভাবে চলিয়াছিল। 
প্রিয়ার রাঁজা ফ্রেডারিক দ্রি গ্রেট ফরাসী ভাষায় বই লিখিয়াছিলেন, 
চিঠিপত্রও সেই ভাষাতেই লিখিতেন। এমন কি বিখ্যাত ইংরেজ এঁতি- 
হাসিক গিবন তাহার প্রথম বই ফরাসী ভাষায় লিখিয়াছিলেন। আসলে 
জীবনযাত্রা, চিন্ত। ও অনুভূতির পরিবর্তন যদি কোনও বিদেশী সভ্যতার 
সংঘাতে হয়, তাহা হইলে বিদেশী ভাষাও আসে, এবং ছুই ভাষার সংঘর্ষে 
একটা ভাষাগত বিপ্লব দেখা দেয় । 

এই বিপ্লবের জন্য রাংলা দেশে, কিংবা শুধু বাংলা দেশ বলি কেন 
সমস্ত ভারতবর্ষেই, ভাষা সম্পকিত বনু সমস্যা দেখ! দেয়। উহার 
সমাধান না৷ বাংলা, না অন্যত্র, কোথাও আজ পর্যন্ত হয় নাই। ইংরেজী 
ভাষা ও দেশী ভাষার ব্যবহার ও সম্বন্ধ লইয়! আজকাল যে বাকৃবিতণ্ডা 
চলিতেছে, উহা! প্রায় প্রলাপের মত; এইরূপ হইবার কারণ সমশ্যাটার 
গুরুত্ব ও জটিলতা । ইহার সহজতম সমাধান ইংরেজীতে কথা বলা বা 
লেখা । পঁচিশ বৎসর দিল্লীতে থাকিয়াও আমি কাহারও সহিত হিন্দীতে 
কথা বলি না। ইহাতে এ অঞ্চলের শিক্ষিত সম্প্রদায় আশ্চর্য হন 
না। কিন্তু আমি আশ্চর্য হই আর একটা ব্যাপার দেখিয়া কলিকাতা 
হইতে কতঙ্পন বাঙালী আসিয়া আমার বাড়ীতে আমার সহিত নিতান্ত 


২২ বাঙালী জীবনে রমণী 


ঘরোয়া বিষয়ের আলোচনাতেও কতটা ইংরেজী চাঁলান। উহা আমার 
কাছে বিরক্তিকর। 
তবে এও আমি বলিব যে, এমন কতকগুলি বিষয়, চিন্তা, ভাব ও 
অনুভূতি আজিকার বাঙালীর মনে আছে, বাহার জন্য আমরা ইংরেজী 
ব্যবহার না করিয়া এখনও বাংলাতে আত্মপ্রকাশ করিতে পারি না। 
এমন কি খাঁটি বাঙালী জীবনেরও এমন কতগুলি ব্যাপার আছে যাহার 
বেলাতে উহারই সম্পর্কে পাশ্চাত্য হইতে নূতন অনুভূতি আসার ফলে 
আমরা এখনও বাংলা ব্যবহার করিতে পারি না--অবশ্ঠ যদি বক্তব্য 
হইতে সেই নূতন অনুভূতি একেবারে বাদ দিতে না হয়। আমি বাংলা 
ও ইংরেজী দুই ভাষাতেই লিখি এবং কথা বলি, স্থতরাং এই দ্বিত্ব ও 
দ্বন্ আমি খুব বেশী করিয়া অনুভব করি। নিজের লেখা হইতেই একটা 
উদাহরণ দিতেছি । 
বঙ্কিমচন্দ্র বিদ্রুপ করিয়া লিখিয়াছিলেন যে, পরে ছুর্গাপুজার মন্ত্রও 
ইংরেজীতে পঠিত হইবে । মন্ত্র না হউক, দুর্গাপূজা সম্বন্ধে এক ধরনের 
বর্ণনা যে ইংরেজী ভিন্ন বাংলায় লেখা সম্ভব নয় তাহা আমি নিজের 
ইংরেজী আত্মজীবনীতে ছুর্গাপূজার বৃণ্তান্ত লিখিবার পর বুঝিয়াছি । এই 
বৃন্তান্তের পিছনে যে অনুভূতি ও আবেগ আছে তাহা বাঙালীর প্রথাগত 
অনুভূতি নয়__যে চোখ দিয়া আমি উহা দেখিয়াছি, যে মন দিয়া আমি 
উহা! উপলব্ধি করিয়াছি, উহা বাডালীর পুরাতন চোখও নয়। স্তৃতরাং 
কেহ যদি আমার বিবরণকে বাংলা করিবার চেষ্টা করেন, তিনি দেখিবেন 
যে উহা পারা যায় না। আমি নিজেও চেষ্টা করিয়া, দেখিয়াছি 
যে, ইংরেজীতে আমি যাহা বলিয়াছি বা যাহার ব্যপ্রনা স্থ্টি করিয়াছি, 
আমিও বাংলা ভাষায় তাহা করিতে পারি না। গোটাকতক ছত্র উদ্ধৃত 
করিতেছি £-_ 
£]16 ০9171776 5/17101) 10110501780 190 91555561017 04 12 
০ 1720 56678 17) 1176 19077817969 1207 ০01 91120 7৩ 1790 8002 21 


70925, 16 51295 12510)67 078195610. 7701 ৫6৮০৫107151) 14 82 


বিষয়টা! কি ? ২৩ 
2150 1706270060১ 97101 1150)05 10152885) 2 1016 ০:০%/৫ 190517005 
200 199011795, 2150 020 110 100151010)079 361727927001590 2.0 
[0015৭ 0119, 627০7 

দুর্গাপূজা একান্ত করিয়া বাঙালীর জিনিস। ইহার বেলাতেই যদি 
নৃতন অনুভূতির দরুন ভাষাগত বিভ্রাট উপস্থিত হয়, তাহা হইলে যেসব 
ব্যাপার একেবারে বিদেশী উহা বাংলাতে প্রকাশ করা কত দুরূহ হইতে 
পারে তাহা সহজেই অনুমেয় । এই কষ্ট ও উৎপাত এড়াইবার জন্য 
বাঙালী পাশ্চাত্য সভ্যতা গ্রহণের প্রথম যুগে ইংরেজী ব্যবহার করিয়া 
বাপারটাকে সহজ করিয়া ফেলিয়াছিল। ইহাই বাঙালীর ইংরেজী ভাষ৷ 
ব্যবহারের মূল কারণ । 

কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ভাষাকে আরও বিস্তৃত ও শক্তিমান করিবার 

চেষ্টাও আরন্ত হইল । ইহার ফলে ১৯০* সনের মধ্যে বাংলা গন্য ও 

পগ্ভের যে রূপ দেখা দিল, আমর! তাহার গর্ব করিতে পারি। কিন্তু 

ভাষার পরিধিকে আগেকার সীমার মধ্যে রাখিয়া এই উন্নতি হয় 
নাই, আগেকার প্রকাশরীতি রাখিয়াও হয় নাই। ইহার জন্য 
বাংল৷ ভাষাকে টালিয়া সাজার প্রয়োজন হইয়াছিল। আমি শুধু 
একটা বিষয়ের নূতন ব্যাখ্যারীতি সম্বন্ধে বন্কিমচন্দ্র যাহা বলিয়াছেন 
তাহা উদ্ধৃত করিব । বিশেষ লক্ষ্যের বিষর এই যে, বঙ্কিমচন্দ্রের উক্তি 
যাহা একান্তভাবে হিন্দুরই সেই গীতার ব্যাখ্যা সন্বন্ধে। গীতার নূতন 
ব্যাখ্যা দিতে প্রবুদ্ত হওয়ার কৈফিয়ত হিসাবে তিনি বলিতেছেন £-_ 
“এখনকার পাঠকদিগের মধ্যে প্রায় অধিকাংশই শিক্ষিত” সম্প্রদায়তুক্ত | 
যাহারা পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত, তাহাঁদিগেরই নচরাঁচর “শিক্ষিত” বলা! 
হইয়া থাকে; আমি প্রচলিত প্রথার বশবর্তী হইয়াই তদর্থে “শিক্ষিত? 
শব্ধ ব্যবহার করিতেছি । কাহারও শিক্ষা বেশী, কাহারও শিক্ষা কম, 
কিন্তু কম হউক, বেশী হউক, এখনকার পাঠক অধিকাংশই “শিক্ষিত” 
সম্প্রদদায়তুত্ত, ইহা আমার জানা আছে। এখন গোলযোগের কথা এই 
যে এই শিক্ষিত সম্প্রায় প্রাচীন পত্ডিতদ্দিগের উক্তি সহজে বুঝিতে 
পারেন না। বাঙ্গালা অনুবাদ করিয়! দ্রলেও তাহা! বুঝিতে পারেন না। 


২৪ বাঁঙালী জীবনে রমণী 


যেমন টোলের পণ্ডিতের! পাঁশ্চাত্যদিগের উক্তির অন্বাদ দেখিয়াঁও সহজে 
বুঝিতে পারেন না, ধাহারা পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত, তাহারা প্রাীন 
প্রাচ্য পণ্ডিতদ্দিগের বাঁক্য কেবল অন্বাদ করিয়া দিলে সহজে বুঝিতে 
পারেন না। 

“ইহা তীহাদিগের দোষ নহে, তাহাদিগের শিক্ষার নৈসগ্সিক কল। 
পাশ্চাত্য চিন্তাপ্রণালী প্রাচীন ভারতবর্ষীয়দিগের চিন্তাপ্রণালী হইতে এত 
বিভিন্ন যে, ভাষার অন্থবাদ হইলেই ভাবের অন্থবাঁদ হৃদয়ঙগম হয় না। এখন 
আমাদিগের “শিক্ষিত” সম্প্রদীয় শৈশব হইতে পাশ্চাত্য চিন্তা প্রণালীর অস্থুবস্তীঁ, 
প্রাচীন ভারতবর্ষায় চিন্তাপ্রণালী তাহাদ্িগের নিকট অপরিচিত; কেবল ' 
ভাষাস্তরিত হইলে প্রাটীন ভাবসকল তাহাঁদিগের হৃদয়ঙ্গম হয় না। 
তাহাদিগকে বুঝাইতে গেলে পাশ্চাত্য প্রথা অবলম্বন করিতে হয়, পাশ্চাত্তয 
ভাঁবের সাহায্য গ্রহণ করিতে হয়।” 


ইহা হইতেই বোঝা যাইবে নৃতন যুগের জন্য বাংলা লেখা কি গুরুতর 
সমস্তা হইয়া ঈরাড়াইল। তবু নূতন একটা বাংলা সাহিত্য যে গড়িয়া 
উঠিল উহা আমাদের বড় জাতীয় কীতি। 

ভাষার আলোচনা এই বই-এর উদ্দেশ্য নয়; কেবলমাত্র 
বাঁডালীর মানসিক পরিবর্তন কতদূর ব্যাপক এবং গভীর হইয়া 
দাড়াইয়াছিল, তাহার আভাস দিবার জন্যই এই প্রসঙ্গের অবতারণা 
সংক্ষেপে করিলাম। এই পরিবত'নের ফলে বাঙালীর মনে উনবিংশ 
শতাব্দীর মাঝামাঝি কাল হইতে আরম্ভ করিয়া কতকগুলি জিনিস 
একেবারে নূতন করিয়া দেখা দিল__যেমন, মানুষের ব্যক্তিত্ব, দেশ ও 
দেশপ্রেম, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ধারণা ; আবার কতকগুলি জিনিস নৃতন 
চক্ষে, নৃতন ভাবে দেখিতে শিখিলাম-_যেমন ঈশ্বর, নরনারীর দৈহিক 
সৌন্দর্য, নরনারীর বিশিষ্ট বাক্তিগত সম্পর্ক। এই সবগুলি লইয়া 
ইংরেজীতে একটা বই লিখিবার উদ্দেশ্য আছে । এই বাংলা বইটাতে 
শুধু দেহসৌন্দর্য ও নরনারীর ব্যক্তিগত সম্পর্কের ব্যাপারে যে নূতন 
ধারণ! ও ভাব দেখা দিয়াছিল তাহার কথাই বলিব । আশা করি বই-এর 


' বিষয়টা কি? রর 
বিষয়টা যে কি তাহা! এতক্ষণে স্পষ্ট করিতে পারিয়াছি। 

ইহার পরও অবশ্য প্রশ্ন উঠিতে পারে বিষয়টা কি এতই বড় কিংবা 
এতই অজানা যে, ইহাকে লইয়া একটা পুরা বই লিখিতে হইবে? এই 
বইটা শেষ করিবার পর পাঠক নিজেই এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিবেন। 
আমি প্রধানত নিজের মনের তাগিদে কাহিনীর্টা লিখিতে বসিয়াছি। 
আমি মনে করি, উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে বাডালীরা ইউরোপীয় 
ও হিন্দু এই ছুই ধারার সমন্বয়ে নরনারীর সম্পর্কের যে একটা নৃতন 
ধারণ! করিয়াছিল-_যাহার প্রকাশ সমস্ত বাংলা সাহিত্য জুঁড়িয়া আছে, 
এবং যে ধারণাকে নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনেও অনেকটা কাজে পরিণত 
করিয়াছিল, উহা নুতন সাহিত্য, গান, রাজনৈতিক কার্ধকলাপ, বা 
ধর্মান্দোলনের মত বত মান যুগের বাঁডালীর একটা বড় কীতি। এই 
অভিমতের বশে আমি আমার নূতন বই “দি কর্টিনেণ্ট অফ. সাসি'-তে 
লিখিয়াছি ₹- 

“00 55 2১ 10৬০1201000 01 0116 70255810172] 1116 01£1010005 6)০002 

121701191) 116072609 71101) 6০০1০ 01513200011 [7110009 10 50011, 

চো।ণু 115 17079206100 10610) €0 1700950 01১১ 10৮৪ ০1 14010106 1 2. 

13০172911 17170077509010, 204. 01105 1060 6505051000 0109 01 055 

17991 109020110] [02555109102] 00652010129 111 নেচার 2150 1109 6৬9] 

3০10 118 1)150070-7+ 
অথচ ইহার কাহিনী বাহিরের লোকের কথা দূরে থাকুক, বাালীর কাছেও 
প্রায় অজ্ঞাত। সুতরাং উহ! বলা আবশ্যক | 

দ্বিতীয়ত, উহাতে একটা মানসিক শান্তি এবং সুখের প্রশ্রও 
আছে। আজ বাঙালী জীবন সব দিকেই বিভ্রান্ত ও বিপর্যস্ত । ইহার 
ফলে সব দিকেই বাডালীর অধোগতি হইতেছে, অন্ততপক্ষে তীব্র 
অসন্তোষ এবং চিন্তবিক্ষোভ যে সকলের মধ্যেই দেখা দিয়াছে 
তাহাতে সন্দেহ নাই। এই সময়ে পুরাতন কীতির কথা স্মরণ করিয়া 
যদি উদ্ভম ফিরিয়া পাওয়া যায়, তাহা হইলে সেই চেষ্টা করা আবশ্যক । 
আর উদ্ভম না আসিলেও পুরাতন স্থুখের কথা স্মরণ করিয়া যদি শুধু 


২৬ বাঙালী জীবনে রমণী 


সাস্তবনা পাওয়। যায়, সে-স্যোগই অবহেল! করিব কেন ? 

নিজের দিক হইতে অন্তত একটা কথা বলিতে পারি। আমি 
আজ পঁচিশ বগসর বাংলা দেশ ছাড়া, দিল্লীপ্রবাসী, একদিনের জন্যও 
কলিকাতায় ফিরিয়া যাই নাই। তবু খবরের কাগজে, অন্য লেখায়, বা 
কথাবাতঁয় বাঙালীর বর্তমান অবস্থার যে সংবাদ পাই তাহাতে মনে 
ঘোর নিরুতসাহ আসে, অধীর হইয়া পড়ি । কিন্তু এই অবস্থায় যখন 
আমাদের সেই সাহিত্য পড়ি বা গান শুনি, ও পুরাতন জীবনযাত্রার 
কথা স্মরণ করি তখন অনেক সময়েই অঞ্সংবরণ করিতে পারি না। 
ইহাতে ছুঃখ এবং স্তুখ ছুইই থাকে । যদি এই ধরনের অনুভূতি পাঠকের 
মনে আনিয়া একটাও সান্ত্বনার স্থল দেখাইতে পারি তাহা হইলেও বইটা 
লেখ৷ সার্থক মনে করিব । 

আমি জানি এই ধরনের কথা কলিকাতার বিজ্ঞ ব্যক্তিদের ভাল 
লাগিবে না। ইহারা অতান্ত বেশী 'ইণ্টেলেকৃচুয়্যাল' । কিন্তু এই 
মনোভাব বত'মান যুগের উর ইউরোগীয় “ইন্টেলেক্‌চুয়্যালিজমে'র এতই 
ক্টীণ ও শৌখীন অনুকরণ যে ইহাকে ঢং ছাড়া কিছু বলা কঠিন। ইহার! 
সারতর (সাখত ) কপচান, কিন্তু জর্জ সার 'লা মার ও দিয়াবলে'র মত 
বই-এর রসোপলব্ধি করিতে পারেন না। 

স্থতরাং ইহারা অতীতের প্রতি আমার এই শ্রীতি দেখিয়া 
আমাকে স্বপ্নবিলামী “একস্ষেপিস্ট” বলিয়া ভুচ্ছ করিবেন সন্দেহ নাই। 
এই বাস্তববাদ ও বাস্তববাদী-সম্প্রদায়ের খবর আমি রাখি। ইহার! 
কার্ধকলাপে বিন্তবানের জীবনযাপন করেন- মোটা বা দোহারা 
মাহিনা পান, ভাল বাড়ীতে থাকেন, ভাল গাড়ীতে চড়েন, ভাল খান, 
দুঃখকষ্টের সহিত কোনও সংশ্রব রাখেন না-_মা বা ভাইবোনের 
দারিত্্যের সঙ্গেও নয়; আর কথাবার্তায় ইহারা ধারকরা পাকামে 
দেখাইয়া! পাশ্চাত্য বুক্নী আওড়ান, এবং পাশ্চাত্য “ইণ্টেলেকচুয়্যাল'দের 
শুকবৃত্তি করেন। ইহারা আমাদের সেই প্রাণহীন, জড়তাপ্রাপ্ত পুরাতন 
নৈয়ায়িক বা স্মার্ত-_নৃতন চেহারায় । 


বিষয়টা কি? ২৭ 


আবার এই বাস্তববাদীরা সামান্য একটু অভাবের সম্ভাবনা দেখিলে, 
চাকুরি যাইবার আশঙ্কা হইলে কত কেঁউ কেউ করিয়া কত হাত কচ- 
লাইতে পারেন, তাহার খবরও আমি কিছু কিছু রাখি । 

সুতরাং ইহারা ষদি আমাকে “রিয়্যালিজম্ বজিত “এক্ষেপিন্ট' বলেন 
তাহা হইলে আমি ভীত বা! সম্কুচিত হইব না । তীহাদের বাস্তবের সহিত 
আমার কোনও কারবার নাই। আসল বাস্তব যেকি তাহা আমি 
দিল্লীতে পঁচিশ বসর মোরি-দরজায় থাকিয়া মর্মে মর্মে বুঝিয়াছি। 
১৯৪৮ সন হইতে বৎসরের পর বৎসর বিষ্ঠার গন্ধ ক্রমাগত নিশ্বাসের 
সঙ্গে পাওয়ার ফলে মরিতে বসিয়াছিলাম। বাস্তবের প্রতি আমার 
বিন্দুমাত্র আসক্তি নাই--অন্ততপক্ষে এদেশের বাস্তবের প্রতি। আমি 
সথদূর ছায়াপথের দিকে তাকাইয়া মানস ছায়াপখেই বসিয়া থাকিব। এই 
প্রত্যক্ষ ও মানস ছায়াপথের আলোই জীবনের প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও 
ভালবাস! অক্ষুণ্ন রাখিয়াছে। আজিকার বাঙালী বুদ্ধিজীবীর সব চেয়ে 
বড় দোষ প্রাণহীনতা ৷ রবীন্দ্রনাথ এই তোতাদের জন্য তোতাকাহিনী 
বৃথাই লিখিয়াছিলেন। 

ইহ! হইতেই বোঝা যাইবে যে, আমি গবেষণা বা তত্বের বই লিখিতে 
বসি নাই। সামান্য তথ্যাদি হয়ত বইটাতে থাকিবে, কিন্তু এই তথ্য 
দিবার জন্য বইটা লিখিত হইবে না। আসল উদ্দেশ্য আধুনিক বাঙালীর 
প্রাণ স্পর্শ করা। 

তাহা ছাড়া বইটার বিষয়বস্তুর কথাও মনে রাখিতে হইবে। 
বইটার প্রধান বিষয় শ্ত্রী-পুরুষের সম্পর্ক। এই সম্পর্ক চিররহস্যময়। 
প্রেম বা ভালবাসা বুঝাইবার বা বুঝিবার জিনিস নয়, উপলব্ধির 
জিনিস। ভ্ভানের দ্বারা উহার অর্থ কোনও দিন কেহই আবিষ্ষার 
করিতে পারিবে না। সে চেষ্টা কেহ করিয়াছে কিন! তাহাও সন্দেহের 
বিষয়, করিয়।৷ থাকিলেও উহা যে সফল হয় নাই তাহা সনিশ্চিত। কবি, 
ওপন্যাসিক, এমন কি সমালোচকও এই রহস্যের মোহে মুগ্ধ হইয়া 
উচ্বার চারিদিকে ঘুরিয়া স্তব করিয়া! বেড়াইয়াছে, কেহ বা “ক্ষুধিত 


২৮ বাঙালী জীবনে রমণী 


পাষাণের মেহের আলির মত চীগকার করিয়াছে, “তফাৎ যাও, তফাৎ 
যাও। সব ঝুট হ্যায়।” 

কাহাকেও তফাৎ যাইতে না বলিলেও আমিও হয়ত স্তবের বেশী 
অগ্রসর হইতে পারিব না। ইহাতে ক্ষোভ বা লজ্জা নাই, কারণ 
বইটার বিষয় যাহা, তাহাকে লইয়া এর বেশী কিছু করিবার শক্তি কাহারও 
নাই। 


প্রথন্ন পিচ্ছেল্ 
কাম ও প্রেম 
নরনারীর সম্পর্কের যে নূতন ধারণা বাঙালী আধুনিক কালে সৃষ্টি 
করিয়াছিল তাহার বিবরণ দিবার আগে পূর্বযুগের ধারণার সহিত, 
উহার প্রভেদের মূল সূত্রটা ধরাইয়া দেওয়া প্রয়োজন । সুত্রটা দিব। 
কিন্তু ধরাইবার জন্য শুধু ব্যাখ্যা করিবার আগে ছুই যুগ হইতে দুইটা 
দৃষ্টান্ত দিলে প্রভেদটা পাঠকের মানসিক অনুভূতির মধ্যেই স্পষ্ট 
হইয়া উঠিবে, শুধু ধারণাতেই আবদ্ধ থাকিবে না। যুক্তির সাহায্যে 
বোঝা অপেক্ষা অনুভূতির সাহায্যে বোঝা অনেক সহজ | জ্রীলোক, 
দেখিলে পুরুষের মনে কি ভাব জাগে তাহার বনু বর্ণনা বাংলা সাহিত্যে 
আছে। আমি প্রথমে পূর্বযুগের কাব্য হইতে একটি উক্তি দিতেছি 8 


“গিয়াছিন্থ মরোবরে সান করিবার তরে 
দ্রেখিরাঁছি একজন অপরূপ কাঁমিনী। 
চক্ষু মুখ পদ্মছন্দ কিবা ছন্দ কিবা বন্ধ 
নীলাম্বরে ঝঁঁপে তন্থ মেঘে যেন দামিনী ॥ 
ঈশ্বর সদয় হন দূতী মিলে একজন 
এই ক্ষণে তার কাছে যায় দ্রুতগামিনী। 
যত চাহে দিব ধন দিব নানা আভরণ 


কোঁন মতে মোর সঙ্গে বঞ্চে এক যামিনী 1৮ 

কবির নাম বলিব না, তাহা হইলে পাঠক শুধু জনপ্রচলিত 
ধারণার বশে কবিতাটির প্রতি অবিচার করিবেন। আমি যুবাবয়সে 
আমাদের সময়কার প্রচলিত নৈতিক ও সাহিত্যিক সংস্কার কাটাইয়! 
এই কবির অত্যন্ত ভক্ত হইয়া উঠি। আমার প্রথম প্রকাশিত রচনা 
_-তাও আবার ইংরেজী ভাষায়- ইহারই সম্বন্ধে । সে ১৯২৫ সনের 
কথা। তখন এই কবিতাটি আমার খুব ভাল লাগিয়াছিল। তাই 
আমার পূর্বতন শিক্ষক ও সাহিত্যগুর মোহিতলাল মজুমদারের 
কাছে আবৃত্তি করি। তিনি এটাকে একেবারে ছুয়ো দিয়া, অতি 


৩০ বাঙালী জীবনে রমণী 


ছোটলোকের উপযুক্ত বলিয়া মুখ ফিরাইয়া নেন। আমি অপ্রতিভ 
হইলাম বটে, কিন্ত্র মত বদলাইলাম না। এই যুগেও ইহাকে ভাল 
কবিতা বলিলে অনেকে মুখ সিঁটকাইবেন, যদিও আধুনিক বাংলা 
লেখায় অত্যন্ত নোংর! ব্যাপারও তাহাদের কাছে পীড়াদায়ক না! হইতে 
পারে। আসল কথা কি, আমাদের শ্লীল-অশ্লীলের ধারণা সাময়িক 
ফ্যাশনে হয়, এর চেয়ে গভীর কোন অনুভূতির দ্বার! হয় না । যে কবিতাটি 
উদ্ধৃত করিলাম উহা! আজিকার যুগধর্মের বিরোধী হইতে পারে, কিন্তু 
উহাতে নারী সম্বন্ধে যে ধারণা ব্যক্ত হইয়াছে উহা সম্পূর্ণ গ্রাহ্য, এমন 
কি স্বন্দরও হইতে পারে। ইহার ছন্দ, ধ্বনি, ও ভাষার অনবদ্যত 
অসাধারণ । 
এখন আধুনিক যুগ হইতে এই বিষয়েরই আর একটা দৃষ্টাস্ত দেওয়া 
যাক 8 
“বিধি ডাগর আখি যদি দিয়েছিল 
সেকি আমারি পানে ভূলে পড়িবে না ॥ 
ছুটি অতুল পদতল রাতুল শতদল 
জানি না কি লাগিয়া পরশে ধরাতলঃ 
মাঁটির পরে তার করুণ] মাটি হল__ 
সে পদ মোর পথে চলিবে না ॥ 
তব ক£-'পরে হয়ে দিশাহারা 
বিধি অনেক ঢেলেছিল মধুধার! | 
যদ্দি ও মুখ মনোরম শ্রবণে রাখি মম 
নীরবে অতিধীরে ভ্রমরগীতিসম 
ছু কথা বল শুধু পপ্রয়? বা “প্রি়তম' তাহে তো! কণ! মধু ফুরাবে না । 
হাসিতে সুধানদী উছলে নিরবধি, 
নয়নে ভরি উঠে অমৃতমহোদধি__ 
এত সুধা কেন স্থজিল বিধি, যদি আমারি তৃষাঁটুকু পূরাঁবৰে ন11” 
দ্বিতীয় দৃষ্টান্তটি সম্বন্ধে একট! জিনিস লক্ষ্য করিবার বিষয় আছে। 
উহার ভাষা, ছন্দ, উপমা অলঙ্কার, প্রকাশরীতি সবই খাঁটি বাংলা-_- 


কাম ও প্রেম রি 


এইসবে বিদেশী কৌটকা গন্ধ একটুও নাই, তবু উহার অনুভূতি সম্পূর্ণ 
স্বতন্ত্র। এই ছুই রকমের দুইটা অনুভূতিকে সংজ্ঞাবদ্ধ করিবার জন্য 
দুইটি শব্দ ব্যবহার করিব। বলা যাইতে পারে, প্রথম কবিতাটিতে যে 
মানসিক বৃত্তি প্রকাশ পাইয়াছে উহা! “কাম” ও দ্বিতীয়টিতে যাহা 
প্রকাশ পাইয়াছে উহা 'প্রেম' । 

“কাম” কথাটা ব্যবহার করিলাম বলিয়া অনেকের অসন্তোষ 
হইবে তাহা জানি। ইহাদের সর্তত্র দেখিতে পাই- ইহারা 
নিজেদেরকে হিন্দু বলিয়া পরিচয় দিতে লজ্জা বোধ করেন অথচ 
জ্যোতিষী ও পুরোহিতের পদলেহন করেন; ভূল অর্থে 'যৌন' কথাটা 
ব্যবহার করিয়া ভাবেন খুব আধুনিক, পাশ্চাত্য, প্রগতিশীল ও বিপ্লবী 
হইয়াছেন; কামশীাস্ত্র বা রতিশান্ত্রকে 'যৌনবিজ্ঞান” নাম দিয়া বৈজ্ঞানিক 
হইবার চেষ্টা করেন; এমন কি “যৌন, যৌন, করিয়৷ চেঁচাইয়। 
ভদ্রলোককে অপ্রতিভ করিয়া ভাবেন ফরাসী ভাষায় যে বাহাছ্বরিকে 
“032,667 165 1995756015৮ বলে তাহার হদ্দমদ্দ করিলেন। ই'হাদের 
মুখে কাম” কথাটা আসিবে না, ইহাদের কলমে উহা সরিবে না । 

যখন বলিলামই তখন ব্যাপারটা আরও একটু পরিফষারই করি। 
“যৌন, কথাটার সংস্কৃত অর্থ কি তাহা বলিয়৷ দেওয়া দরকার । উহার 
বুুৎপন্ডি যাহাই হউক, রূঢ় বা প্রচলিত অর্থ ছাড়াইয়াছিল “বৈবাহিক' ; 
অর্থাৎ পাগ্ডুৰ ও পাঞ্চালের মধ্যে সম্পর্ক যৌন-সন্বন্ধ। এই অর্থ ধরিয়া 
কেহ যদি শ্যালককে “যৌন সন্বন্ধী” বলেন তাহা হইলে অন্যায় হইবে 
না। কিন্তু আধুনিক অর্থে ইহা বলিলে কখনই যুবক-শ্যালকের প্রতি 
ভদ্রোচিত- মনোভাব দেখানো হইবে না। শ্্রীরও রাগিয়৷ যাইবারই 
কথা । সেকালে বাডালী মেয়েরা ননদকে লইয়া একটা স্থল রসিকতা 
করিত, কিন্তু ননদের স্থলে নিজের ভাইকে বসাইতে নিশ্চয়ই অগ্রসর 
হইত না। 

অবশ্য অতি আধুনিক প্রগতিশীল ব্যক্তিদের ছাড়িয়া দিলেও 
অনেক ভদ্র হিন্দু আছেন ধাহারা কাম কথাটা প্রয়োগ করিতে সঙ্কোচ 


৩২ বাঙালী জীবনে রমণী 


বোধ করেন। ইহার কারণ কথাটার অর্বাচীন' প্রয়োগ ও ব্যপ্রনা। 
আমলে “কাম” শবের দারা স্্রী-পুরুষের স্বাভাবিক জৈব আকর্ষণ মাত্র 
বুঝায়। কিন্তু আধুনিক কালে শব্দটার অধোগতি হইয়াছে । এখন 
'কাম' কামের বিকৃত ও অসংঘত রূপ সম্পর্কেই ব্যবহৃত হয়। এই 
আশ্নেষ ছাড়াইয়া উঠাই ভাল । তাহ! না হইলে স্ত্রী-পুরুষের সম্পর্ক 
আলোচনা করিবার জন্য একটা অতিপ্রয়োজনীয় কথা হইতে বঞ্চিত হইব। 

তবে এইসব প্রসঙ্গ লইয়া আলোচনা একটু অবহিত হইয়া কর! 
দরকার, নহিলে উহা! বেলেল্লাপনা হইয়া দাড়াইতে পারে। কাম 
ঘুণা বা লজ্জার বিষয় না হইলেও উহা! লইয়! দেশকালপাত্র নিবিশেষে 
কথা বলা যায় না। এমনকি আমি মনে করি, আসরে বা আড্ডায় 
উহার প্রকাশ্ট আলোচনা সাধারণত না| হওয়াই ভাল। যে-্তুরে 
কামের আলোচনা হওয়া উচিত সে-স্থর ভিড়ের মধ্যে বাজে না। 
এমন কি শ্ত্রী-পুরুষের প্রেমপ্রকাশের যে-সব দৈহিক ভঙ্গী আছে, 
তাহাও প্রকাশ্যে হাস্যরসাত্মক হইয়া দীড়ায়। এযুগে নরনারীর 
চুম্ঘন-আলিঙ্গন পাশ্চাত্যে প্রায় লোক ডাকিয়া তামাশা দেখাইবার মৃত 
হইয়াছে । বিলাতে, ফ্রান্সে ও অন্যত্র এইটা দেখিয়া আমার অত্যন্ত 
বিসদৃশ লাগিয়াছিল। 

কেন্বিজে নদীর ধারে বেড়াইবার সময়ে একদিন দেখিলাম, 
ভিড়ের মধ্যে ঘাসের উপর বসিয়া একটি প্রো একটি প্রৌঢ়াকে 
আদর করিয়া কান কামড়াইতেছে। ছুইটি সমান কুপ্রী, সমান মোট! 
ও সমান লাল। ডানদিকে অদূরে বিরাট কিংস কলেজ চ্যাপেল। 
সেখানে ধর্মসঙ্গীত শুনিয়া ও উপাসনায় উপস্থিত থাকিয়া আমার মনে 
হইয়াছিল, আমি যে হিন্দু, যদি কোথাও আমারও খুষ্টান হইবার 
ইচ্ছা জাগিতে পারে, তবে সে এই গির্জায় । তাহারই ছায়ায় এই 
দৃশ্য । তখন বুঝিলাম সপুদশ শতাব্দীতে ইংরেজ কবি সাক্‌লিং কেন 
লিখিয়াছিলেন-__ 


কাম ও প্রেম ৩৩ 


€]056 15 00০ 9.0 

01 ০৮০৮ 17626 

161021103 2, 002 ড7116127125 10906 ০1959 5 

/0 00015 0০8 019180 ভ1)0% 1019 16 19096.” 


সে-যুগে ইংরেজের জীবন ছিল, শক্তি ছিল, স্পঙ্টবাদিতার সাহস 
ছিল; শালীনতাও ছিল, তবে উহা অশালীনকে যেমন কুকুর তেমন মুণ্ডর 
দিতে কুণ্িত হইত না। 

এই সব ব্যাপার স্বাভাবিক সঙ্কোচের ব্যাপার । এগুলির সম্পর্কে 
যাহা সর্বদাই মনে রাখা উচিত তাহা এই__দেহ এবং দৈহিক কার্যকলাপও 
শ্রদ্ধেয়, বাচালতা ও অশ্লীলতার দ্বারা এই শ্রদ্ধার হানি হয়, সত্য তো 
একেবারেই প্রকাশ করা যায় না। 

তবে ছাপায় বলা ও সম্মুখে বলাতে প্রভেদ আছে। সংস্কৃত অর্থে 
অশ্লীলতা না করিলে এবং জনপ্রচলিত অর্থে অসভ্যতা না করিলে মানব- 
দীবনের সব দিক লইয়াই আলোচন! করিবার অধিকার লেখকের আছে। 
এই কাজে লেখক একাকী, পাঠকও একাকী । বিষয় যাহাই হউক, 
মানসিক আদান-প্রদান যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু হইতে পারে, শ্রদ্ধার 
আক্রু ঘুচে না । 

ইহার উপরেও কথা আছে। আমার নিজের অভিজ্ঞতায় 
দেখিয়াছি, যদি যথাযথভাবে আলোচনা করা যায় তাহা হইলে 
আসরেও কামের প্রসঙ্গ সঙ্কোচের কারণ হয় না। আমি দিল্লীতে 
একদিন জনত্রিশেক বাডালী ভদ্রলোক ও ভদ্রমহিলার সম্মুখে কাম 
ও প্রেম সম্বন্ধে কিছু বলিয়াছিলাম। ইহাদের মধ্যে, নাবালক না 
হইলেও, অনেকের বয়স কম ছিল।- তবু এই বিষয়ে অগ্রসর হইয়া 
টাকাঢাকি বা চোঁখ টিপিয়া ইশীরা করিলে ব্যাপারটা অশোতন 
হইত, তাই প্রয়োজনমত স্পষ্ট কথা বলিতে ইতস্তত করি নাই। তবু 
সকলে, বিশেষত মেয়েরা যেভাবে আমার কথা শুনিয়াছিলেন তাহাতে 
আমি মুগ্ধ হইয়াছিলাম। আমার একটা ধারণা আছে যে, অশ্লীলতা 


৩ 


৩৪ বাঙালী জীবনে রমণী 


পুরুষের স্বাভাবিক বাদরামি ; মেয়েদের এটা স্বভাবত আসে না, শিক্ষার 
দোষে হয়। | 

এই বই-এ অনেক স্পষ্ট কথা বলিতে হইবে, অথচ বাঙালী 
সমাজে এখনও এক ধরনের শুচিবায়ু উগ্রভাব বত্মান। তাই এই 
সাফাই আগেই গাহিয়! রাখিলাম। এখন প্রসঙ্গে ফিরিয়৷ আসা যাক । 
কাম কি? 

কামকে তুচ্ছ করিব, এমন মুঢ়তা আমার এখনও হয় নাই, কারণ 
তাহা হইলে জীবনকেই তুচ্ছ করিতে হইবে । জীব যেদিন “প্রোটোজোয়া' 
হইতে “মেটাজোয়া”তে উন্নীত হইয়াছে সেইদিন হইতেই সে কাম, 
অর্থাৎ স্ত্রীজাতীয় ও পুরুষজাতীয় জীবের পরস্পরের প্রতি বিশেষ একটা 
আকর্ষণেরও দাস হইয়াছে । ইহা ছাড়া কামকে পাপ বলিয়া প্রচার 
করিয়া উহাকে হেয় বা ঘ্বণা বলিব সে নির্বুদ্ধিতাও আমি দেখাইব না। 
এই অস্বাভাবিক 'মর্যালিটি” আমার 'মর্যালিটি” নয়। মহাত্মা গান্ধী 
এ বিষয়ে যে বাড়াবাড়ি করিয়াছেন, তাহা হিন্দুধর্ম হইতে আসে নাই, 
আসিয়াছিল খুইটধর্মের সন্ন্যাস হইতে। ভ্ত্রী-পুরুষের সন্থন্ধের ব্যাপারে 
মহাত্মা গান্ধীর মতের উল্লেখ করিয়৷ বারট্রাণ্ড রাসেল একদিন আমার 


কাছে একট! কঠিন উক্তি করিয়াছিলেন ; তিনি বলিয _ 1015 
$112 1770721165. কথাটা রূঢ় হইলেও উহার যাথার্থ্য আমি অস্বীকার 
করিতে পারি নাই। 


মহাত্মা গাঙ্গীর মতের সহিত এ বিষয়ে বঙ্কিমচন্দ্রের মত তুলনা 
করিলে.বিস্সিত হইতে হয়। তিনি তাহার উপন্যাসের একটি পাত্রকে 
দিয়া লেখা ইয়াছেন,_ 
“যেবৃত্বির কল্পিত অবতার বসন্তসহাঁয় হইয়াঃ মহাদেবের ধ্যানভঙ্গ করিতে 
গিয়াছিলেন, ধাহার প্রসাদে কবির বর্ণনায় মৃগের! মৃগীদিগের গাজর 
গাত্রকণডয়ন করিতেছে, করিগণ, করিণীদিগকে পদ্মম্ণাল ভাঙ্গিয়! দিতেছে, 
সে রূপজ মোহ মাঁজ। এ-বুত্িও জগদীশ্বর প্রেরিত! ; ইহা দ্বারাও সংসারের 
ইষ্টাধন হইয়া! থাকে, এবং ইহা সর্বজীবমু্ধকারী। কালিদাস, বাইরণ, 
জয়দেব ইহার কবি) বিদ্বানুন্দর ইহার ভেঙ্গান। কিন্তু ইহা প্রণয় নহে।” 


কাম ও প্রেম ৩৫ 


ইহার চেয়ে একাধারে সত্য ও উদ্দার উক্তি কল্পনা করা যায় না।' 

কাম সম্বন্ধে ধীরভাবে চিন্তা করিলে দেখা যায়, উহার উচ্চ-নীচ, 
ভদ্র-ইতর, শ্রদ্ধেয় ও ঘৃণ্য, লোকোত্তর ও লৌকিক__নানা রূপ আছে। 
নিন্বস্তরের কামও আবার বিভিন্ন হইতে পারে__যেমন, সাধারণ 
লোকের কাম স্বাভাবিক কিন্তু একেবারে ছ্যাচড়া ; কিন্তু কাহারও 
মধ্যে উহা অস্বাভাবিক ও জুগুপ্নাজনক হয় । এই জাতিভেদ বুঝাইবার 
জন্য যে আলোচনার কথা বলিয়াছি উহাতে আমি একটা দৃষ্টান্ত দিয়া- 
ছিলাম। তাহার উল্লেখ করিব, যাহাতে পাঠক বাপারটার খানিকটা 
শীচ করিতে পারেন। 

আমি ভদ্রলোকদের জিজ্ঞাসা করিলাম, তাহারা ধেনো মদ 
খাইয়াছেন কিনা । সকলেই হাসিলেন। তাহাতে বুবিলাম অন্ততঃ 
জিনিসট! কি ইহাদের জানা আছে। তার পর একটি স্ফটিকের পাত্রে 
একটু ভি-এস্-ও-পি গ্রাদ-ফিন্শ পাঞ কনিয়াক ঢালিয়া একজনকে 
দিয়া বলিলাম__এটুকু খাইয়া আপনি আমাকে বলুন লোকে যাহাকে 
“মদ” বলে এই জিনিসটা সেই বস্ত্র কিনা। অবশ্য অত্যন্ত অনভিজ্ঞ 
ব্ক্তিরও এই প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্থবিধা হইবার নয়। ধেনোমদে 
ও উচ্চশ্রেণীর কনিয়াকে যে তফাত ছোটলোকের কামে ও ভদ্রলোকের 
কামে ঠিক সেই তফাত | 

কিন্তু উচ্চস্তরের কামের ধারণা কেহই আধুনিক, বিশেষত বর্তমান 
যুগের ইউরোপীয় সাহিত্য পড়িয়া করিতে পারিবেন না। দৃষ্ীস্ত 
স্বরূপ ডি-এচ.-লরেন্সের “লেডী চ্যাটারলীজ লাভার”-এর উল্লেখ করা 
যাইতে পারে । উহা! অতি ছোটলোকের ব্যাপার । আমাদের মধ্যে, 
বিশেষ করিয়া ইংরেজী সাহিত্য সম্বন্ধে যাহারা নিজেদেরকে অত্যন্ত 
ফ্যাশনেবল মনে করেন তাহাদের মধ্যে, কয়েকটি জাতগোলাম 
আছেন ধাহাদের কাছে পাশ্চাত্যের আস্তাকুড়ও ফুলের বাগান। আমি 
চল্লিশ বতম়র পূর্বে আরেতিনে! হইতে আরম্ভ করিয়া কাসানোতা, 
ফ্যানি হিল অবধি পড়িয়া হজম করিয়া ফেলিয়াছি। সুতরাং 


৩৬ বাঁঙালী জীবনে রমণী 


পাঠককে এই কথাটা বিশ্বাপ করিতে বলিব যে, ইউরোপীয় 
আদিরসাত্মক লেখা মোটের উপর পর্ণোগ্রাফী” মাত্র, ডি-এচ-লরেন্দের 
উপন্যাসটিও সেই শ্রেণীর অন্তভূক্ত। এই বিষয়ে আর কিছু বল৷ 
এখানে সম্ভব নয়। যাহারা আমার এই মত প্রকাশে একেবারে 
ক্ষিপ্ত না হইয়া আরও কিছু জানিতে চান তাহাদিগকে আমার নূতন 
বই “দি কণ্টিনেন্ট অফ. সাস্সি”তে আমি ডি-এচ-লরেন্ন জন্বন্ধে যাহা 
বলিয়াছি তাহা৷ পড়িতে অনুরোধ করিব। আমার মন্তব্য এই বইএর 
২০২ পৃষ্ঠায় পাইবেন। 

ইউরোপের বেশীর ভাগ আদিরসাত্মক লেখাই কেন পর্ণোগ্রাফি 
তাহার উপযুক্ত কারণ আছে। ইউরোপীয়েরা রোমান্টিক প্রেমের 
অনুভূতি পায় মধ্যযুগের মাঝামাঝি সময়ে । তাহার পর কামের 
যতটুকু প্রেমের মধ্যে অন্তনিহিত থাকে সেইটুকুকে বাদ দিয়া, কামের . 
বাকীটুকুকে সংস্কৃত করিবার প্রবৃত্তি তাহাদের রহিল না, উহা নানা- 
রকমের স্থল রসিকতা, এমন কি অসভ্যতাতেও পরিণত হইল । 
স্থতরাং কাম হইয়া গেল নীতির দিক হইতে বর্জনীয় অথচ মানুষের 
স্বাভাবিক বৃত্তির দিক হইতে অপরিহার্য । ইহাতে ইউরোপে 
নরনারীর সম্পর্কের এক দিকে একটা পোশাকী রূপ আর এক দিকে 
একট] ইতর রূপ, এক দিকে একট! সাজানো সদর ও আর এক দিকে 
লোকচক্ষুর অন্তরালে একটা আবর্জনাবহুল অন্দর দেখা দিল। ইহার 
ফলে রোমান্টিক প্রেমের মূলেও যে কাম আছে, তাহার উপলব্ধি হইল 
না, এবং নির্ভল! কামও যে সুন্দর ও গৌরবের বস্ত্র হইতে পারে সে 
ধারণাও রহিল না। দুইটা তেল-জলের মত ভাগ হইয়া বিভিন্ন 
স্তরে রহিল। 

এই বিভাগের একটা দৃষ্টান্ত দিব। যোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি 
ফরাসী সমাজ যেরূপ ছিল, তাহার বর্ণনা গ্ভ ব্রাতোমের কাহিনীতে 
আছে। উহা অতিশয় অশ্লীল পুস্তক। ইহাতে ফ্রান্সের রাজা দ্বিতীয় 
হেনরী ও ডায়ানা! অফ পোয়াতিয়ের্স হইতে আরন্ত করিয়া সমস্ত 


কাম ও প্রেষ ৩৭ 


অভিজাত স্ত্রী-পুরুষ সম্বন্ধে যে-সব গল্প আছে তাহার কদর্যতার কোন 
আভাস দেওয়াও সম্ভব নয়। কিন্তু তাহার প্রায় একশত বৎসর 
পরেই এই সমাজ এবং এই সমাজের ঘটনা লইয়া মাদাম দ্য লাফাইয়েৎ 
একটি উপন্যাস লিখিয়াছিলেন। উহার নাম “প্রিন্সেস অফ ক্রেভস্” 
( ইংরেজী নাম দিতেছি, ইংরেজী অনুবাদ আছে কিনা তাহা আমার 
জান! নাই); উহা! ফরাসী সাহিত্যের একটি শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। সমস্ত 
বইএ একটি অভব্য কথা বা ইঙ্গিত পর্যন্ত নাই-_-ইহার পবিত্রতা ও 
সৌরভ একসাজি যুই ফুলের মত। 

একদিন এ বিষয়ে আমার সঙ্গে একজন বিশিষ্ট ইংরেজ মহিলার 
কথা হইতেছিল। তিনি ইডিথ সিট্ওয়েল ও স্যর অসবার্ট সিটওয়েলের 
ভাতা স্তাশেভেরেল সিট.ওয়েলের পত্বী। তৃতীয় সিট.ওয়েলও স্বনাম- 
খাত লেখক। মিসেস সিটওয়েল প্রিন্সেস অফ. ক্রেভ্‌স্ণর উচ্ৃসিত 
প্রশংসা করার পর আমি বলিলাম মাদাম ছ্ লাফাইয়েৎ সে- 
সমাজের যে বর্ণনা দিয়াছেন তাহা পড়িয়া আমি আশ্চর্য হইয়াছিলাম, 
কারণ উহার এঁতিহাসিক বর্ণনা আমার কাছে ছ্ঘ ব্রাতোমের মত মনে 
হইয়াছিল। আমি অবশ্য সেই সমাজের আচারব্যবহার ও মানসিক 
ধর্মের কথা সাধারণভাবে স্মরণ করিয়াই এই কথা বলিয়াছিলাম, 
কোনও বিশেষ ঘটনা-_কদর্ধ বা কলুষিত_তাহার কথা মনে করি নাই। 
কিন্তু মিসেস সিট ওয়েল দ্ভ ব্রাঁতোমের উল্লেখে যেন শিহরিয়া 
উঠিলেন; তিনি আমাকে বলিলেন, “[ ৭07৮৮ ০০০ 1০7 ৫ 
1312701)6- বুঝিলাম, ছ্য ব্রাতোমের ইতর .কাম, মাদাম ছা 
লাফাইয়েতের প্রেম আলাদা হইয়া গিয়াছে । 

বাঙালীর মনের উপর উনবিংশ শতাব্দীর প্রারস্তে ইউরোপীয় 
সভ্যতার প্রভাব পড়িবার আগে স্ত্রী-পুরুষের সম্পর্ক সন্বন্ধে যেসব ধারণা 
ও দেশাচার প্রচলিত ছিল সেসব প্রাচীন হিন্দু ধারা ও আচরণেরই সহজ 
অর্থাৎ গ্রাম্য বা বিকৃত রূপ। স্থতরাং প্রথাগত ধারার বৃত্তান্ত দিতে 
হইলে আরম্ভ করিতে হইবে প্রাচীন ভারতীয় রূপের পরিচয় দিয়া । 


৩৮ বাঙালী জীবনে রমণী 


গোড়াতেই বলিতে হয়, প্রাচীন ভারতবর্ষে নরনারীর বিশিষ্ট 
সম্পর্কের কাম ব্যতীত অন্য রূপ আবিষ্ষারই হয় নাই। ইহার প্রমাণ 
হিসাবে কামসুত্রের উল্লেখ করিতে পারিতাম, এবং করা যুগধর্মসঙ্গত 
হইত। পাশ্চাত্য জগতে এখন কামসুত্রের বিশেষ ইভ্জ। সেই 
সমাজে ধাহারা ভারতবর্ম সম্বন্ধে খোজখবর রাখেন বা কৌতুহলী 
তাহাদের প্রায় সকলেরই ধারণা যে, কামসূুত্রে হিন্দুদের মধ্যে 
নরনারীর সম্পর্কের সত্য ও বাস্তব চিত্র পাওয়া যায়। এই ধারণা 
ভাঙাইয়া এ দেশের অনেকে বর্তমানে পয়সা করিবার ফন্দী 
আটিয়াছেন। অন্তত ইহা সত্য যে, কামসুত্র এবং গাজার আকর্মণে অনেক 
পাশ্চাত্য নরনারী এদেশে আসিতে আরম্ভ করিয়াছে । ইহাদের 
মধ্যে লোমশ বানর জাতীয় পাশ্চাত্য তীর্ঘযাত্রীগুলির মুতি সহজেই 
চেনা যায়। 

পাশ্চাত্যে কামসুত্রের এত প্রতিপন্তি হওয়া সত্বেও উহ!কে আমার 
বক্তব্যের প্রমাণ হিসাবে উপস্থাপিত করিব না। আমার বিশ্বাস এ 
নয় যে, ইহাতে প্রাচীন হিন্দুসমাজে নরনারীর সম্পর্কের যথাষথ 
বিবরণ পাওয়া যায়। খুব ভাল হইলেও উহা নরনারীর দৈহিক 
সম্পর্কের, এবং এই দৈহিক সম্পর্কের জন্য যতটুকু মানসিক 
গৌরচন্দ্রিকার প্রয়োজন হয় তাহার ব্যাকরণ মাত্র। ভাষার ব্যাকরণে 
যেমন ভাষার প্রাণ পাওয়৷ যায় না, এই ব্যাকরণেও তেমনই নরনারীর 
সম্পর্কের জীবন্ত রূপ পাওয়া যাইবে না। তাহ। ছাড়া কামসূত্র 
খানিকটা পু খিগত লোচ্চামি ছিল তাহাও অসম্ভব নয়। 

স্থুতরাং নরনারীর সম্পর্কের প্রকৃত প্রাচীন হিন্দু রূপ দেখিবার 
জন্য অন্যত্র যাইতে হুইবে। আমার মতে বেদ ও মহাভারত হইতে 
আরম্ত করিয়া সমস্ত সংস্কৃত কাব্যে উহার আসল পরিচয় মিলিবে। 
স্থতরাং আমাদের এই সব বইকেই প্রমাণ বলিয়৷ গ্রহণ করিতে হইবে। 

এই সাহিত্যের সর্বত্র কামকেই নরনারীর সম্পর্কের অবলম্বন 
বলিয়া মানিয়া লওয়া হইয়াছে । কিন্তু সর্বত্র কামের একটি মাত্র 


কাম ও প্রেম ও৪ 


রূপই দেখিতে পাওয়া যায় না। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যাইতে পারে, 
মহাভারতে কামের যে রূপ আছে, উহা! কালিদাসের কাব্যের রূপ 
নয়; আবার কালিদাসে যে রূপ আছে উহা! “দশকুমারচরিতে'র রূপ 
নয়। মহাভারতের কাম স্বাভাবিক, উহাঁতে শক্তি আছে কিন্ত্বী লজ্জা 
নাই, সারল্য আছে কিন্ত্বু বৈদগ্ধ্য নাই__উহার ধর্ম অনেকাংশে আদিম । 
পরবতী যুগের কাব্যে কামের দুইটা রূপ দেখা যায়--উহাদের 
একটাকে “রোমান্টিক রূপ বলা যাইতে পারে, আর একটাকে বলিব 
বৈশিক রূপ। প্দশকুমারচরিতে' কামের যে রূপ দেখি, উহা বৈশিক 
রূপ, কিন্ত 'মেঘদূত” বা 'কাদন্বরী'তে যাহা পাই তাহার রূপ রোমান্টিক । 
যখন একটা ইংরেজী শব্দই ব্যবহার করিলাম, তখন পার্থকাগুলি স্পট 
করিবার জন্য আরও দুইটা ইংরেজী কথা ব্যবহার করিব। বলিব 
মানুষের মন এমনই যে কাম তাহার জীবনের একটা! বড় উপজীব্য হইলেও 
সে শুধু একদিকে 'প্রিমিটিভ+ কাম ও অন্যদিকে “সিনিক্যাল” কাম লইয়া 
তৃপ্ত থাকিতে পারে না-_তৃপ্তির জন্য কামের অন্য একটা রূপ চায় যাহাতে 
প্রাণরস ও মাধুর্য থাকে । সেজন্যই প্রাচীন ভারতবর্ষে কামেরই একটা 
রোমার্টিক রূপ দেখা দিয়াছিল। ইহাতে কাম একটা নূতন সৌন্দর্যে 
উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল। উহাতেও একটা গৌরব আসিল । 
সংস্কৃত সাহিত্যে এই অনুভূতির বহু পরিচয় পাওয়া যায়। আমি 
আমার নূতন ইংরেজী বই-এ এই ব্যাপারটার আলোচনা করিয়াছি। 
কামের অন্য রূপের কথা সকলেরই জানা, কিন্তু এই রোমান্টিক রূপটা 
একেবারে অজানা না হইলেও সম্পূর্ণ তাবে অনুভূত ও উপলব্ধ নয়। 
তাই শুধু ইহারই ছুই-একটা| উদাহরণ দিব । 
প্রথমটি এই-_ 
ঘঃ কৌমারহরঃ স এব হি বরস্তা এব চৈত্রক্ষপা- 
স্তে চোন্মীলিতমালতীস্ুরভয়ঃ প্রৌঢাঃ কদস্বানিলাঃ। 
সা চৈবাশ্মি তথাপি তত্র জুরতব্যাপারলীলাবিধো 
রেবারোধসি বেতসীতরুতলে চেতঃ সমুৎকতে ॥ 


8০ বাঙালী জীবনে রমণী 


শ্লোকটির অনুবাদ না দিতে হইলেই সুখী হইতাম। কিন্তু আমার 
মনে হয় অনুবাদ ন! দিলে আজিকার দিনের বহু বাঙালী পাঠক উহার 
মাধুর্য ও অনবদ্যতা বুঝিতে পারিবেন না । কিন্তু এখানেও আর এক 
বিপদ । আমি সংস্কৃতের বহু বাংলা অনুবাদ পড়িয়া এবং কিছু করিবার 
চেষ্টা করিয়া এই সিদ্ধান্তে পৌছিয়াছি যে, সংস্কৃত কবিতার উপযুক্ত 
অনুবাদ বাংলায় করা সম্ভব নয়, ইহার চেয়ে অনেক সহজে ইংরেজীতে 
হয়। ইহার কারণ এখানে দেখাইতে পারিব না, শুধু পাঠককে আমার 
কথাটা মানিরা লইতে অনুরোধ করিব। তাই আমার কৃত ইংরেজী 
অনুবাদ, যাহ! আমার ইংরেজী বইএ প্রকাশিত হইয়াছে উহাই দিতেছি । 
আমি ইংরেজীতে সংস্কৃত ছন্দ (শার্দুলবিক্রীড়িত অথবা অতিধৃতি ) 
রাখিবার চেষ্টা করিয়াছি। 


50019 179 177 11001021517020) 204 (০0025 1)0913200 116 ! 
1050 076 9207০ 20101510501 50110 0 

[31955015110 1021905 ০০020025 0০112 1010 
001 0.0 51152,0)0 1122৮ 13০02 ॥ 

1, €0০, 00০ 59,006), 90068 5168 1---911111)9 £২০৮০ 2170৮১, 
"০০৮১ ৪ 05৪ 17) (05150. 0206) 

ঠা) 1017. 006 ৮৪টি 50০00 101 ০091105-19062,5193 


৬৬15010]) 15060] 61০95 07০ 17০26 ! 


একবার তরুণীর মুত্তিটি মনে করুন। মণিজাল-গবাক্ষে বসিয়া 
বিন্ধ্যপর্বতের নীলিমা, বিদ্ধ্যবনভূমির শ্যামলতা, শিপ্রা বা বেত্রবতীর 
ধূসর-ধবল ফেনিল ঝ্রোতের দিকে উদাস দৃষ্টিতে চাহিয়া, কেতকী ও 
মধুকের সৌরভে আবিষ্ট হইয়া দয়িতের কাছে বিবাহের পূর্বে কৌমার্য 
হারাইবার স্তুখন্যৃতি স্বপ্পে ফিরাইয়া আনিতেছে। স্থরাজাতীয় 
পদার্থের সঙ্গে আবার স্ভুলন! করিয়া! বলিব, এই কাম কুরাসাও বা 
কোয়াত্রোর মত। | 


কাম ও প্রেম ৪১ 


দ্বিতীয় কবিতাটি এই-__- 
স্বামিন্! ভঙ্ুরয়ালকং সতিলকং ভালং বিলামিন্! কুরু 
প্রাণেশ ! ক্রটিতং পয়োধরতটে হারং পুনর্যোজয় । 
ইত্যুক্তা। স্ুরতাবসানসময়ে সম্পূরণচন্দ্রাননা 
্ষ্টী তেন তখৈৰ জাতপুলকা প্রাপ্তা পুনর্মোহনম্‌ ॥ 
ইহারও যে ইংরেজী অনুবাদ আমি করিয়াছি তাহা দিতেছি) 


[710510200 া1])0 1 019 015 10903017071) 

[0 ৮০20511) 00 002 1010) হঃগ 41110707001 2155 9 
চিত 01015 01)25010010015910১ 550০0611000 1 

91111752000, [০0 01202 2,912 11710 ৪৮০11 01 10:22, 
17910510006) ৪ 25000011116 ভিত 

৪910 00155 10 170] 00109 61013171109 2 ০1096 9 

4৯00 105 1)1]0 €01101700---015670) 00010, হা 0005, 


ঢ1010055 06100011719 ঠা) 2 3০০11 9150 92015 95211 


ইহাকে কামের চেরী-ত্রাপ্ডি বলা যাইতে পারে। 
আর একটি কবিত৷ এই রূপ ( ইহা বসম্তৃতিলক ছন্দে )-- 


ধন্যাসি যা কথয়সি প্রিয়সঙ্গমেহপি 
বিশ্রন্ধচাটুকশতানি রতান্তরেষু। 


নীবীং প্রতি প্রণিহিতে তু করে প্রিয়েণ 
সখ্যঃ! শপামি যদি কিঞ্চিদপি স্মরামি ॥ 
আমার অনুবাদ; 


13155560 ০৮. ! ৮170 ০9. 0126016 9০, 
৮1761) ৮৮10) 500 1০৮০ ০ 115 8 
£& 10000150 01560-0151055, ০০০11%, 
5৮৪1) 118 00105 0001 ! 
00 01215 517015) 81209914 10% 221:59€ 
170 0016 01021) 5015101 2, 172,00৫ 
0) 15705 1! 95752, [১ 00 ০0 3৬72 |, 


1 ? 16107610952 208106, 


৪২ বাঙালী জীবনে রমণী 


ইহাকে বলিব আদিরসের ক্রেম্‌ ছা মাথ। 

এইখানে সংস্কৃত সাহিত্যে নরনারীর সম্পর্কের যে আদিরসাত্মক 
চিত্র আছে, তাহার একটি ব্যতিক্রমের কথা উল্লেখ করিব । উহা দ্বারা 
আমার বক্তব্যেরও সহায়তা হইবে, কারণ কাম ও প্রেমের মধ্যে কি 
পার্থক্য তাহা শুধু এই একটি দৃষ্টান্ত দ্বারাই স্পষ্ট হইয়া উঠিবে। উহা 
ভবভূতির 'উত্তররামচরিত' হইতে । 

সেদিন পর্যন্তও 'উত্তররা মচরিত' সম্বন্ধে আমার একটু অসম্পূর্ণ ধারণা 
ছিল। এমন কি আমি আমার নৃতন বইএও লিখিয়াছি-_- 


“0306 ০56 ৪21 চো 59০1560, 1650166 105 19085 1202৮ 
115100) 150)0৮7 1 50750017105 1051065 11001110151 21019917617 
1, 00102 10:002]10 1700 59300211106, ১০ 0201 11912100815 
10209 10001220102, 15 51110701019 10)011%6, 10 01015 1 20900 
2. 19980165110 58155950016 00650610075 0660 2720 300151155 
চে 00 5206 1706, 01015010000 0£ ০07100221৫০ 
15. [0195910600 2521 200. 010 হা 9090161165720576, 
20 15 19089 01955101005 19, ০1 09100599 0061012, 1২21002,0170155, ০01 


13172.50101710091 
(119 ০০161152106 0£ 01:06, 19, 195 ) 


কিন্তু আজ বলিব, তবস্ভূতি রামসীতার যে-সম্পর্ক দেখাইয়াছেন 
তাহাতে যে শুধু প্রগাট ন্নেহই আছে তাহা নয়, উহার উপর অতি 
উচ্ছলিত প্রেমও আছে। বহু দৃষ্টান্তের মধ্যে শুধু একটি মাত্র দিব। 
রাম জীতাকে নির্বাসন দিবার পর শূদ্রকবধ উপলক্ষ্যে আবার পঞ্চবটা 
বনে আসিয়া সীতার কথা স্মরণ করিয়া “হা প্রিয়ে জাঁনকি ' এই কথ! 
বলাতে অভিমানিনী সীতা “সমনুয-গদ্গদ-স্বরে বলিলেন-_“আর্যপুত্র, 
অসদৃশং খল্বেতদ্চনমন্থ্য বৃত্তান্তস্য ৮ “ভুমি এই যে কথ! বলিলে উহা যাহা 
ঘটিয়াছে তাহার সহিত অসমঞ্জীস 1”-_ অর্থাৎ আমাকে নিরপরাধে ত্যাগ 
করিয়। “প্রিয়া” বলা শোভা পায় না। | 


কাম ও প্রেম ৪৩ 
কিন্তু তখনই অভিমান ত্যাগ করিয়া প্রেমের আবেগে চোখের জল 
ফেলিয়া বলিলেন, _ 


“ভাথ বা কিমিতি বজ্রময়ী জন্মান্তরেঘপি পুনরসভ্ভাঁবিতদুর্লভদর্শনস্ত মামেব 
মন্দভাগিনীমুদ্দিশ্ত বৎসলশ্যৈবংবাদিন আর্ধ্পুত্রস্তোপরি নিরনথক্রোশা 
ভবিস্যামি। অহমেতন্য হৃদয়ং জানামি মমপ্যেষঃ।” 
“না, না, যাহার দর্শন জন্মান্তরেও অসম্ভব বা ছুর্লভ বলিয়া মনে করি 
সেই আধ্যপুত্র যখন মন্দভাগিনী আমাকে উদ্দেশ্ত করিরা এই ভাবে 
ভালবাসার কথ! বলিতেছেন, তখন মামি কি করিরা বজ্রময়ী হইয়া তাহার 
প্রতি নির্দর হইব? আমি ত তীাহ।র হৃদয় জানি, আর তিনিও আমার হৃদয় 
জানেন ।” 
ইহ। কামের কথ! নয়, শুধু স্নেহের কথাও নয়,-_ সম্পূর্ণরূপে প্রেমের 
কথা, একাধারে সাধ্বী ও প্রণয়িনীর উক্তি । সংস্কৃত সাহিত্যে এক 
ভবভূতি ছাড়া আর কাহারও মধ্যে এই ভাব আছে কিনা তাহা আমার 
জানা নাই, অন্তত আমি পড়ি নাই । এই নৃতন স্থর শুনাইয়াছিলেন 
বলিয়াই বোধ হয় সে-যুগের গতানুগতিক সমালোচকেরা ভবভূতিকে নিন্দা 
করিয়া অবজ্ঞা দেখাইয়াছিলেন। দে যাহাই হউক ভবভূতি নরনারীর 
সম্পর্ক সম্বন্ধে প্রাচীন ভারতের লৌকিক 'থিসিসে'-র 'আ্যান্টি-খিসিস্‌, 
উপস্থাপিত করিয়াছিলেন । 

আশা করি এই প্রসঙ্গে আমার যাহা প্রতিপান্ভ তাহা স্পষ্ট করিতে 
পারিয়াছি।-_অর্থা প্রাচীন ভারতবর্ষে নরনারীর সম্পর্কের ধারণা 
কামের মধ্যে আবদ্ধ ছিল এবং সে কাম মোটেই নীচ ঝা নিন্দনীয় ব্যাপার 
নয়, এই দুইটা কথা পাঠক বুঝিয়াছেন। 

প্রাচীন বাঙালী সমাজে এই সম্পর্কের যে ধারণা ছিল উহা প্রাচীন 
হিন্দুধারারই অনুবতরন। ইহার স্পষ্ট প্রমাণ সমস্ত প্রাচীন বাংলা কাব্য- 
সাহিত্য জুড়িয়া রহিয়াছে । এখানে একটা তর্ক উঠিবেই-__বৈষ্ব কবিতার 
মানস ধর্ম কি? উহা কি আদিরসাত্মক লৌকিক কাব্য, না কাব্যচ্ছলে 
হিন্দু ধর্মসাধনার ভক্তিমার্গের রূপক ? 


৪৪ বাঙালী জীবনে রমণী 


বাংলা বৈষ্ণব কবিতা যে জয়দেবের 'গীতগোবিন্দের সন্তান সে 
বিষয়ে সন্দেহ নাই। 'গীতগোবিন্দ' যে আদিতে লৌকিক আদিরসাত্মক 
কবিতা ছিল, সে বিষয়েও আমার মনে সন্দেহ নাই। 'শীতাগোবিন্দের 
প্রাচীন টীকাকারের! উহার ব্যাখ্যা অন্যভাবে করেন নাই ; স্থানবিশেষে 
কোনও কোনও পদের অর্থ “কামসুক্রে'র সহায়তায়ও করা হইয়াছে। 
অবশ্য চৈতন্যের সময় হইতে যে উহাকে 'ভক্তি-র গ্রন্থহিসাবে দেখা 
আরম্ভ হইল তাহা আমি জানি । গোস্বামীরা "যঃ কৌমারহরঃ” ইহারও 
ভক্তিতত্বঘটিত ব্যাখা করিয়াছেন। পরবর্তী যুগে জয়দেবকে 'ভক্তির 
সাগর” বলিয়! উল্লেখ কর! হইত । আমর] অল্প বয়সেও দেখিয়াঁছি-_ 
ভদ্রঘরের যুবতী খোল-করতাল-হার্মোনিয়াম সহযোগে “রতিস্থখসারে 
গতমভিসারে' গাহিতেছেন, আর প্রৌট ও বুদ্ধেরা হাউহাউ করিয়া 
কাদিয়। গড়াইতেছেন। ইহা সংস্কৃত জ্ঞানের অভাবের জন্য ঘটিত, 
ন1 চোরা লোচ্চামির জন্য ঘটিত, তাহা৷ বলিতে পারি না। তবে এই 
ভক্তি দেখিয়া আমি বিচলিত হই নাই। স্তরাং জয়দেবের 'শীত- 
গোবিন্ব-কে শূঙ্জাররসের লৌকিক কবিতা ভিন্ন আয় কিছু বলিয়াই 
স্বীকার করি নাই। 

ইহার পর মৈথিল ও বাংলাতে লেখা বেষ্বৰ কাবোর কথা । 
চণ্তীদাসে আরোপিত 'কামগন্ধ নাহি তায়” এই কথা কয়টির উপর 
নির্ভর করিয়া বৈঞ্ৰ কাব্যকে অনেকে আদিরসের কবিতা না বলিয়া 
আধুনিক অর্থে প্রেমের কবিতা বলিয়া মনে করেন। কিন্তু এই কয়টা 
কথা বাদ দিলে সমগ্র বৈষ্ণব কবিতাকে যে কামাত্মক বলিয়া মনে হইবে, 
সে বিষয়েও সন্দেহ নাই। বিশেষ করিয়া যে চণ্তীদাস 'কৃষ্ণকীর্তন' 
লিখিয়াছেন, তাহার কবিতা যে অত্যন্ত গ্রাম্য কামানুভূতির প্রকাশ 
তাহাতে কোনও মতভেদ হইতে পারে না। 

বাকী বাংল! কাব্যে নরনারীর সম্পর্কের যে বর্ণনা আছে তাহা! 
সম্পূর্ণ কামাবলম্ী। দৈহিক মিলনের বর্ণনাই উহার প্রধান উপজীব্য । 
তাহাও একেবারে খোলাখুলি । তবে ইহাতেও স্থুলতা এবং সুন্মমতা 


কাম ও প্রেম ৪৫ 


আছে। ভারতচন্দ্রের আদিরসাত্বুক বর্ণনাতেও মোটের উপর বৈদগ্ধ্য 
আছে, অন্ধাত্র তাহ! নাই। বঙ্কিমচন্দ্র যে বলিয়াছিলেন, “বিষ্ভাস্থন্দর' 
জয়দেবের ভেঙ্গান, ইহা! আমি মনে করি না। জয়দেব অপেক্ষা ভারতচন্দ্ 
রসবোধের দিক হইতে কম মাজিত ছিলেন না। তবে তীহার 
“বিদ্যাস্থন্দরের যে লৌকিক ব্যবহার হইয়াছিল সেটা ভারতচন্দ্রের দৌষ 
নয়। এবিষয়ে পরে কিছু বলা হইবে। এইখানে এই কথা বলিয়া 
শেষ করিব যে, বাংলা কাব্যে নরনারীর সম্পর্কের যে চিত্র পাই তাহা 
সংস্কৃত সাহিত্যে উহার যে রূপ দেখানো হইয়াছে তাহারই কম বা বেশী 
ইতরীকৃত ( সংস্কত অর্থে) রূপ। ইহাতে আদিরস অনেক স্থলে স্ুল 
হইলেও আদিরসই ছিল। 

কিন্তু ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজী শিক্ষা প্রবতিত 
হওয়ার ফলে এব্যাপারে মনোভাব বদলাইতে আরম্ত হইল। তবু 
একথা বলা প্রয়োজন যে, প্রথম পঞ্চাশ বতসরের মধ্যে সেই নৃতন 
মনোভাবের প্রকাশ সাহিত্যে দেখা যায় নাই। তখন পর্যস্ত যেসব 
বাঙালী কৰি নরনারীর সম্পর্ক লইয়৷ বা শুধু নারী সম্বন্ধে যাহা 
লিখিতেন তাহা প্রাচীন ধারারই অনুযায়ী হইত । তবে ভদ্র কবিতায় 
কামের প্রকাশ সাক্ষাৎভাবে না হইয়া! প্রচ্ছন্নভাবে হইত। ঈশ্বর গুপ্তের 
কবিতা পড়িলে উহা স্পষ্ট দ্রেখা যাইবে__তিনি অবশ্য এ বিষয়ে 
বদ্-রসিকতাও করিতে পটু ছিলেন। অভদ্র লেখায় যাহা বলা হইত 
তাহা অতি নিম্বস্তরের কামের পরিচায়ক হইত, উহার উদ্দেশ্বাই ছিল 
রিরংসার উদ্দীপন] । 

কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় অর্ধে অকন্মা একট৷ ভাববিপ্নুব 
দেখা দিল। ইহার জোয়ারে বাঙালীজীবনে প্রেম-_অর্থাৎ রোমার্টিক 
প্রেম দেখা দিল। ইহার প্রবত নকতণ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। 
তাহার প্রতিভার শক্তিতে একটি দ্রিনের মধ্যে বাঙালীর ব্যক্তিগত জীবনে 
একটা উন্মাদনা আসিয়! গেল । 

১৮৬৫ সনে “ছুর্গেশনন্দিনী” প্রকাশ হইতে উহার সুত্রপাত, 


৪৬ বাঙালী জীবনে রমণী 


বঙ্কিমচন্দ্রের মৃত্যুর পুর্ব পর্যন্ত উহার নৃতন জোয়ার ফুলিয়া ফুলিয়া 
উঠিতেছিল। নরনারীর সম্পর্কের নূতন ধারণা ও কল্পনা কোন্‌ স্তরে 
উঠিয়াছিল তাহার দৃষ্টান্ত আমি বঙ্কিমচন্দ্রের একটি উপন্যাস হইতে 
দ্িব। এই গল্পটির শেষ সংস্করণকে তাহার শেষ লেখা বলা যাইতে 
পারে। সেজন্যই বঙ্কিমচন্দ্রের পরিণত মনের কল্পনা হিসাবেই আমি 
উহা উদ্ধৃত করিব । 

প্রেমের এই বর্ণনাটি সম্বন্ধে আর একটা কথাও বিশেষ করিয়া 
উল্লেখ করা দরকার । বঙ্কিমচন্দ্র উহা! যে নায়িকার মুখে দিয়াছেন, সে 
আপাতদৃষ্টিতে পাচিকা, ধনী বাক্তির উপপত্বী হইতে স্বীকার করিয়াছে। 
বাঙালী সমাজে ব৷ হিন্দুসমাজে পরিচারিকা-গ্রীতিই ছিল ইন্ড্রিয়পরতন্ত্রতার 
ঘণ্যতম রূপ । কতরশদের উৎপাতে কোনও সচ্চরিত্রা নিন্জাতীয়া বা 
হুরবস্থাপন্না ভদ্র স্্রীলোকের নিরাপদে থাকিবার উপায় ছিল না। 
'উলুখড়ের বিপদ' গল্পে রবীন্দ্রনাথ ইহার একটি নিষ্ঠুর কাহিনী 
লিখিয়াছেন। বঙ্কিমচন্দ্র প্রথমে দেখাইলেন এই স্তরেও নরনারীর সম্পর্ক 
কোথায় উঠিতে পারে। হয়ত বা! প্রেমের মহিম৷ দেখাইবার জন্য উহা 
ইচ্ছা করিয়াই করিয়াছিলেন । 

এইভাবে উপপত্বী হইতে স্বীকার করিয়াও নায়িকা উপপতিকে 
আট দিন তাহার কাছে না আসিতে বলিল, যাহাতে তাহার প্রণয় 
স্থায়ী কিনা পরীক্ষা করিতে পারে। কিন্তু নায়িকা অবশেষে বলিল, 
'অফ্টাহ অতীত হইলে, বিনা বাক্যব্যয়ে উভয়ে উভয়ের অধীন হইলাম । 
তিনি আমায় কুলটা বলিয়া জানিলেন। তাহাও সহা করিলাম |” 

কিন্তু এই আট দিন ধরিয়া নায়কের মনের ভাব ।ও নিজের মনের 
ভাব নায়িকা যাহা দেখিল, তাহার বিবরণ নিম্নলিখিত রূপ, 

“আমি আপনার হাঁসি-চাহনির ফাঁদে পরকে ধরিতে গিয়া, পরকেও ধরিলাম, 

আপনিও ধরা পড়িলাম। আগুন ছড়াইতে গিয়া, পরকেও পোঁড়াইলাম, 

আপনিও পুড়িলাম। হোলির দিনে, আবীর খেলার মত, পরকে রাঙ্কা 

করিতে গিরা, আপনি অনুরাগে রাজ হইয়। গেলাম-.. 


কাম ও প্রেম ৪৭ 


“তার পর এই আগুনের ছড়াছড়ি! আমি হাসিতে জানি, হাঁসির 
কি উতোর নাই? আমি চাঁহিতে জানি, চাহনির কি পাণ্টা চাঁহনি নাই ? 
আমার অধরোষ্ঠ দূর হইতে চুম্বনাঁকাজ্কীয় ফুলিয়া থাকে, ফুলের কুঁড়ি 
পাঁপড়ি খুলিয়া ফুটিয়া৷ থাকে, তাহার প্রফুল্লরক্তপুষ্পতুল্য কোমল অধরোষি 
কি তেমন করিয়া ফুটিয়া উঠিয়া, পাঁপড়ি খুলিয়া আমার দিকে কিরিতে 
জানে না? আমি যদি তাঁর হাসিতে, তার চাহনিতে, তীর চুষ্বনা- 
কাজ্ষায়। এতটুকু ইন্দরিয়াকাঁজ্ষার লক্ষণ দেখিতাম, তবে আমিই জয়ী 
হইতাম । তাহা নহে। সে হাসি, সে চাহনি, সে অধরোষ্ঠবিস্কুরণে 
কেবল স্নেহ_-অপরিমিত ভালবাসা । কাঁজেই আমিই হারিলাম। 
হারিয়া স্বীকার করিলাম যে, ইহাই পৃথিবীর ষোল আনা স্থ। যে দেবতা 
ইহাঁর সঙ্গে দেহের সম্বন্ধ ঘটাইয়াঁছে, তাহার নিজের দেহ যে ছাই হুইয়! 
গিয়াছে, খুব হইয়াছে ।” 
এই নবাবিভূ্ত প্রেমের আর একটি দৃষ্টান্ত বঙ্কিমচন্দ্র হইতেই 

দিব £-- 
“এই প্রথম, ছুইজনে স্পষ্ট দিবসালোকে, পরস্পরের প্রতি দৃষ্টিপাত 
করিলেন। ছুইজনে, দুইজনের মুখপাঁনে চাহিয়া ভাবিতে লাগিলেন, 
আর এমন আছে কি? এই সসাগরা, নদনদীচিত্রিতা, জীবসম্কুলা 
পৃথিবীতলে এমন তেজোময়, এমন মধুর, এমন সুখময়, এমন চঞ্চল অথচ 
স্থির, এমন সহাস্য অথচ গম্ভীর, এমন প্রফুল্ল অথচ ব্রীড়াময়, এমন আর আছে 
কি? চিরপরিচিত অথচ অত্যন্ত অভিনব, মুহূর্তে মুহূর্তে অভিনব মধুরিমাময়, 
আত্মীয় অথচ অত্যন্ত পর, চিরস্থৃত অথচ অদৃষ্টপূর্ব-কখন দেখি নাই, আর 
এমন দেখিব নাঃ এমন আর আছে কি?” 
বোধ করি নরনারীর সম্পর্কের মধ্যে কাম কি এবং প্রেম কি তাহা 
অনুভব করিতে পাঠকের আর কোনও অস্তৃবিধা হইবে না। 
সৌভাগ্যক্রমে বাংলা সাহিত্যে একাটি কবিতা আছে যাহার সাহায্যে 
এই সুলনাটা একেবারে সাক্ষাৎ ভাবে করাইতে পারা যায়। কামিশী 
সেন (পরবর্তী জীবনে কামিনী রায় ) ছাত্রী অবস্থায় 'কাদশ্বরী' পড়িয়া- 
ছিলেন। ইহাকে অবলম্বন করিয়৷ তিনি “আলো ও ছায়া”তে “মহাশ্বেতা” 


৪৮ বাঙালী জীবনে রমণী 


ও 'পুগুরীক' এই ছুইটি দীর্ঘ কবিতা লিখিয়াছিলেন। প্রথম কবিতাটি 
তিনি ১৮৮৬ সনের ২৯শে জুন তারিখে, যে সমপাঠীর সহিত কাদন্বরী 
পড়িয়াছিলেন তাহাকে উৎসর্গ করেন। উৎসর্গের ছোট কবিতাটি 
নিন্নলিখিত রূপ £-- 


“সাহিত্যের সুন্দর কাননে, 
এক সাথে দৌনে, 
গন্ধর্ববাঁলিকা নেহারিয় 
মুগ্ধ তার মোহে। 
“তুমি আমি দূরে দূরে আজ, 
সতীর্থ আমার, 
একসাথে সে কাননে মোরা 
পশিব না আর। 
“একলাটি বসে থাঁকি যবে 
আঁধেক নিদ্রায়, 
অচ্ছোদের তরুণ তাপসী 
দেখা দিয়া যাঁয়। 
“হেরি তাঁর সজল নয়ান, 
শুনি মুদু কথা, 
বুঝি তার প্রণয় গভীর, 
নিদারুণ ব্যথা |” 
“শুনিয়াছ যে গীতলহরী 
আর একবার 
শুনিবে কি”_লাগিবে কি ভাল 
ক্ষীণতর প্রতিধ্বনি তাঁর ?” 
ইহার পিছনে যে একটা প্রত্যাখ্যাত প্রেমের করুণ কাহিনী আছে 
তাহ! ধাহারা সে-যুগের বাংল! সাহিত্যের নেপথ্যের খবর রাখেন তাহারা 


সকলেই জানেন । 
'মহাশ্থেভা” কবিতাটিতে পুগুরীককে দেখিবার পর মহাশ্বেতার মনের 


কাম ও প্রেম ৪৯ 
ভাবের যে বর্ণনা আছে তাহ “কাদন্বরী” হইতে গৃহীত। “কাদন্বরী'তেও 
মহাশ্বেতা নিজেই নিজের অনুরাগের কাহিনী বলিতেছেন । মুল সংস্কৃত 
ও কামিনী সেনের বর্ণনা উদ্ধৃত করিয়া ছুই-এর মধ্যে স্থুরের কি পার্থক্য 
হইয়াছে বুঝাইতে চেষ্টা করিব। ঘটনা এক, অবস্থাও এক, কিন্তু 
মনোভাবের ধর্মের তারতম্য যে আছে, তাহা ধরিতে পাঠকের কোনও 
অস্ত্রবিধা হইবে ন|। 
প্রথমে সংস্কৃত বর্ণনা উদ্ধত করিব। (এখানে একটা কথা বলিয়া 
রাখিতেছি। আমি মূল “কাদন্বরী'র বিবরণ হইতে কিছু কিছু বাদ দিব। 
সংস্কৃত গগ্য হিন্দু মন্দিরের মত; ইহাতে কারুকার্ধবাহুল্য থাকে ; 
সংক্ষেপে সারা দূরে থাকুক সংস্কৃত কাব্যকারের৷ বক্তব্য যথোপযুক্তভাবে 
বলিয়াও ক্ষীন্ত হন না, অনেক ফাউ দিতে যান। কিন্তু ইহার ফল উ্ট। 
হয়, বর্তমান যুগের পাঠকের মন এত প্রাচুর্য সহ্য করিতে পারে না, 
এবং তাহার চাপে মূল বক্তব্য ও মুল রস ধরিতে পারে না। আমি 
এই অস্থবিধাটুকু এড়াইতে যাই। হবে যে-সন কথা উদ্ধত করিব তাহা 
একেবারে মূলানুযায়ী হইবে, পরম্পরারও কোনও ব্যতিক্রম হহবে না।) 
গুগ্ুরীককে দেখিয়া নিজের মনে কি ভাব হইল, মহাশ্বেতা তাহা! 
বলিতেছেন ঃ 
“উচ্ছৃসিতৈঃ সহ বিশ্বাতনিমেষেণ, কিঞ্চিদামুকুলিতপক্ষ্মণ| দক্ষিণেণ চক্ষুষা 
সম্পৃহম[পিবন্তীব, কিমপি যাঁচমাঁনেব, ত্বদায়ত্তাস্মি ইতি বদস্তীব, অভিমুখং 
হৃদয়মপ্রন্তীব, তন্ময়তামিৰ গন্ভমীহমানা, মনোভবাঁভিভূতাং ত্রায়স্ব ইতি 
শরণমিবোপযাঁন্তী, দেহি মে হৃদয়েইবকাঁশম্‌ ইত্যাথিতামিব দর্য়ন্তী, স্তস্তিতেব, 
লিখিতেব, উৎকীর্ণেব, সংযতেব, মৃচ্ছিতেব, কেন।পি বিধুতেব, নিম্পন্দসকলাঁ- 
বয়বা, কিং তন্রপসম্পরা, কি মনসা, কিং মনসিজেন, কিমভিনবযৌবনেন, 
কিমন্তরাগেণ বা উপদিশ্তমাঁনা অহমপি ন জানামি কথং কখমিতি তমতিচিরং 
ব্যলোকয়ম 1” 
( অঙ্গবাদ। দীর্ঘস্বাসের সহিত বিস্বৃতনিমেষ হইয়া, পন্মগ্ুলি অন্ন মুকুলিত 
করিয়া, দক্ষিণ চক্ষু দিয়! যেন তীহাঁকে সম্পৃহভাঁবে পাঁন করিতে করিতে, 
কি যেন যাচঞা। করিতে করিতে, আমি তোমারই হইয়াছি এই কথা যেন 
৪ 





৫০ বাঙালী জীবনে রমণী 


বলিতে বলিতে, যেন তাহার অভিমুখে হৃদয় অর্পণ করিতে করিতে, যেন 
তাহাতেই তন্ময়তা পাইয়াছি এই চেষ্টা করিতে করিতে, মনোভাবের দ্বারা 
অভিভূতাকে আ্রাণ কর ইহা৷ বলিয়া যেন শরণ ভিক্ষা করিতে করিতে, হৃদয়ে 
আমাঁকে স্থান দাঁও যেন এই ভাব দ্েখাইতে দ্রেখাইতে, স্তম্ভিতের ন্যায়, 
চিত্রলিখিতের ন্যাঁ়, প্রস্তরে উৎকীর্ণের স্তায়, আবদ্ধের স্তায়, মৃছিতের স্তায়, 
কাহারও ছারা ধৃতের ন্যায়, সকল অজে নিম্পন্দ হইয়া, জানি না কিসের 
দ্বারা চালিত হইয়া__তীহার রূপসম্পদের দ্বারা, আমার মনের দ্বারা, 
মনসিজের ছারা, অভিনব যৌবনের দ্বারা, না! অন্নুরাগের দ্বারা ?_-তীহাকে 
অনেকক্ষণ ধরিয়া দেখিলাম । ) 


বর্তমান যুগের পাঠক-পাঠিকা এই উক্তিতে বাগবাহুল্যের অভাব 
আছে মনে করিবেন কিনা বলিতে পারি না। কিন্তু সংস্কৃত কাব্যকারের 
দৃষ্টিতে ইহা সংযত উক্তি। আহা! আজিকার বাঙালী মেয়েরা যদি 
এইভাবে অভিভূত হুইয়া৷ এইভাবে আত্মপ্রকাশ করিতে পারিত, তাহা 
হইলে কলিকাতার রাস্তায় রাস্তায় কোমরে অচল আঁটা, কীধ হইতে 
ব্যাগ ঝোলানো এত শুক্ষমুখী অনুঢা যুবতী দেখা যাইত না। 


কিন্তু মহাশ্বেতাও বুঝিয়াছিলেন এত অভিভূত হইয়া পড়া শোভন 
হয় নাই; কারণ সঙ্গে সঙ্গে তিনি এও বলিলেন, “হাহা, 
কিমিদমসাম্প্রতমতিহ্রেপণমকুলকুমারীজনোচিতমিদং ময়া প্রীস্তৃতম্‌।” 
(হায়, হায়! আমি একি অনুচিত ও লজ্জাজনক কুলকুমারীর অনুপযুক্ত 
ব্যবহার করিতেছি!) তবুও এই মানসিক আবেগের জন্য তাহার 
শীরীরিক কি অবস্থা হইয়াছিল তাহ! বলিতেও সঙ্কোচ করিলেন না। 
উহা এইরূপ £-_ 

“উৎক্ষিপ্য নীয়মানেব তৎসমীপমিক্দ্িয়ৈ:, পুরজ্তাদাকুণ্যমাণে হৃদয়েন, পৃষ্ঠত: 

প্রেধ্যমাণের পুষ্পধন্বনা, কথমপি মুক্তগ্রযত্বমপ্যাত্ীনম্‌ অধারয়ম। অনস্তরঞ্চ 

মেহস্তর্মদনেন অবকাশমিব দাঁতুমাহিতসন্তান। নিরীয়ুঃ শ্বাসমরুতঃ | সাঁভিলাষং 

হৃদয়মাখ্যাত্বকামমিব স্ফুরিতমুখমভূৎ কুচযুগলম্‌। ন্বেদলবলেখাক্ষালিতেবা- 

গলল্নজ্জা। মকরধ্বজনিশিতশর নিকরনিপীতত্রস্তেবাকম্পত গাত্রযষ্টিঃ। 


কাম ও প্রেষ ৫১ 


তদ্রপাতিশয়ং দ্রষ্'মিব কুতুহলাদালিঙ্গনলালসেভ্যোইঙ্সেভ্যো নিরগাপ্রোমা 
জালকম্‌। অশেষত: স্বেদাস্তসা ধৌতশ্চরণযুগলাদিব হৃদয়মবিশদ্রীগঃ 1” 
( অস্বাদ। ইন্দট্রিয়ের৷ যেন মামাকে তুলিয়া লইয়! যাইতেছিল, হ্বদয় যেন 
'আমাকে সম্মুখের দিকে আকর্ষণ করিতেছিল, পিছন দিক হইতে পুষ্পধন্থ 
যেন ঠেলা দিতেছিল, তবু কোঁনও প্রকাঁরে উহা রোঁধ করিয়া! নিজেকে 
স্থির রাখিলাম। তারপর আমার হৃদয়ে স্থান করিয়া দিবার জন্যই যেন 
আমার নিশ্বাসবাযু আমার অন্তরস্থ মদনের দ্বার! বিশ্ৃত হইয়া বাহির হইল । 
সাভিলাঁষ হৃদয়কে ডাঁকিবাঁর জন্যই যেন আমার স্তনযুগল ক্ষুরিতমুখ হইল । 
যেন স্বেদপ্রবাহের দ্বারা ক্ষালিত হইয়া লজ্জা গলিয়া গেল। মকরধ্বজের 
তীক্ষ শর পড়িবাঁর ভয়ে গাত্রযষ্টি কীঁপিতে লাগিল । তীহাঁর রূপ ভাল করিয়া 
দেখিবার জন্ই যেন কুতুহলহেতৃ আলিঙ্গনাঁভিলাষী আঁমার অশ্নপ্রত্যঙ্গ হইতে 
রোমাঞ্চজাল উদগত হইল । প্রচুর স্বোদজলের দ্বারা ধৌত চরণযুগল হইতে 
রাগ ঘেন আমার হৃদয়ে প্রবেশ করিল ।) 

কথাগুলিতে লুকোচুরি একটুও নাই। 
ইহার পর মহোশ্বেতা বাড়ী ফিরিয়া কি করিলেন তাহার বিবরণ 

দিতেছেন 8 
গিত্বা চ প্রবিশ্ত কন্ান্তঃপুরং ততঃ প্রভৃতি তছ্িরহবিধুরা' কিমাগতান্মি, 
কিং তত্রৈৰ স্থিতান্মি, কিমেকা কিন্তম্মি, কিং পরিবৃতান্মি, কিং তুষ্ীমশ্মি কিং 
প্ররূতালাঁপান্মি, কি জাগমি' কিং সুপ্তান্মিঃ কিং রোদিমি, কিং ন রোদিমি, 
কিং দুঃখমিদম্,কিং সুখমিদম্, কিমুৎকঠেয়স্‌, কিং ব্যাধিরয়ম্‌, কিং বাসনমিদম্‌, 
কিমুৎসবো ইয়ম্‌, কিং দিবস এষ কিং নিশেয়ম্‌, কানি রম্যাণি+ কান্িরম্যাণতি 
সর্বরং ন বাগচ্ছম্‌! অবিজ্ঞাতমদ্রনবৃত্তান্ত| চক গচ্ছাঁমিঃ কিং করোমি, কিং 
পশ্যাঁমি, কিং আলপামি, কপ্য কথয়ামি, কোঁইশ্য প্রতীকার ইতি সর্বঞ্চ 
নাজ্ঞাসিষমূ। কেবলমারহা কুমারীপুর প্রাসাঁদং বিসর্জ্য চ সখীজনং দ্বারি 
নিবারিতাঁশেষপরিজনপ্রবেশা সর্বব্যাপারাম্থৎমজ্য একাকিনী মণিজালি- 
গবাক্ষনিক্ষিপ্তমুখী, তামেব দিশং ততৎ্সনাথতয়! প্রসাধিতামিব কুস্থমিতামিব 
ঈক্ষমানা তস্মাদ্দি গন্তরাদগচ্ছন্তমনিলমপি, বনকুন্থমপরিমলমপি, শকুনিধ্বনি- 
মপি তদার্তাং প্রশ্টমীহমানা ততপ্রীত্যেব গৃহীত মৌনব্রতা [ইহার পর 
অবস্থার আরও বর্ণনা আছে ] নিশ্পন্দমতিষ্টম্‌।” 


৫২ বাঙালী জীবনে রমণী 


( অন্থবাদ। ফিরিয়! গিয়া! কন্াস্তঃপুরে প্রবেশ করিয়া তখন হইতে তাহার 
বিরহে বিধুর হইয়া, আমি কি আসিয়াছি না লেখানেই আছি, একাকিনী 
আছি কি জনপরিবৃতা আছি, চুপ করিয়া আছি কি আলাপ করিতেছি, 
জাগিয়া আছি কি ঘুমাইয়া আছি, কাদিতেছি না কাঁদি নাই, এটা 
কি ছুঃখ না সুখ, এটা কি উৎকঠা, না রোগ, না বিপদ, না উৎসব, 
এটা কিদ্দিন না! রাত্রি, রম্যই বা কি অরম্যই বাকি এসবের কিছুই 
জানিলাম না । 
মদনের বৃত্তাস্ত জানা না থাকাতে আমি কোথায় যাইতেছি, কি 
করিতেছি, কি দেখিতেছি, কি বলিতেছি, কাহাঁকে বলিতেছি, ইহার 
প্রতীকার কি, এলবেরও কিছুই বুঝিলাম ন|। 
কুমারীপুরীর প্রাসাদের উপরে উঠিয়া সথীদের বিদায় দিয়া ছার 
নিধিশেষে সকল পরিজনের প্রবেশ নিষেধ করিয়া সকল কাজ ছাড়িয়া 
একাঁকিনী মণিজীল গবাক্ষের দিকে মুখ কিরাইয়া যে দ্রিক তীহার উপস্থিতির 
দ্বারা প্রসাধিত ও কুন্থুমিতের মত হইয়া উঠিয়াছিল সেই দিকে চাহির] সেই 
দগন্তর হইতে যে অনিল আঁসিতেছিল যেন তাহাকে, যেন বনকুম্থমের 
পরিমলকে, যেন পাখীর ডাঁককেও তীহাঁর সংবাঁদ জিজ্ঞাসা করিতে করিতে 
তাহার প্রীতি হইতে মৌনব্রতা হইয়| নিম্পন্দ রহিলাম।) 
ইহাতেও কোনও অস্পষ্টতা নাই। টাকাকারের! মহাশ্বেতার এই 
অবস্থাকে তাহার “মদনাকুল অবস্থা” বলিয়াছেন । 
এইবার কামিনী সেন এই সংস্কত বিবরণটি পড়িয়াই পরবর্তী যুগের 
বাঙালী ভাবের আবেগে, সে-যুগের সাহিত্যরীতিতে এবং বাংলা ভাষাতে 
কি লিখিলেন দ্রেখা যাক। পুগুরীকের সহিত মহাশ্বেতার প্রথম সাক্ষাতের 
বর্ণনা “মহাশ্বেতা কবিতাটিতে এই রূপ £_ 


"ছুই পদ হ'তে অগ্রসর, 

কি এক সৌরভে পূর্ণ হ'ল দিক্‌ দশ । 
চাহিলাম চারিভিতে ; দক্ষিণে আমার 
দেখিলাম ছুটি দিব্য খষির কুমার, 
শুভ্র বেশ, আর্দকেশ, অক্ষমালা হাতে । 


কাম ও প্রেম ৫৩ 


যে জন তরুণতর, কর্ণোপরি তার 
অপূর্ব কুন্থুম এক, সৌরভে শোভাঁয় 
অতুলন, দেখি নাই জীবনে তেমন । 
একদৃষ্টে চেয়ে আছি কুন্ুমের পাঁনে, 
কিন্বা সে কুম্থমধাঁরি লাঁবণ্যের ভূমি 
মুখপাঁনে, একদৃষ্টে, আপনা বিস্বৃত_ 
কতক্ষণ ছিন্ত্র হেন না পারি বলিতে” 


ইহার পর শারীরিক বিকারের কোনও কথা নাই, থাকিতে পারেও 
না। তবু বাড়ি ফিরিবার পর মনোভাবের বর্ণনা আছে, কিন্তু নৃতন 
ধরনে । উহা এই রূপ 2 


“কিরিলাম গৃহে । এক নৃতন বিষাদ 
স্বখের জীবন মম করিল আধার । 
জননী বিস্মিত নেত্রে চাহি মুখপাঁনে 
জিজ্ঞাসিলা,_-“কি হয়েছে বাছারে আমার ? 
নারিন্থ কহিতে কিছু, বরষিল আখি 
অবিরল অশ্রধার। জননীর কোলে 
নীরবে লুকায়ে মুখ রহিন্থ কাঁদিতে । 

চে 
শৈশব সহমা যেন যুগ-ব্যবহিত, 
কল্যকার ধুলাখেল৷ হয়েছে স্বপন £ 
ভাসিছে নয়নে এক দৃশ্ত অভিনব__ 
সরোবর তীরবন, ছুঃখী মুগশিশু, 
সুরকুস্থমের বাস, নয়ন-মোহন 
শোভা তার, ততোধিক পবিত্র উজ্জ্বল, 
খধিতনয়ের মুখ, অপাধিব স্বর, 
স্বপ্নময় আখি, মৃছু কম্পিত অঙ্গুলি, 
ভূশায়িনী অক্ষমালা, মুহূর্তের তরে 
স্পর্শে যার শ্বেত ক& পবিত্র আমার ।” 


৫৪ বাঙালী জীবনে রমণী 


'কাদন্বরী'তে পূর্বরাগের যে বর্ণনা পাইলাম উহা অতি উচ্চস্তরের 
কামের- রোমান্টিক কামের ; 'আলো ও ছায়া'তে যে পরিচয় পাইলাম 
উহা রোমান্টিক প্রেমের । দুইএর মধ্যে কি প্রভেদ তাহা ইহার চেয়ে 
স্থুম্পষ্ট কর! যাইত না। 

তবু এই দুইটা অনুভূতির মধ্যে যোগও আছে। রবীন্দ্রনাথের কথায় 
বলিব £_ 

“এ দুয়ের মাঝে তবু কোনোখানে আছে কোনো! মিল) 
নহিলে নিখিল 

এত বড়ো নিদারুণ প্রবঞ্চনা 

হাসিমুখে এতকাল কিছুতে বহিতে পারিত না। 
সব তার আলো 

কীটে-কাঁটা পু্পপম এতদিনে হয়ে যেত কালো! |” 

নরনারীর সম্পর্কের সব আলো নিবাইয়৷ দিয়া, উহাকে কীটে-কাটা 
পুদ্পের মত কালো করিয়া দিবার জন্য একটা সহুপদেশ যে আমাদের 
নীতিপ্রচারকেরা দেন তাহা সকলেরই জান! আছে । এই সদুপদেশের 
মূলে আছে কাম ও প্রেমের মধ্যে একটা মিথ্যা দ্বন্দের ধারণা ৷ এই দ্বন্দের 
শেষ নাই বটে, কিন্তু শেষ হওয়া উচিত৷ আমার বক্তব্য আমি কতকগুলি 
সোজা প্রশ্ন করিয়া উপস্থাপিত করিব। 

সত্যই কি নরনারীর ভালবাসা দেহনিরপেক্ষ, কামগন্ধহীন ? প্রেমের 
কবি যে কামাশ্লেষবজিত প্রণয়ের কল্পনা করিয়াছে তাহা কি কখনও বাস্তব 
জীবনে দেখ! গিয়াছে? যদি ন| হইয়া থাকে তাহা হইলে কামের সহিত 
প্রেমের সন্বন্ধ কি? আমি যে কামকে অতি উন্নত কাম বলিয়াছি, 
তাহারও কি স্থান প্রেমে নাই ? 

এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নাই যে, উনবিংশ শতাব্দীর শেষের 
দিকে বাঙালী বিষ্যান্ুন্দর হইতে মুখ ফিরাইয়া প্রতিক্রিয়া হিসাবে 
সত্যই বিশ্বাস করিত যে, নরনারীর উচ্চতম প্রেম দেহনিরপেক্ষ । ইহার 
দৃষ্টান্ত একজন সাধারণ বাঙালী লেখকের একটি গল্প হইতে দিতেছি । 


কাম ও প্রেম ৫৫ 


এই গল্পটি ১৩০৭ সনে (ইংরেজী ১৯০১) 'প্রদীপে' প্রকাশিত হইয়াছিল । 
তখনই আমার পক্ষে গল্পটি পড় সম্ভব ছিল না, কারণ আমার বয়স 
ছিল চার বৎসর । কিন্তু আমার মা (প্রদীপের গ্রাহিকা ছিলেন, 
স্থৃতরাংবাধানো ভল্যম হইতে বৎসর চার-পাঁচ পরেই উহা পড়িয়াছিলাম । 
অত্যন্ত ডেপো৷ ও ইচড়ে পাকা হওয়াতে সেই বয়সেই প্রেমের গল্পের 
মাধুর্য উপভোগ করিতে পারিতাম। এখন স্তরের কাছাকাছি, তবু 
সে রসবোধ হারাই নাই । আশ! করি অতি অকরুণ সমালোচকও আমার 
সম্বন্ধে এই কথাটা স্বীকার করিবেন । 

গল্পটি এক যুবক ও তাহার বাল্যসঙ্গিনীর মধ্যে প্রেমের গল্প । উহার 
পরিণাম হইয়াছিল নায়িকার আত্মহত্যা । কিন্তু আমার প্রসঙ্গ সেটা নয়, 
আমি দেখাইতে চাই এই ছুইজন পরস্পরের প্রেমকে কি চক্ষে দেখিত। 
নায়ক বলিতেছে (সে অবশ্য কবিতা লিখিত )-_ 

“একটা নৃতন কবিতা! লিখিলেই, খাতা৷ লইয়া কাড়াকাঁড়ি পড়িয়া! যাইত। 

আমি লিখিতাঁম,_বিছুধী সুধা শুনিত, শুধুই শুনিত না, কখনও সংশোধন 

করিয়া! দিত। একটা স্থান খুলিয়া! দেখিলাম-_হায়, সে আজ কতদিন ! 

_-মামি লিখিয়াঁছিলাম “দেহের মিলন” সুধা “দেহের' কাটিয়া “আত্মার, 

করিয়াছে! তাহার সুন্দর হস্তাক্ষরটি তেমনই জলন্ত মহিমায় শোভা 

পাইতেছিল। তখন বুঝি নাই, স্ুধার প্রেমের আদর্শে কতটা উচ্চতা, 

কতটা আন্তরিকতা! ছিল। 

লেখকের নাম না করা অবিচার হইবে। ইনি প্রমথনাথ রায়চৌধুরী 
(বিখ্যাত প্রমথ চৌধুরী নহেন, ইনি সন্তোষের ছোট তরফের জমিদার, 
কবি ও সাহিত্যরসিক হিসাবে তাহার যথেষ্ট খ্যাতি ছিল। প্রিয়নাথ 
সেন প্রভৃতি তাহার বন্ধু ছিলেন । ) 

কিন্তু কথাটা ঠিক নয়। প্রেম কখনই দেহনিরপেক্ষ নয় । প্রমথনাথও 
তাহা দেখাইতে চেষ্টা করেন নাই। তাহা হইলে গল্পটিতে এই কথাগুলি 
পড়িতাম না ।-__-“আমি ডাকিলাম, স্ধা ! আমার স্বর কম্পিত-_কিঞ্চিৎ, 
বেদনাজড়িত। কোন উদ্তর পাইলাম না, কেবল একখানি কুম্থমকোমল 


৫৬ বাঙালী জীবনে রমণী 


করতল আমার করতলের মধ্যে আশ্রয় লইল । উহার মধ্যে এমন একটা 
নির্ভরশীলতা ছিল, যাহ! আজন্মব্যাপী এবং আমরণ-সঙ্গী। সহসা তাহার 
অধরে আমার অধর মিশিল।” নিশ্চয়ই . ইহাদের কেহই, এমন কি 
লেখকও সম্ভবত, ইউরোপীয় সাহিত্যের একটি বিখ্যাত কাব্য হইতে 
নিন্গলিখিত বিখ্যাত চরণগুলি পড়েন নাই। 


[2 1909০07৮ 101 02010 000 110102009 
আমি ইংরেজ কবির কৃত ইংরেজী অনুবাদ দিতেছি । 
“0900 0৮ 92০96162101 172501776, ৮৪ 7920 
01 1,201000106, 20 170 10৮6 11010. 11117) 11 11721]. 
৬০ ২০:০৩ 01070, 200 1017010127৮ ০20. 
১০176111005 ০00] ০93, 2 [100 %৮01৭15 58019 ০০1], 
106, 200. ০0৮ ০7৬1-- 29172708778 ০010101707০, 
[30016 25 ০00. 0256 ০01 0১০6 016 211. 
ডড1০7, ০ 09.0. 1:05 017050507119, 5০ 7175050 £07, 
51515564135 5৮০1) 2 10৮6], 1)6 126 22 
০৬৮০: 0োে [09 100 5102:5150 78016 
/1] 00011)1101515500. 10 17701101),1? 
এই চুম্বনের ফল পায়োলো ও ফ্রাঞ্চেস্কার ক্ষেত্রে কি হইয়াছিল, 
তাহা সকলেরই জানা আছে। কিন্তু মৃত্যুই আসল ব্যাপার নয়, আসল 
কথাটা চুন্ধন। চুন্বন-নিরপেক্ষ প্রেম নাই, স্থৃতরাং দেহনিরপেক্ষ প্রেমও 
নাই; এবং দেহনিরপেক্ষ প্রেম যখন নাই, কাম-নিরপেক্ষ প্রেমও 
নাই, কারণ কাম দেহ্ধর্স, অজেয় জীবধর্ম। মোহিতলাল মজুমদার 
লিখিয়াছেন, "স্ষ্টিমূলে আছে কাম, সেই কাম দুর্জয় হূর্বার !”» এটা কিন্তু 
তিনি ভয় পাইয়া লিখিয়াছিলেন ! আমি কামকে এই চক্ষে দেখি না__ 
মারের দ্বারা বুদ্ধের প্রলোভন ও নানা অপদেবতার দ্বারা সেণ্ট এন্টনীর 
প্রলোভনের গল্লে যে সত্য নাই তাহা বলিব না । কিন্তু উহা কামের এক 
রূপ সন্বন্ধে ধারণা । কামের আর এক রূপও আছে। জীবনের উত্স 
যে কাম, তাহাকে পাপ বলিলে কোথায় দাড়াইব ? 


কাম ও প্রেম ৫৭ 


বঙ্কিমচন্দ্র কামকে যে এই চক্ষে দেখেন নাই তাহার প্রমাণ এই 
প্রবন্ধের প্রথমেই দিয়াছি। তিনি দেহ ও প্রেমের মধ্যে যে বিরোধের 
কথা বলিয়াছেন, তাহা কামের জনপ্রচলিত ধারণা হইতে, কামের যে 
ধারণা কৰি ও দার্শনিকের হইতে পারে তাহা হইতে নয়। 

আমি কামের সহিত প্রেমের তফাত বুঝাইবার জন্য, যে আলোচনার 
কথা বলিয়াছি উহাতে একটি দৃষ্টান্ত দিয়াছিলাম। পাঠকের কাছে 
উহা কাজে না দিতে পারিলেও কথায় বলিব। আগে কনিয়াক দিয়া 
কামের প্রকৃত রূপ কি তাহা বুঝাইবার চেষ্টা করিয়াছিলাম। প্রেমের 
প্রকৃত রূপ বুঝাইবার জন্য “ওয়াইনে'র শরণাপন্ন হইলাম । (“ওয়াইন 
বলিতেছি এই জন্য যে, মদ, মগ্ঠ, সরা, সরাব যাই প্রয়োগ করি না কেন, 
তখনই জিনিসটার ব্যপ্না বদলাইয়৷ যাইবে। ক্ল্যারেট, বারগান্তী, 
শ্যাম্পেন, হক, মোজেল্‌ ইত্যাদিকে “মদ ধাললে রূপসী ও সতী-সাধবী 
ভদ্রমহিলাকে “মাগী” বলার মত হর । তাই “ওয়াইন'ই লিখিলাম |) 

অবশ্য আমার শাতো ইকেম বা শ্যাম্পেন অবশিষ্ট থাকিলে উহা 
পান করাইর়াই ব্যাপারটা বুঝাইতে চেষ্টা করিতাম। কিন্তু আমাদের 
ভণ্ড, অর্থশোষক ও ছোটলোক গভর্মমেণ্টের জ্বালায় ভদ্র জীবনযাত্র 
চালানে। আর সম্ভব না হওয়াতে, এইসব পানীয় ফুরাইয়া গিয়াছিল। 
তাই সামান্য একটু ভাল ওলোরোজো শেরী (অবশ্া হেরেথ দেলা 
ফ্রম্তেরার, দক্ষিণ আফ্বিকা বা অ্রেলিয়ার নয় ) অবশিষ্ট ছিল, তাহাই 
দিতে হইয়াছিল । আমার ধারণা জন্মিয়াছিল যে, আমার অতিথি- 
দম্পতিদের মধ্যে কাহারও কাহারও বিবাহ “ল্যাভ-ম্যারেজ' । তাই কাম 
হইতে প্রেমের প্রভেদ আলোচনার প্রসঙ্গে আমি বলিলাম-_ 

“আমার ধারণা হয়েছে এখানে আপনাদের কারুর কারুর বিয়ে 
লাভ-ম্যারেজ। তীদের মধ্যে এক দম্পতিকে একটা জিনিস খেতে 
দিয়ে জিন্ডেস করব-_এটা খাবার পর তীদের পূর্বরাগের কথা মনে পড়ে 
কিনা |” 

সকলে মুখচাওয়া-চাওয়ি করিতে লাগিলেন, কাহার উপর 


৫৮ বাঙালী জীবনে রমণী 


রসিকতা গড়ায় । যখন এক দম্পতিকে দিলাম, সকলেই হাসিলেন। 
কিন্তু আমার অনুমান সত্য কিনা তাহা আমি জিজ্ঞাসা করি নাই। 

ইহার দ্বারা যে তত্বটা হৃদয়ঙ্গম করাইতে চাহিয়াছিলাম তাহা এই-_ 
কনিয়াক অতি উচ্চাঙ্গের পানীয়, এবং সেই শেরীও উচ্চাঙ্গের পানীয়, 
উহাদের মধ্যে স্বাদ ও ধর্মের প্রভেদ আছে, অথচ ছুইএর মধ্যেই 
'আযাল্কহল' আছে, একটাতে কম, একটাতে বেশী । ছুইএর পার্থক্য যেমন 
স্পষ্ট, যোগও তেমনই নিবিড় । 

আত্রে সিমে! এ বিষয়ে একটা অতি খাঁটি কথা বলিয়াছেন। 
তিনি বলেন, ওয়াইন-এ আ্যাল্কহল নিশ্চয়ই আছে, নহিলে ওয়াইনই 
হইবে না। কিন্তু কেহ আ্যাল্কহলের জন্য ওয়াইন পান করে না, 
করে অন্য কারণে । তিনি আরও বলিয়াছেন, ওয়াইনের পিছনে 
'আলকহল+ চিত্রের পিছনে ক্যানভাসের মত, কেহই চিত্র দেখিতে গিয়া 
ক্যানভাস দেখিতে চায় না। 

কাম এবং প্রেমের মধ্যে যে সম্পর্ক, তাহাকেও এইভাবেই 
দেখিতে হইবে । (বিশুদ্ধতম, পবিভ্রতম প্রেমেও কাম আছে। 
কামবজিত প্রেম নাই। প্রেমের চরম আত্মসমর্পণ দৈহিক মিলনে, 
এই কথাটা মূর্খ বা ভণ্ড ভিন্ন কেহই অস্বীকার করিবে না) বিবাহের 
পূর্বে ধাহাদের সঙ্গমের কোনও অভিজ্ঞতা হয় না, তাহাদের অনেকেরই 
মনে এই বিষয়ে একটা আশঙ্কা থাকে । নিতান্ত অসভ্য ব্যক্তি ভিন্ন অন্য 
কেহই শুধু দৈহিক তাড়ন! তৃপ্ত করিবার জন্য বিবাহ করে না। তাহারা 
প্রধানত যাহা প্রত্যাশা! করে তাহা প্রণয়ের মানসিক স্থখ। স্থতরাং 
সঙ্গম সম্বন্ধে জনপ্রচলিত যে ধারণা আছে তাহা মনে রাখিয়া ভয়ে ভয়ে 
চিন্তা করে উহার সহিত প্রেমের আদর্শের কোনও সংঘাত দেখা! দিবে 
কিনা; একদিকে আকর্ষণ, আর একদিকে,জুগুপ্সা--এই ছুইটার সমন্বয় 
কি করিয়া হইতে পারে তাহা বুঝিতে পারে না। কিন্তু কার্যত দেখা যায়, 
কোনও জুগুপ্স৷ উদ্রিক্ত না হইয়াই কাম ও প্রেমের সমহ্বয় হইয়া যায়। 
সকলের ক্ষেত্রে সমন্বয় অবশ্থ একই পর্যায়ের হয় না, তবু সমন্বয় যে 


কাম ও প্রেম ৫৯ 
হয়, এবং কোথাও কোথাও সমন্বয় যে অত্যন্ত উচ্চস্তরে হয় তাহাতেও 
সন্দেহ নাই। 

তাই বলিয়া কিন্তু কাম ও প্রেম এক নয়; দুইয়ের পরিধিও সমান 
নয়। নরনারীর দৈহিক সম্পর্ক মনুষ্যজাতির দিক হইতে জৈব হইলেও 
বাক্তির দিক হইতে আরও অনেক কিছু। স্তরাং দৈহিক ব্যাপারটা 
আনুষঙ্গিক, মনের দিক হইতে মুখা নয় । 

আজকাল অবশ্য পৃথিবীর সর্বত্র নরনারীর সম্পর্ককে দৈহিক স্তরে 
আবদ্ধ রাখিবার একটা ঝোঁক আসিয়াছে । তাই উহার গা হইতে 
প্রেম চাচিয়। ফেলিয়া উহাকে শুধু কামের বন্ধনে পরিণত করারও 
একটা ফ্যাশন দেখা দিয়াছে । এই জিনিসটার প্রকাশ আমি চাক্ষুষ 
বিলাতে কিছু কিছু দেখিয়াছি । তবে ফ্যাশনটা যে দৃষ্টিকটু তাহা বলিতে 
দ্বিধা করিব না; যেমন নাকি মানুষের শরীর হইতে মাংস ও চামড়া 
কাটিয়া ফেলিয়! কঙ্কাল বাহির করাকে দৃষ্টিকটু বলিব । 

এই ঢং শুধু যে প্রেমের সৌন্ধের বিরোধী তাহাই নয়, মানুষের 
বিবর্তনেরও বিরোধী; আবার শুধু যে মনুষ্তজাতির বিবর্তনের বিরোধী 
তাহাই নয়, প্রাণীজগতের বিবর্তনেরও বিরোধী । প্রাণীদের মধ্যেও সঙ্গম 
কেবলমাত্র দৈহিক ব্যাপার নয়। নহিলে 'আ্যানিম্যাল কোর্টশিপ" সম্বন্ধে 
জীবতত্বের এত গ্রন্থ লিখিত হইত না। বিশেষ করিয়া পাখীদের মধ্যে 
এই জীবধর্মের প্রকাশে যে সৌন্দর্য দেখা দিয়াছে তাহা অপরূপ | যদ্দি 
পক্ষীবংশ বৃদ্ধি করাই একমাত্র উদ্দেশ্য হইত তাহা! হইলে গান বা পক্ষ- 
সৌন্দর্যের কোনও প্রয়োজন ছিল না; কেঁচোও সঙ্গত হইতে পারে ; 
প্রজাপতির প্রয়োজন ছিল না, কৃমি হইলেই চলিত । এমন কি উদ্ভিদ 
জগতেও জৈব প্রয়োজন নিরাভরণ জৈবস্তরে থাকে না, তাহা হইলে 
আমরা ফুল দেখিতাম না। ধাঁহারা প্রেমকে শুধু কাম বলেন, তাহাদের 
কাছে প্রেমের অস্তিত্ব প্রমাণ করিবার জন্য একটা চালাকি খেলিতে ইচ্ছা 
হয়_তাহারা আম খাইতে চাহিলে ফুলটা ন! দিয়া শুধু টাচাছোল৷ আঁটি 
দিলে কেমন হয়? . 


০ বাঙালী জীবনে রমণী 


এ বিষয়ে সত্য ও আসল কথাটা খুবই সহজগ্রাহা ও সহজবোধ্য | 
বিশ্বের কোনও জিনিসই মৌলিক নয়। তাহা! হইলে জড়পদার্থ ইলেক্ট্রন 
এবং ইলেক্ট্রনের সহচারীবর্গের বেশী অগ্রসর হইত না, অর্থাৎ আমরা 
জড়পদার্থ ই দেখিতাম না। ক্রমাগত অভিব্যক্ত হইয়া নূতন নূতন রূপ 
ধরিতে ধরিতে বাহুলোর দিকে যাওয়াই স্থষ্টিধর্ম । ইহার মধ্যে কোনও 
জায়গায় ছেদ টানিয়! বলিবার উপায় নাই যে, এই পর্যন্তই আসল, আর 
বাকীটা বাহুল্য । সবই একত্রসন্বদ্ধ ও অবিচ্ছেস্ধ | 

মানুষের বেলাতেও এই কথা খাটে । যুগে যুগে অভিব্যক্ত হইয়া 
মানুষ মানুষে দাড়াইয়াছে, কিন্ত্বু অভিব্যক্তির কোনও অংশই ত্যাগ 
করিতে পারে নাই-_অর্থা মানুষ একই সঙ্গে জড়পদার্থ, জীব, মানসিক 
বৃন্তিসম্পন্ন মানুষ, উচ্চতম অনুভূতিসম্পন্ন ভাবুক ও আদর্শবাদী । ইহাদের 
মধ্যে বিরোধ কোথাও নাই, নীতিবাদের নামে অনেকে দেহ ও আত্মার 
মধ্যে যে বিরোধ বাধাইয়াছে আসলে সেই বিরোধ কোথাও নাই । 

নরনারীর সম্পর্কেরও তেমনই কালে কালে অভিব্যক্তি হইয়াছে । 
কাম উহার আদিম রূপ হইলেও উহার পুর্ণাভিব্যক্ত রূপ নয়। এককালে 
কামকে হেয় বলিয়া শুধু প্রেমকেই গ্রহণীয় বলিয়৷ প্রচার করা হইত ; 
উহার ফলে মানবজীবনে ভণ্ডামি ভিন্ন আর কিছু দেখা দেয় নাই, দেয় 
না। আবার আজ প্রেমকে বর্জন করিয়া শুধু কামই গ্রাহ এই কথা 
বলিবার যে ফ্যাশন হইয়াছে, উহাও মুঢ়তা-_উহার ফলে নরনারীর 
সম্পর্ক দেন্গ্রন্ত ও নীচ হওয়া অবশ্যন্তাবী। স্থৃতরাং ছুইটা অস্ত্যক্তিই 
ছাড়িয়৷ দিয়া কাম ও প্রেমকে অবিচ্ছেগ্ভ বলিয়া মানা উচিত । আদিমতম 
কাম হইতে নবতম প্রেম পর্যন্ত একটা অবিচ্ছিন্ন ধারা । স্যন্ঠি যদি বন্ধ 
না হয়, তাহা হইলে এই সম্পর্কের নূতন অভিব্যক্তি, আরও বাহুল্য দেখা 
যাইবে এই আশা কর! যাইতে পারে । কাম ও প্রেম সম্বন্ধে এই কথা 
বলিয়াই এই প্রসঙ্গ শেষ করিব । 


ভ্বিতীম্ত্র পল্লিচ্জ্ে 
দেশাচার 


কাম হইতে মুখ ফিরাইয়া প্রেমমুখীন হইতে হইবে-_ইহাই যে উনবিংশ 
শতাব্দীতে বাঙালী জীবনে নরনারীর সম্পর্কঘটিত ভাববিপ্রুবের মূল সূত্র, 
তাহা বুঝাইবার চেষ্টা করিলাম। এখন এই বিবর্তনের কাহিনী লিখিতে 
হইবে। কিন্তু ষে-কাম হইতে নৃতন ধ্যান-ধ্যারণা ও ভাবাবেগের শ্োত 
বহিল উহা পূর্ব পরিচ্ছেদে বণিত কাম নয়। তাই যদি হইত তবে এই 
বিপ্লবকে শুধু আদর্শীন্তর, অর্থাৎ এক আদর্শ ছাড়িয়া অন্য আদর্শকে গ্রহণ 
করা বলিতাম। প্রকৃতপ্রস্তাবে যে পুরাতন ধার! হইতে নৃতন ধারা আরন্ত 
হইল উহা কোনও আদর্শেরই উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল না। উহা প্রাচীন 
ভারতের কামের প্রকাশ তে নয়ই, এমন কি প্রাচীন বাংল! কাব্যের 
কামও নয়। উহাতে যাহা দেখা যাইত তাহা কামের ইতরীকৃত লৌকিক 
রূপও নয়, কারণ উহাও স্থুল হইলেও দ্বণ্য নয়। ভাববিপ্রবের প্রারস্তে 
অর্থাৎ অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে ও উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমে 
কামের যে রূপ বাংলাদেশে দেখা যাইত উহা! অতিশয় জুগুপ্নাজনক। 

এই অধঃপতন কখন এবং কেন হইল তাহার আলোচনা এই 
বই-এ সম্ভব নয়। তাহা ছাড়া এ বিষয়ে পুরাপুরি তথা বা এঁতিহাসিক 
প্রমাণও নাই। কিন্তু এই অবনতির ফলে--অবনতি যে হইয়াছিল সে 
বিষয়ে কোনও সন্দেহ নাই- প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে যে আদিরস 
আছে তাহাকেও ভদ্রভাবে গ্রহণ কর! সে-যুগের বাঙালীর পক্ষে জন্তব 
রহিল না। প্রাচীন হিন্দুর তীব্র অথচ রসভোর মন্দিরা তৃষ্ণায় কাতর 
হইয়াও আর আমরা ওষ্ঠের কাছে ভুলিতে পারিলাম না। উহা! 
পণ্ডিত ব্যক্তির কামজ উত্তেজনার ওষধ, মানসিক মদনানন্দ মোদক 
হইয়া দাড়াইল। স্ত্ুতরাং সংস্কৃত কবিতা পড়। ও পড়াইবার সময়ে 
পণ্ডিতের আদিরসের যে আগ্ধশ্রাদ্ধ করিতেন তাহার ফলে আদিরসের, 
পিগড চটকাইবার সাধ্যও রহিল না। 


৬২ বাঙালী জীবনে রমণী 


এই পণ্ডিতের দুই উদ্দেশ্যে আদিরসাত্মক কাব্যের ব্যাখ্যা 
করিতেন। প্রথমত, প্রৌট বয়সে যুবতী স্ত্রীর অনুগ্রহ পাইবার জন্য । 
ভুঁড়ি, উধ্বগামী ও অধোগামী নানাপ্রকার দুর্গন্ধ ইত্যাদির দ্বারা 
পত্বীকে প্রতিকূল করিয়া কামপ্রবৃত্তির সাহায্যে অনুকূল করিবার জন্য 
আদিরসাত্মক কবিতার সহায়তা লইতেন। বঙ্কিমচন্দ্র ইহা! জানিতেন। 
তাই তিনি শান্তি সম্বন্ধে লিখিয়াছিলেন, পণ্ডিত “শান্তির অভিনব যৌবন- 
বিকাঁশজনিত লাঁবণ্যে মুগ্ধ হইয়া ইন্দ্রিয় কর্তৃক পুনর্বার নিপীড়িত হইতে 
লাগিলেন। শিষ্াকে আদিরসাশ্রিত কাব্য সকল পড়াইতে লাগিলেন, 
আদিরসাশ্রিত কবিতাগুলির অশ্রাব্য ব্যাখ্যা শুনাইতে লাগিলেন । 
তাহাতে শান্তির কিছু অপকার না হইয়৷ কিছু উপকার হইল। লঙড্ভা 
কাহাকে বলে, শাস্তি শিখে নাই; এখন শ্ত্রীস্বভাবস্ুলভ লজ্জা আসিয়া 
আপনি উপস্থিত হইল |” 

পণ্ডিতদের দ্বিতীয় উদ্দেশ্য ছিল, প্রকাশ্যে ছাত্রদের সঙ্গে বদরসিকতা 
করা-_কোনও সময়ে গ্রচ্ছনভাবে, কোনও সময়ে খোলাখুলি ৷ ছাত্ররা 
অধ্যাপকের উক্তি মাথা নীচু করিয়। শ্রদ্ধাসহকারে শুনিত। কিন্তু পরে 
নিজেদের কথাবার্তায় উহার উপর বেশ করিয়৷ নিজন্ব রং চড়াইত। 
একটু চাপা ভাবে এই উৎপাত আমাদের ছাত্রাবস্থাতেও কিছু কিছু ছিল। 
আশ্চর্সের কথা এই, রাগিলেও পণ্ডিত মহাশয়ের এই অধঃপতিত কাম 
হইতেই ভৎ্সনার পারিপাট্য সাধন করিতেন। কলিকাতাঁর এক পণ্ডিত 
মহাশয় রাগিলেই বলিতেন, “তো ছোড়াদের যা অবস্থা তাতে তো 
বিছানার চাদর কেচে জল খাইয়ে দিলে ছুঁড়িদের পেট হয়ে যাবে।” 


৮৯০০ হী পাল বিল স্পা সাপ 


পপ কালা দি পপস 


ছাত্রেরাও অবশ্য যতটুকু পারে টেক্কা দিতে চেষ্টা করিত। একদিন এক 
পণ্ডিত মহাশ্য় গরমে অস্থির হইয়া পাঙ্খাটানাওয়ালাকে বলিয়াছিলেন, 
ধেঁচো ৮ ক্লাসন্ুদ্ধ ছাত্র উহ! হিন্দী অর্থে না লইয়া ক কলিকাতা, বালক 


শী এপ পার 


শপে না-ও এ,০- রন সা এ 


সমাজে প্রচলিত বাংলা অর্থে নিয়া উচ্চ হাস্য করিয়া উঠিয়াছিল। 


৬ জা পা ৯ শি অপ আর 


_ অন্থাদিকে প্রাচীন বালা কবিতার আদিরসও হইয়া ঈাড়াইল বাঙালী 
'প্রাকৃতজনের কামপরিতৃপ্তি বা কামজ রসিকতার অবলম্বন। ফলে 


দেশাচার ৬৩ 


“বিদ্ানুন্দর' সাহিত্য-হিসাঁবে অপাংক্তেয় হইয়া গেল। আমি অল্পবয়সে 
আনাতোল ফাঁসের অত্যন্ত অনুরাগী ছিলাম । ইহা! দেখিয়া আমার এক 
গুরুজন-্যাহাকে আমি অত্যন্ত শ্রদ্ধা করিতাঁম__ আমাকে বলিয়াছিলেন, 
“আনাতোল ফ্রাসেকি আছে? তার “রেড লিলি” তো বিষ্যান্বন্দরে'র 
মত।” পরে নবারন্ধ শনিবারের চিঠিতে প্রসঙ্গক্রমে রসিকতাচ্ছলে 
“বি্যাস্থন্দরে'র উল্লেখ করিয়া নিজেও বিরাগভাজন হইয়াছিলাম । তখন 
দ্রিলীপকুমার রায়ের খুবই নাম, বিশেষ করিয়া গানের জন্য । এই কারণে 
বহুলোকে তীহার নামের পুর্বে গীতন্থন্দর' বা 'স্থরস্ুন্দর, বিশেষণ 
বসাইত। আমি এই ঢং২কে বিদ্রপ করিয়া লিখিয়াছিলাম, “আমরা 
ব্রজেন্্নাথ শীল মহাঁশয়কে 'বিদ্যাসুন্দর' উপাধি দিলাম |” পরে গশুনিলাম, 
উহ! শনিবারের দলের অপরিসীম ও অশ্লীল বেয়াদবীর প্রমাণ বলিয়া 
বিচার করা হইয়াছিল । 

এই অবনতির ফল ভাষাতেও দেখা দিয়াছিল। আমি বাডাল, 
কলিকাতায় বড় হওয়ার দরুন নরনারীঘটিত বহু খানদানী শব্ধ 
শুনিতাম, কিন্তু গুহসাধনায় দীক্ষা না লওয়াতে কথাগুলির ব্যগ্না 
জানিতাম না। তাই একদিন মোহিতবাবুর কাছে ভ্ত্রীলোকের 
হাস্তলাস্ত ও “কোকেটি'-র কথা বলিতে গিয়া “ছেনালী” শব্দ, ও আর 
একদিন স্ত্রীকে সন্দেহ করার বায়ু সম্বন্ধে 'নেয়ো-বাই” শব্দ ব্যবহার 
করিয়াছিলাম। তিনি একেবারে “না-না' করিয়া উঠিলেন। আমার 
অজ্ঞতা বুঝিতে পারিয়৷ রাগ করিলেন না বটে, কিন্তু এই শব্দগুলি 
ভবিষ্যতে প্রয়োগ করিতে একেবারে নিষেধ করিয়। দিলেন। 

ফলে সংস্কৃত আদিরসাত্মক কবিতা দুরে থাকুক, আধুনিক প্রেমের 
উপন্যাস পড়াও নিন্দার ব্যাপার হইয়া ্াড়াইল। আমার মনে আছে, 
একদিন আমার স্কুলের বন্ধু গঙ্গাধর “বিষবৃক্ষ” সম্বন্ধে কি বলিয়াছিল__ 
“বইটা খারাপ নয়, তবে জায়গায় জায়গায় আদ্িরস একেবারে ঢেলে 
দিয়েছে 1” তাহার নাক-সিটকানে! মুখ আমার চোখে ভাসিতেছে। 
আদিরস অবশ্য কমলমণি ও শ্রীশচন্দ্ের চুন্বন। 


৬৪ বাঙালী জীবনে রমণী 


এইভাবে প্রায় জোর করিয়া কামকে ঘরের বাহির করিয়া কুলটা 
করার পর, এবং সকল কুলটার যেস্থানে গতি হয় সেই বেশ্বাবাড়ীতে 
পাঠাইবার পর, কাম লইয়া সাহিত্য-রচনার সাধ্য আর আমাদের রহিল 
ন।। বহুকাল কাম সম্বন্ধে কোন কথ! বলাই সম্ভব হইল না । তবে কাম 
চাঁপা থাকিবার জিনিস নয়। তাই যৌনবিজ্ঞান হইয়া আবার দেখা 
দিয়াছে । হায়! সংস্কীত কবিতার পর এও আমাদের কপালে ছিল। 

নরনারীর সম্পর্ক লইয়া সেকালের কর্মকাণ্ড ও দেশাচারের কথা 
যখন ভাবি, তখন আমার নিজের জীবনের বু অভিজ্ঞতার কথা মনে 
পড়ে। এখানে বলা প্রয়োজন, আমার পিতামাতা ত্রাক্মগপন্থী ছিলেন। 
স্বতরাং কোনও নিন্দনীয় ব৷ কুৎসিত ব্যাপারের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার 
স্থযোগ অন্য বালকের যাহা ছিল, অল্পবয়সে আমার তাহ! ছিল না। 
আমাদিগকে সেই ধরনের জীবনের সকল সংস্পর্শ হইতে অতি সাবধানে 
রক্ষা করা হইত। সেই শিক্ষার ফলে এইসব ব্যাপারে আমার নিজেরও 
একটা সংঘম গড়িয়া উঠিয়াছিল। সুতরাং ছাত্রজীবনে বা প্রথম 
কর্মজীবনে কেহ কখনও আমার সহিত স্ত্রীঘটিত ব্যাপার লইয়া কথা 
বলিত না-__স্ুলিলেও আমি হয়ত চালাইতে দিতাম না, কিন্তু আমার 
ধরন-ধারণ দেখিয়া অন্যেরা আমার কাছে এইসব প্রসঙ্গের উত্থাপনই 
করিত না। এখনও আমার অনেক বন্ধু বা পরিচিত ব্যক্তি বলেন-__ 
নিন্দার ভাবেই বলেন যে, আমি “সেক্স” লইয়া কথা বলি না। 

তবু স্ত্রীঘটিত আকার-ইঙ্িত, ফিস্ফাস্‌ এত পরিব্যাপ্ত ছিল যে, 
আমার দেখিবার বা শুনিবার ইচ্ছা না থাকিলেও বহু জিনিস চোখে 
পড়িত, কানে পৌছিত। অতি সামান্য অংশের সহিত পরিচয় হওয়া 
সত্বেও যাহ! জানিতে পারিয়াছিলাম তাহাতেই আমার মনে একটা গীড়। 
হইত। এইখানে জীবনের বিভিন্ন বয়স হইতে চারিটি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার 
কথ! বলিব। 

প্রথমটি ১৯০৬ অথবা ১৯০৭ সনে ঘটিয়াছিল, তখন আমার বয়স 
আট-নয়। আমাদের পাশের বাড়ীর মোক্তার মহাশয়ের কয়েকটি 


দেশাচার ৬৫ 
মেয়ে ছিল। উহার! মাঘমগ্ডল ব্রত করিত। বাঘের বিক্রমসম মাঘের 
হিমানী, মাঘের শীত সম্বন্ধে এই প্রবাদবাক্য সকলেরই জানা । সেই শীত 
ময়মনসিংহ জেলাতে আবার খুবই প্রখর হইত। উহা সত্বেও মেয়ের! 
খুব ভোরে সূর্যোদয়ের আগে উঠিয়া নদীতে স্নান করিবার পর গান 
গাহিতে গাহিতে বাড়ী ফিরিত। আমরা ছেলেরা সেই গানে জাগিয়। 
উঠিয়া তখনই ছুটিয়া গিয়া মেয়েদের সঙ্গে যোগ দিতাম । 

অবশ্য ব্রতের অনুষ্ঠানে যোগ দিবার উপায় আমাদের ছিল না'। 
প্রথমত, ব্রত মেয়েদের, তারপর আমরা অক্সাত। প্রায় সমস্ত উঠান 
জুড়িয়া নিকানো ব্রতের জায়গার মধ্যেও আমাদিগকে যাইতে দেওয়। 
হইত না। আমরা খড়কুটা যোগাড় করিয়া মেয়েদের আগুন পোহাই- 
বার জন্যে আগুন জ্বালিয়া দ্রিতাম, আর কাছে বসিয়া থাকিতাম। 

মেয়ের ব্রতস্থানে চালের গুঁড়া, কাঠ-কয়লার গুড় ও স্থরকির গুঁড়া 
দিয়া আলপনার ছাঁদে খুব বড় করিয়া চিত্র করিত, উহার মাঝখানে লাল 
গুঁড়া দিয়া সূর্ষের মুখ ও সাদা গুড়! দিয়া চাদের মুখ আকিত। আকা 
হইয়া গেলে ছড়া আবৃদ্তি করিতে করিতে ব্রতের নানারকম ক্রিয়াকর্ম 
করিত। আমরা বালকের! দূর হইতে দেখিতে দেখিতে ভাবিতাম, 
মেয়েগুলি ব্রতের পুণ্যের ফলে স্বর্গে চলিয়া যাইবে, আর আমরা 
পুণ্যহীন, অকর্মণ্য এঁড়ে বাছুরের দল মর্তে পরিয়া থাকিব। 

একদিন এইভাবে মেয়ের! চিত্র করিতেছে । আমি কাছে বসিয়া 
দেখিতেছি । হঠাৎ একটা অস্ফুট যন্ত্রণাধবনি শুনিয়া পিছনের দিকে 
তাকাইলাম। দেখিলাম, কাতরোক্তি মোক্তার-মহাশয়ের মুহুরী, আমাদের 
অমুক-দাদার মুখ হইতে আসিতেছে । দাদা একটি জলচৌকিতে বসিয়া 
আছেন, কোমর পর্যন্ত ধুতি তোলা, একট! কি তীব্রগন্ধ ওষধ দিয়া উন্মুক্ত 
উপস্থ ধুইতেছেন, তাহার অগ্রভাগ হইতে ফৌটা ফৌটা রম্তু নীচে 
একটা পিতলের বাটিতে পড়িতেছে। 

এতগুলি বালক-বালিক! যে কাছে তাহাতে তিনি কোনও সঙ্কোচ । 
বোধ করেন নাই--অবশ্য আমরা বালক-বালিকারাও দৃশ্যটা দেখিয়া 


৫ 


৬৬ বাঙালী জীবনে রমণী 


উহাতে মনোযোগ দেওয়া বা কথা বলার কোনও আবশ্যক দেখি নাই। 
আমাদের অস্পষ্ট একটা ধারণা ছিল যে, শহরের উপকণ্ঠে বেশ্যাপাড়া 
বলিয়৷ যে একটা বেড়া-দেওয়া দৌচালা-চারচালার বসতি আছে, 'সেখানে 
যাওয়ার জন্যেই এই ধরনের রোগ হয়; উহা লইয়া চেঁচামেচি বা 
মাতামাতি একেবারে অহেতুক । 

দ্বিতীয় ঘটনাটি ১৯১৩ সনের-_তখন আমি দশম শ্রেণীতে পড়ি। 
আমার পিতার কলিকাতায় একটা ব্যবসা ছিল, তিনি কিশোরগঞ্জে 
থাকিতেন বলিয়া একজন প্রৌঢ় ভদ্রলোক উহা চালাইতেন। তিনি 
অতিশয় ফিটফাট পোশাক-পরিচ্ছদ ও প্রসাধন করিতেন। আমরা 
তাহাকে কাকা বলিয়া ডাকিতাম ও তীহার কাছে খরচের টাকার জন্য 
মাঝে মাঝে যাইতাম। 

একদিন আমি ও আমার জ্যেষ্ঠ টাক! আনিতে গিয়! দেখি, তীহার 
কুড়ি-বাইশ বসরের যুবক ভ্রানুষ্পুত্র জরে শয্যাশায়ী। জ্রটা বেশী, 
তাই কাকা-মহাঁশয় চিন্তিত। এই অবস্থায় দুই-তিনদিন পরে আমরা 
আবার খবর লইতে গেলাম। তখন কাকা-মহাশয় গম্ভতীরভাবে আমা- 
দিগকে বলিলেন, “প্রথমে ভেবেছিলাম ম্যালেরিয়াঘটিত জ্বর, এখন বের 
হয়েছে প্রমেহঘটিত জ্বর ।” দাঁদাও আমার মুখের দিকে চাহিলেন না, 
আমিও দাদার মুখের দিকে চাহিলাম না__চোখ চাওয়া-চাওয়ির তো 
কোনও প্রশ্নই উঠিতে পারে না। 

তৃতীয় ঘটনা ১৯২১ সনের, তখন বিশ্ববিদ্যালয় হইতে বাহির 
হইয়াছি। একবার কলিকাতা হইতে কিশোরগঞ্জ যাইবার সময়ে 
জগন্নাথগণ্জ ঘাটে ইন্টার ক্লাসের গাড়ীতে বসিয়া আছি। সামনের 
বেঞ্চিতে একটি প্রৌঢ় ভদ্রলোক । তিনি রেলের কর্মচারী, ছুটি লইয়া 
বাড়ীতে যাইতেছেন । 

রেললাইনের ধারে কয়েকটি খড়ের ছোট ঘর, দরমার 'টাটি' দিয়া 
«ঘেরা । বেড়ার দরজার কাছে একটি যুবতী দাড়াইয়৷ আছে। তাহার 
বয়স অল্প, রং শ্যাম হইলেও দেহ সুঠাম, মুখখানা কমনীয়। পাশে একটি 


দেশাচার ৬৭ 


রুলধারী রেলওয়ে কনস্টেবল ব্রিতঙ্গমুরারি ভঙ্গীতে দঈাড়াইয়া হাসি-হাসি 
মুখে মেয়েটির সঙ্গে কথা বলিতেছে, স্যন্ক বাহিয়।৷ পানের রস পড়িতেছে। 

ঘরগুলি কি, মেয়েটি কি, বোধ করি বলিয়া দিতে হইবে না। রেল- 
স্টেশনে এবং অন্যান্য ছোট জায়গায় যে-সব কর্মচারী সামান্য বেতনে 
কাজ করিত তাহাদের পক্ষে সপরিবারে থাকা সম্ভব হইত না। তাই 
তাহাদের স্থবিধার জন্য এই ধরনের ঘর এবং ঘরের অধিবাসিনীও 
থাকিত, নহিলে রাত্রিযাপনে কম্ট।হইত। জগন্নাথগঞ্জ ঘাটের চড়ার 
ধারেও এই ব্যবস্থা স্বতঃই গড়িয়া উঠিয়াছিল। 

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করিবার পর হঠাৎ একটি যুবক প্রৌঢ় ভদ্রুলোককে 
দেখিয়া লাফ দিরা কামবাঁয় উঠিয়া পদধুলি লইয়া জিজ্ঞাসা করিল, “কই 
ঠান্‌?” ভদ্রলোক বলিলেন যে, ছুটিতে বাড়ী যাইতেছেন। কতদিনের 
ছুটি ইত্যাদির কথাবার্তা চলিতেছে এমন সময়ে দেখি যুবকের চোখ 
মেয়েটির দিকে পড়িয়াছে। সে তৎক্ষণাৎ গলা বাড়াইয়৷ খুব ভাল 
করিয়া দেখিয়া বলিয়া উঠিল, “আরে, এ কবে আইছে ? এরে ত আগে 
দেখি নাই !” 

ভাষাতেই পাঠক বুঝিতে পারিবেন কোন্‌ অঞ্চলের লোক। প্রো 
ভদ্রলোকটি একেবারে অগ্রিমুতি হইয়া বলিলেন, “তোমার লজ্ভা করে না? 
এতজন ভদ্রলোকের সামনে এই ধরনের কথা বল!” ক্রমাগত ভত্সনা 
চলিল, বেচারা যুবক বুঝিতেই পারিল না কেন এত ভ্সিত হইতেছে। 
চোখের সম্মুখে লৌভনীয় বারবনিতা, ইহার সম্বন্ধে কথা বলিব, না নীরস 
কথা বলিব? 

চতুর্থ ঘটনা ১৯২৭ সনের। তখন. আমি বেলেঘাটার_ কাছে 
শুঁড়োতে থাকি। ফাড়িপথে কলিকাতা আসিবার জন্য একটা পায়ে 


গাহি সানা আট (জিত আপা কন উড তর পা বাট এজ পপর শব রমার জর রা 


চলার রাস্তা নারিকেলডাঙ্গার রেলপুল [পুল পর্যন্ত ছিল। সেটা ধরিয়া হারিসন 


রর ৩ পার ৭ এসএ পরিররান রহারাএটমারে 


রোডের দিকে আসিতেছি। -জায়গাঁটী ফাকা, কিন্তু মাঝে মধ্যবিত্ত 


বাপ, ওর 


গৃহস্থের একতলা কতকগুলি বাড়ী ছিল । পাড়াটার সামনে একটা মাঠের 


০০৬ এ 


ধারে আসিয়াই দেখি ওপারে একটা ছোট রকমের ভিড়, উহাতে 


৬৮ বাঙালী জীবনে রমণী 


পুরুষ-ন্তরীলোক দুই আছে। কাছে গিয়া দেখিলাম একটি বাড়ীর সদরের 
কাছে একটি কিশোরী কাদ-কীদ মুখে দাঁড়াইয়া আছে। তাহার সামনে 
একটি স্থুলকায় ভদ্রলোক হেঁটো ধুতি পরিয়া খালি গায়ে চীৎকার 
করিতেছেন। পাশে একদিকে কয়েকটি প্রা গৃহিণী। এক গৃহিণীর 
মুখে শুনিতে পাইলাম, “ও মাগো, কি থেম্সার কথা! সোমন্ত মেয়ের 
বুকে হাত দেয়া! 

ভদ্রলোকটির সামনে একটি যুবক অত্যন্ত অসহায়ভাবে জোড়হাতে 
দাঁড়াইয়াছিল। সে গঞ্জনার উত্তরে অতি কাতরকণ্ঠে বলিল, “আমাকে 
আপনারা ভুল বুঝবেন না। আমি নিজের বোন ভেবে শুধু বৌটাতে 
একটু কুরকুরুনী দিয়েছিলাম ।” 

ভদ্রলোক একেবারে. বোমার মত ফাটিয়! গিয়া চেচাইয়া উঠ্িলেন, 
“শালা! তুমি বোন ভেবে কুরকুরুনী দিয়েছিলে? _ কুরকুরুনী ঢুকিয়ে 
দেবো তোমার পৌদে।” ্ 

আমি তখন মূল ফরাসীতে কাসানোভার আত্মজীবনী পড়িতেছি। 
ভাবিলাম ইহা কি কাসানোভার অনুসন্ধান, না অন্য কিছু? যথেষ্ট আদি- 
রসাত্মক বই পড়িয়াছিলাম, তাই প্রশ্ন করিলাম-_ইহাঁও কি আদিরস? 

এই ধরনের ঘটনা হইতে আলোচনা শুরু করিতে গেলে তখনই 
ছুইটি প্রশ্ন উঠিবে। প্রথম, এরূপ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর 
করিয়া কি সমগ্র একটা সমাজের আচরণ সম্বন্ধে রায় দেওয়৷ চলে ? 
একজন ব্যক্তি কত দেখিতে পারে? সব সমাজেই অনাচার থাকে, 
ভুল ধারণা থাকে, খোজ লইলে ইহার অল্লবিস্তর সংবাদ মেলে । এই 
সব সত্বেও মোটের উপর সমাজের আদর্শ এবং আচরণ দুই-ই দুষিত না 
হইতে পারে । এই যুক্তি মানিয়া লইতে আমার একটুও আপঙ্তি 
হইবে না। যে ঘটনাগুলির বিবরণ দিয়াছি, উহার সহায়তায় আমি 
বততধয শ্রমীণ করিতেও বসি নাই। প্রশ্নটার সম্বন্ধেও বলিব উহা 
যুক্তিযুক্ত । আমার অভিজ্ঞতায় এরূপ পঞ্চাশটা ঘটন! - আসিলেও 
বলিতাম, উহার উপর নির্ভর করিয়া সিদ্ধান্ত করা যায় না--খদি না-*" 


দেশাচার ৬৯ 

এই 'যদি-নাস্টা গুরুতর, ইহাই ভাবিবার বিষয়। অর্থাৎ এই চারিটা 
ঘটন! যদি বিচ্ছিন্ন না হয়, যদি এগুলির সহিত অন্য তথ্য-প্রমাণ 
হইতে একটা সমাজ সম্বন্ধে যে ধারণ। করা যাঁয় তাহার সঙ্গতি ও 
সামগ্স্ত থাকে, তবে প্রতীক বা উদাহরণ হিসাবে এগুলিকে নিশ্চয়ই 
উপস্থাপিত করা যায়। আমিও তাহাই মাত্র করিলাম । আপাতত এর 
বেশী কিছু নয়। 

দ্বিতীয় প্রশ্ন এই-__বাংলাদেশে উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি 
সময় হইতে নরনাধীব সম্পর্কের যে নুতন ধাবা দেখা দিয়ছিল তাহার 
'মাবি9।বেব পর যাহা দেখা যাইত বা আজ পর্যন্ত যাহ! দেখা যায়, সেই 
সব ঘটনা বা ব্যাপারকে পূর্ববর্তী যুগের অবস্থার গ্রমাণ হিসাবে ব্যবহার 
করা যায় কিনা। সাধারণত এঁতিহাসিক অনুসন্ধানে পূর্ববর্তী যুগের 
অবস্থার প্রমাণ হিসাবে পরবত। যুগের কোনও আচরণকে সাক্ষ্য বলিয়া 
গ্রাহ্থা করা হয় না। প্রতিটি যুগের তথ্য-প্রমাণকে আলাদা রাখা হয়। 

কিন্তু এই ক্ষেত্রে এই নিয়মের ব্যতিক্রম করিলে অন্যায় হইবে না। 
কেন হইবে না, বলিতেছি। বাংলা দেশে নরনারীর সম্পর্কঘটিত 
ব্যাপারে সকল দিক হইতে নূতন ধ্যানধারণা ও আচরণ দেখা দিবার 
পরও পুর্ব যুগের আচরণ মোটেই লোপ পায় নাই। বাঙালী সমাজের 
সর্বত্র নৃতন ধারার পাশে পাশে পুরাতন ধার! দেখা যাইত। এই কথা 
কলিকাতা সম্বন্ধেও খাটে, পল্লীগ্রামের তো কথাই নাই। গ্রাম অঞ্চলে ও 
গ্রাম্যসমাজে__যেখানে পাশ্চাত্য শিক্ষা বা আচার-ব্যবহার পৌছিতে 
পারে নাই, সেখানে পুরাতন ধারা প্রায় অক্ষু্ ভাবেই ছিল । 

তবে নরনারীর সম্পকিত পুরাতন দেশাচারের বিবরণ দিবার আগে 
আমার বিবরণ কি ধরনের তথ্য-প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত হইবে তাহার 
একটু আলোচনা! করিতে চাই, যাহাতে পাঠক বুঝিতে পারেন যে, আমি 
শুধু সীমাবদ্ধ ব্যক্তিগত প্রত্যক্ষ জ্ঞানের উপর নির্ভর করিয়াই এই বিষয়ে 
বর্ণনা দিতে অগ্রসর হই নাই। 

নরনারী-সম্পকিত ব্যাপারে পাশ্চাত্য প্রভাৰ সাহিত্যে আত্মপ্রকাশ 


৭০ বাঙালী জীবনে রমণী 


করিবার পুর্ববর্তীকালে, অর্থাৎ মোটামুটি ১৮০০ সন হইতে ১৮৫০ পর্যন্ত 
যে যুগ তাহা হইতে যে সাক্ষ্য পাওয়া উহারই কথ! আগে বলিব। 
ছাপার অক্ষরে সাক্ষ্য প্রধানত চার ধরনের রচনায় আছে-_(১) সংবাদ- 
পত্রের বিবরণ; (২) গগ্ভসাহিত্য ; (৩) কবিতা; (৪) গান। গানের 
মধ্যে টপ্পা ইত্যাদি হইতে আরন্ত করিয়৷ কবির গান তরজা পর্যন্ত ছিল। 
তবে উহার বেশীর ভাগ ছাপা হয় নাই। 

এই সব রচনাকে এঁতিহাসিক প্রমাণ হিসাবে ব্যবহার করিবার আগে 
কয়েকটা আপন্তি মনে রাখিতে হইবে । সংবাদপত্রে, নরনারী জম্পকিত 
যে আলোচন৷ প্রকাশিত হইত তাহার উদ্দেশ্য ছিল হয় সমাজ-সংস্কার, 
নয় বাক্তিগত নিন্দা ও আক্রমণ । উহাতে অতিরঞ্জন থাকাই সম্ভব, 
একেবারে নির্জল! মিথ্যা থাকাও অসম্ভব নয় । উদাহরণ দিয়া সমস্যাটা 
কি বুঝাতে চেষ্টা করিব। ১৮৩১ সনের ৫ই নভেম্বর তারিখে 'সন্বাদ 
স্বধাকর' পত্রিকাতে এই সম্পাদকীয় প্রবন্ধ প্রকাশিত হইয়াছিল 


“কস্যচিৎ “চেতো৷ পরগণা৷ নিবাসিনঃ বিপ্রস্তানস্য” ইতি স্বাক্ষরিত এক 
পত্র আমরা গত সপ্তাহে প্রকাশিত করিয়[ছি। 

“চেতো পরগণা নিবাসি বিপ্রসস্তান লিখিয়াছেন যে, ইঙ্গরেজী বিদ্কা 
শিক্ষাকরণাশয়ে তিনি স্বদেশ পরিত্যাগ পূর্বক কলিকাতায় উপনীত হইয়! 
সথুযোগক্রমে এতন্নগরস্থ কোন প্রধান ব্যক্তির ভবনে বাসা করিলেন। দিবা 
অবসাঁনে যখন এ বিপ্রসস্তান সাঁয়ংসন্ধা। করিয়া বসিয়াছিলেন তখন প্রথমতঃ 
বাঁটীর বৃদ্ধ কর্তা, তৎপরে তাহার জ্যেষ্ঠ ও মধ্যম পুত্র ও পরে তীহার কনিষ্ঠ 
পুজঅও, ইহারা একে একে তাবতেই বাঁটী হইতে বহির্গমন করিলেন, 
তৎপরে ছুইজন দৌবারিক ও অন্ত কোঁন কোন চাঁকর অন্দর মহলে প্রবেশ 
করিয়া নিশাবসান করিল, যাবৎ কর্তা ও তাহার পুত্রের! বাহিরে যামিনী 
যাপন করিয়া! প্রাতঃকালে গৃহে প্রত্যাগমন করিলেন। এইস্থানে বিশেষ 
ব্যাখ্যার প্রয়োজনাভাব। পাঠক মহাশয়ের! অনায়াসে অন্থমান করিতে 
পারিবেন যে কি ব্যাপার হইয়াছিল, আর এ বিপ্রসস্তানের সহিত ও বাটির 
খানসামার যে কথোপকথন হইয়াছিল তাহা প্রকাশাবশ্তক নহে। যর্দিও 
উপরি উক্ত বৃত্তান্ত পাঠকরণীস্তর অস্মদাদ্ির ইঙ্গরেজ পাঠকেরা মনে মনে 


দেশাচার ৭১ 


হাস্য করিয়া হিন্দুদিগের প্রতি তাহাদের দ্বণা জন্মিলেও অসঙগত হয় না, 
তথাচ এ রূপ রীতি চরিত্র এই রাজধানীর মধ্যে এতাদূক চলিত হইয়াছে যে 
এক্ষণে প্রায় অনেক বিশিষ্ট লোকেরা ইহাঁতে আশ্চর্য্য জ্ঞান করিবেন না?” 
এই কাহিনীর কতটুকু সত্য বলিয়া গ্রহণীয়? সম্পাদক যে বিশ্বাস 
করিয়া লিখিয়াছিলেন তাহাতে কোনও সন্দেহই নাই। তাহার উদ্দেশ্য 
পরের মন্তব্যে স্থম্পষ্ট । তিনি বলিতেছেন ;_- 
“নারী জাতির মদন পুরুষাপেক্ষা অষ্টগুণ প্রবল (এই রূপ অনেকে কৃহিয়া, 
থাকেন ), তাহাতে অন্মদ্দেশের কঠিন রীত্যন্থসারে বিগ্কারূপ যে জ্ঞান 
তাহা তাহারদিগকে বঞ্চত করাতে এ ছূর্ববার মদন অজ্ঞান অবলাঁদিগের 
উপর পূর্ণতা ক্ষমতা প্রাপ্ত হইয়! তাহারদ্রিগের কামানল উজ্জল করিয়া যে 
তাহারদিগকে অতি ঘেরতর দুক্র্মে প্রবৃত্ত করাইবেক ইহার বাধা কি? আর 
ইহাতে যে তাহারদিগের সতীত্বও বিনাশ হইবে ইহাঁরই বা অসম্ভাবনা কি 
আছে?" 


“কিন্ত ইহাও জানিয়! যদি পুরুষের! স্বপত্বীদিগকে অবহেলা করিয়া উপপত্বীর 
বশীভূত হইয়া কেবল তাহারদিগের সহিত আলাপে রত হন তবে স্বন্ব 
পত্বীদ্দিগের সতীত্ব ধর্ম বিনাশ জন্য যে অন্গুযৌগ তাহা এ অবোধ পুরুষদিগকে 
বই আর কাহাকে অপিতে পারে? বাস্তবিক এই যে তীহাঁরাই কুরীতির 
মূলাধার, অতএব তাহারদিগকেই আমরা অনুযোগ করিতে পারি।:*" 
“স্ত্রীলোকের বিগ্ভাশিক্ষার দৃঢ়তর শত্রু যাহার! অবলার্দিগকে বিগ্ভাবতী করিতে 
মনস্থ না করিয়া তাহাঁরদিগকে চিরকাল কেবল রন্ধনশাঁলায় রাখিতে প্রয়াস 
করেন তাহারদিগের প্রতি আমরা এইক্ষণে এই প্রশ্ন করি যে, উপরি উক্ত 
লম্পটাচরণ কেবল জ্ঞাঁনীভাবেই হইয়াছে, কি তাহার আর কোন কারণ 
আছে? তাহারদিগকে আরও জিজ্ঞাসা করি যে, বিদ্যা অথবা জ্ঞান থাকিলে 
এ স্ত্রীলোকেরা কি এমত কুৎসিত কর্ধে প্রবর্ত হইত ?” 
সম্পাদক সমাজ-সংস্কারে উৎসাহী হওয়াতে একট! উড়ো ঘটনাতে 
বেশী আস্থাশীল হইয়া মনে করিয়৷ থাকিতে পারেন যে এই ধরনের 
অনাচার ব্যাপক। স্থৃতরাং সংবাদ বাদসাদ দিয়া নিতে হইবে । তবে ইহার 
পিছনে যে একটা-না-একটা অনাচার ছিল সে বিষয়ে সন্দেহ নাই। 


৭২ বাঁঙালী জীবনে রমণী 


সুতরাং স্ত্রীলোক-সন্বন্ধীয় প্রচলিত মনোভাবের প্রমাণ হিসাবে উহা গ্রহণ 
করা যাইতে পারে। পুরাতন ও নূতন মনোভাবের মধ্যে কি প্রভেদ 
তাহাও এই সম্পাদকীয় মন্তব্যে স্পৰ্ট হইয়া উঠিয়াছে। 

ইহার পর সংবাদপত্রে ব্যক্তিগত আক্রমণের কথা বলিব। আমি এই 
ধরনের আক্রমণ কিছু কিছু পড়িয়াছি। উহা! যে অতি জঘন্য স্তরের হইত 
সে বিষয়ে সন্দেহ করা চলে না। ইহার আভাস দিতেছি । একটি 
পত্রিকায় পাঁচী-নান্নী ঝির স্বাক্ষরিত একটি পত্র ছাপা দেখিয়াছি । 
উহাতে বাড়ীর গৃহিণীর সহিত চাকরের দুপুর-বেলাকার ব্যাপারের বর্ণনা 
দেওয়া হইয়াছিল, এবং বলা হইয়াছিল যে, উহা এই পরিচারিকার 
চাক্ষুষ দেখা । এই ঘটনাটা কলিকাতার একজন ভদ্রগৃহস্থের বাড়ীতে 
ঘটিরাছে, ইহাও নাম করিয়৷ বলা হইয়াছিল। 

কবিদের ঈর্ষাপ্রসূত আড়াআড়িতে এই ধরনের নিন্দা আরও কুৎসিত 
ভাবে করা হইত। আমি পড়িয়াছি এরূপ একটিমাত্র দৃষ্টান্ত দিতেছি । 
এক কৰি অন্য কবির মাত! সম্বন্ধে বলিতেছেন যে, মাত৷ পুত্রবধূর সহিত 
( অর্থা প্রতিদ্বন্দ্বী কবির স্ত্রীর সহিত ) অস্বাভাবিক ভাবে কাম পরিতৃপ্ত 
করিতেছে । ইহার খোলসা বর্ণনা আছে। পুত্রবধূ হতভম্ব হইয়া, 
“শাশুড়ী কি কর, কি কর” বলিয়া চেচাইতেছে, কিন্তু শ্বশ্রামাতা কিছুমাত্র 
গ্রাহ না করিয়া কাজ সমাধা করিতেছে, ও এই কাজের কি সুখ তাহা 
পুত্রবধুকে বুঝাইতেছে। ইংরেজী ভাষায় ও অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষায় 
এই কাজের সুচক যে শব্দ আছে, তাহার অন্তত ভাষাগত ভদ্রতা 
আছে। কিন্ত্রু এই বিবরণ হইতে প্রথম জানিলাম, ইহার জন্য বাংলা 
ভাষায় অতি ইতর একটা কথা প্রচলিত ছিল। এই সব কাহিনী 
প্রমাণ হিসাবে নিলে বহু ছাটিয়া নিতে হইবে। 

গগ্ভসাহিত্যে নরনারীর সম্পর্ক লইয়া দুই" রকমের রচনা আছে 
__প্রীথম অশ্লীল রসিকতাপূর্ণ গল্প; দ্বিতীয়, বাংল! কামসুত্র। ছুই-ই রিরংসার 
কাল্পনিক খোরাক জোগাইয়! পয়সা করিবার উদ্দেশ্যে লেখা । এইক্লগ 
একখানি চিত্রসম্বলিত বইও আমি দেখিয়াছি । উহাতে 'িড-কাটে অতি 


দেশাচার ৩ 


খোলাখুলি রকমের ছবি ছিল, কতকগুলি আবার অস্বাভাবিক কাম 
চরিতার্থ করিবার। এগুলিকে আচরণের সাক্ষ্য হিসাবে নেওয়া৷ যুক্তিযুক্ত 
হইবে না। কিন্তু মনোভাবের পরিচায়ক বলিয়৷ ধরা যাইতে পারে। 

ইহা ছাড়া কতকগুলি বই ব্যঙ্গের ভিতর দরিয়া নীতিশিক্ষার 
উদ্দেশ্যে লেখা হইয়াছিল। এইগুলিতে অতিরপ্জন ও তামাশা! আছে। 
তবু এগুলির সাক্ষ্য অনেকাংশে নির্ভরযোগ্য । কারণ সামাজিক আচরণের 
ব্যঙ্গাত্মক সমালোচনার বাস্তর ভিন্তি না থাকিলে লোকে উহা মোটেই 
গ্রহণ করে না। তাই যতই তামাশা থাকুক না কেন, মোটামুটি ভাবে 
এইসব লেখাতে সতা কথাই থাকে । তখনকার দ্রিনে লেখা এই ধরনের 
বাংলা বই-এর যেসব জায়গা আমার কাছে সমসাময়িক অবস্থা বা আচরণের 
যথার্থ বিবরণ বলিয়া! মনে হইয়াছে, সেগুলি প্রমাণ হিসাবে গ্রহণ করিতে 
আমি দ্বিধা করি নাই। 

তার পর কবিতা ও গান। এগুলি অংশত তামাশা, অংশত 
আদিরস পরিবেশন । ইহাদের সবই যে অশ্লীল তাহ! নয়__কতকগুলি 
গৌণ ইঙ্গিত ও ব্যগ্রনাপূর্ণ, কতকগুলি একেবারে সোজা কথা । আগেই 
বলিরাছি কবির গান ও তরজার বেশীর ভাগই কখনও ছাপা হয় নাই। 
স্বৃতরাং এগুলির ধারণা করিতে হয় পরবর্তী যুগের অভিমতের উপর 
নির্ভর করিয়া। সেই যুগে কবির গানকে কুরুচির পরিচায়ক বলিয়াই 
ধরা হইত । 

কবিত! এবং গানে, বিশেষ করিয়! গানে, লপেটি ভাব না থাকিলে 
উহা সমাদর পাইত ন1। কু্তন, শ্যামা বিষয়, ও অন্যান ধূ্মমূলক সঙ্গীত, 
ছাঁড়া অন্যত্র আদিরস না৷ থাকিলে চলিত না । এই সম্বন্ধে বঙ্কিমচন্দ্রের 
রজনী উপন্যাসে যে একট! কথা আছে, তাহ উদ্ধত করিয়া লৌকিক 
গানের কি ধর্ম ছিল তাহার পরিচয় দিব। এক সাধু বেদগান করেন, তাই 
আধুনিক শচীন্দ্রনাথ জিজ্ঞাসা করিলেন £-_ 

“তবে টগ্লা, খিয়াল প্রভৃতি থাকিতে বেদগান করেন কেন? 

সন্ন্যাসী উত্তর দিলেন, 





৭৪ বাঙালী জীবনে রমণী 


“কোন্‌ কথাগুলি সুখকর-_প।মান্তা গণিকাঁগণের চরিত্রের গুণগান সুখকর, 
ন৷ দেবতী্দিগের অসীম মহিমাঁগাঁন সুখকর ? 
একটি গান “বিষবৃক্ষণ হইতে উদ্ধৃত করিতেছি । হরিদাসী বৈষ্$বী 
বেশধারিণী দেবেন্দ্র দন্ভবাড়ীর অন্তঃপুরে আসিয়া গান ধরিল,_ 
“কাটা বনে তুলতে গেলাম কলঙ্কের ফুল, 
গো সখি, কাল কলঙ্কেরি ফুল। 
মাথায় পরলেম মালা গেথে, কানে পরলেম ছুল। 
সখি, কলঙ্কেরি ফুল। 
“মরি মরব কাটা ফুটে, 
ফুলের মধু খাব লুটে, 
খুঁজে বেড়াই কোথায় ফুটে 
নবীন মুকুল ।” 
ইহাতে যে একটা মাধুর্য আছে তাহা স্বীকার করিতেই হইবে। তবু 
নবীনা, মেমের কাছে শিক্ষিত কমলমণি ভ্রভঙ্গী করিয়া বলিলেন,_ 
“বৈষ্ণবী দ্রিদিৎ তোমার মুখে ছাই পড়,ক, আর তুমি মর। আর কি গান 
জান না ? 
সূর্যমুখী যখন বলিলেন যে, ওসব গান তাহাদের ভাল লাগে না, 
“গৃহস্থবাড়ীতে ভাল গান গাও,” তখন হরিদাসী গান ধরিল-_ 
'ম্থৃতিশাস্ত্র পড়ব মামি ভট্টাচার্যের পায়ে ধারে, 
ধর্মাধর্ম শিখে নেব, কোন্‌ বেটি বা নিন্দে করে ।” 
তখন কমল প্রস্থান করিলেন । 
এই সব রকমের সাক্ষ্ের পিছনেই নরনারীর সম্পর্ককে দৈহিক 
তাড়নার দ্বারা অন্ুরপ্সিত করিয়া দেখাইবার একটা বিশেষ উদদেশ্থা 
আছে-_এই উদ্দেশ্য কখনও ভাল, কখনও মন্দ। সেজন্যই ইহা হইতে 
এই বিষয়ে যে সাক্ষ্য পাওয়া যায়, তাহাকে সেই যুগের সমাজের 
যথাযথ বাস্তব চিত্র বলিয়া গ্রহণ করা ঠিক হইবে না। তবে ছুইটা 
কথা মানিয়া লওয়া যাইতে পারে ।-_ 


দেশাচার ৭৫ 


প্রথমত বলা যাইতে পারে__এই চিত্রের পিছনে একটা বাস্তব 
আছে, এবং সেটা এত কামাত্মক না হইলেও মূলত কামাবলম্বী। 

দ্বিতীয়, এইসব কাহিনী ও আলোচনাকে সে-যুগের জনমত, 
মনোভাব ও রুচির প্রমাণ বলিয়া গ্রহণ করা যাইতে পারে। 
নরনারীর সম্পর্ক লইয়া সে-যুগে যে-সব ধারণা ব্যাপকভাবে লোকের 
মনে ছিল তাহার প্রমাণ হিসাবে এই সাক্ষোর যথেষ্ট মূলা আছে। 
আমি উহাকে এইভাবেই নিব । 

সেই সাক্ষ্যকে একটা বাস্তব অবস্থার অতিরঞ্িত ও অংশত বিকৃত 
কাহিনী বলিয়। মনে করিবার আরও একটা কারণ আছে। পরবর্তী 
যুগে হিন্দু সতীত্ব ও পাতিব্রতা লইয়া বু আলোচন! হইয়াছিল, উহার 
বড়াইও কম হয় নাই। কিন্তু পুরাতন রচনার ইহার কোন আলোচনা 
নাই, উল্লেখও অতান্ত কম। গাহস্থ্য-জীবনে স্ত্রীলোকের সতীত্ব ও 
পাতিব্রত্য এরকম একটা মামুলী আচরণ বলিয়া ধরা হইত যে, উহা! 
নরনারী-সম্পকিত 'আইডিওলজি'র অন্তভূক্তই হয় নাই। পাশ্চাত্য 
প্রভাব আসিবার পর এই প্রাচীন হিন্দু ধারণাকে পাশ্চাত্য প্রেমের 
'আ্যান্টিথিসিস্ঠ হিসাবে দাড় করানো হইয়াছিল। কামই যে নরনারীর 
সম্পর্কের মূল কথা ইহার বিরুদ্ধে আপঘ্ডি তোলা পুর্বযুগে আবশ্ঠক 
মনে হয় নাই। বরঞ্চ স্বাভাবিক বলিয়! মানিয়া শুধু একটু মশলাদার 
করিয়া পরিবেশন করা হইত। 

এখন পরবর্তী যুগের সাক্ষের কথা। পূর্ববর্তী যুগের আচরণ ও 
ধ্যান-ধারণার বিবরণ দিবার জন্য ১৮৫০ সনের পরেকার সাক্ষ্যও কেন 
গ্রাহ্া তাহার কারণ আমি ইতিপূর্বে দিয়াছি। সাক্ষ্য কি ধরনের তাহার 
পরিচয় দিব। 

আমার জ্ঞানবুদ্ধি হইবার আগেকার কালের তথ্যপ্রমাণ সম্পূর্ণ 
সাহিত্য হইতে গৃহীত, পরেকার সাক্ষ্য অংশত মুদ্রিত বর্ণনা বা আলোচনা 
হইতে নেওয়া, অংশত নিজের দেখা এবং শোনা ব্যাপার হইতে । 

নূতন যুগের সাহিত্যে নরনারীর সম্পর্কের যে চিত্র আছে, তাহ 


৭৬ বাঙালী জীবনে রমণী 


পাশ্চাত্য হইতে পাওয়া প্রেমের চিত্র। উহাতে কামমূলক বর্ণনা 
একেবারেই নাই, পুরাতনের প্রসঙ্গেও নাই। "তবে পুরাতন যুগের 
আচার-ব্যবহার ও ধ্যান-ধারণা গৌণভাবে এই সাহিত্যে বণিত আছে। 
এই বর্ণনা খোলাখুলিও নয়, অভব্যও নয় । কিন্তু তাহ! সত্বেও যেভাবে 
আছে তাহাতেও পুরাতন ধারা নিন্দার বিষয় বলিয়াই দেখা যায়। 
বন্িমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরগুচন্দ্র বা অন্যান্য গল্পকারেরা কেহই পুরাতন 
দেশাঁচারকে ভাল বলিয়া দেখান নাই। তাহাদের বিবরণকে সেই 
যুগের আচরণ সম্বন্ধে গৌণ প্রমাণ বলিয়া গ্রহণ করা যাইতে পারে । 

তাহা ছাড়! আমি নিজে বহু জিনিস দেখিয়াছি এবং শুনিয়াছি যাহা 
হইতে পূর্বযুগের ধারণা করা যায়। সেই যুগ হইতে যেসব আচরণ 
আমাদের যুগেও চলিতেছিল সেগুলি আমার চোখ এবং কান এড়ায় 
নাই। অবশ্য আমার যখন অল্প বয়স তখন কেহই আমার সম্মুখে 
অশ্লীল আলোচনা বা রসিকত৷ করিতে আসিত না, তবু শ্রবণ-শক্তি 
অত্যন্ত প্রখর হওয়াতে বনু চাঁপা কথাবার্ত! কানে আসিয়া পৌছিত, 
অশ্লীল ধরন-ধারণও চোখে পড়িত। প্রৌটত্বের আরন্ত হইবার পর 
পরিটিত ব্যক্তিদের আর বেশী সন্কোচ না থাকায় তখন সাক্ষাৎভাবেও 
অনেক কথা শুনিয়।ছি। বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে ধাহারা লেখক তাহারা 
আলোচনা-প্রসঙ্গে এই ব্যাপারে নিজেদের অভিচ্ঞতার কথা বলিয়াছেন, 
মতও প্রকাশ করিয়াছেন। দৃরটীন্তত্বরূপ স্হৃদ্বর বিভূতিভূষণ 
বন্দ্যোপাধ্যায়ের উল্লেখ করিব। তাহার কোনও লেখায় স্ত্রী-পুরুষের 
সম্পর্কঘটিত কোন কামাত্মক বিবরণ নাই। কিন্তু তিনি আমাকে এই 
বিষয়ে গ্রাম্য জীবনের ধারা সম্বন্ধে তীহার অভিজ্ঞতা হইতে যাহা 
বলিয়াছেন, তাহাতে বুঝিয়াছিলাম যে, প্রাচীন ধারা আমাদের কালেও 
অল্পবিস্তর অব্যাহত ছিল। এই সব রকমের সাক্ষ্য হুইতে যাহা 
জানিয়াছি এখন তাহার একটা সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিব। 

প্রথমে দ্বেহ-সৌন্দর্ষের অনুভূতির কথাই ধরা যাক। প্রাচীন সমাজে 
উহার কি ধর্ম ছিল? যখন বাঙালী রূপ দেখিয়৷ বলিতে পারিত-_ 


দেশাচার পণ 


“জনম অবধি হাম রুপ নেহারল, নয়ন না তিরপিত ভেল”--তা সে 
পুরুষেরই হউক বা নারীরই হউক--সে যুগ অনেক দিন কাটিয়া 
গিয়াছিল। ইহা দেহ-সৌন্দর্যানুভূতির রোমার্টিক দেশীয় রূপ। ইহার 
পাশে একটা নাগরিক বৈশিক অনুভূতিও ছিল। পুরুষের দিক হইতে 
তাহার একটি দৃষ্টান্ত পূর্ব পরিচ্ছেদের প্রথম দিকে উদ্ধত করিয়াছি। 
সেখানে পাঠককে কবির নাম না বলা সত্বেও তিনি নিশ্চয় বুঝিয়াছেন 
এই কৰি ভারতচন্দ্র। এই ভারতন্দ্রেই নারীদের সৌন্দর্যানুভূতির 
বৈশিক রূপও দেখিতে পাই । 
“দেখিয়া! সুন্দর রূপ মূ 
_স্মরে জরজর যত রমশী 4 
কবরী-ভুষণ _ কাচিলি কষণ_ 
কটির বসন খসে অমনি ॥৮”. 
_ ইত্যাদি 
কিন্তু ভারতচন্দ্র নিজে বিদগ্ধ হইলেও একটা গ্রাম্য সমাজেই বাস 
করিতেন। স্থৃতরাং তাহার কাব্যের মধ্যে সে-যুগে প্রচলিত লৌকিক 


আচরণেরও পরিচয় পাওয়া যায়। কোনও স্ন্দর রাজকুমারকে 
দেখিয়া পুরনারীদের মুগ্ধ অবস্থা ও | 


কাব্যেও আছে। যেমন, চন্দ্রাগীড়কে দেখিয়৷ নাগরীগণ পরস্পরকে 
বাক্স করিতে আরম করিল--“দর্শনোম্মত্ে ! উততরীয়টা তুলিয়া লও” 
“চন্দ্রাগীড় দর্শনাসক্তে! কাক্ষীদাম ভুলিয়া রাখ?” “অয়ি যৌবনম্মন্তে ! 


লোকে যে দেখিতেছে, স্তন আবুত কর)” “অপগতলজ্জে! শিথিল 
ঢুকল বাধে” ইত্যার্দি। ভারতচন্দ্রের উপরের কবিতাটি. উহার 


সহিত ুলনীয়। কিন্তু নারীগণের পতিনিন্দা অন্য ধরনের, একেবারে 
স্থলভাবে গ্রাম্য । 

সাধারণ বাঙালী জীবনে রূপের আকর্ষণ এর চেয়েও নিন্স্তরে 
আসিয়া! দাড়াইয়াছিল। উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে যে ধারণাট। 
একেবারে স্বাভাবিক বলিয়া মানা হইত তাহা এই-_রূপ কামের উদ্দীপক 





৭৮ বাঙালী জীবনে রমণী 


মাত্র। সকলেই ধরিয়া লইত রূপবতী ন্ত্রীলোক দেখিলে তাহার পর 
একমাত্র ভাবনাই হুইবে কি করিয়া তাহার সহিত সঙ্গত হওয়া যায়। 

ধরি মাছ, না ছুই পানি অন্তত এতটুকু ভদ্রস্থতা রাখিয়া রূপ 
দেখিবার দেশাচারসম্মত জায়গা ছিল নদী বা দীঘির ঘাট। গ্রামেই 
হউক, আর শহরেই হউক, এটাই ছিল রূপের হাট । “শুন হে পরাণ 
সবল সাডাতি, কে ধনী মাজিছে গা, যমুনার তীরে বসি তার নীরে, 
পায়ের উপরে পা৮-__ইহারই ইতরীকৃত কোরাস সর্বত্র শোনা যাইত। 
তাই শরৎচন্দ্র “পণ্ডিতমশাই” গল্পে কুগ্রের শাশুড়ীকে দিয় কুস্থুমকে 
এই কথা বলাইয়াছিলেন--“ভূমি যে এলো চুলে ভিজে কাপড়ে ঘাট 
থেকে এলে তাতে বল দেখি মুনির মন টলে কিনা !” 

ব্যঙ্গ, বিশেষ করিয়া রং চড়ানো ব্যঙ্গ ঈশ্বর গুপ্তের কাব্যের বিশেষ 
রস ছিল। তাই তাহাতে স্্রীনের ঘাট লইয়া বু রসিকতা আছে। 
বফ্চিমচন্দ্র এ সম্বন্ধে লিখিয়াছেন £_ 

“তিনি স্ত্রীলোকের রূপের কথা পড়িলে হাসিয়। লুটাইয়। পড়েন। মাঁঘ 

মাসের প্রাতঃক্নানের সময় যেখানে অন্য কবি রূপ দেখিবার জঙ্ যুবতি- 

গণের পিছে পিছে যাঁইতেন, ঈশ্বরচন্দ্র সেখানে তাহাদের নাঁকাঁল 

দেখিবার জন্ত যাঁন। তোমরা হয়তঃ সেই নীহারশীতল শ্বচ্ছসলিলধৌত 

কষিত কান্তি লইয়া আদর্শ গড়িবে, তিনি বলিলেন, “দেখ দেখি! কেমন 

তামাসা! যেজাতি স্নীনের সময় পরিধেয় বসন লইয়া! বিব্রত, তোমরা 

তাঁদের পাইয়! এত বাড়াবাড়ি কর।” 

ঘাটে বা ঘাটের পথে স্ীলোকের রূপ দেখিবার কথা বঙ্কিমচন্দ্র 
নিজেও যুবাবয়সে লিখিয়াছিলেন। তাহার প্রথম গল্প "রাজমোহনের 
রাতে এই ব্যাপারটার যে বিবরণ দিয়াছেন, রূপ সম্বন্ধে বাংলা- 
দেশের জনগ্রচলিত মনোভাব বুঝাইতে হইলে উহার অপেক্ষা ভাল 
দৃষ্টান্ত পাইব না। তাই অনেকটা ভুলিয়া দিতেছি। 

হইটি যুবক (সম্পর্কে খুড়তুতো-জ্যাঠভুতো ভাই হয়; একটি 
গ্রাম্য বড়লোক, নাম মথুর; অপরটি কলিকাতায় শিক্ষিত, নাম মাধব ) 


দেশাচার ৭৯ 


দুইটি অল্পবয়স্ক মেয়েকে ঘাট হইতে জল লইয়া ফিরিতে দেখিল। 
বয়সে বড় মেয়েটি গ্রামের কন্যা, অপরটি বধু-_অপরূপ স্ুন্দরী। বড়টি 
ছোঁটটিকে এই বলিয়াই ঘাঁটে লইয়া গিয়াছিল-_“এখন এস দেখি, মোর 
গৌরবিনী, হাঁকরা লোকগুলোকে একবার রূপের ছটাটা দেখাইয়া আনি” 

হঠাৎ হাওয়াতে বধূটির ঘোমট! সরিয়া যাওয়ায় মাধব ভ্র কুঞ্চিত 
করিল। তাহ! দেখিয়া কৃষ্ণকায়, স্লদেহ, গলায় হার পরা! গ্রাম্য দাদাটি 
বলিয়া উঠিল-_“ওই দেখ, ভূমি ওকে চেন।” ইহার পর যে কথাবাত 
হইল সম্পূর্ণ উদ্ধত করিতেছি । 

মাধব_-“চিনি |” 

মথুর__“চেন? ভুমি চেন,আমি চিনি না; অথচ আমি এইখানে 
জন্ম কাটাইলাম, আর ভূমি কয় দিন ! চেন ষদ্রি, তবে কে এটি 1৮. 

মাধব-__“আমার শ্যাঁলী |” 

মথুর_“তোমার শ্যালী ? রাজমোহনের স্ত্রী? রাজমোহনের স্ত্রী, 
অথচ আমি কখনও দেখি নাই ?” 

.মাধব__“দেখিবে কিরূপে ? উনি কখনও বাটার বাহির হয়েন না।” 

মথুর-_“হয়েন না, তবে আজ হইয়াছেন কেন ?” 

মাধব_কি জানি!” 

মথুর--মানুষ কেমন ?” 

মাধব--“দেখিতেই পাইতেছ-_-বেশ সুন্দর ।৮ 

মথুর- “ভবিষ্যদ্বক্তা গণকঠাঁকুর এলেন আর কি! ত৷ বলিতেছি 
না__-বলি, মানুষ ভাল ?” 

মাধব--“ভাল মানুষ কাহাকে বল ?” 

মথুর_“আঃ কলেজে পড়িয়৷ একেবারে অধঃপাতে গিয়াছ। একবার 
যে সেখানে গিয়! রাঙগামুখোর শ্রান্ধের মন্ত্র পড়িয়া আসে, তাহার জঙ্গে 
দুটো কথা বলা ভার । বলি ওর কি” 

মাধবের বিকট ভ্রভঙ্গ দৃষ্টে মথুর যে অশ্লীল উক্তি করিতে 
চাহিতেছিলেন, তাহা হইতে শ্গান্ত হইলেন । 


৮০ বাঙালী জীবনে রমণী 


মাধব গবিত বচনে কহিলেন, “আপনার এত স্পষ্টতার প্রয়োজন 
নাই; ভদ্রলোকের স্ত্রী পথে যাইতেছে, তাহার সম্বন্ধে এত ব্তৃতার 
আবশ্যক কি?” 

মথুর__“বলিয়াছি তো! ছু'পাত ইংরাজী উপ্টাইলে ভায়ারা৷ সব অগ্নি 
অবতার হইয়। বসেন। আর ভাই, শ্যালীর কথা কব না তো কাহার 
কথা কব? বসিয়া বসিয়া কি পিতামহীর যৌবন বর্ণনা করিব? যাক, 
চুলায় যাক; মুখখানা ভাই, সোজা কর-_নইলে এখনই কাকের পাল 
পিছনে লাগিবে। রাজমুহুনে গোবর্ধন এমন পম্সের মধু খায় ?” 

এই তো গেল বনিয়াদী বাংলায় স্ত্রীলোকের রূপ সম্বন্ধে পরপুরুষের 
আগ্রহ । তার পর স্বামীদের ভাবটা কি রকম দেখা যাক। রাজমোহনের 
স্ত্রী ঘরের কাছে গিয়াই দেখিল স্বামী কালমুতির ন্যায় দণ্ডায়মান | 
কথাবার্তা এইরূপ হইল-_ 

রাঁজমোহন-_“তবে রাজরানী কোথায় যাওয়া হইয়াছিল ?” 

স্রী-“জল আনিতে গিয়াছিলাম |” 

রাজ_-“জল আনিতে গিয়াছিলে ! কাকে বলে গিছলে, ঠাকুরাখি ?” 

স্রী--“কাহারেও বলে যাই নাই |» 

রাজ-_“কারেও বলে যাও নাই--আমি দশ হাজার বার বারণ 
করেছি না?” 

_-কিরেছ।” 

রাজ- “তবে গেলি কেন, হারামজাদি !” 

স্্রী-_“আমি তোমার ভ্ত্রী। গেলে কোনো দোষ নাই বলিয়া 
গিয়াছিলাম।” 

তখন রাজমোহন শ্ত্রীকে প্রহার করিবার জন্য হাত তুলিল। “অবলা 
বালা কিছু বুঝিলেন না; প্রহারোগ্ভত হস্ত হইতে এক পদও সরিয়৷ 
গেলেন না, কেবল এমন কাতর চক্ষে স্ত্রীঘাতকের প্রতি চাহিয়া রহিলেন 
যে, প্রহারকের হস্ত যেন মন্ত্রমুগ্ধ রহিল। ক্ষণেক নীরব হইয়া রহিয়৷ 
রাজমোহন পত্বীর হস্ত ত্যাগ করিল; কিন্তু ততক্ষণাৎ পূর্বমত বজ্ঞনিনাদে 


দেশাচার ৮১ 
কহিল, “তোরে লাখিয়ে খুন. করব।” 

এই ছিল পুরাতন বাংলায় ঘরে-বাহিবে রমণীর রূপের সম্মান। 

রূপ সম্বন্ধে এই মনোভাবের জন্যই ধীহার! ধায়িক, তীহারা এই 
বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ তো করিতেনই না, এমন কি রূপ কিছু নয় গুণই 
সব, এই সছ্ূপদেশও দিতেন। রূপ সম্বন্ধে মুগ্ধতা পরের যুগে পাপ 
বলিয়াই মনে করা হইত। স্বদেশী আন্দোলনের যুগে এই নীতিকথা 
আরও উগ্রভাবে প্রচার করা হইয়াছিল। আমার অভিচ্্ততা হইতে 
উহার পরিচয় দিতেছি । 

তখন বাঁঙালীকে বীর করিবার জন্য আখড়ায়-সমিতিতে ডন-বৈঠক, 
কুস্তি, লাঠিখেল! ইত্যাদি ব্যায়াম করানে৷ হইত, অন্যদিকে মানসিক 
ব্যায়ামও কম হইত না । আমাদের সকলকেই ব্রহ্মচর্ণ লইয়া দাদাদের 
শাসনে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করিতে হইত । 

এই ব্রক্মচর্ষের একটি অঙ্গ ছিল একখানি “পাপের খাতা” রাখা। 
দিনে কতবার কত রকম কুচিন্তা মনে হইতে পারে, আর কতবার কোন্‌ 
দুর্বলতার বশে কি কুকর্ম করা যাইতে পারে, তাহার একটি তালিকা উহাতে 
থাকিত। অপরাধ হইয়া থাকিলে সেই সব পাপের ঘরে ব্রহ্ষচর্যব্রতীকে 
দিনের শেষে টার কাটিতে হইত । সেই সবের সংখ্য ও গুরুত্ব দেখিয়। 
শোধনের জন্য উচিত ব্যবস্থা হয় নিজেদের কিংবা দাদাদের করিতে হইত। 
অন্য পাপের কথ! এখানে বলা নিশ্রয়োজন, শুধু ইহা বলিলেই যথেষ্ট 
হইবে যে, একট! শারীরিক পদস্মলনের পরই যে পাপটির দ্বিতীয় স্থান 
ছিল সেটি__“রূপমোহ” । 

আমিও এই পাপের খাতা কিছুদিন রাখিয়াছিলাম। কিন্তু সেই 
বয়সেও একটু রসবোধ থাকায় চালাইতে পারি নাই। আমার কনিষ্ঠ 
ভ্রাতা আরও উগ্র স্বদেশী ছিল, হাসি-তামাশা বা এই ধরনের হূর্বলতাও 
তাহার কম ছিল। গস্তীর প্রকৃতির প্রমাণ হিসাবে তাহার দেরাজে 
কখনও ছোরা পাওয়া যাইত। একদিন ম! তাহার দেরাজ খুলিয়৷ তাহার 
পাপের খাতাটি পাইলেন, এবং খুলিয়া! দেখিলেন, “রূপমোহে”্র ঘরে 


ঙ 


৮২ বাঙালী জীবনে রমণী 


অসংখা ট্যারা। বারো-তেরো বতসরের পুত্রের এত রূপমোহ তাহার 
সহ হইল না, ডেপো, জ্যাঠা ইত্যাদি বকাঁবকি কৰ্রিয়া৷ খাতাটি ছিড়িয়া 
ফেলিলেন। 

কিন্তু বলিব, এই কৃচ্ছ,সাধনের ফল খারাপ হয় নাই। যখন যুবা 
বয়সে কলিকাতায় পড়ি, তখন কখনও কখনও মা আসিয়া আমাদের 
লইয়! বাস! করিয়া থাকিতেন। এক সময়ে আমর! উত্তর কলিকাতার 
অতি-রক্ষণশীল পল্লীতে থাকি। পাশের বাড়ির গৃহিণী আসিয়া মাকে 
বলিলেন, “দিদি, তোমার ছেলেরা কি ভালে! ! একদিন জানলায় দেখতে 
পাই নে!” তিনি ঝি-বউ লইয়া ঘর করিতেন, স্থতরাং প্রাণে ভয় ছিল। 

তখনকার দিনে ছাঁতে উঠা, ছুরবীন বা ক্যামেরা রাখা যুবকদের 
চরিত্রহীনতার লক্ষণ বলিয়৷ মনে করা হইত । কিন্তু ইহাঁও অস্বীকার করা 
যায় না যে, খাস কলিকাতার বহু বাঁদর এই ছুইটি জিনিস খারাপ 
অভিসন্ধি ভিন্ন অন্য কোনও উদ্দেশ্যেই রাখিত না । আমাদের নারীদেহ 
সম্বন্ধে কৌতৃহলের অভাব মফঃস্বলের, বিশেষ করিয়া! বাঙাল ছেলের লক্ষণ 
বলিয়াই ধরা হইত । 

কিন্তু পরজীবনে ক্যামেরা লইয়া আমাকেও বিপন্ন হইতে হইয়াছিল | 
আগেই উল্লেখ করিয়াছি, ১৯২৭ সনে আমি শুঁড়োতে থাকিতাম | 
কলিকাতার উপকণ্ঠে যে-সব পল্লী ছিল সেগুলিতে নূতন যুগের ধাকা প্রায় 
লাগে নাই বলিলেই চলে, এগুলি অত্যন্ত রক্ষণশীল ও গৌঁড়৷ ছিল। 
এই পাড়ায় আধুনিকত্ব দেখাইতে গিয়া বিব্রত হইয়াছিলাম। 

আমার এক ভাই একদিন কোথা হইতে একটা ক্যামের লইয়া 
আসিয়াছিল। শুধু ক্যামেরাটাই ছিল, ফিলম্‌ ছিল না। আমরা 
বারান্দায় গিয়। দোতলা হইতে সামনের একতলা বাড়ীর ছাতের দিকে 
ক্যামেরা ধরিয়া ফোকাস্‌ ইত্যাদি পরীক্ষা করিতেছিলাম। বাড়ীটা এক 
ধোঁপা পরিবারের, উহাতে থাকিত বিধবা ধোপানী কত্রী, বড় ছেলে ও 
তাহার শ্রী,আর এক ছেলে যুবাবয়সী, চুয়াড়ে চেহারা, অবিবাহিত । 
বাড়ীটা তাহাদের নিজেদের । আমি ভাড়াটে বাড়ীতে থাকিতাম । 


দেশাচার ৮৩ 


ক্যামেরা ধরিবার সময়ে লক্ষ্য করি নাই যে, ছাতে যুবতী ধোপাবধু 
কাপড় শুকাইতে দিতেছে । হঠাঁৎ্ একটা টেচামেচি শুনিয়া চাহিয়৷ দেখি, 
গলির ওপারে ছাত হইতে তাহার দ্রেবর আমাদিগকে গালাগালি করিতেছে 
ও শাসাইতেছে। তাহার কথ! হইতে বুঝিতে পারিলাম তাহারা ধরিয়া 
লইয়াছে, আমরা ধোপাবধুর ছবি ভুলিতে চেষ্টা করিতেছিলাম | 

আমর! যতই বলি, আমাদের এরকম কোন অভিসন্ধি ছিল না, এমন 
কি ক্যামেরায় ফিন্‌ পর্ধন্ত নাই, ততই সে আরও চেঁচাইতে লাগিল । 
ততক্ষণে নীচে লোক জমি! গিয়।ছে । আমার এক ভাই একটু মারামারি- 
প্রির ছিল। মে তখন রাস্তায় নামির| গেল, আমিও সঙ্গে সঙ্গে গেলাম । 
ধোপ।-দেবরও হাত উঠাইরা! অগ্রসর হইর। আসিল, মারামারি লাগে আর 
কি! হাতাহাতির ব্যাপারে ভাই-ই উৎসাহা। আমি শুধু পিছনে 
দাড়াইরা চীৎকার করিতে লাগিলাম। নূতন পাগ্ডিত্যের ফোটা তখনও 
কপালে চড়চড় করিত, তাই ধোপা-যুবককে জিজ্ঞাসা করিলাম, “তোমার 
বৌদিদি কি ভেনাস ডি মিলো যে আমরা তার ফটোগ্রাফ তুলব ?” রাম 
রজকিনীর কথ সুলিলাম না, তাহা হইলে উপ্ট| উৎ্পন্তি হইত। বারান্দায় 
অন্য ভ্রাতার দিকে চাহিয়া বলিলাম, “বন্দুকটা দাও তো! ওদের গুলি 
করে মারব |” কোথায় বন্দুক? তবে একটু ভালভাবে থাকিতাম 
বলিয়৷ হয়ত কথাটা ধোপারা একেবারে অবিশ্বাস করে নাই। বিধবা 
ধোপানী ছাত হইতে টেচাইতে লাগিল, “ভাড়াটে বাড়ীতে থেকে দেমাক 
দেখ না! বন্দুক দিয়ে মারবে !” 

পাড়ার প্রবীণজনেরা আসিয়া ঝগড় মিটাইয়া দিলেন । অল্লক্ষণ 
পরেই ইন্দোফরাসী বদ্ধুত্ব-সভ।র আধিবেশনে যোগ দিবার জন্য গরদের 
পাঞ্জাবি পরিরা প্্যাসনে-চশমা আটিয়া উহার চওড়া ফিতা গলায় ঝুলাইয়া, 
মিহি ধুতি ও সেলিমজুতা পরিহিত হইয়া চন্দননগর যাত্রা করিলাম । 
সেখানে প্রমথ চৌধুরী মহাশর, কালিদাস নাগ, স্থবোধ মুখোপাধ্যায়, 
নিরঞ্জন চক্রবর্তী প্রভৃতি ফরাসীভাষাবিদ বাঙালীরা উপস্থিত ছিলেন। 
চন্দননগরের গভর্নরের বাড়ীতে অতিথি। কালচারাল জাঁকজমক 


৮৪ বাঙালী জীবনে রমণী 


খুবই হইল, কিন্তু সমস্তক্ষণ সকালের ঝগড়ার গলানিটাও জামাতে তেলের 


দাগের মত লাগিয়া রহিল । 
রূপের ঘথার্থ আদর কি, তখনকার বিবরণ হইতে তাহার আভাস 
দিয়া রূপের প্রসঙ্গ শেব করিব । একটি পুরাতন বই-এ পাই 
“যখন চন্দ্রবদনা কম্ঠার যৌবন ষোডশ কলা পূর্ণ হওয়াতে যৌড়শী পূর্ণ 
যৌবনবতী হয় তখন গগনস্থ চন্দ্রের ঘেক্ধপ রাহু গ্রহণের শঙ্কা তদ্রপ এ 
গৃহস্থ চন্দ্রবদনার কুসঙ্িনী চণ্ডালিনী দূতীর আশঙ্কা হয়, অর্থাৎ যৌবন।গতে 
এ বিধুমুখীর রূপের সৌন্দর্য 9 মনের অধৈর্য দেখিয়া কদর্য বৃত্তিজীবীনী 
কুটনী, তাহাঁরাই গ্রহণ দ্বারা গ্রহণ করিতে উপস্থিতা হয় । তম্মপ্য বিশেষতো 
নাপিতিনী যিনি সহজেই ধূর্তা ।” 
একেবারে আধুনিক যুগে পাশ্চাত্যে, বিশেষ করিয়া আমেরিকাতে 
মিস্‌ ইউনিভাসরদের রূপ প্রচার করিবার জন্য 'ইম্প্রেসেরিও রাখার 
রেওয়াজ হইয়াছে । ইহারা কি করে তাহার স্পষ্ট ধারণা আমার নাই। 
তবে সে-যুগের কুটনীরূপিণী ইম্প্রেসেরিও'রা কি করিত তাহার একটু 
পরিচয় দ্িব। তাহারা নাগরের নিকট গিয়া বলিত £-_ 
“কুলকাঁমিনীর অঙ্গে কর নিরীক্ষণ । 
সকল সুখের স্থান হবে নিরূপণ ॥ 
ভালে ভালে চন্দননগর শোভা পায় । 
চুচুড়ার সং দেখ চুলের চুড়ায় ॥ 
সিঁতীর বাগানে বাবু যাও নিতি নিতি। 
কপাল জুড়িয়া আছে দেখ সেই সি'তী॥ 
তুক্ুুট পরগণ! তুরুতে নির্যাস। 
তার গুণ কহিব কি ভারতে প্রকাশ ॥ 
কানপুর শুনেহছ কেবল মাত্র কানে । 
স্বচক্ষে দেখহ বাবু যুবতীর স্থানে ॥ 
শোনা আছে দানাপুর দেখ! নাহি তায়। 
সোনাদানাঁপুর পাবে নারীর গলায় ॥ 
নগরের মধ্যে এক কলিকাতা সার। 
গ্রতি পথে কতশত মজার বাজার ॥ 





দেশাচার ৮৫ 


কিন্তু দেখ অর্গনার অঙ্গ সহকার। 
বুকে ছুই কলিকাতা! অতি চমৎকার ॥ 
এ কলিকাতায় সব দেয় রাজকর। 
সেই স্থানে রাজাকে 9 দিতে হয় কর। 
কটি মাভরণগলে দেখ কাঞ্চিপুর | 
চন্ত্রকোণা চন্দ্রহাঁরে দেখিবে প্রচুর ॥ 
অপূর্ব নগর দেখ যার নাম ঢাকা। 
শিল্পবিগ্া সেখানে কত ত্বাকাবীকা ॥ 
কি দেখেছ রসরাজ এ কোন্‌ নগর । 
রমণীর শঙ্গে াছে ত্রিকোণ নগর ॥ 
_ ইত্যাদি । 
এই দালালি স্ুল, কিন্তু একেবারে আধুনিক পাশ্চাত্য দালালি কি 
ইহার চেয়ে সুন্গম ? যাহার! কিরিঙ্গি বনিয়া প্রাচীন বাংলাকে অতি 
নৃতন বাংলার সুলনায় হেয় বলিয়া মনে করেন, তাহারা এই কথাটা 
ভাবিয়! দেখিবেন। আমার কাছে দুই-হ সমান। 
এইবার সেই যুগে নরনারীর বিশিষ্ট ব্যক্তিগত সম্পর্ক কি ছিল, 
তাহার আলোচনা করিব। উহার অবলম্বন ছিল তিন শ্রেণীর নারী-_ 
অর্থাৎ এই সম্পর্ক স্বীয়া, পরকীয়া, সামান্যবনিতা, ইহাদের যে-কোনটির 
সহিত, বা একট সঙ্গে সকলেরই সহিত স্থাপিত হওয়া সকলেই স্বাভাবিক 
মনে করিত। 
প্রথমে স্বীয়ার কথা বলিব । পুরাতন বাঙালী সমাজে দাম্পত্যজাবন 
প্রাচীন হিন্দু ধারারই অনুবর্তী ছিল। তাহাতে প্রাচীন কালের বৈদগ্গয 
ও শক্তি অবশ্য ছিল না। কিন্তু একটা যে আর একটা হইতে উদ্ভূত 
এবং দুইটাই যে মূলত এক তাহাতে সন্দেহ নাই । এই পুরাতন ধারাতে 
(কি প্রাচীন হিন্দুসমাজে, কি পরবর্তী বাঙালী সমাজে ) স্্রী-পুরুষের 
সম্পর্কের সব দিক মিলাইয়া, সমন্বয় করিয়া একীভূত একটা সম্পর্ক কখনই 
গড়িয়া উঠে নাই। উহার মধ্যে সম্পর্কটার বিভিন্ন দিক আলাদা আলাদা 
কোঠায় থাকিত। বড় কোঠাগুলির উল্লেখ সংক্ষেপে করিতেছি । 


৮৬ বাঙালী জীবনে রমণী 


প্রথম কোঠা বিবাহের সামাজিক কর্তব্যের জন্য রিজার্ভ করা, অর্থাৎ 
উহা সন্তানোৎপাদন ও গৃহস্থালির ক্ষেত্র। ইহাতে অল্পবয়স্ক দম্পতির 
কোনও হাতই থাকিত না_উহা৷ সমগ্র পরিবারের অধীনস্থ ছিল, কর্তা! ও 
কত্রীদের নিদেশে চলিত । স্ৃতরাং স্বামীন্দ্রীর সত্যকার কোনও 
পারিবারিক জীবন প্রাচীন সমাজে দেখা যাইত না। 

দ্বিতীয় কোঠা, স্বামী-্্রীর পরস্পর ল্নেভের, প্রেমের নয়। দুর্ভাগ্যক্রমে 
বছু দম্পতির বেলাতে এই ন্নেহ কখনও জন্মিত না । ন্বামী ও স্ত্রী 
পরস্পরের সহিত অল্পবিস্তর মনোমালিন্য ও একজন অন্যের প্রাতি 
কমবেশী উদাসীনতা লইয়া সারাজীবন কাটাইত। কিন্তু ইহাতে 
সন্তানোৎপাদনের কোনও ব্যাঘাত হইত না। ইহার কারণ ভূতীর কোঠা। 

এই তৃতীয় কোঠা স্বামী-স্্রীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের । উহা কামপরিতৃপ্ডি 
ছাড়া অন্য স্তরে উঠিত না । কিন্তু তাই বলিয়া উহাতে ভদ্রমনোবৃত্তি- 
সম্পন্ন নরনারীরও কোনও সঙ্কোচ ছিল না। এটা প্রাকৃত কর্মকাণ্ড 
বলিয়া সকলেই মানিয়া লইত। সে-যুগে স্বামীন্দ্রীর দেখ। ও মিলন 
রাত্রিতে ভিন্ন হইত ন1 বলিয়৷ তাহাদের সম্পর্ক কামাবলম্বী হইবার আরও 
একটা কারণ ছিল । 

তবে যেখানে কামেও স্বামী-্ত্রীর একাত্মতা পুরাপুরি হইত না, 
সেখানে কাম আরও নীচ রূপ ধরিত। অনেক ক্ষেত্রে স্ত্রী গরজ বুঝিয়া 
দাম্পত্যজীবনে থাকিয়া গহন্া-কাঁপড়-পয়সা আদায়কারিণী গণিকার বৃদ্ধি 
চালাইত, এবং স্বামীও ধর্মভ্রষট না হইয়া এবং নিজে ব্যাধি না আনিয়া 
থাকিলে ব্যাধিপ্রস্ত হইবার ভয় না রাখিয়া বারবনিতা ভোগ করিতেছে 
মনে করিয়া খুশী হইত। কেহ কেহ ষোল আনা খুশী না হইলেও 
“মধ্বাভাবে গুড়ং দগ্ভাৎ এই কথা. স্মরণ করিয়া সন্তুষ্ট থাকিত। 

বহুবিবাহ যতদিন প্রচলিত ছিল, ততদিন স্ত্রী-পুরুষের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে 
কাম ছাড়া প্রেম দেখা দিবার কোনও উপায় ছিল না। সত্যকার 
ভালবাসা থাকিলে কেহ এক রাত্রির পর আর এক রাত্রিতে বিভিন্ন পত্বীতে 
উপগত হইতে পারে না। অথচ বহুবিবাহ করিয়া থাকিলে বিভিন্ন রাত্রির 


দেশাচার 


কথা দুরে থাকুক এক রাত্রিরই বিভিন্ন প্রহরে পত্থীদের উপরোধে বা 
বাগ্রতায় একাধিক পত্বীতে উপগত হইতে হইত- বিশেষত প্রবাস হইতে 
বাড়ী ফিরিলে। 
ভারতচন্দ্রে হার বেশ একটা রসিকোচিত বর্ণনা আছে । ভবানন্দ 
মন্ডুমদার দিল্লী হইতে বাড়ী আসিয়া! পদ্মমুখী চন্দ্রমুখী ঢুই পত্রী লইয়া 
বিশেষ বিপদে পড়িলেন,_ 
“শুনি মজুমদার বড় উন্মানা হইল। 
কার ঘরে আগে যাব ভাঁবিতে লাগিল ॥ 
যাইতে ছোঁটর ঘরে বড় মনোরথ। 
বড় কৈলা বাঁদহাট1 আগুলিয়। পথ ॥ 
এক চক্ষু কাতরায়ে ছোটঘরে যাঁয়। 
আর চক্ষু রাড হয়ে বড়জনে চায় ॥ 
দুই পত্রীই সাধী-মাধী দাসী সহ দেউড়ির কাছে দীড়াইয়া আছে 
দেখিয়া ইশারাতে ছোট পত্বীর সহিত একটা ফয়শালা করিয়া মজুমদার 
দাঁসীদের বলিলেন, 
“দুজনার ঘরে গিয়া ছুই জনা! থাঁক্‌। 
ডাঁকাঁডাঁকি না কর সহিতে নারি ডাক ॥ 
কাঁমের করাঁতে ভাগ করি কলেবরে। 
সমভাবে রব গিয়া দুজনার ঘরে ॥” 
অবশ্য বড় রাণীই ধরিয়া লইয়া গেলেন, এবং মর্যাদার খাতিরে 
মজুমদারও তাহাই উচিত মনে করিলেন। কিন্তু সেখানে মন অবিকল 
রাখিয়া কতবব্য সাধন করিতে পারিলেন না। 
“ছেলেপিলে নিদ্রা! গেলা চন্দ্রমুখী লয়ে খেলা 
রাত্রি হৈল দ্বিতীয় প্রহর | 
যাইতে ছোটর কাঁছে মনের বাঁসনা আছে 
সমাপিল! বড়র বাসর ॥” 
বেশী দেরি করিলে প্লমুখী কি বলিবে তাহা ভাবিয়া মজুমদার 
চিন্তিত 


৮৮ বাঙালী জীবনে রমণী 


“রাত্রিশেষে গেলে তথা ক্রোধে না কহিবে কথ 
খণ্ডিতা হইবে পদ্নমুখী 
খেদ্রীইবে কটু কয়ে কলহান্তরিতা হয়ে 


ক. য়ে বড় ॥ 

এই ধরনের দাম্পত্যজীবনে কাম ভিন্ন প্রেম কি করিয়া আসিতে 
পারে? বুবিবাহের স্থখ যেমন, দায়িত্বও তেমনই । তাই 
“দেবীচৌধুরাণী'তে বক্কিম্তন্দ্র ব্রন্ম-ঠাকুরাণীকে দিয়া বলাইয়াছিলেন__- 

“বুড়ীর কথাট।ই শোন্‌ না; কি জালাঁতেই পড়লেম গা? আমার মাল। 

জপা হলো না। তের ঠাঁকুরদাদার তেষট্রিটা বিয়ে ছিল-_কিন্তু চৌদ 

বছরই হোঁক্‌, আর চুয়াত্তর বছরই হোক্‌_-কই কেউ ডাঁকলে ত কখনও 

না” বলিত না।” 

ব্রজেশ্বর উদ্ভর দিল; __- 

“ঠাঁকুরদাদার অক্ষয় স্বর্গ হৌক_-আমি চৌদ্দ বছরের সন্ধানে চলিলাঁম। 

ফিরিয়া আসিয়! চুয়াত্তর বছরের সন্ধান লইব কি? 

এর পর পরকীয়া-চ্ সম্বন্ধে বিচার করিতে গেলে একটা বিষয়ে 
সাবধান হওয়৷ অত্যন্ত দরকার । যে-কোনও দেশের ভদ্র সামাজিক 
কাঠামোর মধ্যে ব্যভিচার বা স্্ী-পুরুষ সম্পকিত অন্য নীতিবিরুদ্ধ আচরণ 
কতট৷ পরিব্যাপ্ত, তাহা নিরূপণ করা সব সময়েই ছুরুহ । এ বিষয়ে 
হিন্দুসমাজে আবার একটা বাহক কড়াকড়ি বা বজ্জ-আটুনি আছে, যাহার 
জন্য অনাচার গোপন রাখাই যথেষ্ট বলিয়া ধরা হয় এবং ভদ্রব্ক্তির 
জানি-না জানি-না ভাব ধরিয়া থাকাই রেওয়াজ । তাই এই সব ব্যাপারে 
স্ট্যাটিন্টিক্স্‌ পাওয়া দূরে থাকুক, কানাঘুষা ভিন্ন নির্ভরযোগ্য তথ্য 
পাওয়াও কঠিন। এই কানাঘুষাও খানিকটা নিন্দা বা তামাশার জন্য 
কেচ্ছা বা কেলেঙ্কারি পরিবেশন । স্ততরাং সতর্কতার প্রয়োজন আছে। 

পক্ষান্তরে সমাজ-সংস্কারকেরা একটু বাড়াইয়া বলিতেন। যেমন, 


প্রথম যুগের ত্রান্মরা পুরাতন হিন্দুসমাজকে অত্যন্ত ছুর্নীতিপূর্ণ বলিতে 
বিন্দুমাত্র দ্বিধা করিতেন না । তবুও তাহাদের মত খানিকটা বাদসাদ 


দেশাচার ই 


দিয়া গ্রহণ করিতেই হইবে, কারণ ধর্মবিশ্বাস ছাড়া, সামাজিক অনাচার 
নানাদিকে অসহা হওয়ার দরুনও তাহার! হিন্দুসমাজ ছাঁড়িয়া ব্রা্মসমাজে 
আসিয়াছিলেন। ইহাদের মধ্যে অনেকেই দুর্নীতি প্রত্যক্ষ দেখিয়াছিলেন। 
স্বতরাং তাহাদের মত ও সাক্ষ্যকে উড়াইয়া দেওয়া চলে না। 

আরও মনে রাখা উচিত ব্যক্তিবিশেষের অভিজ্ঞতা সব সময়েই 
সীমাবদ্ধ । একজন অবস্থাচক্রে বহু খারাপ জিনিস দেখিয়া থাকিতে 
পারে যাহা অন্যের গোচরে আসে নাই, এবং যাহাকে সাধারণভাবে 
বন্ুপ্রচলিত বল! চলে না । পুলিসের দারোগা বা বিচারকের চোখ দিয়া 
দেখিলে সমাজের যে চিত্র দেখা যায়, তাহাকে যথাযথ চিত্র বলা যায় না। 
একটা দৃষ্টান্ত দিতেছি । 

চণ্ডীচরণ সেন ব্রাহ্ম এবং মুন্সেফ ছিলেন । তিনি তাহার একটি 
রায়ে বলেন যে, হিন্দ্রু বিধবাদের 'মধো শতকরা নিরানববই জন অসতী। 
ইহার জন্য বঙ্কিমচন্দ্র তাহাকে একটু ব্যঙ্গাত্মক সমালোচন! করিয়াছিলেন। 
একটা হাসির গল্প বলিয়া তিনি এই মন্তবা করিয়াছিলেন, “আমরাও 
চণ্তীবাবুকে অনুরোধ করিব-যদি নিরানব্বইটির মাথাই খাঁইলেন, তবে 
আর একটি রাখিয়া ফল কি? আর একবার রায় লিখিয়া উটিকেও 
টানিয়া লউন।” ইহা! ১৮৮৮ সনে লেখা। 

এখন মুখ্য প্রসঙ্গে ফিরিয়া আসা যাক। উপরে নীতিবিরদ্ধ 
আচরণের কথা বলিয়াছি, সমাজবিরুদ্ধ আচরণের কথা বলি নাই। 
দুইটার মধ্যে প্রভেদ আছে। নীতিবিরুদ্ধ আচরণ সমাঁজবিরুদ্ধ না 
হইলে, অর্থাৎ প্রকাশ না হইলে, সেকালের সমাজ ইহা লইয়া! বেশী 
গোল করিত না। বরঞ্চ নীতির ব্যাপারে তখনকার দিনে একটু 
শৈথিল্যই ছিল। এই ফক্কা গেরো বজ্জ-আটুনিরই উল্ট! দিক। দুশ্চরিত্র 
লোকে বেলেল্লাপন! না৷ করিলে, ভদ্র ব্যবহার হইতে এমন কি সামাজিক 
মর্যাদা হইতেও বঞ্চিত হইত না। কিন্তু কোনও অনাচার শুধু নীতিবিরুদ্ধ 
না হইয়া যদি সমাজবিরুদ্ধ হইত তখন সেখানে কঠিন শাস্তি হইত। 
তাই শহরের সমাজে থাকিয়া সমাজবিরুদ্ধ কুকাজ করা প্রায় অসম্ভব 


৯৩ বাঙালী জীবনে রমণী 


ছিল, গ্রামের তে! কথাই নাই। তবে সমাজের বাহিরে চলিয়া গেলে 
সমাজ কিছুই বলিত না। | 

আমাদের দেশে স্ত্রীলোকের জন্য ভদ্রসমাজ ও বেশ্যাসমাজের মধ্যে 
“দোশি-মদ' বলিরা কোনও জায়গা ছিল না। এখন ইংরেজী এবং 
ফরাসী ভাবাতেও “দোমি-ম€্ প্রায় বারাঙ্গন। সমাজ বলিয়৷ প্রচলিত, 
অন্ততপক্ষে রঞ্ষিতা সমাজ ত বটেই । আসলে কথাটা যখন প্রথমে 
১৮৫৫ সনে আলেকসাদ্ব ছ্ামা ফিজ, বাবহার করেন তখন উহার অন্য 
অর্থ দিয়াছিলেন। উহার আর্দি অর্থ ওয়েবন্টার অভিধান হইতে 
দিতেছি, 

“1019 01238 01 800106),,091 ₹1011701) 11) $001 0170010156217993 
706 00৮ 011 [1007 দ10000১ 01161) 1) 1)01)110 80%0011. 

এই “পাবলিক ক্কাগডালে"র জন্য “দোমি-মদেও না গিয়া একেবারে 
অভিজাত সমাজে মধাদা রাখিয়া মেলামেশা ইউরোপে সন্তব ছিল। 
মাদাম দ্ধ ন্টায়েলের একাধিক প্রণরী ছিলেন। ইহার জন্য তাহার মান- 
মর্যাদার কোনও হানি হর নাই, তাহার কন্যার সহিত ফ্ান্মের বিশিষ্ট 
অভিজাত সন্তানের বিবাহ হইতেও কোন বাধা জন্মে নাই। এই বংশ 
বিখ্যাত গ্ভ ব্রয় বংশ। একদিন ডিউক মরিস ছ্ভ ব্রয় ও প্রিন্স লুই ছ্ভ 
ব্রয়ের ভগিনীর সহিত আমার কথাবাতি1 হইয়াছিল। (ইনি নিজে 
একজন কাউন্টেস্‌, লববপ্রতিষ্ঠ লেখিকা, তাহার দুই ভ্রাতা পৃথিবীবিখ্যাত 
বৈজ্ঞানিক) তিনি আমাকে বলিলেন, মাতার দিকে তিনি মাদাম ছ্ছ 
স্টায়েলের সন্তান । মাদাম ছ্ ন্টায়েলের সহিত যে ব্রয় বংশের বৈবাহিক 
সম্বন্ধ, তখন প্রথম শুনিলাম। একটু আশ্চর্য হইয়াছিলাম বই কি! 

এইরূপ প্রণয়সন্ভত পুত্রদেরও লব্বপ্রতিষ্ঠ হইতে যে বাধা জন্মিত 
তা নয়। কাউণ্টেস ভালেভ্স্কার গর্ভপ্রসূত নেপোলিয়নের পুত্র ফ্রান্সের 
পররা্রসচিব হইয়াছিলেন, রানী অরীসের প্রণয়ী-সম্ভৃত পুত্র মণি ফরাসী 
সমাজে এবং রাজনৈতিক জীবনে গণ্যমান্য ব্যক্তি ছিলেন। নিজের মাতার 
প্রণয়ী-সম্ভৃত বলিয়া, তৃতীয় নেপোলিয়ন তাহার প্রতিবিরাগ দেখান নাই। 


দেশাঁচার র ৯১৫ 

সেদিন লগ্ুনে একটি কৌতৃহলজনক সংবাদ শুনিলাম। এক বাড়িতে 
খাইতে গিয়াছি। সেখানে অতি স্বপ্রী, স্থুশিক্ষিত এবং অতি স্থবেশও 
বটে-_একটি ভারতীয় যুবকও ছিলেন। কথায় কথায় তিনি আমাকে 
বলিলেন যে, মায়ের দিক হইতে তিনি চতুর্দশ লুই-এর বংশধর । আমি 
হাসিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, “কোন্‌ তরফ, সিধা না বাঁকা ?” যুবকও 
হাসিয়া উত্তর দিল, জারজ তরফেই বটে। আমি আবার 
জিজ্ঞাসা করিলাম, “কোন্‌ উপপত্রীটি ?” যুবক বলিলেন, “মাদাম 
গ্ভ মতেম্প |” এইটির উপর আমার বিশেষ বিরাগ, তাই মন্তবা 
করিলাম, “লা মতেম্প ? লা মাযাতেনে। হইলেও কথা ছিল না।* 
সকলেই অবশ্য হাঁসিলেন। 

এ-রকম একটা মাঝেকার সমাজ আধুনিক হিন্দু সাজে কখনই 
ছিল না। স্তবতরাং সমাজবিরুদ্ধ কাজের ফলে চিরকালের জন্য সমাজের 
বাহিরে যাইতে হইত । 

(কিন্তু এ ব্যাপারে হিন্দু সমাজ পুরুষ ও নারীর মধ্যে যে পার্থকা 
করিত, তাহা ঘোরতর অবিচারের মত । পুরুষ সমাজের বাহিরে গিয়৷ 
অনাচার করিলেও সমাজে তাহার স্থান অব্যাহত থাঁকিত, সমাজ তাহাকে 
বাহির করিয়া দিত না। কিন্তু স্রীলোকের বেলাতে অন্য বিচার । এই 
অবিচারের কথা বঙ্কিমচন্দ্র লিখিয়াছিলেন, 

'স্ত্রীলোকদ্দিগের উপর যে-বূপ কঠিন শাঁসন, পুরুষদিগের উপর সে-রূপ কিছুই 
নাই। কথায় কিছু হয় না; ভ্রষ্ট পুরুষের কোন সাঁমাঁজক দণ্ড নাই। 
একজন স্ত্রী সতীত্ব সপ্বন্ধে কোন দোষ করিলে সে আর মুখ দেখাইতে পারে' 
না; হয়ত আত্মীয়স্বজন তাহাকে বিষ প্রদান করেন; আর একজন পুরুষ 
প্রকাস্তে সেইরূপ কাঁধ্য করিয়া, রৌশনাই করিক়া, জুড়ি হাকা ইয়া রাত্রিশেষে 
পত্বীকে চরণরেণু স্পর্শ করাইয়া আসেন; পত্বী পুলকিত হরেন; লোকে 
কেহ ক করিয়া অনাধুবাদ করে না; লোকসমাজে তিনি বেরূপ প্রতিষ্টিত 
ছিলেন, সেইবপ প্রতিষ্ঠিত থাঁকেন, কেহ তাঁহ!র সহিত কোন প্রকার 
ব্যবহারে সঙ্কুচিত হয় না; এবং তাহার কোন প্রকার দাবিদাওয়া থাকিলে, 
চ্ছন্দে তিনি দেশের চুড়া বলিয়া প্রতিভাত হইতে পারেন ।” 


৯২ বাঁঙালী জীবনে রমণী 


অবশ্য এই বৈষম্য কমবেশী পৃথিবীর সর্বত্রই ছিল, এবং আছে । তবে 
পুরাতন বাঙালী সমাজে খুবই বেশী ছিল। 

স্ৃতরাং কুলনারী- কুমারী, সধবা বা বিধবা যাহাই হউক নাঁ_ 
প্রবৃদ্তির বশে, বা অনেক সময়ে অর্থের প্রলোভনে কিংবা পারিবারিক 
অত্যাচারে পরপুরুষের প্রতি আসক্ত হইলে তাহাকে কুলত্যাগ করিয়া 
যাইতে হইত। চলিত ভাষায় ইহাকে বল! হইত “বাহির হইয়া যাওয়াঃ। 
ইহাদের শেষ গতি প্রায় সব ক্ষেত্রেই হইত বেশ্টালয়ে। এই বিষয়ে 
বনু কথা পুরাতন বাংলা বই-এ আছে। রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্র এই 
ব্যাপার লইয়। গল্প লিখিয়াছেন। এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের “বিচারক 
গল্পটির উল্লেখ করিব। এই ধরনের কুলত্যাগ প্রায়শই ন ঘটিলেও 
সামাজিক জীবনের একটা “এণ্ডেমিক' ব্যাপার ছিল । আমাদের বাড়ীতে 
আমার অল্প বয়সে একটি ব্রাহ্মণী পাচিকা' ছিল। উহার চেহারা, চরিত্র 
ও ব্যবহারে কোনদিন ভদ্রস্থৃতা বা সচ্চরিত্রতার ত্রুটি দেখি নাই। কয়েক 
বৎসর পরে হঠাৎ বাহির হইয় পড়িল যে, সে কুলত্যাগিনী। আমর! 
জানিয়াছি উহ! টের পাওয়া মাত্র সে যে চলিয়া গেল, আর আসিল না । 
যে-বাড়ীতে সে ভদ্রকন্যা হিসাবে রাধুনী হইয়াও সম্মানিত ছিল, সে 
বাড়ীতে কলঙ্কিনীর খ্যাতি লইয়া থাকা তাহার প্রাণে সহিল না । 

এই ব্যাপারের অতি করুণ একটি সত্য ঘটনার বিবরণ শিবনাথ শান্দ্রী 
তাহার আত্মজীবনীতে দিয়াছেন । সেটি উদ্ধত না করিয়া পারিলাম না। 

শিবনাথ তখন ঠাপাতলার দীঘির পৃবদিকে থাকেন । তাহার বাড়ীর 
কাছে এক ছুতোর-জাতীয়া বিধবা থাকিত, তাহার ছয়-সাত বতসরের 
একটি মেয়ে, সেও বিধবা । শিবনাথ একটি বিধবার বিবাহ দিয়াছেন 
শুনিয়৷ সেই ভ্ত্রীলোকটি নিজের মেয়েরও বিবাহ দিতে চাহিল। শিবনাথ. 
লিখিতেছেন,_ 

“মেয়েটি সকাল বিকাল আমাদের বাঁড়ীতে আসিত ও আমাদের সঙ্গে 


কালযাপন করিতে লাগিল। আমাকে “দাদা, বলিয়৷ ডাকিত এবং আমার 
গলা জড়াইয়া কোলে বসিয়। থাকিত। একদিন প্রাতে সে আমার গলা 


দেশাচার ৯৩ 


জড়াইয়া কোলে বসিয়া আঁছে, এমন সময় বিষ্ভাসাগর মহাশয় আসিলেন। 
মেয়েটিকে অগ্রে তিনি দেখেন নাই, আমার কোলে তাহাকে দেখিয়া 
বলিলেন, “ও মেয়েটি কে হে? বাঁ» বেশ সুন্দর মেয়েটি তো 1, 
“আমি বলিলাম, “ওটি পাশের বাড়ীর একটি ছুতোরের মেয়ে, অম।কে 
দাদ] বলে, আমার কোলে বস্তে ভালবাসে । ওটি বিধবা, ওর মা ওর 
বিয়ে দিতে চাঁর, তাই আমাদের কাছে দিয়েছে । 
“এই কথা শুনিয়াই বিগ্ভাসাঁগর মহাশয় চমকাইয়া উঠিলেন, “বল কি। 
এইটুকু মেয়ে বিধবা ? তাঁহার পর তাহাঁকে ডাঁকিলেন, “আয় মা, আমার 
কোলে আয়, 
“সে তো লজ্জাতে যাইতে চায় না, আমি কোলে করিয়া তাহার কোলে 
বসাইয়! দিলাম । বিগ্ভাসাঁগর মহাশয় তাহাঁকে বুকে করিয়া আদর করিতে 
লাগিলেন। শেষে যাইবার সময় মেয়েটিকে ও তাহার মাকে পাল্কী করিয়' 
তৎপর দ্রিন বৈকাঁলে তীহার ভবনে পাঠাইবার জন্য অচ্গরোধ করিয়! গেলেন 
এবং আমাকে বলিয়া গেলেন, “মেয়েটিকে বেথুন স্কুলে ভর্তি করে দেও, . 
মাহিনা আমি দেব ।” 
একটা দুর্ঘটনায় মেয়েটির মার সহিত শিবনাথের পরে আর দেখা 
হয় নাই। ইহার বহু বৎসর পরে তিনি যখন ব্রাহ্মসমাজের আচার্য ও 
সমাজের লাইব্রেরী ঘরে থাকেন, তখন তিনি একটি চিঠি পাইলেন,__ 
“বহু বৎসর পূর্বে টাপাঁতলার দীঘির কোণের এক বাড়ীতে পাড়ার একটি 
সাত-আট বৎসরের বালিকা আপনাকে দাদা বলিত ও কোলে পিঠে উঠিত, 
আপনার হয়ত মনে আছে। আমি সেই হতভাগিনী। আমি বিপদে 
পড়িয়া আপনাকে ভাকিতেছি। একবার দয়! করিয়া আসিয়া সাক্ষাৎ 
করিবেন ।” 


শিবনাথ কতব্য মনে করিয়া তখনই গেলেন, এবং সাক্ষাতের পর 
মেয়েটির পরবর্তী ইতিহাস শুনিলেন। টাপাতল! ছাড়িয়া! যাইবার 
পর তাহার মা আর বিদ্ভাসাগর মহাশয়ের কাছে যায় নাই, ও মেয়েটি 
বড় হইলে তাহাকে পাপপথে লইয়া যায়। সে এক ব্যক্তির রক্ষিতা 
হিসাবে আধিক দিক হইতে স্থুখেই ছিল, ছুইটি পুত্রও জন্মিয়াছিল ।' 


৯৪ বাঙালী জীবনে রমণী 


কিন্তু সেই বাক্তি পরে তাহাকে ছাড়িয়া চলিয়া যায়, তাহার শুধু 
একখানা বাড়ী ছাড়া আর কিছু না থাকাতে বিপদসমুদ্রে পড়িয়া 
শিবনাথকে স্মরণ করিয়াছে । তিনি সেখানে যাতায়াত করিতে 
লাগিলেন। কিন্তু দেখিলেন, মেয়েটি অন্য পথ ধরিতেছে। আবার 
শিবনাথের নিজের বিবরণ উদ্ধত করিব__ 
“একদিন গিয়া দেখি, একটি উনিশ-কুড়ি বত্সরের মেয়ে কোথা হইতে 
জুটিয়াছে, তাহার একটা ইতিবৃত্ত আমাকে বলিল, তাহ! এখন স্মরণ নাই। 
কিন্তু এ মেয়ের'ঘরে করাস বিছানা তাকিয়া বাধা হু'ক! প্রভৃতি দেখিলাম । 
তখন মনে হইল, নিজের রূপযৌবন গত হওয়াতে অর্থোপাঞজ্জনের আশায় 
আনিয়াছে। তখন আঁমি বলিলাম, “এই আমার তোমার ভবনে শেষ আসা 1, 
“আমার এই ভগিনীকে অনেকদিন পরিত্যাগ করিয়া আসিয়াছি, কিন্ত 
তাহার বিষয় স্মরণ করিয়া এখনও ছুঃখ হয়। সে এতদিন পরে দাদা 
বলিয়া স্মরণ করিল, তাহাকে যে হাঁতে ধরিয়া বিপথ হইতে ্থপথে 
আঁনিতে পাঁরিলাম না, এই বড় ছুঃখ রহিয়া গেল ।” 
কিন্তু আপাতত আমার আলোচ্য বিষয় সমাজের ভিতরে অনাচার। 
এ বিষয়ে কানাঘুষ! ছাড়া অন্য খবর পাওয়া যে কঠিন, তাহা আগেই 
বলিয়াছি। তবে কানাঘুষার পরিমাণ যাহা ছিল তাহা ভাবিবার বিষয়। 
নিন্দা ইত্যাদি ছাঁড়িয়৷ দিলেও বাকী খানিকটা থাকিত, যাহা অগ্রাহা করা 
যায় না। আমি অনেক চিন্তার পর সিদ্ধান্তে পৌছিয়াছি যে, চার আনা 
বা ছয় আনা কেচ্ছা সত্য বলিয়া ধরিলে পুরাতন বাঙালী সমাজের প্রতি 
অবিচার কর! হইবে না। 
সেই সমাজে পারিবারিক জীবনের কাঠামোর মধ্যে শ্ী-পুরুষের 
সম্পর্কঘটিত অনাচার যে ছিল তাহাতে সন্দেহ করা চলে না। ইহা 
সাধারণত চলিত আত্মীয়তায় আবদ্ধ ব্যক্তিদের মধ্যে। একটা সংক্ষিপ্ত 
হিসাব দ্রিব। সেকালে মেয়েদের বিবাহ এত অল্পবয়সে হইত যে কুমারী- 
সংক্রান্ত অনাচার বেশী হইবার কোন স্থযোগই ঘটিত না। অনাচার 
দেখ! যাইত বিবাহিত ও বিধবা নারীদের সম্পর্কে। প্রথমে বিবাহিত 
সধবা নারীর কথা ধর! যাক। 


দেশাচার ৯৫ 


সেকালে বাঙালীদের মধ্যে 'শাশুড়ে এবং “বৌও” বলিয়া ছুটি 
গালি শোনা যাইত, উহার প্রথমটির অর্থ শীশুড়ীরতও দ্বিতীয়া অর্থ, 


পুত্রবধূরত। শ্বশুর-পুত্রবধূর ব্যাপার সম্ভবত খুবই কম 





দুই একটি অবিসনথাদিত ঘটন দেখিয়াছি । ইহার কারণ অবশ্য বালিকা 
কম্যার বিবাহ । পুরুষের বিবাহ অপ্রাপ্ত বয়সে না হইলে অনেক সময়ে 
শাশুড়ী ও জামাতার মধ্যে বয়সের তারতম্য শাশুড়ী ও শ্বশুরের বয়সের 
তারতম্য হইতে কম হইত । তখন ছুই-এর মধ্যে একটা নীতি ও রীতি- 
বিরুদ্ধ প্রণয় হওয়া একেবারেই বিচিত্র বলা চলে না। 

এই জন্য সে-যুগে শাশুড়ী প্রায়ই জামাতার মহিত আলাপ করিতেন 
না, এবং সম্মুখে আসিলেও অবগুগনবতী হইয়া থাকিতেন। আমার 
দিদিমা বুদ্ধ বয়স পর্যন্তও আমার পিতার সহিত আলাপ করেন নাই। 
পরে যখন দুই একটা কথা বলিতে শুনিতাম, তখনও দেখিয়াছি তিনি 
জামাতাকে “আপনি” বলিয়া সন্বোধন করিতেছেন। 

এই অনাচার ছাড়৷ দেবর-ভ্রাতৃবধূ, এমন কি ভাস্ুর-ভাদ্রবৌ-এর 
মধ্যেও অনাচার দেখা বাইত। দেবর-্রাতৃবধূর “ফ্লাটে শ্বান” সামাজিক 
আচার-ব্যবহারেরই অন্তভূক্ত ছিল। উহা কোনও কোনও সময়ে 
উনাঞউিস্ন নপগ না। কিন্তু ব্যাপার যে 
সময়ে সময়ে আরও দূর পর্যন্ত গড়াইত তাহা সন্দেহ করা চলে না। 

কিন্তু সমাজের মধ্যে এই ধরনের অনাচার বেশী হইত অল্পবয়স্থা 
বিধবার সম্পর্কে । তাহাদের পদস্মলন যখন হইত, তাহা যে নিকট 
আত্মীয়ের দ্বারা হইত সে বিষয়ে সন্দেহ নাই। কিন্তু এ বিষয়ে সমস্ত 
বাঙালী সমাজ জুঁড়িয়া একটা বিরাট ভগ্তামি ছিল। ব্যাপকভাবে 
জ্রণহত্য। চলিলেও, এই সামাজিক পাঁপ সম্বন্ধে সম্ভব হইলে সকলেই 
চুপ করিয়া থাকিত। বিদ্কাসাগর মহাশয় বিধবাদের ছুঃখ এবং 
এই অনাচার, ছুই দেখিয়াই বিধবা-বিবাহের আন্দোলন আরম্ত 
করিয়াছিলেন । 


৯৬ বাঙালী জীবনে রমণী 


এর পর সামান্য বনিতার কথা। এ বিষয়ে এত সাবধানতার কোনও, 
প্রয়োজন নাই । এক্ষেত্রে স্টাটিস্টিকৃস্ঠ না থাকিলেও প্রমাণ স্থপ্রাচুর | 
বাঙালাসমাজে বেশ্যাসক্তির পরিব্যাপ্তি সম্বন্ধে সন্দেহের কোনও অবকাশই 
নাই। ব্রাঙ্গধর্সের নৈতিক শিক্ষা প্রচার হইবার আগে বেশ্যালয়ে 
যাওয়৷ পুরুষের পক্ষে স্বাভাবিক বলিয়াই ধরা হইত। অবশ্য সেখানে 
গেলে ধামিক বলিয়া খ্যাত হওয়া যাইত না, কিন্তু নিন্দার বিষয়ও ছিল 
না। বরঞ্চ সাধারণ লোকে বিষয়ী সচ্চরিত্র ব্যক্তির অপেক্ষা দুশ্চরিত্র 
বাক্তিকেই বেশা ভালবাসিত কারণ একদিকে তাহাদের কুটিলতা, অর্থগৃরু তা, 
ষড়যন্ত্রপরায়ণতা ইত্যাদি দোষ কন হইত, অন্যদিকে তাহারা উদারপ্রকৃতির 
ক্ষমাশীল মানুষ হইত। তাই একটি পুরাতন পুস্তকে এইভাবে ছুশ্চরিত্র 
ব্যক্তির প্রশস্তি গাওয়। হইয়াছিল, 


“লোকে যারে বলে লুচ্চ, সে কেবল জানিব৷ কুচ্ছ 
লুচ্চ বিনা মজা জানে নাই । 

মারে মগণ্ডা আদা ছেনা, সাদা থাকে বাবুয়ানা, 
সোনাদান। তুচ্ছ তাঁর ঠাই ॥ 

মাতা পিতা দাদ! ভাই, কাহার তোয়াক্কা নাই, 
ছুঃখী নাহি হয় কার দুখে। 

কেহ যদি কটু বলে সে কথা গায়ে না তোলে 
সর্বদা সরল কথা মুখে ॥ 

বুদ্ধির নাহিক ওর, নরমেতে করে জোর 
গরম নরম তার কাছে। 

যার সঙ্গে কোন ঠাই, কোঁন কালে দেখ। নাই, 
যেন কত আলাপন আছে ॥ 

লুচ্চ হলে দাতা হয়, কাহারো না করে ভয়, 
কেবল প্রেমের বশ রয়। 

যে জন পিরিতে রাখে, তার প্রেমে বন্দী থাকে, 
তার জন্ত বহু দুঃখ পার ॥' 


ইহাতে অবশ্য খানিকটা শ্লেষ আছে। তবু ইহাকে সাধারণভাবে 


বেশ্যাসক্ত ব্যক্তি সম্বন্ধে জনমতের প্রমাণ হিসাবে গ্রহণ কর! যাইতে 
পারে। 

অপর পক্ষে শহরে বেশ্যাদের খ্যাতি, প্রতিষ্টা, প্রসার-প্রতিপত্তি ও 
অর্থসম্পদ সম্বন্ধে কোনও সন্দেহ করা চলে না। নাম করিতে হইলে 
ন্রীলোককে হয় জমিদারের স্ত্রী অথবা বারাঙ্গনা হইতে হইত। রাণী 
ভবানী হইতে আরম্ত করিয়া রাণী রাসমণি, মহারাণী স্বর্ণময়ী, রাণী জাহবী 
চৌধুরাণী পর্যন্ত রাণীরা যতই নামজাদা হোন না কেন, অন্য দিক হইতে 
আর এক রকমের নামের জোরও কম ছিল না। 

ইহাদের প্রতিষ্ঠা সম্বন্ধে রসিক মহলে একটা সংস্কত বুকনীও 
প্রচলিত ছিল,_- ূ 

“স্বনায়শ্চ স্ত্ীয়োধন্যা মাতৃনামশ্চ মধামাঃ | 
অপমাশ্ছ,ক্রীনায়্াঃ, কুলর তাশ্চাধমাবমাঃ ॥ 

ইহার তগুকালীন্তন ব্যাখ্যা দিতেছি, “সেই শ্রীলোক ম্বনামা যাহার- 
দিগের নাম করিলে অনায়াসে বাবুগণে জানিতে পারেন; মধ্যমা 
মাতৃনামে যাহারা খ্যাত তাহারদিগেরও বাবুরা জানেন; কিন্তু 
কুলবধু সকলকে কোন বাবু জানেন না, এ কারণ তাহারা অধমের 
অধম ।” 

কিন্ত্র এই বারাঙ্গনা জগণ্ প্রাচীন ভারতবর্ষের বারাঙ্গনা জগৎ নয়, 
প্রাচীন গ্রীস বা রোমের জগৎ নয়, রিনেসেন্সের জগণ্ও নয়। ইহাদের 
বাড়ীতে বসিয়া কাথাবাত চালানো পেরিক্লিস এবং আম্পাসিয়ার 
কথোপকথনের মত হওয়ার কোনও সম্ভাবনাই ছিল না। স্বনামধন্যা 
হইলেও ইহাদের নাম 'থাইস্” বা “ফ্রাইনি” হইত না। সেকালের বাংলার 
স্বনামধন্যাদের নামের নমুনা দিতেছি, _বক্নাপিয়ারী, কৌকড়া-পিয়ারা, 
দামড়াগোপী, ছাড়ুখাগী, ওম্দা খানুম, পেয়ারা খানুম, বেলাতি খানুম, 
নানিজান, মুন্সিজান, স্থপন্জান ইত্যার্দি। 

সকল যুগেই বেশ্যাদের যত্ব করিয়া শিক্ষা দেওয়া হইত-_পেশা 
তো. পেশা, তা উকীলেরই হউক, ভাক্তারেরই হউক, আর বেশ্যারই 


ণ 


৯৮ বাঙালী জীবনে রমণী 


হউক। প্রাচীন ভারতে বেশ্যার শিক্ষার একটা বর্ণনা উদ্ধত ছি। 


সম্ভবত উহা! সপ্তম শতাব্দী হইতে । বেশ্যামাতা ঘলিতেছে,- 

প্রতোক বেশ্টামাতাই জন্ম হইতে কন্তাকে শিক্ষা দিয়া থাকে । প্রথমে 

মিতাহার ইত্যাদির দ্ব।রা শরীরের তেজবল বাড়ায় । পাঁচ বৎসর বয়সের 

পর পিতার সহিতও বেশী মিশিতে না দিয়া বড় করে। জন্মদিনে, 

পুণাদিনে উৎসব ও মঙ্গলবিধি করিয়া থাকে । পুরাপুরি কামশান্ত্র পড়ায় ) 

নৃতা, গীত, ব।ছা, চিত্রাঙ্কন ইত্যার্দি সকল কলা শিখায়; লিপিজ্ঞান ও 

বচনকৌশল আয়ত্ত করায়; বাঁকরণ, তর্বশাস্ত্, জোতিষও কিছু কিছু 

শিখায়) নানারকম ক্রীড়ীকৌশল, দৃবাতক্রীড়া ইত্যাদিতে দক্ষ করে-_- 

ইত্যাদি । 

এই রূপ আরও বহু জিনিস শিক্ষা দেওয়া হইত। পরে পর্বদনে 
সাজাইয়া গুজাইয়। মেলা ও লোকসমাগমের স্থানে পাঠানো হইত, 
যাহাতে ধনী প্রণয়ী আনিতে প!রে। 

পুরাতন বাংলায়ও বেশ্যার সর্বতোমুখীন শিক্ষা দেওয়া হইত। 
কলিকাতার বেশ্মাদের সব রকম শিক্ষার পরিচয় দিব না। তবে একটা 
দিকে শিক্ষা আমার কাছে কৌতুহলজনক মনে হইয়াছে বলিয়া একটু 
বিবরণ দিতেছি । বুদ্ধা বেশ্যা বলিতেছে যে, কেবল “বিহারের রীতি 
জানিলেই বেশ্যা হওয়া যায় না, তাহাদিগকে প্রেমের ধারা'ও জানিতে 
হইবে। সেপ্রেমকি? বৃদ্ধা বেশ্া বলিতেছে-_ 

প্রেম, যাহ!কে গ্রীতি বলে তাহা ঈশ্বরের সঙ্গেই ভাল, ইহা কেবল 

যোগীরাই পারেন। নচেৎ অন্ত প্রেম কপট প্রেম, অর্থাৎ স্বকার্য্যোদ্ধার 

হেতু যকঞ্চৎ যাহা! করিতে হয়-_তাহ! মন্থুযসকলের আন্তরিক নহে, 

প্রায় বাঁচনিকই |” 

এই স্পঞ্টোক্তির জন্যে শিক্ষযেত্রী বেশ্যাকে “বেলফুল বাহার দিতে 
হয়। তাহার পর সে বলিতেছে,_ 

“অতএব, বাঁছা, আমারদিগের প্রেম যাঁহা হইতে অধিক টাকা পাওয়া 

যায়, তাহার(দিগেরই সহিত প্রেম হয়, কিন্তু তাহাঁও নিপট প্রেম নয়, 

সেহ কপট প্রেম জানিব11” 


দেশাচার ৯৯ 


বেশ্া সত্যকার প্রেমে পড়িলে কলিকাতার খানদানী সমাজে 
প্রেমপাত্রকে ইংরেজী অক্ষরে সংক্ষিগুভাবে পি-এন্‌ বলা হইত । এই 
দুর্বলতার কথা ধরিবার নয়। আসল বেশ্যার প্রেম সম্বন্ধে এইরূপ 
শিক্ষা দেওয়া হইত_- 

“তুমি এই প্রকার প্রেম করিবা, কাহারও দমে ভূলিবা না। বাবুকে 

আপনার কাবুতে আনিবা। ইহার পন্থা এই ছয় ছ [পঞ্চ মকারের মত ] 

শিখিলে হয়, যথা ছলনা, ছেনাঁিঃ ছেলেমি, ছাঁপান, ছেমোঃ ছেচড়ামি।” 

অন্যগুলির অর্থ পাঠক অল্পশ্বল্প অনুমান করিতে পারিবেন। তাই 
শুধু “ছেমে/ সন্বন্ধীয় শিক্ষা উদ্ধত করিতেছি । রক্ষিতা অবস্থায় থাকার 
সময়ে বাবু সন্দেহ করিয়া রাগ করিলে তাহাকে জব্দ করিবার উপায়কে 
'ছেমো” বলা হইত। বাবু সন্দেহ করিলেই ক্রোধ করিয়া! মৌনা হইয়া 
থাকিতে হইবে, অনেক সাধ্যসাধনার পরও এক-মআধটা কথা কহিয়া 
নীরব থাকিতে হইবে । 

“এইরূপ হকৃ-নাহক্‌ ক্রোধ করিয়া মৌন! হইয়া থাকিলে তাহাঁকেই ছেমো 

বলে। যগ্পি প্রবঞ্চন! করিয়া কিঞ্চিৎ কপট রোদন করিতে পার তৰে 

বড়ই ভাল এবং তোমার মাথ! খাই এই একটি মাত্র কথা মুখ হইতে 

অপ্দেক নির্গত করিয় দুইচক্ষে এক একফ্োটা জল বাহির করিয়া নীরব 

থাকিলেই ববুর ক্রোধ মার্গে ঢুকবেক, উল্টিয়া তোমাকে সাধ্যসাধনা 

করিবেন, এবং তোমাকে যত সাধিবেন তুমি ততই আপনার ছেমো 

প্রক।শ করিব1।” 

প্রাচীন ভারত ও অর্বাচীন ভারতের মধ্যে বেশ্যার শিক্ষার সম্বন্ধে 
যে বেশ পার্থক্য ছিল তাহা স্বীকার করিতেই হইবে । কিন্তু তাহার 
জন্য বেশ্যার আকর্ষণ ও প্রতিপত্তি কমে নাই, কারণ বেশ্যার উৎকর্ষের 
সহিত বেশ্যাসক্তের রুচিও নামিয়া গিয়াছিল। বেশ্যালয়কে চলিত 
বাংলায় যে “মাগীবাড়ি' বলা হইত তাহাই এই অবনতির সুচক। 

ধনী বা সস্ছল লোকের বাঁড়িতে বেশ্থাসক্তি এতই স্বাভাবিক বলিয়া 
মানিয়৷ লওয়া হইত যে খাজাঞ্চিখানাতে এই বাবদে খরচপত্রের জন্য 
স্ট্যাপ্ডিং অর্ডার” কর্তার কাছ হইতে থাকিত, অবশ্য অনুচ্চারিত ভাবে । 


১৩০৪ বাঙালী জীবনে রমণী 


স্থৃতরাং খাজাঞ্চি খতিয়ানে লিখিতে পারিত, ছোট বাবুর হিসাবে লাল 
পেড়ে শান্তিপুরে শাড়ীর বাবদে দশ বা পনের টাকা | 

ফলে ধনী পরিবারে বেশ্যাসক্তির ক্রেদাক্ত দিক ছাড়৷ আর একটা 
মর্মান্তিক নিষ্ঠুর দিকও দেখা যাইত। উহা পত্বীদের উপেক্ষিত, বঞ্চিত, 
বিড়ন্বিত জীবন । এ-বিষয়ের উল্লেখ বঙ্কিমচন্দ্র করিয়াছেন, প্রায় সকল 
সমাজসংস্কারক ও ওপন্যাসিকও করিয়াছেন । তাহাদের আগেও বাংল! 
বইএ ইহার উল্লেখ আছে। একটি পুরাতন পুস্তক হইতে একজন সতী 


নারীর বিলাপ উদ্ধৃত করিতেছি ;_ 
“আমার সমান নারী,  ভ্রিজগতে নাহ হেরি, 
আমি নারী অতি অভাগিনী । 


ধনে মানে কুলে শীলে, বর দেখি বিয়ে দিলে, 
সমাদরে জনক জননী ॥ 
বিবাহের পর আসি, শ্বশুর ঘরেতে বসি, 
দিবানিশি থাঁকি একাকিনী। 
নবীন যৌবন ভরে, চিরকাল কামজ্রে, 
পুড়ে মরি দিবস রজনী |” 
টাকার অভাব হইলে ন্ত্রীর অলঙ্কারের উপর যে টান পড়িত তাহার 
বিবরণও আছে; 
“কি করেন শেষে নিজ পত্বীর গাত্রের অলঙ্কারাদি অপহরণ করিবার মন-স্থ 
করিয়া এক দিবস শয়নছলে বাঁটীর মধ্যে যাইবেন সংবাদ পাঠাইলেন। 
তিনি এই সংবাদ পাইয়া তৎক্ষণাৎ ছড়া গুয়! পান দিয়া পাঁচ এও লইয়! 
স্ববচনি পূজা দিলেন, কারণ নববব্বাশয়নের পর স্বামীর মুখ সঈন্দর্শন করেন 
নাই। রাত্রিতে বাঁটির মধ্যে বাবু শয়নার্থ গমন করিলেন। তাহাঁকে অনেক 
বিনয়বাক্যেতে সন্তুষ্ট করিয়া ছুই চারি খানি ত্বর্ণ গহনা তাহার স্থানে লইলেন, 
কহিলেন উত্তম গড়াইয়া দিব।” . 
এই জনপ্রচলিত আচার হইতেই রবীন্দ্রনাথ তাহার “মানভগ্জন; 
গল্পের উপকরণ লইয়াছিলেন। কিন্তু পরযুগের অনুভূতির দ্বারা উহাকে 
তিনি যে-জগতে নিয়াছিলেন, তাহা পুরাতন গহনাচুরির জগত নয়। 


দেশাচার ১০১ 


ইহার পর আর একটা কথ! বিশেষ ভাবে প্রণিধান করিতে হইবে । 
সেটা এই- গ্রাম্য সমাজ পাপবজিত ছিল না স্ত্রী-পুরুষ-সংক্রান্ত এক 
ধরনের অনাচার শহরে বেশী হইলেও আর এক ধরনের অনাচার পল্লী- 
গ্রামে কম ছিল না। আমার গ্রাম্জীবনের সাক্ষাৎ অভিজ্ঞতা যতটুকু 
তাহাতে পঙ্কিলতা দেখি নাই। তাই আমার ধারণা ছিল, স্্রী-পুরুষ 
সংক্রান্ত নীতিবিরুদ্ধ আচরণ হইতে গ্রাম্য সমাজ মোটামুটি মুক্ত। কিন্তু 
ক্রমশ জানিতে আরন্ত করিলাম যে, আমার ধারণ! ঠিক নয়, গ্রামেও 
যথেষ্ট অনাচার ছিল এবং আছে। বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরগুচন্্ 
গ্রাম্য সমাজের বাস্তব বর্ণন! যেখানেই দিয়াছেন, সেখানেই উহাকে বড় 
বা মহত বলিয়া দেখান নাই। তীহার৷ অবশ্ট বিশেষ করিয়া উহার 
কষুত্রতা ও নীচত৷ দেখাইয়াছেন। শরৎচন্দ্রের “পল্লীসমাজে' যে চিত্র 
পাই, তাহ যেমন বাস্তব তেমনই নীচ। রমেশের চরিত্র উহাতে কল্লিত 
আদর্শ মাত্র। তবে উহাদের গল্পে নরনারীঘটিত অনাচারের বুল 
বিবরণ নাই, ইঙ্গিত অবশ্য যথেষ্ট আছে । 

আমি বাংলার পল্লীসমাজের এই দিকটার পরিচয় পাইতে আরন্ত 
করিলাম প্রাপ্তবয়সে লেখক বন্ধুদের সহিত আলাপে । তীহাদের 
কথাবার্তা হইতে যাহা জানিতে লাগিলাম তাহা আমার পীড়াদায়ক হইয়া 
দ্রাড়াইল। অথচ ইহাদ্দের কথা অবিশ্বাস করিবার কোনও হেতু পাই 
নাই। জম্প্রতি দুইজনের লেখা পড়িয়াছি, তাহাতেও একটা গীড়াদায়ক 
কলুষিত চিত্র পাইয়াছি। ইহার্দের একজন শ্রীযুক্ত জিতেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী 
ও আর একজন শ্রীযুক্ত গজেন্দ্রকুমার মিত্র। জিতেনবাবু বন্ধু না হইলে 
তাহার বইটা সম্ভবত আমার নজরে আসিত না। কিন্তু গজেনবাবু 
খ্যাতনামা! লেখক, তাহার বইও স্থুপরিচিত। জিতেনবাবুর বইটির নাম 
“পিছু ডাকে”; গজেনবাবুর বই স্থুপরিচিত উপন্যাসত্রয়ী--কলকাতার 
কাছেই' উপকণ্ঠে, ও 'পৌষ-ফাগুনের পালা? । 

জিতেনবাবুর সহিত কলিকাতায় আমার ঘনিষ্ঠতা ছিল। তীহার 
বইখানাকে সাহিত্য হিসাবে খুবই উচ্চস্তরের বলিয়৷ আমি মনে করি। 


১*২ বাঙালী জীবনে রমণী 


কিন্ত্ব উহাতে গ্রামের জীবনের যে বর্ণনা আছে, তাহা আমার গায়ে 
আযসিডের জ্বালা ধরাইয়৷ দিয়াছিল। তাই তাহাকে লিখিয়াছিলাম, 
তিনি এরকম “করোসিভঃ বই কি করিয়া লিখিলেন! তিনি ভাবিলেন, 
আমি তাহাকে অসত্যভাষী বলিতেছি, অর্থাৎ সাজানে! কাহিনী লিখিবার 
জন্য দোষী করিতেছি । সেজন্য ক্ষু্ হইয়া উত্তর দ্রিলেন, বইটি গল্প 
হইলেও উহা গ্রাম্য জীবনের সাক্ষাৎ অভিজ্ঞতা হইতে লেখা । এমন 
কি এও বলিলেন যে ইচড়ে-পাকা হওয়াতে বহু জিনিস তাহার নজরে 
আসিয়াছিল। আমি অবশ্য তিনি মিথ্য। বলিয়াছেন তাহা কখনও মনে 
করি নাই, শুধু লিখিয়াছিলাম তীহ।র বর্ণনা অত্যন্ত পীড়াদায়ক। 

গজেনবাবুর বইগুলিতেও পল্লীমাজের উজ্জ্বল চিত্র জাকা হয় নাই। 
উপন্যাসগুলি আমার আগে আমার শ্ত্রী পড়েন। পীড়াদায়ক বোধ 
হওয়াতে তিনি গজেনবাবুকে চিঠি লিখিয়া বর্ণনার সত্যাসত্য জানিতে 
চাহিয়াছিলেন। গজেনবাবুও তাহাকে জানাইয়াছিলেন যে, তাহার 
কাহিনী বাস্তবজীবনের অভিজ্ঞতার উপর প্রতিষ্ঠিত। 

এই দুই লেখক-বন্ধুর সাক্ষ্য আমি উপেক্ষা করিতে পারি না। অন্য 
কেহও আন্তরিক আলাপে গ্রাম্মজীবনের নীচতা ও কলুষতা অস্বীকার 
করেন নাই। তবে যাহা জানিয়াছি এবং শুনিয়াছি তাহা হইতে মনে 
হয়, শহরের অনাচার এক রকম, গ্রামের অনাচার অন্য রকম । গ্রামে 
ছুই একজন ছুষ্টা বোষ্টমী ও নিন্জাতীয়া কুলটা স্ত্রীলোক ছাড়া 
পতিতাঘটিত অনাচার কম ছিল। কিন্তু বিবাহিতা নারী ও বিধবা 
ংক্রাস্ত অনাচারের প্রাবল্য ছিল। 

পুরুষ-নারী সম্পকিত কার্যকলাপের কলুষতার এত প্রমাণ থাকা 
সত্বেও এই কর্মকাণ্ডকে আমি গুরুতর মনে করিতাম না যদি 
'জ্ঞানমার্গে' ইহার বিপরীত কিছু পাইতাম । গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ে প্রথমে 
'সাখ্য' অর্থাৎ জ্ঞানের কথা আছে, পরে “যোগ' বা কর্মের কথা আছে। 
আমি প্রথমে “যোগের কথা বলিলাম, এইবার 'সাংখ্যে'র কথা বলিৰ। 

বাঙালী সমাজে পাশ্চাত্য প্রভাব আসিবার আগে স্ত্রী-পুরুষের 


দেশাচার ১৩৩ 


সম্পর্ক লইয়া যে-সব ধ্যান-ধারণা জনপ্রচলিত ছিল, যে-সব কথাবাত4 
চলিত তাহার মধ্যে কোনও মহত্ব, মাধুর্য, বা সৌন্দর্যের অনুভূতি ছিল 
না। সবটাই যেমন রূঢু, তেমনই অশালীন। পাশ্চাত্য ভাব আসিবার 
পরও যাহারা নৃতন ধারণা গ্রহণ করে নাই, তাহাদের মুখে পুরাতন 
ভাষাই শোনা যাইত, তাহাদের মনে পুরাতন ভাবই আমিত। এই 
অনুবর্তন হইতেই আমি সেকালের হাবভাব ও কথাবার্তার স্বরূপ কি 
ছিল তাহার সাক্ষাৎ পরিচয় পাইয়াছি। 

আলাপের কথাই বিবেচনা করা যাক্‌। প্রথমত, বয়স্ক ভদ্র 
প্রাচীনের! স্ত্রীলোক সম্বন্ধে বা স্ত্ী-পুকষের সম্পর্ক সম্বন্ধে কোন কথা 
বলতেন না, বলা রুটি ও ভদ্রতাবিক্ুদ্ধ বলিয়া মনে করিতেন। এই 
নীরব থাকার কারণ কি? আমার মনে হয়, তাহাদের অভিজ্ঞতায় 
অথবা ধারণায় এই সম্বন্বের যেরুপ তীহারা দেখিতেন তাহ! অভব্য 
ছিল, তাই এ-বিষয়ে কথা বলা তীহার। গহিত মনে করিতেন। 

কিন্তু নারী সম্বন্ধে কথাবার্তার ও আচরণে তাহারা যে মনোভাব 
প্রকাশ করিতেন তাহা একান্তই অবজ্ঞ্াসূচক হইত। শ্ত্রীলোককে "মাগী? 
ঝ স্ত্রীজাতিকে 'মাগী-ছাগী” বলিয়া তুচ্ছ করা একটা প্রচলিত ধারা 
ছিল। বঙ্কিমচন্দ্র পর্যন্ত ব্রজেশ্বরের মুখে এই অবজ্ঞাসুচক উক্তি 
দিয়াছিলেন, “মেয়েমানুষকে পুরুষে ভয় করে এ ত কখনও শুনি নাই। 
মেয়েমানুষ ত পুরুষের বাদী ।» 

তবে ভদ্র যুবকেরাঁও ইয়ারমহলে নিজের পত্বীকে লইয়াও যে- 
ভাবে আলাপ করিত তাহাতে শালীনতার কোনও গন্ধই থাকিত না। 
শুধু স্ত্রীর স্তন-নিতম্বের বৈশিষ্টের বর্ণনাতেই আলাপ আবদ্ধ থাকিত না, 
আরও অনেক গোপনীয় স্থান পর্যন্ত যাইত। কোনদিন নাপিতের ক্ষুরে 
কাটা গাল লইয়া বন্ধুসমাজে যাইবার উপায় ছিল না। তখনই অশ্াল 
ইঙ্গিত আর্ত হইত। কোনও কেরানীর স্ত্রী পিত্রালয় হইতে ফিরিয়া 
আসিবার পরের দিন সহকর্মীরা তাহাকে ঘিরিয়া ধরিত, পূর্বরাত্রে কয়বার 
হইয়াছে এই সংবাদ জানিবার জন্য। মিলিটারী আযাকাউণ্টস্‌ ডিপার্টমেণ্টে 


১5৪ বাঙালী জীবনে রমনী 


কেরানীগিরি করিবার সময়ে এই ধরনের চাঁপা কথা আমার কানে 
পৌছিত। 

ইহার উপর রমিকতা চাগিলে ত কথাই নাই। তখন যেকোনও 
বস্তুর উল্লেখ নরনারীর সঙ্গমের প্রত কাজ 

করিলে 'লেড' ও“স্পেস্ঠ বলিবার উপায় ছিল না, কেরানীগিরি করিলে 

দৌয়াত-কলমের উল্লেখ করিলে সকলে হাসিত। এ-রকম কত বলিব! 

তাহারও উপর আবার অসুয়৷ বা দ্বেষপ্রসূৃত নিন্দা আরন্ত হইলে 
ষোল আনা বত্রিশ আনায় চড়িত। এক উচ্চশিক্ষিত ভদ্র ব্যক্তি একদিন 
আমাকে কলিকাতায় একজন বিশেষ গণ্যমান্য, বিদ্বান ও নেতৃস্থানীয় 
ব্যক্তি সম্বন্ধে বলিলেন, “ও তো মাসস্ভুতো বোনের পেট করেছিল !» 
আমি কথাটা! উড়াইয়া দেওয়াতে বলিলেন, “আমি 'আই-উইটনেস্' এনে 
দেব।” তখন আমি না বলিয়! পারিলাম না, “কেউ যে কারো পেট 
'আই-উইটনেস্ঠ রেখে করে তা তো আমার জানা ছিল না।” তখন 
তিনি আমাকে বলিলেন, যে দাই গর্ভপাত করাইয়াছিল, তাহার সাক্ষ্যের 
কথা তিনি বলিতেছেন । 

আর একজন আমাকে একদিন কলিকাতার আর একজন সন্ত্রান্ত 
ভদ্রলোক সম্বন্ধে বলিলেন, “ও ত ভাইঝির সঙ্গে শোয়।” ইহাঁও আমি 
অবিশ্বাস করাতে আপন্তি অগ্রাহ্থ করিলেন, তবে ভাইঝির সাফাই হিসাবে 
বলিলেন, “ওর স্বামীর অমুক স্থানে গোদ। তা" বলে কি মেয়ে 
খালিপেটে বসে থাকবে ?” 

। ইহাদের পরস্পরের কথামত কলিকাতার প্রত্যেকটি সন্ত্ান্ত ব্যক্তিই 
হয় জারজ, নয় পরন্ত্রীরত, নয় অন্যরকম অপরাধে অপরাধী । এই সমস্ত 
আলাপের পিছনে ছিল স্ত্রীজাতি সম্বন্ধে একটা অবিচ্ছিন্ন কামজ উত্ভতেজন। 
ও কলুষিত চিন্তা ও কল্পনা। ইহাদের পক্ষে এই একভাবে ছাড়া 
স্ত্রীলোক সম্বন্ধে অন্যভাবে ভাবাঁও অসম্ভব ছিল। / 

ইহার পরও আর এক রকমের কুকথার উল্লেখ করিতে হয়। শহরে 
ও পল্লীগ্রামে অনেক সময়েই এমন ধনী বয়ন্ক ব্যক্তি দেখা যাইত 


দেশাচার ১০৫ 
ধাহাদের যৌবনের চরিত্রদোষ প্রৌঢত্ব বা বাক্যের অভ্যাসে দাঁড়াইয়া 
গিয়াছিল। এই শ্রেণীর বাবুর! বিকাল বা সন্ধায় ফুলবাবু সাজিয়া 
বেশ্য/লয়ে বা রক্ষিতার ঘরে গিয়া আলাপ-সালাপ করিয়া আসিতেন। 
ইহাদের আচার-ব্যবহাঁর সকলেই মামুলী বলিয়া মনে করিত। সুতরাং 
ইহাদিগকে ধর্মের ষাঁড়ের মত ধর্মের লোচ্চা বলিতে পারা যাইত। 
ইহাদের এক কাজ ছিল, অল্পবয়স্ক বালকদের ইকন্দ্রিয়পরতন্ত্রতায় 
দীক্ষিত করা। আমার এক বন্ধু আমাকে বলিয়াছিলেন যে, তাহার 
ভ্ঞাতিসম্পর্কে এক কাকা ছিলেন, তিনি তাহার যখন দশ বসর বয়স 
তখন হইতেই তীহাকে বারাঙ্গনাজগতের সংবাদ দিতে আরম্ত করেন। 
একদিন তাহাকে বলেন, “যাবি আজ সন্ধ্যেবেলা আমার সঙ্গে এক 
জায়গায়? বড় জবর মেয়েমানুষ! থরে ঢুকতে হলেই পাঁচ টাকা 


দিতে হয়, আর মাই-এ হাত দিতে দশ টাকা ।” দশ-বারো৷ বতসরের 
বালকের সঙ্গে এই আলাপ । এই ক্রেদ পুরাতন বাঙালী সমাজের 
সবটুকু ব্যাপিয়া ছিল। এইসব লোকের মন গরম জল ও সোড৷ দিয়া 
ধুইয়াও নির্মল করিবার উপায় ছিল না। 
এই পরিচ্ছেদে যাহা লিখিলাম তাহা অনেকে রুচিবিরুদ্ধ ও অশ্লীল 
বলিয়া মনে করিবেন, তাহা জানি। জানিয়াও ইহা ইচ্ছা করিয়াই 
লিখিয়াছি। পুরাতন সমাজ ছুর্নীতিপরায়ণ, এই কথাটা প্রায়ই বলা 
হইয়া থাকে। কিন্তু সে দুর্নীতি কি তাহার স্পৰ্ট কোনও পরিচয় 
দেওয়। হয় না। তাই নুণতন যুগে বাঙালী কোথা হইতে কোথায় 
উঠিয়াছিল তাহার যথাযথ ধারণা হয় না। আমি পুরাতন ধারা ও 
নৃতন ধারার মধ্যে পার্থক্য গভীরভাবে অনুভব করাইতে চাই। এই 
অনুভূতি তীব্রভাবে আনিবার জন্য পুরাতন ও নৃতন ছুই-এরই পরিক্ষার 
বর্ণনা দেওয়। আবশ্াক। এ-বিষয়ে সঙ্কোচ করিলে আমার বক্তব্য 
অসম্পূর্ণ থাকিবে । 
এই অগ্রীতিকর বিষয়ের উপসংহারে বলিব, নারী সম্বন্ধে নূতন ভাব 
আসার আগে বাঙীলী জীবনে নরনারীর সম্পর্কের যে-যুগ ছিল, তাহা! 





১৪৬ বাঙালী জীবনে রমণী 


সেই সম্পর্কের ঘোর অমানিশা। তখন মুখেও সতী-সাবিত্রীর বড়াই 
ছিল না। আর লোককটাক্ষের পিছনে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে যে জিনিসটা 
ছিল উহা! রিরংসা, নির্জল৷ রিরংসা ছাড়া কিছুই নয়। 

এই ঘনান্ধকার রাত্রি বৈদিক মন্্র্রধটার দিবা-নিশা দুই ভগিনীর 
এক ভগিনী নয়, ফ্লোরেন্ের মেদিচি চ্যাপেলে মিকেল এঞ্লেলোর 
'নন্ধে-র রাত্রিও নয়। সেই সব রাত্রি মানুষের মনের অপরিসীম, 
তলহীন প্রশান্তির আশ্র ৷ যে-রাত্রি বাংল দেশে ছিল তাহার রূপ অন্য 
প্রকার--৬৬০11901215 ০০10 তবে আরও ক্লেদাক্ত, আরও পঙ্থিল। 
উহা বেশ্যালয়ের শেষ রাত্রি-যখন অপধিমিত মছ্পানের আবেশে ও 
অবিরত সন্তোগের অবসাদে বিঅরস্তবসন যুবক-যুবতী বমির উপর অজ্ঞান 
হইয়া পড়িয়৷ থাকিত, আর বন্ধুর পরদিন সকালে মেস হইতে আসিয়া 
বন্ধুকে ধুইয়া-মুছিয়া পরিষ্কার করিয়া ফিরাইয়৷ লইয়া যাইতে হইত। 

কিন্কু এই রাত্রির পর সহস। উষার রক্তিম বিভ| আলিয়া পড়িল। 
কোথা হইতে আসিল? সেই ইতিহাসই বলিতে চাই। 


সতী পলিচ্ছ্েদ্‌ 
বাংলার দৃশ্য ও বাঙালীর ভালবাসা 


কোথা হইতে আসিল, কে আনিল, কিভাবে প্রকাশিত হইল, তাহার 
সবই জানা, শুধু বলার অপেক্ষা রাখে । কিন্তু ইহা ইতিহাসের ব্যাপার, 
ইহার বিবরণ তথ্যগত হইবে, আলোচনাও অংশত তত্বগত হইতে 
বাধ্য । শুধু তথ্য, যুক্তি*ও বিশ্লেষণের একটা উষরতা আছে, যথেষ্ট 
কচকচি এ পর্যন্ত হইয়াছে, আরও বিচারের অবতারণ| করিতে চাই 
না। তাহার বদলে নূতন প্রেম যে কি দীড়াইয়াছিল তাহা অনুভব 
করাইতে চাই। হৃদয়ে অনুভূত হইলে বিষয়টার তথ্য সহজে মনে 
থাকিবে, তত্বও সহজবোধ্য হইবে । 

তাহা ছাড়া পুর্ব পরিচ্ছেদের ক্রেদাক্ত মালিন্যও মুছিয়া ফেলা 
দরকার। নূতন জীবনে যাহা দেখা দিয়াছিল তাহ! পুরাতন জীবনের 
আবিলতাকে খধুইয়া নির্যল করিয়া দিয়াছিল। দেশীচারের বিবরণ দিতে 
গিয়া উহার গ্রানি আমি নিজে যেভাবে অনুভব করিয়াছি, পাঠক- 
পাঠিকাও তেমনই করিয়া থাকিবেন। তাই আপাতত খানিকটা 
্টিকন্বচছ ও হিমশীতল বৃষ্টিধারার প্রয়োজন । 

নৃতন ভালবাসা যখন বাঙালী জীবনে পুর্ণবিকশিত হইয়া উঠিল 
তখন দেখা গেল যে, উহা! বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে একেবারে 
মিশিয়া আছে। এই সৌন্দর্যের অনুভূতিও প্রেমের অনুভূতির মতই 
নৃতন ব্যাপার । কিন্তু এই অনুভূতি আসিবার পরও বহু বাঙালী এই 
সৌন্দর্য সম্বন্ধে সচেতন কখনই হয় নাই, অনেক সময়ে অসাড়ই ছিল। 
ঢুইটি দৃষ্টান্ত দিতেছি । 

অনেক দিন আগেকার কথা । বিশ্ববি্যালয় হইতে সবেমাত্র 
বাহির হইয়া জন্মস্থানে যাইতেছি। বিরাট নদীর উপর দিয়া জাহাজ- 
চলিয়াছে। সকালবেলাকার প্রবল বাতাস ঘুরিয়া ফিরিয়া মুখে ও 


১০৮ বাঙালী জীবনে রমণী 


কপালে যেন ছোট ছোট 'চাপড় মারিয়া! যাইতেছে, চুল উড়াইতেছে। 
কান না পাতিয়াও নীচে ইগ্রিন-ঘরের মৃছ্র-গন্তীর দ্রততালের শব্দ 
শুনিতে পাইতেছি। অভ্যাসমত একটা বই হাতে ছিল, কিন্তু পড়াতে মন 
লাগিতেছিল না। তাই চারিদিকের দৃশ্য দেখিবার জন্য উঠিয়া পড়িলাম। 

পাটাতনের উপর পা দিতেই ইপ্রিনের সহিত একতালে সমস্ত 
শরীরটা স্পন্দিত হইতে লাগিল। রেলিং ধরিয়া ঝুঁকিয়া দেখি, জলের 
মধ্যে ইহার চেয়েও অনেক বড় একটা আলোড়ন,_চাকার আঘাতে 
জল ফেনায় আবর্তে তরঙ্গে, উরবেগে পিছনের দিকে ছুটিয়। চলিয়াছে। 
শহর হইতে অনেক দিন পর প্রকৃতির কোলে ফিরিয়া গেলে অনুভূতির 
একটা তীব্রতা আসে, পল্লীদৃশ্ঠের বর্ণ, রূপ, গন্ধ, স্পর্শ যেন তীক্ষধার 
হইয়া চেতনার মধ্যে প্রবেশ করিতে থাকে । আমিও এই অনুভূতির 
মধ্যে এমন ভাবে আত্মসমর্পণ করিয়! দিয়াছিলাম যে, মনের মধ্যে 
চিন্তার জন্য আর এতটুকু মাত্র ফাক ছিল না। 

তবু কিন্তু একটা জিনিস লক্ষ্য না করিয়া পারি নাই। জিনিসটা 
আর কিছু নয়, একটি মানুষ__স"্মুখের বেঞিতে উপবিষ কোট-পরিহিত 
একটি প্রৌঢ় ভদ্রলোক । ইহার মুখে ক্রুরতা, পৈশাচিকতা, দিব্যভাব, 
বা এমন কোনও বিশেষন্ধ ছিল না যাহার জন্য দশজনের মধ্যে তাহার 
প্রতি কাহারও দৃষ্টি আরুষ্ট হইতে পারে। কলিকাতায় ট্রামে চলিবার 
সময়ে এই ধরনের মুখ যাহাতে না দেখিতে হয় সেজন্য চোখ বুজিয়া 
থাকিতাম । এ মুখ একেবারে তাহাদেরশ্যাহারা শহরে ছোট সাংসারিক- 
তায় জীবনের ছোট লাভ-ক্ষতির নিভূ'ল হিসাব করিয়া, খতিয়ানে কোনও 
লোকসান না লিখিয়া নিঃসংশয়ে দীর্ঘজীবন কাটাইয়া যায়। ম্থতরাং যে 
দৃশ্যের ভিতর দিয়া আমরা যাইতেছিলাম তাহার দিকে মুখ ফিরানো৷ দূরে 
থাকুক, তীব্র বাতাস লাগিবার ভয়ে তিনি বিমুখ হইয়াই ছিলেন। 

কিন্তু সর্ব-অসামান্যতা-বজিত বলিয়াই সেই আকাশ বাতাস 
নদীর সহিত মুখখানার অপরিসীম অসামগ্তস্ত অত্যন্ত উগ্র হইয়। 
উঠিয়াছিল। আমি ভদ্রলোকের দিকে একবার, দুইবার, তিনবার 


বাংলার দৃশ্ট ও বাঙালীর ভালবাসা ১০৯ 


চাহিলাম। একটা অনুকম্পামিশ্রিত অবজ্ঞা ভিতর হইতে ঠেলিয়া 
আসিতে লাগিল--এত ক্ষুদ্র, এত সাধারণ ! 

হঠাৎ অবহিত হইয়া দেখিলাম, ভদ্রলোকও আমাকে লক্ষ্য 
করিতেছেন। একটু ইতস্তত করিয়া তিনি জিভ্ভীসা করিলেন, “কোথায় 
যাইবেন?” আমি পরবর্তী স্টেশনের নাম করিলাম। কিছুক্ষণ 
শীরব থাকিয়া আমার ধরন-ধারণ দিয়া আমাকে বিচার করিয়া আবার 
লিজ্ঞীসা করিলেন, “বিএ এম-এ বুঝি? আমি মাথা নড়িয়া 
জানাইলাম, হাঁ । তিনি অতি ধীরম্বরে বলিলেন, “আজকাল বি-এ 
এম-এর কোনও মান নাই ।” 

আমি একেবারে ধুলিসাৎ হইয়া গেলাম। মনে করিতেছিলাম 
যে, বাঙালী বুর্জোয়া! সমাজের উপর খুব চাল মারিতেছি। আমার ভুল 
ভাঙ্িয়া গেল। বুঝিতে পারিলাম, প্রৌঢ় ভদ্রলোকটির জ্বালাহীন, 
ধীর, সাবলীল, ও সহজ লগুড়াঘাতের ভূলনায় আমার অবজ্ঞা 
পিপীলিকা-দংশনও নয়.। এই ধরনের অননুভুতির ক্ষমতাও নমন্থয | 

আর একবার কিশোরগঞ্জ হইতে কলিকাতা আসিতোছিলাম। তারিখ 
১৪ই নবেম্বর, ১৯২৭ সন। পূর্ববঙ্গ যে চিরকালের মত ছাড়িয়া 
আসিতেছি সেদিন তাহা জানিতাম না। তবু ময়মনসিংহ-জগন্নাথগঞ্জ 
লাইনের একটা জায়গ৷ আমার বড় প্রিয় ছিল, সেটা দেখিবার জন্য 
উৎন্থুক ছিলাম | 

সেখানে পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের খাত একেবারে রেল লাইনের ধারে 
আসিয়৷ পড়িয়াছিল। শীতের প্রারস্তে নদী শীর্ণ, কিন্তু পারার মত 
শুভ্র ও প্রবহমাঁণ, তাহার উপর সাদা বালির চড়া খুবই বিস্তৃত। ওপারে 
দুরে গ্রামের সবুজ রেখা শাড়ীর পাড়ের মত। তাহারও উপরে 
ধূুসরায়মাণ নীল আকাশে ধূসরতর গারো! পাহাড়ের ছাপ। 

যাই ট্রেন জায়গাটার কাছে আসিল আমি উঠিয়া গিয়া দরজা ধরিয়া 
ধাড়াইলাম, মুখ বাহির করিয়া । মাইল খানেক জায়গ! পার হইয়া গেলে 
আবার আসিয়া বেঞে বসিলাম। এবারেও একটি প্রৌঢ় ভদ্রলোক 


১১০ বাঙালী জীবনে রমণী 


আমাকে লক্ষ্য করিলেন। তিনি ফিরিয়া আসিলে আমাকে জিঙ্ছাসা 
করিলেন আমি কেন উঠিয়া গিয়াছিলাম। শৌচাগারে যাই নাই, 
স্থতরাং এত টানাপোড়েনের উদ্দেশ্যট! তাহার কাছে প্রতিভাত হয় নাই। 
আমি বলিলাম যে নদীটা দেখিতে গিয়াছিলাম। তিনি শুধু বলিলেন, 
“ওতে দেখবার কি আছে?” আমি একটু বিরক্তির স্থরেই উত্তর 
দিয়াছিলাম, “আপনি উহা বুঝিবেন না।৮ ভদ্রলোক কিন্তু ইহাতে 
অসন্তুষ্ট না হইয়া পরে গ্তীমারে উঠিয়। আমার সঙ্গে যাচিয়া আলাপ 
করিলেন। পরিচয়ে জানিলাম তিনি পুলিসের দারোগা । 

কিন্তু বাংলাদেশের এমন কোনও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আছে কি, যাহা 
মনকে অভিভূত করিবার মত? আমরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ধারণা 
বিলাতের কল্পনায় করিতাম, একমাত্র সেখানকার দৃশ্যকে প্রাকৃতিক 
সৌন্দর্য বলিয়। ধরিতাম, আমারও সেই মনেভাব ছিল। তাই ডি নদী 
ও মল্ভার্ন পাহাড়ের কথা মনে করিয়া যত আনন্দ পাইতাম, দেশের 
কথা মনে করিয়া তত আনন্দ পাইতাম না__অন্তত মনকে বলিতাম না 
যে আনন্দ পাইতেছি। এই মনোবৃদ্তির বশীভূত হইয়া “1397215১ 20৫ 
[312,65০ 19০97016 1)০9০10১% 40) 13716772110210155 212 5৮110 
2১10৫192154 
15 1701 17017,” এই সব উচ্ছাসের সহিত আবৃত্তি করিতাম। তখন 
আমি ক্লাস এইট-এ পড়ি এবং বেলেঘাটা-বালিগঞ্জ লাইনে ডেইলি 
প্যাসেপ্রারি করি। পাঠ্য বইটা খুলিয়া শেষোক্ত কবিতাটি দেখিয়৷ 
থাকিতে পারিতাম না, উচ্চৈঃম্বরে পড়িয়া উঠিলাম। সামনে একটি 
ভদ্রলোক বসিয়াছিলেন, তিনি বিরক্ত হইয়া একেবারে টেঁচাইয়া উঠিলেন, 
“য্যা, ফ্যা, অহ চাড় দেখাতে হবে না! ছেলে বাচলে হয় 1» 

বিদেশের সৌন্দর্য সম্বন্ধে এই মনোবৃদ্তির বশেই ভারতবর্ষের 
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা ভাবিলেও আমরা স্থদুর কাশ্মীর, হিমালয়, 
পুরী বা ওয়ালটেয়ারের সমুদ্রতীরের কথা স্মরণ করিতাম। বাংলাদেশের 
কথা মনেই পড়িত না। 


1১1% 1)02110 15 10 0106 11151)12005, 109 19626 


ব|ংলার দৃশ্ঠ ও বাঙালীর ভালবাস! ১১১ 


তবু আমার মনের গভীরতম তলে বাংলাদেশ সম্বন্ধে একটা তাত্র 
অনুভূতি ছিল। বিরাট নদী, ঢেউখেলানো ধানের ক্ষেত, দিক্চক্রবাল 
পর্যন্ত বিস্তৃত মাঠ দেখিলে মনে কোন ভাব বা ধারণ! আসিত না, শুধু 
শরীর-মন দিয়া উহার সঙ্গে মিশিরা যাইতাম। কিন্তু এই দৈহিক অর্থাৎ 
ইন্ড্রিয়গত অনুভূতির পিছনে কোন বিচার ছিল না। তাই আমার 
এই তন্ময়তাকে কখনও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অনুভূতি বলি নাই--অবশ্য 
অল্পবয়সে। 

বড় হইয়া নিজেকে জিজ্ঞাসা করিতে আরন্ত করিলাম, সত্যই কি 
বাংলাদেশের কোন নৈসগিক সৌন্দর্ব আছে? একদিন বিকালে 
বেড়াইবার সময়ে কিশে।রগঞ্জ শহর হইতে রেল লাইন ধরিয়া মাইল 
কয়েক উদ্ভব দিকে যাইবার পর একট। জলে ডেবা ধানক্ষেতের ওধারে 
একটি বাস্তভিটা দেখিতে পাইলাম । মাঝখানে একটা পুকুর । তাহার 
উ“চু পাড়ের উপর ছয়-সাতটা আটচালা। উত্টািকে বাঁশের ঝাড়। 
স্থির নিস্তরঙ্গ জলে আটচালার স্পষ্ট ছায়ার সম্মুখে নীল আকাশ ও 
সন্ধ্যার রক্তিম মেঘের প্রতিবিম্ব পড়িরাছে। সমস্তটা কন্্টেবলের 
ছবির মত। তখনই বুঝিলাম, বাংলাদেশেরও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আছে । 
উহার দিকেও মুখ ফিরাইয়া মুগ্ধনেত্রে চাহিয়া থাকিতে হইবে । এই 
নৃতন দৃষ্টি ফিল্ম-স্টারের রূপ হইতে চোখ ফিরাইয়া ঘরের মেয়ের রূপ 
দেখিবার মত। 

কিন্তু বাংলার মুখখ্রী শুধু গৃহস্থঘরের বাঙালী মেয়ের মুখশ্রীর মতই 
নয়, ইহাতে বিশালত্ব, গরিমা ও মহিমা আছে। সে বিশালব্ব, গরিমা, 
ও মহিমা বাংলার জলরাশির। তাহার কত রূপ! এই জলরাশির 
সহিত ক্ষেতের সবুজ, আকাশের নীল, বনের শ্মামলতা মিলিয়া বাংলার 
শ্রী গঠিত হইয়াছে । 

এই শ্রী, বিশেষ করিয়া জলের বিচিত্র রূপ, চল্লিশ বত্সর দেখি নাই, 
আর যে দেখিব তাহারও আশ! নাই। বাঙালী বুদ্ধির দোষে, মন্ধ 
উত্ভতেজন্/র বশে, ভয়াবহ দ্বেষের তাড়নায় বাংলাকে ভাগ করিয়াছে । 


১১২ বাঙালী জীবনে রমণী 


সেদিন হইতে যে মানসিক ও বৈষয়িক যন্ত্রণা আরন্ত হইয়াছে, উহার 
অবসান হয় নাই, কখনও হইবে না। আমি বৈষয়িক 'সর্বনাশকে গুরুতর 
বলিয়া মনেই করিতাম না, যদি তাহার মুলে মানসিক বিকলতা না 
থাকিত। অথচ বঙ্গবিভাগের অন্য সব দিক লইয়াই হাহাকার ও 
ঝগড়ার বিরাম নাই। শুধু একটিও কথা শোনা যায় না সব চেয়ে বড় 
ক্ষতি সন্বন্ধে। বাঙালী তাহার প্রাকৃতিক এশ্বর্য হারাইয়াছে। ইহার 
ডুলনায় অন্য অভাব কিছুই নয়। সম্পত্তি গেলেও প্রাণ থাকিলে 
আবার সব ফিরাইয়৷ আনা যায় । প্রাণ গেলে দীনতা হইতে ত্রাণ নাই। 

নদী, জল, উন্মুক্ত উদার নীল আকাশ, কাজলকালো বা মরালশুতভ্ 
মেঘ, দিগন্ত প্রসারিত ক্ষেত, ও ঘনশ্যাম বনানী বাডালীজীবনে প্রাণের 
অবলম্বন। ইহাদের ছাড়িয়া জীবন্ত বাঙালী কল্পনা করা যায় না। 
বাডালী যে আজ এই প্রাকৃতিক সম্পদ, বিশেষ করিয়৷ জলের কথা 
স্মরণও করে না তাহা দেখিয়াই আমি বুঝিতে পারি, তাহাদেরকে কেন 
আমার কাছে চলন্ত মমীর মত মনে হয়। আমি যে সন্তর বসর 
বয়সেও সজীব আছি, তাহার ও কারণ এই, আমি বাংলার জলরাশিকে 
ভুলি নাই। বারে৷ বৎসর বয়সে দেশ ছাড়িয়া আসিয়াছিলাম, কিন্তু 
সারাজীবনেও আমি আর কোথাও আমার দেহমনের জন্য ঘর খুজিয়া 
পাইলাম না। প্রবাসে--তা সে দিল্লীতেই হউক বা কলিকাতাতেই 
হউক--পুর্ববঙ্গের গ্রাম্য বালকই আছি, আর কিছু হইতে পারিলাম না। 

সেজন্য যখনই জলের দেখা পাই চাহিয়! থাকি, ও বাংলার জলের 
কথা মনে করি। প্রায় রোজই দিল্লীতে যমুনার ধারে যাই। দিল্লীতে 
যমুনা কলিকাতার ভাগীরথীর মত শহরের কারাগারে আবদ্ধ নয়। 
যমুনার ধারে গেলে ভারতবর্ষের রাজধানী উহার পারে, তাহার কোনও 
লক্ষণ দেখা যায় না । উহা এখনও উদ্দাম, এখনও বন্য, এখনও গ্রাম্য । 

কিন্তু উহা কালিন্দী নয়, উহা! উপ্তরাপথের নদী, ব্রহ্মষি দেশের 
শুদ্ধতার মধ্যে একটু নীরের সরসত৷ বজায় রাখিয়াছে। তাই প্রতিদিন 
ভোরবেলা এই অঞ্চলের নরনারীকে স্নান করিবার জন্য 'যমুনাজী'র পারে, 


বাংলার দৃশ্য ও বাঙালীর ভালবাসা ১১৩ 


ভ্রুতপদে যাইতে দেখি । “যমুনাজী”কে এখনও ফুল বা ফুলের মালা অর্থ্য 
দিতে হয়, সেজন্য পথে পথে ফুলের পসারীরা বসিয়া থাকে । 

শুধু বর্ষায় বন্যা আসিলে যখন অক্ষম দিল্লী “নগর-নিগমে'র তুচ্ছ 
চেঁচামেচি শুনিতে পাই, ভারত গভর্ণমেন্টের ইঞ্লিনিয়ার-বাহিনীর উপর 
টান পড়ে, দিল্লীর পার্ক ও রাস্তা গ্রামের গরু-মহিষে ভরিয়৷ যায়, তখন 
যমুনার যে রূপ দেখি তাহাতে আমার বাল্যকালে দ্রেখা পূর্ববঙ্গের 
ন্দীতীরের কথা মনে পড়ে । একবার ভোরে বেড়াইতে গিয়৷ দেখিলাম, 
যমুনার ঢেউ পারের বালির উপর আছড়াইয়া পড়িতেছে, ওপারে 
শ্বেতশীর্ষ কাশ । তখন ১৯০৭ সনে ভৈরববাজারের কাছে মেঘনার 
যে মুত্তি দেখিয়াছিলাম, তাহার কথা মনে হইল। সঙ্গে সঙ্গে যেন 
শিউলির গন্ধ পাইলাম । 

তেমনই ইংলগ্ডের নদী দেখিয়াও দেশের নদীর কথ! মনে হইয়াছে । 
কিন্ত সেসব নদী আমাদের নদী হইতে এত বিভিন্ন যে, তাহার সৌন্দর্য 
এবং সৌন্দর্যানুভূতি অন্যরকমের। লগুনের বাহিরে টেম্সই হউক, 
আইসিস, কেম, বা এভনই হউক, সে-সব নদী দেশের দিকে মন 
ফিরাইলেও ঠিক দেশের স্মৃতি ফিরাইয়া আনিতে পারে নাই। 

কিন্তু স্থদূর আর এক দেশে জলের ধারে বসিয়া দেশের মত দৃশ্য 
দেখিয়াছিলাম । কোনেো৷ কোনো দিকে দৃশ্য অবশ্য সম্পূর্ণ অন্য রকমের, তবু 
বাংলার জল ও সেই জলের মধ্যে একটা একাত্মতা ছিল । সে কোথায় ?-_ 
জিওাসা করিতেছেন ? ইআয়েলে, সী-অফ-গ্যালিলির পারে । একটি 
রাত্রি বাইবেলে বণিত গেনেসারেটের সমতলভূমির প্রান্তে সী-অফ- 
গালিলির একেবারে ধারে কাটাইয়াছিলাম। সে দৃশ্য ভুলিব না। 

সী-অফ-গ্যালিলি একটা হুদ- মাইল পনেরে৷ লম্বা ও মাইল পাঁচেক 
চওড়া । সুতরাং মেঘনা বা পদ্মার একটা অংশের মত। ওপারে সিরিয়ার 
সবুজ পাহাড়, এপারেও পিছনে পাহাড় । হোটেলের জানালার ভিতর 
দিয় হ্রদের নীল জল দেখিতে পাইতেছিলাম। একদিকে আসল হুদ 
ও হোটেলের মধ্যে একটা বিলের মত জায়গা ; উহা! হুদ হইতে নল- 


৮ 


১১৪ বাঙালী জীবনে রমনী 


খাগড়ার সারি দিয়া স্বতন্ত্র করা। আগের দিনের সন্ধ্যায় বীচিতঙ্গ 
হইলেও হুদটার চেহারাতে মাধুর্য ভিন্ন কিছু ছিল না। তাই আমি 
ইল্সায়েলি বন্ধুকে জিজ্ঞাস! করিলাম, “ধীশু যে ঝড়কে শান্ত করিয়াছিলেন, 
তাহা কি এই হ্দে সম্ভব?” তিনি উত্তর দিলেন, “হা, মিস্টার চৌধুরী, 
কখনও কখনও এই হ্দও অত্যন্ত বিক্ষুব্ধ হইয়। উঠিতে পারে ।” 

পরধিন ভোরে জাগিয়। একট! জলের গর্জন শুনিতে পাইলাম, 
পুরীতে সমুদ্রের গঞ্জনৈর মত। বাহির হইয়! দেখি, হুদ হইতে ঢেউ ও 
ফেনিল জল নলখাগড়ার সারিকে আন্দোলিত করিয়া ভিতরে ছুটিয়া 
আসিতেছে । দূরে সী-অফ-গ্যালিলি বাত্যা-বিক্ষুব, টেউএর চুড়ায় 
চূড়ায় সাদা ফেনা। উচ্চঢুড় ইউকালিপ্টাস গাছগুলির মাথার দিকে 
চাহিয়। দেখিলাম, বাতাসের চিহ্নও নাই, উহারা নিশ্চল নিষম্প। 
ছুটিয়া ইউকালিপ্টাস বন পার হইয়া একেবারে হুদের ধারে পাথরের 
উপর গিয়া দ্রাড়াইলাম । সেখানে জল গর্জন করিয়া আছড়াইতেছে, 
তবু গাছে গাছে আন্দোলন নাই । পরে জানিয়াছিলাম, জেরুজালেমে 
প্রবল ঝড় বহিতেছিল, সে-ঝড় জর্ডান নদীর অতি-নিন্ন উপত্যকা 
বাহিয়া উত্তর দিকে আসিতেছিল। সেই ঝড়ই বেল! নয়টা নাগাদ 
যখন কাপেরনম্নএ গেলাম তখন একেবারে প্রচণ্ড হইয়া দাড়াইল। 
চাহিয়া দেখি, সী-অফ.-গ্যালিলির নীল জল কালো হইয়া গিয়াছে-_ 
ঝটিকাবিক্ষু্ধ মেঘনার কথা স্মরণ হইল। 

এই সব স্মৃতিই এখন আমার পূর্ববঙ্গের সৌন্দর্যের অনুভূতি 
ফিরাইয়া আনিবার একমাত্র উপায়। চোখ বুজিলেই সেই দৃশ্য 


ভাসিয়া উঠে। 
প্রথমে বড় নদীর কথাই বলি। আমি ব্রহ্মপুত্র, পল্পা, মেঘনা, 


এই তিনটি নদীতেই বন্বার গ্ীমারে বা নৌকায় যাতায়াত করিয়াছি। 
শ্রম, বর্ষা, শর, হেমন্ত, শীত, বসন্ত সকল খডুতেই দেখিয়াছি । 
ইহাদের বর্ষব্যাগী রূপ আবার খুবই পরিচিত। শুধু পল্মার কথাই 
বলিব। 


বাংলার দৃশ্ঠ ও বাঙালীর ভালবাস৷ ১১৫ 


বর্ষায় উহা উন্মাদিনী দুতি ধরে । মনে হয় যেন যোগিনী-বেশধারিণী 
পার্বতী সাগর-মাতার কাছে ছুটিয়৷ চলিয়াছেন। তীব্র শ্রোত চাক্ষুষ 
করিয়া, ফুলিয়া ফুলিয়া গ্টীমারকে পিছনে ফেলিয়া নদী চলিয়াছে-_ 
তাহার রং উজ্জ্বল গৈরিক, কখনও বা হেমন্তের নূতন খড়ের মত, জলের 
বিস্তার ফেনায় আবর্তে উচ্ছসিত। 

আবার শীতকালেও উহাকে দেখিয়াছি-_তখন নদীর খাত আয়তনে 
বিস্তৃতই থাকে, এক পার হইতে আর এক পারে গ্রামের সার সঙ্কীর্ণ 
কালো পাড়ের মতই দেখা যায়, কিন্তু এবহম।ণ জলের খাত চড়ায় 
চড়ায় বিচ্ছিন্ন হইয়! বিসপিত হইয়া যায় । দেখিলে মনে হয়, যেন নিশ্চল 
সাদা বালি ও প্রবহমাণ কলখৌতের মত নদীর আোত সখীর মত 
মিলিতেছে। এই দৃশ্যে একটা উদাস ও করুণ নিবে থাকে; তেমনই 
আবার একটা উদার, বিক্ষোভবিহীন, অপার শীন্তিও থাকে। 

একটা দিনের কথ। বলব । তখন এপ্রিল মাস, ১৯১৩ সনের 
এপ্রিল মাস। 'কণ্তর-জাহাজে গোয়ালন্দ হইতে নায়ায়ণগঞ্জ যাইতেছি। 
(“কণডরঁ ১৯৩০ সনে কালবৈশাখীতে ব্র্মপুত্রে ডূবিয়া গিয়াছিল।) 
সেদিন পদ্মা ও পল্মার চরের যে মৃতি দেখিয়াছিলাম, তাহ! জীবনে আর 
কখনও দেখি নাই। 

জাহাজে যাত্রী বিশেষ ছিল না, ডেক ফাঁকা ছিল, তাই এপাশ- 
ওপাশ করিয়া চারিদিকের দৃশ্য দেখিতে কোনও অন্থুবিধা হয় নাই। 
তবুও আরও ভাল করিয়া দেখিবার জন্য দোতলার ডেক হইতে 
সারেং-এর ব্রীজে উঠিয়। গেলাম । যাহা দেখিলাম ভুলি নাই। দিনের 
আলো প্রথর হয় নাই, বাংলার বড় নদীর উপরে রৌদ্র কখনই প্রখর 
মনে হয় না, উহাতে শুধু একটা উজ্জ্বলতা আসে। সেই আলোতে 
চরের বালি একেবারে উন্তাসিত হইয়া উঠিয়াছিল। কেন জানি না, 
সমস্ত বালি সেবার সোনালী রূং-এর ছিল, সাদা নয়। পদ্মাকে সেদিন 
শোণের মত হিরণ্যবান্থু বল! যাইত, বিশালতর হিরণ্যবাহু। দিগন্ত- 
প্রসারিত সোনার বালু যেন জ্বলিতেছিল। টার্নারের চিত্রের কথা 


১১৬ বাঙালী জীবনে রমণী 


সবেমাত্র পড়িয়াছিলাম, বইটা নীচের ডেকের উপর পড়িরাছিল। মনে 
হইল টার্নারের ছবিই দেখিতেছি। অবশ্য তখনও টার্নারের মূল 
ছবি দেখি নাই, শুধু উহার একটা ধারণা কল্পনায় ছিল। 

তারপাশা বা লৌহজঙ্গ স্টেশনের অল্প পুব হইতে পদ্মা ও মেঘনার 
সঙ্গম পর্যন্ত একটা বনুবিস্তৃত চড়া ছিল। বহরের খাড়ি বর্বাকাল ভিন্ন 
চলে না, সেইজন্য জাহাজ সেই চড়ার দক্ষিণ দিক দিয়! টাদপুরের দিকে 
যাইতেছিল। কতক্ষণ পরে দেখিলাম দূরে পল্মা"মেঘনার সঙ্গম প্রয়াগে 
গঙ্গা-যমুনা৷ সঙ্গমের মত দেখা যাইতেছে । ছুই-এর ভেদরেখা সুক্ষ, 
একদিকে পিঙ্গল জল, আর একদিকে গভীর কালো জল । রেখাটা 
মাইলের পর মাইল জুড়িয়া স্পষ্ট। 

স্থখানী চাকা ধরিয়া নীরবে দ্রাড়াইয়াছিল, মাঝে মাঝে শুধু 
চাকাটাকে এক-আধটু ঘুরাইতেছিল। সঙ্গম-রেখার উপর পৌছিবামাত্র 
তাহার হাতে হালের চাকা চরকির মত ঘুরিতে লাগিল; দেখিলাম, 
' বিশ্যাকূলে কম্পাস থুরিতেছে, হালের চাকার স্তুস্তের উপরের কাটা 
প্রায় চবিবশ পয়েন্ট ঘুরিয়া গিয়াছে । জাহাজ দক্ষিণ-পূর্বদিকে 
চলিতেছিল, ঘুরিয়া একেবার উদ্ভরমুখী হইয়া চাকার আবততনে গর্জন 
ও আলোড়ন তুলিয়া পল্মার বুক হইতে হইয়া মেঘনার বুকে আসিল। 
অল্পক্ষণ পরে রাজাবাড়িতে কেদার রায়ের মাতার চিতার উপরের মঠ 
ঝ1 দিকে রাখিয়া ধকৃধক্‌ করিয়া নারায়ণগঞ্জের দিকে চলিল। 

আমি অতি শৈশব হইতে জাহাজে চড়িয়াছি। ইহার ফলে 
বরাবরই মনে হইয়াছে, বাংলার পল্লীজীবনে গ্তীমারের আনাগোনা একটা 
বড় রোমান্স । একবার বাল্যকালে নিজেদের দেবোত্তর সম্পত্তির কালী 
ও কাছারী বাড়ী হইতে হাটিয়া গ্রামে যাইতেছিলাম। মাইল বারো 
পথ ও শেষ রাত্রি। একটা মাঠের ধারে আসিয়া দড়াইতেই পূর্বদিগন্তে 
- সেখানে তখন ভোরের অস্ফুট আলোও ফুটে নাই-_-একটা উজ্জ্বল 
বিভা দেখা গেল, সেটা আবার সচল । এটা কি জিজ্ঞাসা করাতে সঙ্গে 
যে মুসলমানটি ট্রাস্ক বহিয়া ও রক্ষী হিসাবে যাইতেছিল সে বলিল উহা! 


বাংলার দৃশ্য ও বাঙালীর ভালবাসা ১১৭ 


জাহাজের আলো৷। বুঝিলাম, মেঘনার উপর দিয়! সার্চলাইট ঘুরাইয়া 
জাহাজ যাইতেছে । কিন্তু সে কতদুরে, অন্ততঃ বিশ মাইল ! 

আবার মাঙুলালয়ে গেলে রাত্রিতে হঠাৎ জাগিয়া গ্রীমারের ভে। 
শুনিতে পাইতাম । মনে হইত তিন মাইল দূর হইতে মেঘন৷ 
ডাকিতেছে। কিন্তু সে কি ভীষণ গন্তীর ডাক। মোটেই বিলাতী 
স্বোতশ্বিনীর সমুদ্রে যাইবার জন্য কুলকুল করিয়া নিমন্ত্রণ নয়। এ 
অন্য বাপার--বরিশাল-গানস্*এর কথা শুনিয়াছিলাম। সাগরের 
অতলতলে যে গুহ। আছে, তাহাতে জল আছড়াইয়! পড়িবার সময়ে 
বোধ করি প্রমূ প্রম্‌ করিয়া ঘোর গর্জন হয়, সেই গর্ভনের সহিত স্তর 
মিলাইয়। থেন মেঘনা স্রামারের ভোর স্বরে কোন চির-অন্ধকারময় 
পাতালে বন্দী হইবার জঙ্য ডাকিতেছে। শুনিয়া ভয় হইত বলাই 
বাল্য । 

কিন্তু গ্রীমারে চড়িলে মনের অবস্থা সম্পূর্ণ বদল হইয়া যাইত। 
মনে হইত লোকালয়েই আছি। ইহার কারণ ছিল-_স্রীমার একটি 
ছোট ভবের হাট । একটা জনসমাজ উহাতে থাকিত; কেহ কাহারও 
চেনা, অন্যেরা অপরিচিত, তবু শুধু মানুষ বলিয়াই আপন। তাই 
স্ীমারের উপর হইতে তীরকে, এমন কি স্টেশনকেও অজানা পরলোক 
বলিয়া মনে হইত, বুঝিতে পারিতাম না কেন লোক সেখান হইতে 
হ্রমারে আসিতেছে, কেনই বা গ্রীমার হইতে নামিয়া সেখানে 
যাইতেছে । যাহারা নামিত উঠিত, তাহাদের কাছে নিজেদের ঘর- 
বাড়ী অত্যন্ত স্পষ্ট, অত্যন্ত সত্য ; তাহার! জানিত সেখানে ম৷ আছে, 
স্ত্রী আছে, পুুত্র-কন্যা, ভাইবোন সকলেই আছে। কিন্তু অন্য লোকের 
তাহা মনে হইত না। তাহারা ভাবিত পরিচিত শ্টীমারের ইহলোক 
হইতে উদ্দাস চড়াতে নামিয়া লোকগুলি যেন কোন অপরিচিত 
ছায়াময় লোকে উধাও হইয়! যাইতেছে । দু-চারটা যে পালকি, ডুলি, 
এমন কি ছ্যাকরা গাড়ি থাকিত সেগুলিকেও পরলোকের রথ বলিয়াই 
মনে হইত। গ্ত্রীমার ছাড়িবার পর, বে যাত্রীরা নামিয়া গিয়াছে 


১১৮ বাঙালী জীবনে রমণী, 


তাহাদের একে একে অদৃশ্য হইয়া যাইতে দেখিয়। মনে যে নির্বেদ 
আসিত, তাহা আমি আরও তীব্রভাবে বাহরেইন-এ একটি 
এরোপ্লেনকে যাত্রী লইয়া ধুসর মরুবালু হইতে উঠিয়া ধুসরতর 
আকাশে বিলীন হইয়া যাইতে দেখিয়া অনুভব করিয়া ছিলাম । 
কিন্তু জাহাজ যতক্ষণ সিঁড়ি ফেলিয়া ঘাটে বাধা থাকিত ততক্ষণ 
আবার একটা অত্যন্ত সামাজিক ব্যাপার মনে হইত। রবীন্দ্রনাথ 
গ্টীমারঘাট সম্বন্ধে শিশুদের জন্য অতি সুন্দর একটি কবিতা লিখিয়া- 
ছিলেন, উহা বয়স্কেরও ভাল লাগিবে। খানিকটা উদ্ধত করিতেছি-_ 
রত ০৩ উকডতব তত ঘন ঘন ডাক ছাড়ে 
স্টারের বাশী; কে পড়ে কাহার ঘাড়ে, 
সবাই সবার আগে যেতে চায় চলে” 
ঠেলাঠেদি বকাবকি । শিশু মার কোলে 
চীতৎ্কার-ন্বরে কীদে। গড গড় ক'রে 
নোঙর ডুবিল জলে) শিকলের ডোরে 
জাহাঁজ পড়িল বাধা ) (সিঁড়ি গেল নেমে, 
এঞ্জিনের ধকধকি সব গেল থেমে |” 
এর পর যাত্রীদের ডাঙাঁয় নামার পালা ।__ 
“কুলি, কুলি ডাক পাড়ে, ডাঁঙা হতে মুটে 
ছুড়দাড় ক'রে এল দ্বলে দলে ছুটে। 
তীরে বাজ ইয়] হাড়ি গাহিছে ভজন 
অন্ধ বেণী ।” 
যাত্রীরা যে যার পথে চলিয়া গেল, তার পর-_ 
“শৃন্ঠ হয়ে গেল তীর । আকাশের কোণে 
পঞ্চমীর টা ওঠে । দূরে বাশবনে 
শেয়!ল উঠিল ডেকে । মুদির দোকানে 
টিম্‌ টিম্‌ ক'রে দীপ জলে একখানে ।” 
ইহার পর বাংলার জলের অন্য রূপের কথা বলিতে হয়। 
তাহারও বিচিত্রতা কম নয়। মাঝারি নদীর চেহার! প্রায় বড় নদীরই 


বাংলার দৃশ্ঠ ও বাঙালীর ভালবাসা ১১৯ 


মত, শুধু স্বল্পপরিসর । আমি উহাদের দেখিলে, 'জাতসাপের বাচ্চা! 
এই কথাটার অনুকরণে, “জাতনদীর বাচ্চা” বলিতাম। কিন্তু ছোট 
নদীর মুতি ও প্রকৃতি একেবারে অন্য রকমের ছিল। সেগুলির এত 
জল বা শ্োত কখনই হইত না যে পার কাটিয়া সোজা পথে যাইতে 
পারে। তাই সেগুলি বনবাদাড়ের মাঝখান দিয়া ঘুরিয়া ফিরিয়া 
বাকের পর বাঁকে চলিত। ছুই ধাকের মধ্যে সোজা! খাত দেখা 
যাইত যেন জলের ফিতা, কিন্তু এই অংশটুকুর দৈর্্য বেশী হইত না; 
পাঁনকৌড়ি এক ডুবে উহার এক প্রান্ত হইতে আর এক প্রান্ত পর্যন্ত 
যাইতে পারিত। প্রায়ই দেখিতাম, পানকৌড়ি টুপ, করিয়া ডুব দিয়া 
জলের উপরে লাঙ্গলের রেখার মত দাগ জুলিয়া দূরে গিয়া আবার 
উঠিতেছে। কাছে না যাওয়া পর্যন্ত মনে হইত নদী বাঁকের কাছে 
শেষ হইয়৷ গিয়াছে__তাহার পর শুধু জঙ্গল। এইসব বাকের জন্য, 
কোনও জায়গায় পৌছিতে আরও কতদূর যাইতে হইবে জিজ্ঞাসা 
করিলেই মাঝিরা বলিত, “চার বা ছয় বাঁক, বাবু।” 

এই সব নদীতে জল এত বেশী হইত না৷ যে দাড় বাওয়ার প্রয়োজন 
হয়। তাই দ্রত চলিবার জন্য এক বা ছুই লগি ব্যবহৃত হইত। 
আমরাও কখনও কখনও মাঝির হাত হইতে লগি লইয়া তাহাদের 
কাজের বিদ্ব করিতাম। তবে একটু হছুঁকা টানিয়া লইবার অবকাশ 
পাইত বলিয়া তাহারা বেশী আপত্তি করিত না। যে মাঝি হাল 
ধরিত তাহার অবশ্য খুবই উৎপাত হইত। সে হাসিয়া মাঝে মাঝে 
হালে এমন টান দিত যে, নৌকার মুখ হঠাৎ ঘুরিয়া আমাদের পড়িয়া 
যাইবার মত হইত। আবার হঠাৎ দেখিতাম উ“চু পাড়ের জঙ্গল হইতে 
কি যেন ঝুপ করিয়া পড়িয়া মাতার দিয়া নদী পার হইতেছে। লক্ষ্য 
করিয়৷ দেখিতাম, উহা স্তুবর্ণ গোধিকা। 

এই সব নদী খোলা জায়গায় পড়িলে দেখিতাম, ক্ষেত ডুবিয়। ছুই 
ধারে বিলের মত হইয়া গিয়াছে । নদীর জলে ও এই সব জায়গার 
জলে বেশ পার্থক্য থাকিত। নদীর জল বহমান, চঞ্চল, কম্পিত, উহা 


১২০ বাঙালী জীবনে রমণী 


রোদে ও আলোতে এত চিকৃমিক্‌ করিত যে, জলের নীচে কিছুই দেখিতে 
পাইতাম না। কিন্ত্রু ডোবা! মাঠের জল স্বচ্ছ ও নির্মল হইত। তাহার 
ভিতর দিয় নীচে রাশি রাশি লতার মত ঝিরঝিরে পাতার উত্ভিজ্ঞ 
দেখিতাম। উপরে কোথাও কোথাও সারাটা জায়গা জুড়িয়৷ থাকিত 
অগণিত শালুকের পাতা, সাদা ও লাল ফুল। উহার মৃণাল ছিড়িয়া 
টানিয়া সুলিতাম। অন্য জায়গা দেখিলে মনে হইত, একখানা বিরাট 
কাচের শাসি বা আরশী। 
ইহার পরও বড় বিল বা হাওর ছিল। আমাদের কাছে এগুলিকে 
সমুদ্রের মত মনে হইত। ময়মনসিংহ জেলার “হাওরে গিয়াছি, কিন্তু 
শ্রীহট্ট জেলায় যাই নাই। শুনিয়াছি সেখানকার "হাওর পার হইতে 
দিনমান লাগিত, জোর হাওয়া থাকিলেও। 
ংলার সৌন্দর্যের চরম রূপ যাতে দেখা গিয়াছে, বাঙালীর 
জীবনে প্রাণরস যেখান হইতে আসিয়াছে, সেই জলরাশিকে বাদ দিয়! 
নূতন ভালবাসা বাঁচিতে পারিত না । বাংলার পুরাতন গীরিতিও জলকে 
বাদ দেয় নাই। দুইটি মাত্র দৃষ্টান্ত দ্রিব। প্রথমটি জ্ঞানদাস হইতে_ 
“রজনী শাঙন ঘন, ঘন দেয়া গরজন 
ঝন্বন-শবদে বরিষে । 
পাঁলস্কে শয়নে-রঙ্ষে বিগলিত-চীর-অঙ্গে 
নিন্দ যাই মনের হরিষে ॥” 
দ্বিতীয়টি ভারতচন্দ্র হইতে, বিষ্ভাস্ুন্দরকে বলিতেছে,_- 


"ভাদ্রমাসে দেখিবে জলের পরিপাঁটি। 
কোঁশা চড়ি বেড়াবে উজান আর ভাটি ॥ 
ঝরঝরি জলের বায়ুর খরখরি। 
শুনিব দুজনে শুয়ে গলাগলি করি ॥” 
বিষ্ভাপতির “ই ভর ভাদর, মাহ ভাদর, শূন্য মন্দির কী ত 


সকলেরই জানা । 
ইহাদের সকলের পরে শাবি হই হন যাওনী বি বাজার 


বাংলার দৃশ্য ও বাঙালীর ভালবাসা ১২১ 


জলের কথা ভুলিয়। যাইবে, তাহা! কিছুতেই সম্ভব ছিল না। তাই প্রথম 
হইতেই দেখিতে পাই, আবির্ভাবের পর হইতেই বাংলার নৃতন ভালবাসা 
বাংলার সনাতন জলের সঙ্গে মিশিয়া আছে । কয়েকটি দৃষ্টান্ত দিব । 
'ইন্দিরা+ 'রজনী”, ও “দেবীচৌধুরাণী” বঙ্কিমচন্দ্রের এই তিনটি 
উপন্যাসই উচ্ছলিত প্রেমের গল্প । তিনটিই বাংলার জলের সহিত 
অঙ্গাঙ্গীভূত । ইন্দির! বলিতেছে, 
“আমি গঙ্গা কখনও দেখি নাই। এখন গঙ্গা দেখিয়া আহল।দে প্রাণ 
ভরিয়া গেল। নামার এত ছুঃখ, মুহূর্ত-জন্টে সব ভুলিলাম। গঙ্গার 
প্রশস্ত হাদয়! তাহাতে ছেটি ছোট ঢেউ--ছোটি ঢেউর উপর রৌদ্রের 
চিকিমিকি_-ধত দূর চক্ষু যায়, তত দূর জল জ্বলিতে জলিতে ছুটিয়ছে।” 
নৌকা গ্রামের ঘাটে বাধা ছিল। ে-সময়ে ইন্দিরা ছুইটি 
মেয়েকে গান গাহিতে শুনিয়া ছিল, 
“মেয়ে দুইটির বয়স সাত আট বত্সর| দেখিতে বেশ, তবে পরম জুন্দরীও 
নয়। কিন্ত সাজিয়াছিল ভাল। কানে দুল, হাতে আর গলায় একখানা 
গহনা। ফুল দিয় খোঁপ] বেড়িয়াছে। রঙ করা শিউলি-ফুলে ছোবানো, 
দুইথানি কালোঁপেডে শাড়ী পরিয়ছে। পায়ে চারিগাঁছি করিয়া মল 
আছে। কীকালে ছোট ছোট ছুইটি কলসী আছে। তাহারা ঘাটের 
রাণায় নামিবার সময়ে জোয়ারের জলের একটা গান গাহিতে গাহিতে 
নামিল। গানটি মনে আছে, মিষ্ট লাগিয়াছিল, তাই এখানে লিখিলাম। 
একজন একপদ গায়, আর একজন দ্বিতীয় পদ গাঁয়।” 
এর পর গানটি, আমি উহার কয়েকটি কলি উদ্ধত করিব ।-_ 


"ধানের ক্ষেতে ঢেউ উঠেছে, 
বাঁশ তলাতে জল। 
আয় আয় সই, জল আনিগে, 
জল আনিগে চল॥ 

খ ক টি 
“বিনোদবেশে মুচকে হেসে, 
খুলব হাসির কল। 


১২২ বাঙালী জীবনে রমণী 


কলসী ধরে গরব ক'রে 


বাজিয়ে যাঁব যল। 
আয় আয় সই, জল আনিগে, 
জল আনিগে চল ॥ 
সী সু পঁ 


“যত ছেলে খেল! ফেলে, 
ফিরচে দলে দল । 
কত বুড়ী জুজু বুড়ী 
ধরবে কত জল, 
আঁমর। মুচকে হেসে, বিনোদ বেশে 
বাজিয়ে যাঁব মল। 
“আমরা বাঁজিয়ে যাঁব মল 
সই, বাজিয়ে যাঁব মল ॥ 
ছুইজনে 
আয় আয় সই, জল আনিগে, 
জল আঁনিগে চল্‌।” 
ইন্দিরা বলিতেছে, “বালিকাসিঞ্চিতরসে, এ জীবন কিছু শীতল 
হইল।” 
এরপর অন্ধ রজনীর উক্তি, 
“ছুই এক পা করিয়া অগ্রসর হইতে লাঁগিলাম-_মরিব! গঙ্গার তরঙ্গ- 
রব কাণে বাজিতে লাঁগিল--বুঝি মরা হইল না--আমি মিষ্ট শব্দ বড় 
ভালবাসি! না, মরিব। চিবুক ডুবিল! অধর ভুূবিল! আর একটু 
মাত্র। নাঁসিকা ডুবিল! চক্ষু ডুবিল! আমি ডুবিলীম 1 
রজনীর সেই মুতি শচীন্দ্রনাথ স্বপ্পে দেখিলেন, 
"অকন্মাৎ সেইখানে প্রভাতবীচি-বিক্ষেপ্চপল কলকলনাদিনী নদী 
বিস্তৃত দেখিলাম__যেন তথাঁয় উষাঁর উজ্জল বর্ণে পূর্ববদিক প্রভাঁসিত 
হইতেছে--দেখি, সেই গঙ্গাপ্রবাহমধ্যে সৈকতমূলে রজনী ! রজনী জলে 
নামিতেছে। ধীরে, ধীরে, ধীরে! অন্ধ অথচ কুঞ্চিত ভর; বিকলা অথচ 
স্থিরা) সেই প্রভাতশান্তিশীতলা ভাগীরথীর ন্যায় গম্ভীরা, ধীরা, সেই 


বাংলার দৃশ্ট ও বাঙালীর ভালবাসা ১২৩ 


ভাগীরথীর ন্ঠায় অন্তরে ছুঙ্জয় বেগশালিনী! ধীরে, ধীরে, ধীরে-জলে 
নামিতেছে । দেখিলাম, কি স্ন্দর! রজনী কি সুন্দরী! বুক্ষ হইতে 
নবমঞ্জরীর সুগন্ধের স্ায়, দূরশ্রুত সঙ্গীতের শেষভাগের ন্তাঁয়, রজনী জলে, 
ধীরে- ধীরে-ধীরে নামিতেছে। ধীরে রজনি! ধীরে! আমি দেখি 
তোমায়। তখন অনাদর করিয়। দেখি নাই, একবার ভাল করিয়। 
দেখিয়| লই ।” 

এইবার দেবীচৌধুরাণী ! প্রথমে ত্রিত্োতার দৃশ্য__ 

“বর্ধাকাল। রাত্রি জ্যোৎসা। জ্যোতনা এমন বড় উজ্জল নয়, বড মধুর, 
একটু অন্ধকারমাঁখা--পৃথিবীর স্বপ্নময় আাবরণের মত। ত্রিশ্রোতা নদী 
বর্ধাকীলের জলপ্লাবনে কুলে কুলে পরিপূর্ণ। চক্জের কিরণ সেই তীব্রগতি 
নদীজলের শ্রেতের উপর- তে, মাবর্ডে, কদাচিৎ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তরঙ্গে 
জলেতেছে । কোথাও জল একটু ফুটিয়া উঠিতেছে-__সেথানে একটু 
চিকিমিকি ; কোথাও চরে ঠেকেয়! ক্ষুপ্র বীচিভঙ্গ হইতেছে, সেখ।নে একটু 
ঝিকিমিকি। তীরে, গাছের গেডায় জল আঁপিয়া লাগিয়াছে-- গাছের 
ছাঁয়া পড়িয়। সেখানে জল বড় অন্ধকার; অন্ধকারে গাছের ফুল, ফল, 
পাত! বাহিয়া তীব্র আত চলিতেছে; তীরে ঠেকিয়া জল একটু তর-তর 
কলকল পত-পত শব্দ করিতেছে-কিস্ত সে আধারে আদারে। 
আধারে আধারে, সে বিশাল জলধারা সমুদ্রন্থিসন্ধানে পক্ষিণীর বেগে 
ছুটিয়াছে। কুলে কুলে অসংখ্য কল-কল শব্' আবর্তের ঘোঁর গঙ্জন, 
প্রতিহত জ্োতের তেমনি গল্জন; সর্ধশুদ্ধ একটা গম্ভীর গগনব্যাপী 
শব্দ উঠিতেছ্ে 1” 


এই নদীরই উপর একটা “বজরার ছাদের উপর_ একজন মানুষ । 
অপূর্ব দৃশ্ঠ 1” 
“ছাদের উপর একখানি ছোট গালিচা পাঁতা। গালিচাখানি ছুই আঙ্গুল 
পুরু--বড় কোমল, নাঁনাবিধ চিত্রে চিত্রিত। গালিচার উপরে বসিয়া 
একজন স্ত্রীলোক । তাহার বয়স অনুমান কর! ভার--পঁচিশ বৎসরের 
নীচে তেমন পূর্ণায়ত দেহ দেখা যাঁয় না) পচিশ বৎসরের উপর তেমন 
যৌবনের লাবণ্য কোথাও পাওয়া যাঁয় না। বয়স যাই হউক--সে 
স্রীলোক পরম সুন্দরী, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই | এ সুন্দরী কৃশাঙ্গী 


১২৪ বাঙালী জীবনে রমণী 


নহে--অথচ স্থুলাঙ্গী বলিলেই ইহার নিন্দা হইবে । বস্তুতঃ ইহার অবয়ব 

সর্বত্র ষোলকলা৷ সম্পূর্ণ--আজি ত্রিক্রোতা যেমন কুলে কুলে পুরিয়াছে, 

ইহাঁরও শরীর তেমনই কুলে কুলে পুরিয়াছে। তাঁর উপর বিলক্ষণণ উন্নত 

দেহ। দেহ তেমন উন্নত বলিয় ই স্কুলাঙ্গী বলিতে পারলাম না । যৌবন- 

বর্ষার চারি পোয়া বন্ত।র জল, মে কমনীয় আধারে ধরিয়াছে_ ছাপায় 

নাই। কিন্তু জণ কুলে কুলে পুরিয়া টল-টল করিতেছে অস্থির 

হইয়াছে । জল অস্ির, কিন্তু নদী অস্থির নহে; নিস্তরঙ্গ । লাবণা চঞ্চল, 

কিন্তু সে লাবণামরী চঞ্চলা নহে-_নিব্রিকার। সে শান্ত, গম্ভীর, মধুর 

অথচ আনন্দমরী ; সেই জ্যোৎ্সাময়ী নরীর অন্ুষঙ্গিনী 1” 

এই প্রসঙ্গে প্রতাপ ও শৈবলিনীর গঙ্গায় সাতারের কথাও 
পকলেরই মনে পড়িবে, তাই উদ্ধৃত করিলাম না। 

বাংলার প্রাকৃতিক রূপের সহিত নুতন প্রেমের অঙ্গাঙ্গীকরণ 
বঙ্কিমচন্দ্রের মধ্যে যেমন, রবীন্দ্রনাথের মধোও তেমনই । বরঞ্চ বলা 
যাইতে পারে র্বীন্দ্রনাথে এই সম্পর্কের আরও নিবিড়তা দেখা যায় । 
তাহার গল্প-উপন্যাসে প্রেমের নানা রূপের সহিত বাংলার জলের নানা 
রূপের যে সঙ্গতি দেখা যায় তাহা অপূর্ব । কিন্ত ইহার দৃষ্টান্ত দিবার 
আগে রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে আর একটা কথাও বলা প্রয়োজন । তাহার 
কবিপ্রতিভাও বাংলার প্রাকৃতিক দৃশ্য ও বাংলার জলের মধ্যেই বিকশিত 
হইয়াছিল। তীহার গল্পের মধো যেগুলি সর্বোতকুষ্ট উহাদের ঘটনাস্থলও 
তাহারই যৌবনকালের আবেষ্টনী । 

আবেষ্টনীটা এই । কুন্তিয়া বা শিলাইদহকে কেন্দ্র করিয়৷ মাইল 
পঁচিশেক ব্যাসাধ” ধরিয়া একটা বুদ্তাংশ টানিলে তাহার মধ্যে পল্সা, 
গোড়াই, পাবনার ইছামতী ও আত্রাই, বাংলার যমুনা ( অর্থাৎ ব্রঙ্গপুত্রের . 
নূতন খাত)__এই সব লইয়া একটা নদীমাতৃক অঞ্চল পড়িবে । এইখানেই 
রবীন্দ্রনাথ যৌবনে বনু বুসর কাটাইয়া ছিলেন, আবার তাহার শ্রেষ্ঠতম 
গল্পগুলির আবেষ্টনীও এই অঞ্চল। এই অঞ্চল ছাড়া গল্পগুলি কল্পনা 
করা যায় না। আমি দেশে যাতায়াত সুত্রে এই সমস্তটা অঞ্চল বনবার 
দেখিয়াছি । একট! দিন এখনও আমার জীবনে চিরস্থায়ী উষার মত 


বাংলার দৃশ্থ ও বাঙাঁলীর ভালবাসা ১২৫ 


রহিয়া গিয়াছে । সেদিন আমি একটা মন্থরগামী ট্রেনে সিরাজগঞ্জ হইতে 
পোড়াদহ পর্যন্ত আসিয়াছিলাম। হায়! কয়জন কলিকাতার আজিকার 
বাঙালী এই দৃশ্য দেখিতে পায় ! 

কিন্তু গল্প, আবেষ্টনী, ও জীবনের এই সংযোগ রবীন্দ্রনাথ অজ্ঞাত- 
সারে করেন নাই। এই অঞ্চলে থাকার সময়ে তিনি ইহার সহিত পাঠ্য 
বিষয়ের ও লেখার বিষয়ের যে একটা নিবিড় যোগ হওয়া উচিত তাহা 
অনুভব করিয়াছিলেন। এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের নিজের সাক্ষ্য চূড়ান্ত । 
১৮৯২ সনের প্রথম দিকে রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহ হইতে সেখানে কি 
উপন্যাস পড়া বা লেখা যায় সে-সম্বন্ধে যাহা লিখিয়াছিলেন, তাহা 
উদ্ধৃত করিব। তিনি লিখিলেন,_ 

“ঠিক এখাঁনকাঁর উপযুক্ত কোঁনে! কাব্য নভেল খুঁজে পাই নে। ফেটা 

খুলে দেখি সেই ইংরেজী নাম, ইংরেজী সমাজ, লগ্ডনের রাস্তা এবং 

ড্রয়িংরুম, এবং যতরকম হিজিবিজি হাঙ্গাম; বেশ সাদাসিধে সহজ 

সুন্দর উন্মুক্ত দরাজ এবং মশ্রবিন্ুর মত উজ্জল কোমল স্তগোল করুণ 

কিছুই খুঁজে পাই নে ।” 

রবীন্দ্রনাথ যতদিন সত্যকার গল্প-লেখক বা ওপন্যাসিক ছিলেন, 
যতদিন গল্প ও উপন্যাসের নামে সমাজতত্বের বই লেখেন নাই, ততদিন 
গল্পউপন্যাসে তত্ব সম্বন্ধে তাহার একটা দারুণ বিতৃষ্ণ ছিল । তাই 
এর পরই তিনি লিখিলেন,_ 

“কেবল প্যাচের উপর প্যাচ, ম্যানালিসিসের উপর ম্যানালিসিস-- 

কেবল মানবচরিত্রকে মুচড়ে নিংড়ে কুচকে-মুচকে তাঁকে সজোরে পাক 

দিয়ে দিয়ে তার থেকে নতুন নতুন থিয়োরি এবং নীতিজ্ঞান বের করবার 

চেষ্টা। সেগুলো পড়তে গেলে আমার এখানকার এই গ্রীক্ষশীর্ণ ছোঁট 

নদীর শান্ত শ্রোত, উদাস বাতাসের প্রবাহ, আকাশের অখণ্ড প্রসারতা, 

ছুই কুলের অবিরল শাস্তি, এবং চারিদিকের নিস্তবূতাকে একেবারে 

ঘুলিয়ে দেবে ।” 

ইহার আগেও রবীন্দ্রনাথ এই বিতৃষ্ঞা প্রকাশ করিয়াছিলেন-_ 
পৃথিবীর একটি বিখ্যাত উপন্যাস সন্বন্ধে। “আনা কারেনিনা? সম্বন্ধে 


১২৬ বাঙালী জীবনে রমণী 


আটাশ বশসর বয়স্ক রবীন্দ্রনাথ লিখিয়াছিলেন, 
“আন। কারেনিনা পড়তে গেলুম, এমন বিশ্রী লাগল যে পড়তে পাঁরলুম 
না__এরকম সব 81017 বই পড়ে কি সুখ বুঝতে পারিনে। আমি চাই 
বেশ সরল সুন্দর মধুর উদার লেখা--কূটকচাঁলে অদ্ভুত গোলমেলে কাও 
আমার বেশীক্ষণ পোঁষার না ।” 
তৰে এখানে কি পড়া, কি লেখা যাইতে পারে? রবীন্দ্রনাথ 
বলিতেছেন | 
“এখ|নে পড়বার উপযোগী রচনা আমি প্রায় খুঁজে পাই নে, এক বৈষ্ণব 
কবিদের ছোট ছোট পদ ছাড়া । ঝাঁংলার যদ কতকগুলি ভাঁল ভাল 
মেয়েলী রূপকথা জানতুম এবং সরল ছন্দে সুন্দর করে ছেলেবেলাকার 
ঘোঁরো স্মৃতি দিয়ে সরস করে লিখতে পাঁরতুম তা হলে ঠিক এখানকার 
উপযুক্ত ই'ত। বেশ ছোট নদীর কলরবের মত, ঘাটের মেয়েদের 
উচ্চহ[সি, মিষ্ট কঠস্বর এবং ছোটখ|টো! কথাবার্তার মত, বেশ নারকেল- 
পাতায় ঝুরসুর কীপুনি, আঁমবাগানের খন ছায়া, এবং প্রক্ফুটিত সর্ষেক্ষেতের 
গন্ধের মত-বেশ সাদাসিধে অথচ নুন্দর এবং শান্তিময়--অনেকখানি 
আকাশ আলো নিস্তবূতা এবং সকরুণতায় পরিপূর্ণ! মারামারি হানাহানি 
যোঝাযুঝি কান্নীকাটি সে-সমস্ত এই ছায়াময় নদী-স্সেহ-বেষ্টিত প্রচ্ছন্ন বাংলা 
দেশের নয়।” 
কিন্তু রবীন্দ্রনাথের এই আকাঙ্ক্ষা অপুর্ণ থাকে নাই। তিনি 
পল্মাতীরের বাংলার যে অপরূপ কাহিনী রাখিয়া গিয়াছেন, তাহা একই 
সঙ্গে রুপকথা ও বাঙালীর আত্মজীবনী । আমার নিজের আত্মজীবনীর 
প্রথম অংশও এই বাংলারই স্মৃতিকথা, উর উন্তরাপথে বসিয়া লেখা । 
রবীন্দ্রনাথের সমস্ত গগ্ভরচনার মধ্যে ছোট গল্পই শ্রেষ্ঠ, তাহার মধ্যেও 
আবার নিন্মলিখিত গল্পগুলিকে আমি সর্বোৎকৃষ্ট বলিয়া মনে করি-_ 
কঙ্কাল; একরাত্রি; জীবিত ও মৃত; মধ্যবতিনী; সমাপ্তি; 
মেঘ ও রৌদ্র ; নিশীথে ; মানভর্ন ; অতিথি; মণিহারা ; দৃষ্টিদান ; 
'নফনীড়। 
এই বারোটি গল্পের মধ্যে আটটি বাংলার জলের সহিত সংশ্লিষ্ট, 


বাংলার দৃশ্ঠ ও বাঁডালীর ভাঁলবাঁসা ১২৭ 


কতকগুলি জল ভিন্ন দাড়াইত না; এই আটটির মধ্যে ছয়টি পাবনা 
অঞ্চলের, একটি ভাগীরধীতীর ও পদ্মার তীরের মধ্যে বিভক্ত, একটি 
নোয়াখালি জেলায়। বাকী চারিটি মাত্র কলিকাতার। পঙ্পলী-অঞ্চলের 
গল্পগুলি ও কলিকাতার গল্পগুলির মধ্যে আর একটি পার্থক্যও লক্ষ্য 
করিবার বিষয়। পল্লী-অঞ্চলের সবগুলি গল্পই উদার ও করুণ-_ 
রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলিতে পারি, “সাদাসিধে সহজ উন্মুক্ত দরাজ এবং 
অশ্রুবিন্দুর মত উজ্জ্বল কোমল স্থগেল করুণ ।”৮ কলিকাতার চারিটি 
কাহিনী গল্প হিসাবে, আটটি হিসাবে, অতি উচ্চন্তরের, কিন্তু প্রত্যেকটিই 
নিদারুণভাবে নির্মম ও কঠিন। এই গল্পগুলির নিষ্ঠুরতা মোপাসার 
গল্লের নিষ্ঠুরতার মত। 

রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসেও জলের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। 
'নৌকাড়ুবি, উপন্যাস হিসাবে খুব বড় জিনিস নয়, কিন্তু উহার মধ্যে 
রমেশ ও কমলার গোয়ালন্দ হইতে গাজিপুর পর্যন্ত গঙ্গায় শ্রীমার 
যাত্রার অংশটুকু অতি স্থন্দর। “গোরা'তেও গল্পের দিক হইতে যে 
ঘটনাটি সব চেয়ে প্রাণম্পর্শী তাহাও গ্রীমারেই ঘটিয়াছে। গঙ্গার বুকে 
স্মারে আমিতে আমিতে ললিতা বিনয়ের প্রতি নিজের ভালবাস! 
আবিষ্কার করিল। সমস্ত বাংলা সাহিতো এই অংশট্ুকুর মত মাধুর্যপূর্ণ 
বর্ণনা কমই আছে। আমি উহা উদ্ধৃত করিব। প্রথমেই শ্থীমারের 
কথা, 


“ললিতা ধীরে ধীরে ক্যাবিনের দরজা খুলিয়া! বাহিরের দিকে চাহিয়া দেখিল, 
রাত্রিশেষের শিশিরার্্ অন্ধকার তখনও নদীর উপরকার মুক্ত আকাশ এবং 
তীরের বনশ্রেণীকে জড়াইয়া রহিয়াছে--এই মাত্র একটি শীতল বাতাস 
উঠিয়া নদ্রীর জলে কলধ্বনি জাগায়! তুলিয়াছে, এবং নীচের তলায় এক্জিনের 
থালাঁসিরা কাজ আরম্ভ করিবে এমনতরো! চাঁঞ্চল্যের আভাস পাওয়া 
যাইতেছে। 


আমিও একদিন শেষরাত্রে ভৈরব বাজারে গ্ীমারে উঠিয়া মেঘনার 
বুকে ধীরে ধীরে অন্ধকার কাটিতে দেখিয়াছিলাম, সঙ্গে অবশ্য কোনও 


১২৮ বাঙীলী জীবনে রমণী 


ললিতা ছিলেন না। 

তারপর ললিতার কথা__ 

“ললিতা ক্যাবিনের বাহিরে আসিয়াই দেখিল, অনতিদূরে বিনয় একটা গরম 

কাপড় গায়ে দিয়া বেতের চৌকির উপর ঘুমাইয়! পড়িয়াছে। দেখিয়াই 

ললিতার হৃৎপিণ্ড স্পন্দিত হইয়া উঠিল। সমস্ত রাত্রি বিনয় এইখানেই 

বসিয়া পাহাঁর দিয়াছে । এত নিকটে, তবু এত দুরে । 

“ডেক হইতে তখনই ললিতা কম্পিতপদে কাঁবিনে আসিল; দ্বারের কাছে 

দাড়।ইয়া সেই হেমন্তের প্রত্যুষে সেই অন্ধকারজড়িত অপরিচিত নদীদৃষ্ঠের 

মধ্যে একাকী নিদ্রিত বিনয়ের দিকে চাঁহিয়! রহিল। সন্মুখের দিকপ্রাস্তের 

তারাগুলি যেন বিনয়ের নিদ্রাকে বেষ্টন করিয়া তাহার চোঁখে পড়িল; 

একটি অনির্বচনীয় গাস্ভীষ্যে ও মাধুর্য্যে তাহার সমস্ত হৃদয় একেবারে কূলে 

কুলে পূর্ণ হইয়া উঠিল; দেখিতে দেখিতে ললিতার ছুই চক্ষু কেন যে জলে 

ভরিয়া আসিল তাহা সে বুঝিতে পারিল না।” 

সকালে দুইজনের মধ্যে একটু সম্ভাষণ মাত্র হইল ।-_ 

“ইহার পরে ছুইজনে মার কথ! কহিল না। শিশিরসিক্ত কাঁশবনের 

পরপ্রান্তে আসন্ন সয্যোদয়ের স্বর্ণচ্ছিটা উজ্জণ হইয়। উঠিল। ইহার! দুইজনে 

জীবনে এমন প্রভাত আর কোনোদিন দেখে নাই ।” 

ছুইজনে কলিকাতা ফিরিবার সঙ্গে সঙ্গে “গোরা” উপন্যাস আবার 
প্রধানত সমাজতত্খের আলোচনাতে পরিণত হইল । কলিকাতা ও 
ব্রাহ্মদমাজের লোক হিসাবে হারাণবাবু বিনয় ও ললিতার একত্রে ন্টীমারে 
আসা সম্বন্ধে এই রায় দিলেন-__ 

“কোনে কুমারীকে তার মায়ের সঙ্গ পরিত্যাগ করে যদি বাইরের পুরুষের 

সঙ্গে একলা এক জাহাজে ভ্রঘণ করতে প্রশ্রয় দেওয়। হয়ঃ তবে সে সম্বন্ধে 

কোন্‌ সমাজের মালোচন1 করবার আধকারে নেই জিজ্ঞাসা করি ।” 

হারাণবাবু নিশ্চয়ই শুনিয়াছিলেন, বিবাহিতা রমণী ওইভাবে 
পরপুরুষের সহিত ল্টীমারে ভ্রমণ করিলে ডিভোসে'র মামলা হইতে 
পারে। বাংলার জলে ও কলিকাতার ইটে মনোভাবের এই প্রতেদ 
হইতে বাধ্য । তাই গ্রাম্যবালিকা কলিকাতায় বধূ হইয়া আসিয়া. 


বাংলার দৃশ্ঠ ও বাঙালীর ভালবাসা ১২৯ 


বলিয়াছিল,_ 


“সবার মাঁঝে আমি ফিরি একেলা । 

কেমন করে কাটে সারাটা বেল! । 

ইটের "পরে ইট, মাঝে মানুষ কীট-_- 

নাইকো ভালবাসা, নাইকে] খেল11৮-- 

তাহার কানে আর একট! ধ্বনি বাজিতেছিল,__ 

“বেলা যে পড়ে এল, জল্ঠ চল্‌-_ 
পুরেনে! সেই স্বরে কে যেন ডাকে দূরে, 
কোথা সে ছাঁয়া সখী, কোথা সে জল। 
কোথা সে বাধা ঘাটি, অশথতল 1” 

রবীন্দ্রনাথের গল্প-উপন্যাসে শুধু যে প্রেমের সহিত জলের যোগই 
আছে তাহাই নয়, ইহার উপরেও কিছু আছে-_কি করিয়া প্রেমের 
বিভিন্ন রূপের সহিত জলের বিভিন্ন রূপের যোগ তিনি ঘটাইয়াছেন তাহা 
আরও লক্ষ্য করিবার বিষয় । হয়ত রবীন্দ্রনাথ জানিয়া শুনিয়া এই 
সমন্বয় করেন নাই, এই যোগাযোগ সম্ভবত অন্তনিহিত অনুভূতির জোরেই 
হইয়া গিয়াছিল। কিন্তু ফলে প্রেমের বিশিষ্ট রূপের সহিত জলের 
বিশিষ্ট রূপ যে-ভাবে এক হইয়! গিয়াছিল, তাহা বিশ্লেষণ করিলে আশ্চর্য 
হইতে হয় । ইহা গভীর অন্তদুর্ন্টি হইতে আসিয়াছে সন্দেহ নাই, কিন্তু 
যাহাকে আমরা অন্তৃণ্টি বলি উহা যুক্তির ব্যাপার নয়ন। 

“এক রাত্রি”, নিশীখে” ও পিমাপ্তি” শুধু এই তিনটি গল্পের প্রসঙ্গেই 
প্রেমের সহিত জলের যোগের কথা বলিব। “এক রাত্রি গল্পের নায়ক 
কলিকাতায় পড়াশুনা করিবার সময়ে বাল্যসঙ্গিনী স্ুরবালার সহিত 
বিবাহের প্রস্তাব কানে তোলে নাই। পরে যখন নোয়াখালি জেলার 
এক জায়গায় সে মান্টারি লইয়া গেল তখন জানিতে পারিল, সেখানকার 
সরকারী উকিল রামলোচন রায়ের স্ত্রী তাহার সেই বাল্যসখী। 

সে মাঝে মাঝে রামলোচনবাবুর বাড়ী যাইত। একদিন যাওয়ার 
পর বর্তমান ভারতবর্ষের দুরবস্থা সম্বন্ধে শখের গল্প হুইতেছিল এমন সময় 


ৈ 


১৩০ বাঁঙালী জীবনে রমণী 


সে অনুভব করিল, পাশের ঘর হইতে কেহ যেন তাহাকে দেখিতেছে। 
হঠাৎ স্থুরবালার মুখ তাহার মনে পড়িয়া গেল-_“সহসা হৃৎপিগুকে কে 
যেন একটা কঠিন মুষ্টির দ্বারা চাপিয়া ধরিল এবং বেদনায় ভিতর হইতে 
টন্টন্‌ করিয়া উঠিল ।” 

এই ভাব কেন হইল তাহার আলোচনা অন্থাত্র করিব, কারণ গল্পটি 
তিন দিক হইতে তখনকার বাঙালী জীবন সন্ন্ধে গভীর অনুভূতির 
প্রকাশ। এখানে শুধু নিরাশ বা ব্যর্থ প্রেমের সহিত জলের সংহারক 
ও ভয়ঙ্কর মুতির কি যোগ তাহাই দেখাইব। 

সেদ্রিন হইতে তাহার আর কাজে মন বসে না, ছুটি হইয়া গেলে 
ঘরে থাকিতে ইচ্ছা হয় না, অথচ দেখা করিতে লোক আসিলে অসহ্য 
ঠেকে। যত সে মনকে বুঝাইতে চায় স্থরবালা তাহার কেউ নয় ততই 
তাহার মন বলে, -সত্য, স্থরবালা আজ তোমার কেউ নয়, কিন্তু স্থরবালা 
কি না হইতে পারিত। 

এই অবস্থায় এক রাত্রিতে তখন রামলোচনবাবু মোকদ্দমার কাজে 
মফঃস্বলে গিয়াছেন--প্রচণ্ড ঝড়ের পর বান আসিল। সে যেমন 
পুকুরের উ“চু পাড়ে গিয়া ঈাড়াইল, আর দিক হইতে স্থরবালাও উঠিয়া! 
আসিল। দুইজনে পাশাপাশি দীড়াইয়। রহিল/_ 

“তখন প্রলয় কাল, তখন আকাশে তারার আলে! ছিল না! এবং পৃথিবীর 

সমস্ত প্রদীপ নিভিয়। গেছে--তখন একটা! কথা! বলিতেও ক্ষতি ছিল ন! 

_কিন্তু একটি কথাঁও বল! গেল ন1। কেহ কাহাঁকেও একটা কুশল প্রশ্নও 

করিল না। 

“কেবল ছুইজনে অন্ধকারের দিকে চাহিয়া রহিলাম। পদ্রতলে গাঢ় 

কৃষ্ণবর্ণ উন্মত্ত মৃত্যু গর্জন করিয়! ছুটিয়া চলিল।” 

তাহার মনে হইল, আজ সমস্ত বিশ্বসংসার ছাড়িয়া স্ুরবালা তাহার 
কাছে আসিয়া দাড়াইয়াছে। সে ছাড় স্থুরবালার আর কেহ নাই। 
শৈশবে সুরবালা কোক্গুজন্মান্তর হইতে ভাসিয়া আসিয়া সূর্ধচন্দ্রালোকিত 
পৃথিবীতে তাহার পার্থে আসিয়া সংলগ্ন হইয়াছিল, কতদিন পরে সেই 


বাংলার দৃশ্ঠ ও বাঙালীর ভালবাস! ১৩১ 


আলোকময় লোকময় পৃথিবী ছাড়িয়া সেই ভয়ঙ্কর জনশূন্য প্রলয়ান্ধকারের 
মধ্যে একাকিনী তাহারই পাশে আসিয়৷ দাড়াইয়াছে। জন্মশোত 
নববালিকাটিকে তাহার কাছে আনিয়াছিল, মৃত্যুোত বিকশিত পুষ্পটিকে 
আবার কাছে আনিয়াছে। এখন একটা ঢেউ আসিলেই বিচ্ছেদ কাটিয়া 
ভ্ুইজনে এক হইয়া যায়। কিন্তু সে বলিল,_ 
“সে ঢেউ না আসুক। স্বামীপুত্র গৃহ ধনজন লইয়া সুরবাঁল! চিরদিন 
সুখে থাঁকুক। আমি এই একরাত্রে মহাপ্রলয়ের তীরে ফঁড়াইয়! অনন্ত 


আনন্দের আশ্বাদ পাঁইয়াছি*** 
“আমি এক ভাঙা স্কুলের সেকেওড মাস্টার, আমার সমস্ত ইহজীবনে কেবল 


ক্ষণকাঁলের জন্য একটি অনন্তরাত্রি উদয় হইয়াছিল--আমাঁর পরমায়ুর সমস্ত 

দ্িনরাত্রির মধ্যে সেই একটিমাত্র রাত্রিই আমার তুচ্ছ জীবনের একমাত্র 

চরম সার্থকতা |” 

অনেকের মন এত সঙ্কীর্ণ, এত ক্ষুদ্র যে এই লোকোন্তর অনুভুতি 
তাহাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে না হইতে পারে। কিন্তু কাপুরুষ না 
হইলে প্রকৃতির প্রলয়ঙ্করী মতি দেখিলে মানুষ মাত্রেরই দৈনন্দিন সামান্যতা 
ছাড়িয়া অনুভূতির উচ্চতম স্তরে উঠিবার ক্ষমতা হয়। তখন তাহার 
ইন্ড্রিয়ের অস্বাভাবিক তীব্রতা আসে, মানসিক উদারতার অপরিসীম 
প্রসার হয়, স্থখ-দুঃখকে সমান গৌরব মনে হয়, আত্মবিসঞ্জীনের একটা 
ছুনিবার ঝোঁক আসে । আমি নিজেও উহা খানিকটা অনুভব করিয়াছি | 

কিশোরগঞ্জে একদিন ভূমিকম্পে আমাদের সমস্তটা পাকা বাড়ী 
একেবারে ধুলিসাৎ হইয়৷ গিয়াছিল। আমি শুইয়া একটা ইংরেজী 
উপন্যাস পড়িতেছিলাম, এমন সময় ভূমিকম্প আরম্ত হইল। প্রথমে 
বুঝিতে পারি নাই, পরে বুঝিয়৷ যখন বাহির হইতে যাইতেছি তখন 
দেখিলাম মা দৌড়িয়া পাশের ঘরে ঢুকিয়৷ আমার জ্রগ্রস্ত ছোট ভাইকে 
নিতে আসিয়াছেন। চীৎকার করিয়া বাহিরে যাইতে বলিলাম, কিন্তু 
মা পরে বলিয়াছিলেন-_তিনি কিছুই শোনেনঞ্নাই, কারণ চারিদিকে 
একটা সর্বব্যাপী গুরু-গুরু শব্দ হইতেছিল। তাহাদের বাহির হইয়া 
যাইতে দেখিয়াই আমিও এক দরজা দিয়া বাহির হইয়া গেলাম। ছুই 


১৩২ বাঁডালী জীবনে রমণী 


চার পা গিয়াছি, তখন দেখি সমগ্র বাড়ীটা! কাপিতে কাপিতে ধ্বসিয়! 
পড়িতেছে। প্রত্যেকটি ইটকে যেন খসতে দেখিলাম, দেখিলাম ছাতের 
কানিশ কাত হইয়া নীচের দ্রিকে আসিতেছে, দেখিলাম দেয়াল ও ছাতের 
বড় বড় টাই ধীরে ধীরে বাহিরের উঠানের ঘাসের উপর দরিয়া ফুটবলের 
মত গড়াইয়া যাইতেছে । বাড়ী পড়িয়া যাইতে মিনিটখানেক লাগিয়া 
থাকিবে, কিন্তু সেটা যেন এক দণ্ড মনে হইল । চোখের ও অনুভূতির 
এত তীব্রতা আসিয়াছিল যে আজও মনে হয় যেন একখানা ফোটোগ্রাফ 
তোলা আছে, বসিয়৷ বসিয়া দেখিতেছি। 

আর একবার একটা প্রলয়ঙ্কর সাইক্লোনের পর কিশোরগঞ্জে গিয়া 
ছিলাম। ১৯১৯ সনের সেপ্টেম্বর মাস। সিরাজগঞ্জ হইতে ট্টীমারে 
উঠিবার পরই দেখিলাম, নদীর পূর্বতীরের গাছপালা যেন বিধ্বস্ত মনে 
হইতেছে, সারারাত যেন ঝড় বহিয়াছে। ময়মনসিংহ শহরে পৌছিয়। 
শুনিলাম, ট্রেন যাইবে কিনা সন্দেহ--টেলিগ্রাফের লাইন ছি ডিয়া গিয়াছে, 
স্টেশনে খবর দিবার কোন উপায় নাই, ট্রেনের চল। বিপভ্ভনক। 
তবু সন্ধ্যা নাগাদ সিটি দিতে দিতে ধীরগতিতে ট্রেন চলিল। ময়মনসিংহের 
কাছে ব্রহ্মপুত্রের পুল পার হইয়া বিশ্‌কা স্টেশনের কাছে আমিতেই 
দেখিলাম, ঝড়ে একটা ট্রেনের কয়েকটা গাড়ীকে উড়াইয়া পাশের 
ধানক্ষেতের উপর ফেলিয়াছে। চোখে না দেখিলে বিশ্বাস করিতাম না। 

কিশোরগঞ্জ সেশনে পৌছিয়। দেখি, চারিদিক অন্ধকার, যানবাহন 
নাই। মালপত্র স্টেশনে রাখিয়া একা হাটিয়া বাড়ীর দিকে চলিলাম, 
মাইল দেড়েক পথ । চলিতে পারি না, গাছ পড়িয়। জায়গায় জায়গায় 
রাস্তা বন্ধ । চারিদিক এত অন্ধকার যে বাড়ীঘর আছে কি নাই তাহাও 
বুঝিতে পারা কষ্ট হইতেছিল। মাঝে মাঝে রাস্তা হইতে নামিয়! নদীর 
পাড় দিয়! বন্ধ জায়গা অতিক্রম করিয়৷ আবার রাস্তায় উঠিতে লাগিলাম । 
বাড়ী পৌছিয়া দেখি, চারিদিক যেন ছন্নছাড়া-_বাড়ীটা পাকা, তাই পড়ে 
নাই। “বাবা” “বাব বলিয়া তিন-চারবার ডাক দিলাম-_খবর দিই 
নাই, সুতরাং তীহারা জানিতেন না। যখন বাবা উত্তর দিলেন, 


বাংলার দৃশ্য ও বাঙালীর ভালবাসা ১৩৩ 


“কে? নীরু?” তখন মনে হইল যেন আবার পৃথিবীতে ফিরিয়া 
আসিয়াছি। 

দাদার কাছে ঝড়ের বর্ণনা শুনিলাম। রাত্রি এগারোটা-বারোটা 
হইতে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হইয়া গেল, সেই মেঘ “ঘরাটোপের মত, উহার 
ভিতর হইতে একটা পিঙ্গল জ্যোতি বিচ্ছুরিত হইতেছিল। আর রাত্রি 
ছুপুর হইতে একটা দম্দ্রম্‌ শব্দ হইতে লাগিল, যেন বনু দুর হইতে একটা 
সেনাবাহিনী তামার দামামা বাঁজাইয়া আসিতেছে । ক্রমে সেই শব 
বহু রথের চাকার ঘর্ধবের মত হইয়া দাড়াইল। রাত তিনটা হইতে 
ঝড় বহিতে লাগিল। ক্রমাগত ভুষ্কার ছাড়িতে ছাড়িতে তিন-চারঘণ্টা 
ধরিয়া চলিল, ইহার পর কিছুক্ষণ থামিয়৷ সাইক্লোনের ধর্মমত আবার 
উন্ট! দ্বিক হইতে বহিল। বাড়ীর টিনের বারান্দার একটা কোণ 
মচকাইয়া৷ কাগজের মত ভাজ হইয়া গেল। খোলা থাকিলে সমস্ত 
বারান্দ৷ উড়িয়া যাইতে পারে, তাই ভাইরা ও চাকররা ও বাবা কাছি 
দিয়া বাধিয়া চালটাকে আবার ঠিক জায়গায় আনিয়া! দিতে চেষ্টা করিলেন, 
কিন্ত্ব পারিলেন না। 

সকালে বাহির হইয়! দেখিতে পাইলাম, হাকিমদের বাংলোর বড় 
বড় ভারী টিনের চাল ঘুড়ির মত উড়িয়া গিয়া হয় দীঘিতে, নয় ক্ষেতে 
পড়িয়া আছে। এই তাগণুব ঝড়ের মধ্যে যদি উপস্থিত থাকিতাম, 
আর যদ্দি কাহাকেও ভালবাসিয়া জানিতাম যে তাহাকে কখনও পাইৰ 
না, তখন নিশ্চই মনে হইত এই সাইক্লোনে নিরুদ্দেশ হইরা! উড়িয়া 
যাইবার মধ্যেও একটা উচ্ছৃসিত সখ আছে। 

রবীন্দ্রনাথ সম্ভবত নোয়াখালি-চট্টগ্রাম অঞ্চলের বান নিজে দেখেন 
নাই। কিন্তু তাহার অল্পবয়সে ওই দিকে অতি সর্বনাশকারী বান 
একাধিক হইয়াছিল । উহার বর্ণনা পড়িয়া নিজের মনে যে চিত্র 
জাগিয়াছিল তাহার জোরেই “এক রাত্রি গল্পের লোকোন্র অনুভূতি 
তিনি আনিতে পারিয়াছিলেন। আমিও সেই বান দেখি নাই, বর্ণন| 
মাত্র পড়িয়াছি, তবে আমি অগ্য রকম বন্যা দেখিয়াছি। সেটা এত 


১৩৪ বাঙালী জীবনে রমণী 


আকস্িক এবং প্রলয়ঙ্করী না হইলেও, আরও ব্যাপক ও সর্বনাশকারক । 
স্থতরাং জলের এই মুত্তি দেখিয়াও মনের ভাব কি হইতে পারে তাহা 
কল্পনা করিতে পারি। 

১৯১৩ সনের দামোদরের বন্যার বর্ণন৷ শুনিয়াছিলাম ও ছবি খবরের 
কাগজে দেখিয়াছিলাম । কিন্তু নিজের চোখে সর্বব্যাপী বন্যা দেখিলাম 
১৯২২ সনে উদ্তরবঙ্গে । ইহার কথ! সকলেরই জানা আছে । সিরাজগঞ্জ 
হইতে ট্রেনে ঈশ্বরদি আসিতেছি। গভীর রাত্রি, অন্য যাত্রীরা ঘুমাইয়া 
আছে। আমার কিন্তু ট্রেনে ভাল ঘুম হয় ন' প্রায়ই জাগি। সে 
রাত্রিতে জাগিবামাত্র দেখিলাম, ট্রেন দ্লাড়াইয়া আছে, শুনিলাম নীচে 
লোকে চীৎকার করিয়া কি নির্দেশ দিতেছে তার পর ট্রেন আবার ধীরে 
ধীরে চলিতেছে । একবার উঠিয়া দরজার কাছে গিয়া দীড়াইলাম। 
জ্যোৎস্সা রাত্রি, প্রায় দিনের মত পরিক্ষার, তবে রূপালী । চারিদিক 
জলে জলাকার, এক রেলের বাঁধ ভিন্ন কোথাও স্থলের চিহ্ন নাই। একটু 
পরেই ট্রেনটা একটা পুলের উপর আসিয়া আরও বেগ কমাইয়! অতি 
ধীরে চলিল। দেখি, নীচে নদীর জল প্রায় গার্ডার পর্যন্ত পোৌছিয়াছে, 
আর ফেনায় ফেনায় আবতিত হইয়া ঘোর গর্জন করিয়া পুলের নীচ দিয়া 
যাইতেছে । জলের বেগ এত প্রবল যে দুরে কয়েকটা নৌকার মাঝিরা 
লগি ঠেকাইয়া নৌকাগুলিকে রুখিতেছিল, নহিলে সেগুলি পুলের উপর 
পড়িয়া ভাঁউিয়া যাইত । 

পুল পার হইয়৷ গাড়ী যখন খোল৷ জায়গার ভিতর দিয় চলিল, তখন 
আর একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখিলাম । জল উচু-নীচু হয় না প্রবাদেই 
আছে, বিজ্ঞানেও বলে। কিন্তু রেল লাইনের বাঁধের ছুধারের জল 
একেবারে অসমতল । একদিকে জল লাইনের প্রায় কাছে উঠিয়াছে, 
অন্য দিকে ছয়-সাত ফুট নীচে। বুঝিলাম, পুল ও কালভার্টের 
অল্পতার জন্য জল একদিক হইতে আর একদিকে তাড়াতাড়ি 
সরিতেছে না। আরও একটা জিনিস দেখিলাম_পারে পারে 
শেয়ালের! বসিয়া আছে, উধ্বমুখ হইয়া শৃগালজীবনের এই বিপর্যয়ের 


বাংলার দৃশ্ত ও বাঙালীর ভালবাসা ১৩৫ 


ধ্যান করিতেছে । ট্রেনের গর্জনে ও সান্নিধ্যে তাহাদের কোনও 
ভয় নাই। 

কলিকাতায় আসিয়া দেখিলাম, এই বন্যা লইয়া ঘোর তোলপাড়। 
পথে পথে গাঁন গাহিয়া লোকে বন্যাবিপর্যস্তদের সাহায্যের জন্য টাকা 
ভূুলিতেছে। কিন্তু তাহার স্থর আর বন্যার সুর বিভিন্ন প্রকার। 
লোকের দুঃখে বিচলিত হইয়া কলিকাতার নান! পল্লীর বেশ্যারাও টাক৷ 
ভুলিবার জন্য দলে দলে বাহির হইয়া পড়িয়াছিল। একদিন একটি 
দল আসিয়া এসপ্ল্যানেডে আমাদের আপিসের উঠানে ঢুকিল। দারোয়ান- 
পুলিস নিষেধ করিতে যাইতেছিল, কিন্তু অর্ডন্যান্স বিভাগের ডেপুটি- 
ডিরেক্টর কর্নেল ব্রাউন জানালায় আসিয়। ইঙ্গিতে মানা করিলেন, পরে 
নিজেও কিছু টাকা দিলেন। মেয়েগুলিকে পোশাক-পরিচ্ছদে বেশ 
শালীন দ্েখাইতেছিল, গানও খারাপ গাহে নাই। কিন্তু আমার 
সহকর্মীরা ভাল করিয়া দেখিয়া একজন আর একজনকে জিজ্ঞাসা 
করিতেছিল, “এর! রামবাগানের দল না? কাল সোনাগাছি আর 
হাড়কাটার দল এসেছিল” বুঝিলাম কলিকাতার কেরানীর বন্যার 
অনুভূতি আর বন্যাপীড়িত শুগালের অনুভূতি এক নয়। মেসে ফিরিয়া 
বাঙাল মেস-মেটের উক্তি শুনিয়া এই পার্থক্যটা আরও অনুভব করিলাম। 
আমরা বাঙালরা শালীন হইতে চেষ্টা করি। তাই 'মাগী” বা খানকী? 
এমন কি 'বেশ্ঠা” শব্দও মুখে সহজে আসে না। স্থতরাং মেসবাসীরা 
সলজ্জভাবে জিজ্ভ্রাসা করিলেন, “টাকা তুলবার জন্যে “প্রাস্রা নাকি 
বেরিয়েছিল ?” একেবারে বনিয়াদী কথাটা মুখে আনিলেও ইহারা বন্যা 
হইতে এর চেয়ে বেশী দূরে সরিয়া যাইতেন না। 

ণনিশীথে” গল্পে প্রেমের সহিত একটা গুরুতর অপরাধ জড়িত আছে 
বলিয়৷ উহাতে জলের আর এক রূপ দেখা যায়। আশা করি গল্পটা 
সকলেরই স্মরণ আছে। আমার একটা বড় দুঃখ এই যে, যখনই 
কোনও বিখ্যাত বাংলা গল্প বা উপন্যাস সম্বন্ধে মন্তব্য করিতে চাই, 
তখনই শ্রোতার মুখ দেখিয়া বুঝিতে পারি, ঘটনাগুলি ইহাদের 


১৩৬ বাঁঙাঁলী জীবনে রমণী 


একেবারেই জান! বা মনে নাই। বাংলা সাহিত্যের শিক্ষকের সহিত 
দেখা হইলে ব্যাপারটা আরও শোচনীয় হইয়া দ্াড়ায়। তখনই 
তাহারা কতকগুলি চিরশ্রুত, পুরাতন বাধাবুলি আওড়াইতে আরম্ত 
করেন। রবীন্দ্রনাথ একজাতীয় ইংরেজ সাহিত্য সমালোচক সম্বন্ধে 
লিখিয়াছিলেন,_ 


“সেদিন সন্ধ্যাবেলীয় একখানা ইংরাঁজি সমালোচনার বই নিয়ে কবিতা 
সৌন্দধ্য আর্ট প্রভৃতি মাথানুণ নানা কথার নান! তর্ক পড়া যাচ্ছিল_ 
এক-এক সময় এই সমস্ত মর্মগত কর বাঁজে মান্দোলন পড়তে পড়তে 
শ্রান্তচিন্তে সমন্তই মরীচিকাঁবৎ শূন্য বোঁধ হয় - মনে হয় এর বারো আনা 
কথা বানানো» শুধু কথার উপরে কথা ।” 


আমাদের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপকগণ এই কথাই আমাদের 
শুনাইতেন, আমরা নিজেরাও উহাই পড়িয়াছি। কিন্তু আজকালকার 
অধ্যাপকের ইহাদেরও নকল শিষ্যানুশিষ্য । ইহাদের কথা ধের্য ধরিয়া 
শোনা যায় না। আমি ধরিরা লইতেছি, আমার পাঠক-পাঠিকারা 
ইহ।দের কথ ছাড়া মূল লেখারও সন্ধান রাখেন। 

জমিদার দক্ষিণাচরণবাবু সাধবী শ্ত্রীর প্রতি গভীর অপরাধ করেন। 
তিনি পীড়িত৷ পত্বীর চিকিত্সার সময়ে ডাক্তারের যুবতী কন্যা মনোরমার 
প্রতি অনুরাগের লক্ষণ দেখান। পত্রী তাহাকে সুখী করিবার জন্য-_ 
অভিমান হইতে নয়__বিষ খাইয়া আত্মহত্যা করেন। পরে দক্ষিণাবাবু 
মনোরমাকে বিবাহ করেন বটে, কিন্তু মনোরমাও তাহার প্রতি পূর্ণ প্রেম 
ব্যক্ত করিত না, তিনিও কল্পনায় সর্বদাই পত্রীর আর্ত “ওকে, ওকে গো 
প্রশ্ন শুনিতে পাইতেন। এই শান্তি হইতে পরিত্রাণ পাইবার জন্য তিনি 
মনোরমাকে লইয়! বজরাঁয় করিয়া পন্মার বক্ষে চলিয়া গেলেন । প্রথমে 
মনে করিলেন, সেখানে শান্তি পাইয়াছেন । সে-পন্মার এই রূপ, 

“ভয়ঙ্করী পান্মা তখন হেমন্তের বিবরলীন তূজঙ্গিীর মত কশ নিজাঁবভাবে 


সুদীর্ঘ শীতনিদ্রায় নিবিষ্ট ছিল। উত্তরপারে জনশুন্ত দিগন্তপ্রসারিত বালির 
চর ধু ধূ করিতেছে--এবং দক্ষিণের উচ্চ পাঁড়ের উপর গ্রামের আত্রবাগানগুলি 


বাংলার দৃশ্ট ও বাঙালীর ভালিবাসা ১৩৭ 


এই রাক্ষপীনদীর নিতান্ত মুখের কাছে জোড়হস্তে ফ্রাড়াইয়া কাপিতেছে,_" 

পদ্মা ঘুমের ঘোরে এক একবার পাঁশ কিরিতেছে এবং বিদীর্ণ তটভূমি 

ঝুপঝাঁপ করিয়া ভাঙিয়। ভাঙিয়া পড়িতেছে ।” 

এই রকম চড়াতে একদিন রবীন্দ্রনাথের পত্বী এবং ভ্রাতৃবধূ 
বলেন্দ্রনাথের সহিত বেড়াইতে বাহির হইয়৷ হারাইয়৷ গিয়াছিলেন। উহার 
বর্ণনা ছিন্নপত্রাবলীগতে আছে, 

“উপরে উঠে চারদিক চেয়ে কালো মাথার কোনে চিহ্ন দেখতে পেলুম না-_ 

সমস্ত ক্যাকাঁশে ধৃধূকরছে। একবার “বলু বলে পুরো জোরে চীৎকার 

করলুদ-_কণ্ম্বর হু হু করতে করতে দশ দিকে ছুটে গেল, কিন্তু কারও সাড়া 

পেলুম না, তখন বুকট। হঠাৎ চারদক থেকে দমে গেল, একথা! না বড় খোলা 

ছাতা হঠাৎ বন্ধ করে দিলে যেমনতর হয়। গফুন আলো নিয়ে বেরোল, 

প্রসন্ন বেরোল, বোটের মঝিগুলো বেরে।ল, সবাই ভগ করে ভিন্ন ভিন্ন 

দিকে চল্লুম-মআমি একদিকে “লু” বিলু' করে চীৎকার করছি--প্রসন্ন আর 

এক ডাক দিচ্ছে ছেট মাঁঁ-মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছে মাঝির! 

“বাবু” “বাবু করে ফুকৃরে উঠছে । 
চাঁরিদিকের দৃশ্য সে কি! 

“সেই মরুভূমির মধ্যে নিস্তব্ধ রাত্রে অনেকগুলো আর্তম্বর উঠতে লাগল" 

কল্পনা করতে গেলে নিঃশব্দ রাত্রি, ক্ষীণ চন্দ্রলোক, নিজ্জন নিস্তব্ধ শূন্য চর, 

দূরে গফুরের চলনশীল একটি ল্নের আলো-_মাঝে মাঝে এক এক দিক 

থেকে কাতর কের আহ্বান এবং চতুর্দিকে তার উদাস গ্রতিধ্বনি ""” 

এই রকম চড়ায় দক্ষিণাবাবু মনোরমাকে লইয়া চন্দ্রালোকে বেড়াইতে 
বাহির হইয়াছেন। হঠাৎ মনোরম! হাতখানি বাহির করিয়া তাহার 
হাত টানিয়া ধরিল। তিনি মনে করিলেন, এইরূপ অনাবৃত অবারিত 
অনন্ত আকাশ নহিলে কি ছুটি মানুষকে কোথাও ধরে। এর পর 
কি হইল ? 

"এইরূপ চলিতে চলিতে এক জায়গায় আসিয়া দেখিলাম, সেই বালুকা- 

রাশির মাঝখ[নে অদূরে জলাশয়ের মত হইয়াছে--পন্না সরিয়া যাওয়ার পর 

জল বাণিয়া আছে। 


১৩৮ বাঙালী জীবনে রমণী 


“সেই মরুবালুবেছ্িত নিস্তরক্গ নিষুপ্ত নিশ্চল জলটুকুর উপরে একটি 
সুদীর্ঘ জ্যোৎ্মার রেখা মৃষ্ছিতভাবে পড়িয়া আছে। সেই জায়গাঁটাতে 
আসিয়া আমরা ছুইজনে ফঁড়াইলাম-_মনোরম! কি ভাবিয়া! আমার মুখের 
দিকে চাহিল; তাঁহার মাথার উপর হইতে শাঁলটা খসিয়া পড়িল; আমি 
তাহার সেই জ্যোতম্নাবিকশিত মুখখানি তুলিয়া ধরিয়! চুম্বন করিলাম! 
“সেই সময় সেই জনমানবশূন্থ নিঃসঙ্গ মরুভূমির মধ্যে গম্ভীরম্বরে কে 
তিনবার বলিয়া উঠিল--ও কে। ওকে। ও কে।, 
“আমি চমকিয়া উঠিলাম, আমার স্ত্রীও কাঁশিয়। উঠিলেন। কিন্তু 
পরক্ষণেই আমরা ছুইজনেই বুঝিলাঁম, এই শব্দ মান্ুষিক নহে, অমান্ুষিকও 
নহে-_চরবিহারী জলচর পক্ষীর ডাক ।” 
যিনি রাত্রিতে বড় নদীর চর দেখিয়াছেন ও হঠাৎ জলচর পাখীর 
ডাক শুনিয়াছেন, তাহার কাছেই এই বর্ণনার ভয়াবহ সৌন্দর্য স্পষ্ট 
হইয়া উঠিবে | 

এইবার “সমাপ্তির কথা বলিয়! এই প্রসঙ্গ শেষ করি। শ্রীযুক্ত 
সত্যজিত রায় সমাপ্তির মৃন্ময়ীকে তাহার “তিনকন্যাঁর এক কন্যা করাতে 
গল্পটির সহিত অনেকের চাক্ষুষ পরিচয় ঘটিয়াছে। কিন্তু উহার ফলে 
অন্তরঙ্গতা কতটা হইয়াছে বলিতে পারি না। আমি গল্লাট বালাকালে 
--১৯১১ কি ১৯১২ সনে প্রথম পড়ি, তার পর আরও অনেক পড়িয়াছি, 
পড়িতে পড়িতে প্রায় মুখস্থ হইয়া গিয়াছে । 

গল্পটির নাম “সমাপ্তি” । কিসের সমাপ্তি? প্রশ্ন কখনও করিয়াছি। 
তবে যে-উত্তর পাইয়াছি তাহাতে মনে হয়, আমাদের বাঙালীদের 
মানসিক ধর্মে একটা গেরো বা প্যাচ আছে, উহা হইতে নিস্তার 
পাওয়া কঠিন। পা্যাচটি আর কিছু নয়, অতি সহজ, চোখে দেখিবার 
জিনিসকে, কানে শুনিবার ব্যাপারকে তত্বের গ্যাসে পরিণত করিয়া 
কচকচি পরিবেশ। একবার কোনও ফরমুলা বাহির করা গেল, কি 
তাহার হাত হইতে আর নিষ্কৃতি নাই। 

অথচ গল্পটার শেষ ছত্রে নামটা কেন দেওয়া হইয়াছিল, এই প্রশ্নের 
স্পষ্ট উত্তর আছে। ছত্রটি এই, “অপূর্ব প্রথমে চমকিয়া উঠিল, তাহার 


বাংলার দৃশ্ ও বাঙালীর ভালবাসা ১৩৯ 


পর বুঝিতে পারিল-_অনেক দিনের একটি হাস্বাধায় অসমাপ্ত চেষ্টা 
আজ অশ্রুজলধারায় সমাপ্ত হইল ।৮ 
অর্থাৎ গল্পটির পুরা বিস্তার যাই হউক, উহার দীপ্ত শিখা একটি 
চুন্বনের ইতিহাস । একদিন উহ! সমাপ্ত হয় নাই, অবশেষে গভীর 
অন্ধকারে সমাপ্ত হইয়াছিল। এই প্রসঙ্গে চুম্বন লইয়া আর একটি 
বিখ্যাত গল্পের কথা মনে হইবে। সেটি অন্ধকারে আরম্ত হইয়াছিল, 
কিন্তু কখনই শেষ হয় নাই। সেই অসমাপ্ত ও অসমাপ্য চুম্বনের জন্য 
লেফটেনাণ্ট রিয়াবোভিচের জীবন একটা অর্থহীন, লক্ষ্যহীন পরিহাসে 
পরিণত হইয়াছিল। সমাপ্তিতে সেই অসমাপ্ত চুম্বন সমাপ্তি লাভ 
করিয়া, যাহারই প্রাণ আছে তাহারই কাছে চির-উচ্ছলিত সুখের 
উৎস হইয়া রহিয়াছে । 
সমস্ত গল্পটা জুড়িয়। বাংলার জল এই স্খের সাথী হইয়া 
আছে ।-- 
“শ্রাবণের শেষে জলে ভরিয়া উঠিয়৷ নদী একেবারে গ্রামের বেড়! ও 
বাঁশঝাঁড়ের তলদেশ চুম্বন করিয়া চলিয়াছে। 
“বহুদিন ঘনবর্যার পরে আজ মেঘমুক্ত আকাশে রৌদ্র দেখা দিয়াছে। 
“নৌকায় আসীন অপূর্বরৃষ্ণের মনের ভিতরকাঁর একখাঁনি ছবি 
যদি দেখিতে পাইতাম তবে দেখিতাম সেখানেও এই যুবকের মানস-নদী 
নববর্ধার কুলে কূলে ভরিয়া আলোকে জলজ্বল এবং বাতাসে ছলছল করিয়! 
উঠিতেছে।” 
এই 'লাইট-মোটিফ' সমস্ত গল্পটাতে আছে,_ 
“ভাদ্রমাসের পূর্ণ নদী ফুলিয়া ফুলিয়৷ নৌকা দোলাইতে লাগিল, মৃশ্ায়ীর 
সমস্ত শরীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন হইয়া আসিল; অঞ্চল পাতিয়া সে নৌকার মধ্যে 
শয়ন করিল এবং এই ছুরস্ত বালিক1 নদী-দোলায় প্রকৃতির স্েহপালিত শান্ত 
শিশুটির মত অকাতরে ঘুমাইতে লাঁগিল।” 
এর পর,-_ 
পরদিন কি মুক্তি, কি আনন! ছুই ধারে কত গ্রাম, বাজার, শস্তক্ষেত্র, 
বন, ছুইধারে কত নৌকা যাতায়াত করিতেছে ।” 


১৪৪ বাঁঙালী জীবনে রমণী 
আর একটি মাত্র দৃষ্টান্ত দিব, 
“ছুই বেল! নিয়মিত ট্টামার আসিয়া লাঁগে, কত লোঁক, কত কোলাহল । 


সন্ধ্যাবেলায় নদীতীর একেবারে নির্জন হইয়া যাঁয়। তখন কি অবাধ 
স্বাবীনতা।” 


শুধুকি এই? আগেকার অসাড়হৃদয়া মৃন্ময়ীর মনে ভালবাসার প্রথম 
আবির্ভাবের প্রতীকও সেই বাংলার নদী, বর্ষা ও মেঘ_ 


“এই যে একটি গম্ভীর ন্গিগ্ধ বিশাল রমণীপ্রকৃতি মুন্ময়ীর শরীরে ও সমস্ত 
অন্তরে রেখায় রেখায় ভরিয়া ভরিয়া উঠিল ইহাতে তাহাঁকে যেন বেদনা 
দিতে ল।গিল। প্রথম আষটের সজল নব মেঘের মত তাহ|র হৃদয়ে একটি 
বিস্তীর্ণ অভিমানের সঞ্চার হইল। সেই অভিমান তাহার চোখের 
ছ|রামর সুদীর্ঘ পল্লপবের উপর আর একটি গভীরতর ছায়। নিক্ষেপ 
করিল।” 


বাঙালী আজ তাহার জলরাশি হারাইয়া কলিকাতার সংকীর্ণতায় 
'শুকাইয়া গিয়াছে । তাহার প্রাণে এই ছবি সাড়৷ জাগাইবে কিন! জানি 
না, চোখে জল আনিবে কিন] বলিতে পারি না। 
আমি এইটুকু বলিব, যদি কাহারও মুখে আমার জন্য এই অভিমান 
জাগিত, তাহা হইলে তাহাকে বুকে বাধিয়া চুম্বনে চুন্ধনে অভিমান 
মুছিয়া দিবার আগে পায়ে পড়িয়া পদচুম্বন করিয়া বলিতাম,_ 
“ভুমি মোরে করেছ সম্রাট । তুমি 
মোরে পরায়েছ গৌরব-মুকুট ।৮ 
পুরুষের একটা ক্ষুদ্র দন্ত আছে। সে পয়সা উপার্জন করে বলিয়া 
মনে করে নারীর ভালবাসা পয়সা দিয়াই কেনা যায় বেশ্বার 
'ভালবাসা'র উপর জোর আছে বলিয়া সে বুঝিতে পারে না, সত্যকার 
ভালবাস! পাওয়া! কি দুর্লভ, কত বড় সৌভাগ্য । ইহার পর রূপে, বিদ্যায়, 
ধনে, বুদ্ধিতে নারীর যোগ্যতা বিচার করার মত মৃতা কিছু হইতে 
পারে না। 


বাংলার দৃশ্য ও বাঙালীর ভালবাসা ১৪১ 


'সমাপ্তি'তে এই ভালবাসাকে বাংলার জলের সহিত একীভূত দেখি । 
প্রথমেই বলিয়াছি, সে জল কতদিন দেখি নাই। তবু রাম সীতার সম্বন্ধে 
যাহা বলিয়া।ছলেন, আমিও বাংলার জলের উদ্দেশ্যে তাহাই বলিব,__ 

“ইয়ং গেছে লক্ষমীরিয়মমুতবতিনগ্নয়ো__ 
রস|বস্তাঃ স্পর্শে বপুষি বহুলশ্তন্ননরসঃ | 
অয়ং বাঁছঃ কে শিশিরমস্থণো মৌক্তিকসরঃ 
কিমশ্যা ন প্রেয়ো যদি পরমসহাস্ত বিরহ: ॥" 


হায়! ছুরমুর্খ আসিয়া শুধু আমাকে নয়, প্রতিটি বাঙালীকেই 
বলিতেছে_ 
“দেব! উপস্থিতঃ।৮ 


চতুর্থ পল্িচ্জ্েছ 
বাঙালী সমাজ ও নৃতন ভালবাসা 


নূতন ভালবাসার সহিত বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দৃশ্ঠের যে বহুমুখীন 
সঙ্গতির কথা আগেকার পরিচ্ছেদে আলোচনা করিলাম, উহা৷ অনুভূতির 
ফল, যুক্তির নয়। এ ধরনের সামগ্তাম্ত কেহই ইচ্ছা করিয়া, হিসাব 
করিয়া করিতে পারে না; ইহার উপলব্ধি যদি হৃদয়ের অন্তস্তল হইতে 
না আসে তাহা হইলে একেবারেই আসে না। আমার মনেও উহার 
ধারণা যে জাগিয়াছে, তাহাও আমার বিচারবুদ্ধি হইতে আসে নাই__ 
আসিয়াছে একদিকে বাংলার প্রারুতিক সৌন্দর্য সম্বন্ধে আবেগ হইতে, 
অপরদিকে বই বা গল্পগুলির মধ্যে যে লোকোন্তর ভাব আছে তাহার 
অনুভূতি হইতে । ভালবাসা, ভক্তি ও শ্রদ্ধা হইতে যাহা! আসে, বিচার 
বাতর্ক হইতে তাহা কখনই আসিতে পারে না; আজিকার দিনের 
হৃদয়হীন, কচকচি ব্যবসায়ী বাডালীরা ইহা! মনে রাখিলে বনু বাগ- 
বিতণ্ডা হইতে আমর! সাধারণ বাঁঙালীরা ত্রাণ পাইতাম । 

কিন্তু বাঙালীর সামাজিক জীবনের পুরাতন ধারার সহিত কি করিয়া 
নূতন ভালবাসার সমন্বয় করা যায়, সেই হিসাবটা প্রথম হইতেই সঙ্ঞানে 
করা হইয়াছিল। সমস্যাটার সমাধান অবশ্য যুক্তি হইতে আসে নাই, 
তবু উহার রূপনির্ণয় বিচারের দ্বারাই করা হইয়াছিল। যিনি বাঙালী 
জীবনে নূতন ভালবাসার প্রবর্তনকর্তা, অর্থাৎ বঙ্কিমচন্দ্র, তিনি প্রথম 
হইতেই এ বিষয়ে অবহিত ছিলেন। তিনি কি করিয়া এই ভালবাসাকে 
আমাদের জীবনে আনিলেন, তাহার কথা পরে বলিব । এখানে শুধু 
জিনিসটাকে বাঙালীজীবনে প্রতিষ্ঠিত করার সম্বন্ধে যে সমস্যা ছিল, 
সে বিষয়ে বঙ্কিমচন্দ্র কি বলিয়াছিলেন তাহাই উদ্ধৃত করিব। তিনি 
বুবিয়াছিলেন, পাশ্চাত্য ভালবাসাকে পাশ্চাত্য আচরণের মধ্যে আবদ্ধ 


বাঙালী সমাজ ও নৃতন ভালবাসা! ১৪৩ 


রাখিয়া এদেশে চালানে! যাইবে না। তাই বন্ধু দীনবন্ধু মিত্রের 
লীলাবতী এবং অন্যান্য বই-এর আলোচনা প্রসঙ্গে তিনি লিখিয়াছেন, 
“লীলাবতী বা কামিনীর শ্রেণীর নায়িকা সম্বন্ধে তাহার কোন অভিজ্ঞতা 
ছিল না, কেন না কোন লীলাঁবতী বা কামিনী বাঙ্গীল| সমাজে ছিল না 
বানাই। হিন্দুর ঘরে ধেড়ে মেয়ে, কোঁ্টাশিপের পাত্রী হইয়া, যিনি কোর্ট 
করিতেছেন, তীহাঁকে প্রীণ মন সমর্পণ করিয়া বসিয়া আছে, এমন মেয়ে 
বাঙ্গালী সমাঁজে ছিল না__কেবল আজকাল নাকি ছুই একটা হইতেছে 
শুনিতেছি। ইংরেজের ঘরে তেমন মেয়ে আছে; ইংরেজ কন্তা-জীবনই 
তাই।” 
ইহা ১৮৮৬ সনে লেখ! । এই বসরেই সত্যকার একটি বাঙালী মেয়ের 
রচিত ব্যর্থ প্রেম সম্বন্ধে একটি করুণ কাব্য প্রকাশিত হইয়াছিল । 
বঙ্কিমচন্দ্র ইহার পূর্ব ইতিহাস শুনিয়া থাকিবেন, কারণ মেয়েটির পিতাকে 
তিনি চিনিতেন। তাই হয়ত পৃর্বোল্লিখিত ইঙ্গিত তিনি করিয়াছিলেন । 
কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র ইহাও জানিতেন যে, পাশ্চাত্য ধরনের পূর্বরাগ প্রাচীন 
ভারতবর্ষে ছিল; তাই তিনি লিখিলেন, 
“আমাদিগের দেশের প্রাচীন সংস্কৃত গ্রস্থেও তেমনই আছে। দীনবন্ধু 
ইংরেজি ও সংস্কৃত নাটক নবেল ইত্যার্দি পড়িয়া এই ভ্রমে পড়িয়াছিলেন 
যে, বাঙ্গাল! কাঁব্যে বাঙ্গীলার সমাঁজস্থিত নায়ক-নায়িকাকেও সেই ছাঁচে 
ঢালা চাই। কাঁজেই যাহা নাই, যাহার আদর্শ সমাজে নাই, তিনি তাই 
গড়িতে বসিয়াছিলেন |” 


সেজন্য দীনবন্ধুর এই সব বই জন্বন্ধে বঙ্বিমচন্দ্রের শেষ বিচার 
এই 

“এখানে পাঠক দেখিলেন যে, দীনবন্ধুর সামাজিক অভিজ্ঞতাও নাই-- 

স্বাভাবিক সহান্ৃভৃতিও নাই । এই ছুইটি লইয়! দীনবন্ধুর কবিত্ব। কাঁজেই 

এখাঁনে কবিত্ব নিক্ষল 1৮ 

দীনবন্ধুর নায়কদের সন্বন্ধেও বঙ্কিমচন্দ্র এই একই আপপ্তি 


ভুলিয়াছিলেন, 


১৪৪ বাঁডালী জীবনে রমণী 


“দীনবন্ধুর নায়কগুলি সর্বগুণসম্পন্ন বাঙ্গীলী যুবাঁ-কাজকর্শ নাই, 
কাজকর্মের মধ্যে কাহারও 1)1127100[যঃ কাহারও কোটশিপ। 
এরূপ চরিত্রের জীবন্ত আদর্শ বাঙ্গীলা সমাঁজেই নাই, কাঁজেই এখানেও 
অভিজ্ঞতা নাই, সহানুভূতি নাই। কাজেই এখানেও দীনবন্ধুর কবিত্ব 
নিক্ষল |” 


এখানে কিন্তু একটা মজার কথা বলা যাইতে পারে । এত কথা 
জানিয়াও বঙ্কিমচন্দ্র নিজে একটি গল্পে শুধু যে “ধেড়ে বাঙালী মেয়েকে 
নায়কের কোর্টশিপের জন্য প্রতীক্ষমানা করিয়াই রাখিয়াছিলেন তাহাই 
নয়, এগারো বতুসর বয়সে পূর্বরাগ অনুভব করিবার পর-_তাহাও চাক্ষুষ 
না দেখিয়া--তাহাকে দিয়াই উনিশ বৎসর বয়সে নায়ককে প্রথম 
দেখার পরই “প্রপোজ পর্যন্ত করাইয়াছিলেন। গল্পটা অবশ্থা 'রাধারাণী” । 
ইউরোপে একমাত্র রাণী হইলে ভ্ত্রীলোকে প্রপোজ" করে, নহিলে পুরুষে 
করে, রাঁধারাণী এই কথাটা জানে ইহা দেখাইয়া বঙ্কিমচন্দ্র তাহাকে 
দিয়! এই কথাগুলি বলাইয়াছিলেন, 

“ুঁতে আমাঁতেই সে কথাটা হবে কি? ক্ষতি কি, ইংরেজের মেয়ের কি 

হয়? আমাদের দেশে তাঁতে নিন্দা আছে, তা আঁমি দেশেন লোকের 

নিন্নার ভয়ে কোন্‌ কাঁজটাই করি? এই যে উনিশ বৎসর বয়স পর্যন্ত 

আমি বিয়ে করলেম্‌ না, এতে কে ন। কি বলে? আমি ত বুড়ো বয়স 

পধ্যন্ত কুম!রী ,_তা এ ক!জটাও না হয় ইংরেজের মেয়ের মত হইল ।” 

কিন্তু তখনই রাধারাণীর মনে পড়িল যে, সাধারণ ক্ষেত্রে ইংরেজী 
প্রথা অন্য রকম। বহ্কিমচন্দ্র তাহার বিবরণ দিতেছেন, 

“তার পর রাঁধারাঁণী বিষঞ্ণ মনে ভাবিল, তা যেন হলো; তাতেও বড় 

গোল! মোমবাতিতে গড়া মেয়েদের মাঝখানে প্রথাটা এই যে, পুরুষ- 

মানুষেই কথাটা পাঁড়িবে। ইনি যদ্রি কথাটা না পাড়েন ?” 

এই অবাঙালী ধরন-ধারণ দেখিয়া আমি অল্পবয়সে ভাবিতাম, 
বঙ্কিমচন্দ্র আধুনিকাদের ব্যঙ্গ করিবার জন্য গল্পটা লিখিয়াছিলেন। 
পরে কিন্তু এই মত পরিবর্তন করিয়াছি। এখন আমি মনে করি, 


বাঙালী সমাজ ও নৃতন ভালবাস! 


বন্কিমচন্দ্র এই প্রেমের গল্পটা আস্তরিকভাবেই লিখিয়াছিলেন, 'এধ 
গল্পটা উত্রাইয়াছে। কি উপায়ে এই ধরনের গল্লকে বিশ্বাস করাইতে 
হয় সে বিষয়ে বঙ্কিমচন্দ্রের ধারণা! খুবই স্পষ্ট ছিল, নহিলে তিনি এত 
বড় ওপন্যাসিক হইতে পারিতেন না। 

বাঙালীজীবনে নূতন ধরনের রোমার্টিক . প্রেমকে প্রতিষ্ঠার পথে 
যে মুলগত বাধার প্রশ্ন বঙ্কিমচন্দ্র ুলিয়াছিলেন তাহার সমাধান কি 
করিয়া হইল উহা পরে বলা হইবে । আপাতত তখনকার বাঙালী 
সমাজের একটু পরিচয় দিতে হইবে এবং সেই সমাজের সহিত নৃতন 
ভালবাসার যোগাযোগ কি রূপ ধরিল, তাহার একটু আলোচনা করিব। 

উহা! অবশ্য উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকের বাঙালী সমাজ । 
কিন্তু উহা এক সমাজ নয়, দুইটি সমাজ-_অর্থাও কলিকাতার বাঁডালী 
সমাজ ও পল্লীগ্রামের বাডালী সমাজ । এই ছুইএর মধো ধর্ম ও লক্ষণের 
বনু পার্থক্য ছিল। সেইজন্য প্রেমকেও বাঙালী সমাজের এই ছুইটি 
ভাঁগের সহিত বিভিন্নভাবে মিলিতে হইয়াছিল । 

কলিকাতা মহানগরের আবির্ভাবই বাঙালী সমাজের এই দ্বিত্ের 
মূলে; কারণ কলিকাতা শুধু শহর হিসাবেই ভারতবর্ষে একটা নৃতন 
জিনিস, উহা! পাশ্চাত্য মহানগরের একট! দেৌ-আসলা রূপ । উহার 
উত্তব ইংরেজের শীসন, ইংরেজের শিল্পবাঁণিজ্য, ইংরেজের জীবনযাত্রা 
হইতে হইয়াছিল । ইংরেজের পক্ষে ভারতবর্ষে বাম কর! একটা প্রাচ্য 
লগুন স্যস্টি না করিয়া সম্ভব হয় নাই। বাঙালী যখন বৈষয়িক উন্নতি 
বা নিতান্তপক্ষে জীবিকার জন্য এই প্রাচ্য লগ্ডনে বাস করিতে আরম্ত 
করিল, তখন হইতে তাহার জীবনের বাহক, সামাজিক, ও মানসিক 
আবেষ্টনী বদলাইয়া গেল--গ্রামে যে বাঙালী ছিল সে তাহা আর 
থাকিতে পারিল না । 

কিন্তু ইহাও দেখা গেল যে পুর্ণভাবে নৃতন নাগরিক জীবন গ্রহণ 
করার ক্ষমতাঁও তাহার নাই। তাই নূতন ধরনের জীবনযাত্রার চাপে 
একদিকে যেমন সে অসহায়ভাবে বদলাইতে লাগিল, তেমনই সে মনে 


১৩ 





১৪৬ বাঙালী জীবনে রমণী 


মনে একটা অসামগ্তস্তের কষ্টও অনুভব করিতে লাগিল। স্তরাং 
বাঙালী সমাজের যে দ্বিত্বের কথা বলিলাম, তাহার দুই দ্দিক সমান হইতে 
পারে নাই-_-একদিক প্রবল এবং দুনিবার হইলেও মনের দিক হইতে 
অস্বাভাবিক ও অস্বাস্থ্যকর হইল, অন্য দিক উহার তুলনায় দুর্বল এবং 
ক্ষয়িষু হইলেও স্বাভাবিক এবং স্বাস্থ্যবান রহিল। বাংল! সাহিত্যে 
পাশ্চাত্য রোমান্টিক প্রেমের আবির্ভাবের পর এই দ্বিত্বটাও প্রেমের 
চিত্রে প্রতিফলিত হইল, অর্থাৎ বাঁডালীর নূতন ভালবাসা কলিকাতায় 
দেখা গেল এক রূপে, পল্লীজীবনে অন্য রূপে । 

কলিকাতার বাহক চেহারার সহিত-_-ইটের উপর ইট চাপানো 
মানুষউইএর টিবির সহিত, এই মানসিক ও সামাজিক দ্বিত্বের একটা 
ঘনিষ্ঠ যোগ আছে। স্থৃতরাং এই দৃশ্যগত বৈষম্যের আলোচনা আগের 
পরিচ্ছেদে করা উচিত ছিল, অর্থাৎ বাংলার জলের সংস্পর্শে প্রেমের 
কি রূপ দাঁড়াইয়াছিল তাহা! যেমন দেখানে। হইয়াছে, তাহার সঙ্গে সঙ্গে 
কলিকাতার ইটের সংস্পর্শেও প্রেমের কি রূপ দেখা দিয়াছিল তাহার 
কথা বলাও উচিত ছিল। কিন্তু বলি নাই এই কারণে বে, কলিকাতার 
বাহিক রূপকে “দৃশ্য বলিলেও “প্রাকৃতিক দৃশ্য বলা চলে না-_তৃতীয় 
পরিচ্ছেদে শুধু বাংলার প্রাকৃতিক সম্পদের সহিত নৃতন ভালবাসার কি 
সম্পর্ক তাহা! বলাই আমার অভিপ্রেত ছিল। কলিকাতায় বাংলার 
দৃশ্যগত দৈন্য ভিন্ন কিছু দেখা দেয় নাই। তাহা ছাড়া আরও বড় কথা 
এই যে, কলিকাতার বাহক দৃশ্য কলিকাতার সামাজিক জীবনেরই বস্তুগত 
প্রকাশ । স্থতরাং কলিকাতার সমাজ ও কলিকাতার দৃশ্যকে একই জিনিস 
বলিয়া ধরিয়া! এই পরিচ্ছেদে প্রেমের সহিত এই ছুইটারই কি সম্পর্ক 
তাহা একই সঙ্গে বিচার করিব । 

কলিকার্তার বাহিক চেহারার যে কুশ্রীতা আমি বত্রিশ বসর 
সেখানে বাস করিয়া প্রতিটি মুহূর্তে অনুভব করিয়াছি, তাহা আমার 
কাছে এখনও একটা বিভীষিকার মত। বড় শহর হইলেই যে সৌন্দর্য 
ও শ্রঙ্থল। বজিত হইতে হইবে তাহার কোনও অর্থ নাই। আমি লগ্ন, 


বাডালী সমাজ ও নৃতন ভালবাসা ১৪৭ 


প্যারিস এবং রোম নিজে ভাল করিয়৷ দেখিয়াছি । এই তিনটি শহরের 
সর্বত্র সৌন্দর্য আছে তাহা বলিব না, কিন্তু কোথাও পরিচ্ছন্নতা ও 
শৃঙ্খলার অভাব লক্ষ্য করি নাই। তাহার উপর যে জায়গাগুলি সুন্দর 
সেগুলি অপূর্ব সৌন্দর্যে অভিষিক্ত । লগুনে সেপ্টজেমস্‌ পার্কে, প্যারিসে 
লুভ্‌রের বা লুক্সমবুগ্গের চারিদিকে, রোমে সেপ্ট পিটার্সের অঙ্গনে ব! 
ক্যাপিটলে যে সৌন্দর্য দেখিয়াছি তাহা বিভিন্ন ধরনের হইলেও, মনকে 
সমানভাবেই অভিভূত করে । কলিকাতায় এক গড়ের মাঠেবা নদীর ধারে 
গিয়। উহার ক্ষীণ ছায়! ভিন্ন কিছু পাই নাই-__অন্যাত্র তো সর্বদাই নিঃশ্বাস 
বন্ধ হইয়৷ আসিয়াছে- দেহের নিঃশ্বাস এবং মনের নিঃশ্বাস ছুইই। 

এই বাহিক সঙ্কীর্ণতা এবং কুশ্রীতা কলিকাতাবাসীদের মনেও 
সংক্রামিত হইয়াছিল। ইহার একটা মাত্র দৃষ্টান্ত দিব। আমি তখন 
চবিবশ-পঁচিশ বৎসরের যুবক_ মিলিটারী আ্যাকাউণ্টস্‌ ডিপার্টমেন্টে 
কাজ করি। আমার এক সহকর্মী-_কলিকাতাবাসী এবং প্রৌট__- 
আমাকে একদিন জিজ্ঞাসা করিলেন” 

“ভাই, ভূমি রোজ গড়ের মাঠে বেড়াও ?” 

ন-_“হা।” 

সহঃ-_ কতদূর যাও ?? 

ন-_“ভিক্টোরিরা মেমোরিয়্যাল পর্যন্ত ।৮ অবশ্য এসপ্লানেড হইতে । 

সহঃ--পারো ? আমিও ভাই কখনো-কখনো ভাবি হেঁটে যাব। 
কিন্তু বলব কি, আভউন্্রাম সায়েবের স্ট্যাচুর কাছে গিয়ে যখন ফাকা মাঠটা 
দেখি তখন প্রাণটা কেমন হু-হু করে ওঠে, আর ব্রামে উঠে পড়ি ।” 

ইহার সহিত পুর্ব পরিচ্ছদে বণিত স্বাভাবিক বাডালীমনের তুলনা 
করুন। 

এখানে একটা বড় আপত্তি উঠিবে, এবং সে আপন্িটা যথার্থ। 
কলিকাতার কুণ্রী সন্ীর্ণতার বস্তুগত ও মনোগত রূপ সম্বন্ধে যাহা 
বলিলাম তাহা সত্বেও এ কথা অস্বীকার করিবার উপায় নাই যে, 
কলিকাতাই বাঙালীর বর্তমান যুগের সংস্কৃতির কেন্দ্র ছিল; সাহিত্য, 


১৪৮ বাঙালী জীবনে রমণী 


সমাজ, ধর্ম, নীতি, রাজনীতি, ব্যক্তিগত আদর্শবাদ, এই সব বিষয়ে নৃতন 
ধারণার উদ্ভব কলিকাতাতেই হইয়াছিল; নৃতন কর্মধারাও কলিকাতা 
হইতেই বহিয়াছিল। তাহা হইলে ক্ষুদ্রতা বা কুশ্রীতাই কলিকাতার 
সবটুকু নয়-_কলিকাতার একটা মহান্‌ দিকও আছে । 

এ কথা আমি অস্বীকার করিতে পারি না। প্রথমত, ব্যক্তিগত 
কারণে-_-আমি মানসিক ধর্মে যাহা হইয়াছি তাহ! কলিকাতাতে থাকিয়াই 
হইয়াছি, বিলাত গিয়া হই নাই ; আমি শিক্ষা কলিকাতাতেই পাইয়াছি; 
জীবনের আদর্শকেও কলিকাতায়ই পুর্ণ করিয়াছি। কলিকাতার খণ 
অস্বীকার করা আমার পক্ষে কৃতদ্তা হইবে । বাঙালী জাতির বর্তমান- 
কালের ইতিহাসও আমি যতটুকু পড়িয়াছি, তাহাতেও কলিকাতার কি 
দ্রান তাহ! দেখিয়াছি । সুতরাং একদিকে কলিকাতাই বাঙালীর উন্নতির 
মূলে তাহা বলিতে আমার দ্বিধা নাই। 

কিন্ত সেদিক, বাঙালী জীবনের যেদিক লইয়া এই বইএ আমি 
আলোচনা করিতে যাইতেছি সেদিক নয়। ছুইটা ইংরেজী কথা ব্যবহার 
করিয়া বলিব__কলিকাতার মাহাত্ম্য বাঙালীর “পাবলিক লাইফ" ও 
'পাব্লিক থিঙ্কিং-এ, “প্রাইভেট লাইফ” ও “প্রাইভেট ফিলিং-এ 
নয়। কলিকাতায় শিক্ষায়তন ছিল, শাসনযন্ত্র ছিল, লাইব্রেরী ছিল, 
রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল, সভাসমিতি ছিল, খবরের কাগজ ছিল, 
তাই কলিকাতা হইতে এই দ্রিকগুলিতে বাঙালীর মানমিক জীবনের 
প্রসার হইবার সহায়তা হইয়াছিল, বলিতে কি কলিকাতা ভিন্ন 
উহা সম্ভবই হইত না। কিন্তু বাডালীর ব্যক্তিগত জীবনে যে স্তুখ, 
উচ্ছাস, বা আনন্দের অনুভূতি আসিয়াছিল তাহাতে কলিকাতার 
ও অনুভূতিকে শুধু ভারাক্রান্ত ও গীড়িতই নয়, অনেক ক্ষেত্রে 
নির্বাপিত করিয়া দিত। কলিকাতা ও কলিকাতার সমাজ লইয়া সেজন্য 
উদ্দারতম সাহিত্যিক স্ষ্টি হয় নাই-_অন্তত রবীন্দ্রনাথ যাহাকে “সহজ 
সুন্দর উন্মুক্ত দরাজ এবং অশ্রুবিন্দুর মত উজ্জ্বল কোমল স্থগোল করুণ” 


বাঙালী সমাজ ও নৃতন ভালবাসা ১৪৯ 


বলিয়াছেন তাহা হয় নাই। অথচ গ্রাম্য জীবন লইয়া যে সব গল্প তিনি 
লিখিয়াছেন তাহার প্রত্যেকটিই তাই। 

রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যপ্রতিভা অসাধারণ স্তৃতরাং কলিকাতার জীবন 
লইয়াও তিনি যে-সব গল্প লিখিয়াছেন তাহা সাধারণ হয় নাই। এমন 
কি কলিকাতার জীবনের ঘ্বণ্যতম ও ভুচ্ছতম দিক লইয়া তিনি যে তিনটি 
গল্প লিখিয়াছেন, তাহা বিশুদ্ধ আর্ট হিসাবে অন্য কোনও গল্পের কাছে 
পরাজয় স্বীকার করিবে না। কিন্তু এইগুলি নিষ্ঠুর ও মর্মস্তর, হৃদয়কে 
যেন আসিডের ছিটা দিয়া পুড়াইয়া ফেলে। উহাদের সৌন্দর্য গোস্ষুর 
সাপের সৌন্দর্যের মত, কীটভোজী উদ্ভিদের সৌন্দর্যের মত, পারদের 
সৌন্দর্যের মত। লোকোন্তর অনুভূতি থাকিলে কলিকাতার কদর্যতা 
এবং ভুচ্ছত লইয়াও কি ধরনের গল্প লেখা যায় তাহার তিনটি মাত্র 
দৃষ্টান্ত দিব। এই তিনটি 'কঙ্কাল', “মানভগ্জন' ও “মধ্যবতিনী”। 

কঙ্কাল গল্পে বলিবার ভঙ্গী এবং আসল কাহিনীটাকে অবতারণা 
করিবার উপলক্ষ্য যেরূপ, তাহার মধ্যে একটা লঘুতা আছে। ইহার 
জন্য সমস্ত গল্পটাকেও লঘু মনে হয়-_উহা'র ভয়াবহ সৌন্দর্য অনেকের 
কাছেই অনুপলবধ থাকে । কিন্তু এই বাহক কাঠামোর পিছনে চরিত্র 
যেটি আছে, উহ সর্বদেশে সব কালে নারীচরিত্রের একটা পরিচিত রূপ-_ 
মোহিনী অথচ সব্নাশিনী। এই চরিত্রের নারী চিরন্তনী মানসী 
ভ্যাম্পায়ার__নিজের অপরূপ সৌন্দর্য তাহার কাছে শিকারের অস্ত্র মাত্র; 
তাহার ভালবাসার ক্ষমত নাই কিন্তু উগ্র কামনা আছে ; সেই তীব্র 
কামনা একেবারেই আত্মপরায়ণ, তাই এই নারী পুরুষকে আত্মতৃপ্তির 
উপকরণ হিসাবেই গ্রাস করিতে চায়; সুতরাং বঞ্চিত হইলে হিংজ্্ হইয়৷ 
উঠিতে পারে, তখন তাহার আর দয়া বা মমত৷ থাকে না। 

এই কুহকিনী কীটসের 12. 196115 2076 92105 1791০1-র 
অপেক্ষাও ভয়ের বস্ত্র, কারণ কীটসের মায়াবিনীর একটা আর্ত নির্ভর- 
শীলতা আছে, পেলব উদাস ভাব আছে, অস্ফুট প্রেমগুপ্রন আছে, মধুর 
চুম্বন আছে, অপরকে মায়ামুগ্ধ করিবার জন্য তাহার যে চেষ্টা উহার 


১৫০ বাঙালী জীবনে রমণী 


মধ্যে আত্মসমর্পণও আছে। এই কুহকিনীর এসব কিছুই নাই, এ 
হীরকের মত দীপ্ত অথচ গোলাপের মত প্রস্ফুটিত, আবার রূপে লাবণ্যময়ী 
হইলেও হীরকের মতই কঠিন ও বিষাক্ত । সে পুরুষকে গ্রাস করিতে 
চায় নিজে তিলমাত্র আত্মসমর্পণ না করিয়া__যেন সে একটা অপ্রা- 
রূপিণী বিষাক্ত উর্ণনাভ, যাহার কাজই জাল বিস্তার করিয়া পুরুষ-মক্ষিকা 
খাওয়া। 

নায়িক শ্বশুরের মুখ দিয়া নিজেকে “বিষকন্যা” বলিয়৷ বর্ণনা করিয়াছে । 
এখানে রবীন্দ্রনাথের সম্ভবত একটু ভুল আছে। 'বিষকন্যাঃ সংস্কৃত 
সাহিত্যে পরিচিত, মুদ্রারাক্ষস' ও “কথাসরিৎসাগরে” ইহার উল্লেখ আছে। 
ইহাদের সহিত সহবাস করা মাত্র পুরুষের মৃত্যু হয়। সেইজন্য রাজা 
এবং রাজ্যকামীরা শক্রবধ করিবার জন্য উহাদিগকে প্রলুব্ধকারিণী করিয়া 
শত্রুর কাছে পাঠাইতেন। বিশেষ গ্রহ-নক্ষত্রের যোগে বিশেষ বিশেষ 
বারে উহাদের জন্ম ঘটিত, লক্ষণ দেখিয়া বা কার্ষকলাপের হিসাব লইয়! 
উহাদিগকে খুঁজিয়া বাহির করা হইত। 

এই অর্থে কঙ্কালে'র নায়িকা বিষকন্যা নয়, কারণ তাহার স্বামীর 
যখন মৃভ্যু হইল, তখন সে একেবারে বালিকা, প্রাচীন বিষকন্যার 
মত কাহারও মৃত্যু ঘটাইবার বয়স তাহার হয় নাই। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ 
হয়ত শুধু কুলক্ষণা ও অমঙ্গলকারিণী অর্থেই এটিকে “বিষকন্া+ 
বলিয়৷ বর্ণনা করিয়াছিলেন । ফরাসী ভাষায় যাহাকে 16071700 1909,10 
বলে, নায়িকা যে তাহ! সে-বিষয়ে কোনও সন্দেহ নাই। তাহার 
সামিধ্য বিপজ্জনক অথচ তাহার আকর্ষণে কাহারও অবিচলিত থাকিবার 
উপায় নাই। পাঠকেরও তাহার আকর্ষণ হইতে বিপদ আছে, তাই 
সেও যাহাতে বাঁচিতে পারে এই উদ্দেশ্যে রবীন্দ্রনাথ এই অপরাধিনী 
রূপসীকে কস্কালের সহিত যুক্ত করিয়াছিলেন। সেই কঙ্কাল যেন 
“তফাত যাও” তফাৎ যাও এই কথা বলিয়া স্থন্দরীর সর্বনাশকারী 
লাবণ্যের কাছ হইতে দূরে থাকিবার জন্য সকলকে সাবধান করিতেছে । 
এই কঙ্কাল না থাকিলে হয়ত পাঠক পর্যস্ত তাহার স্থুডোল বানু, আরক্ত 


বাঙালী সমাজ ও নৃতন ভালবাসা ১৫১ 
করতল ও লাবণ্যশিখার মত অঙ্গুলি হইতে বিষের গুঁড়া গ্লাসে পড়িতেছে 
স্পষচক্ষে দেখিয়াও স্থরাটুকু নিঃশেষে চুমুক দিয়া ফেলিতেন। 

কিন্তু রবীন্দ্রনাথের কবি-প্রতিভা যে উপকরণ হইতে গল্পটাকে এই 
স্তরে উঠাইয়াছিল সে উপকরণ কলিকাতার শ্রেণীবিশেষের জীবনের 
একটা পঙ্কিল দিক। “কঙ্কালে'র নায়িকার দাদা বড়লোক, বাড়ীর 
অন্দরে বকুল গাছস্ুদ্ধ বাগান ছিল, বাহিরে আস্তাবলে জুড়ি গাড়া 
ছিল। এই ধরনের ধনীবাড়ীতে অতিশয় রূপসী মেয়ে যেমন দেখা 
যাইত, তেমনই কামনারও একটা উলঙ্গ এবং উন্মাদ রূপ প্রকাশ পাইত। 
রবীন্দ্রনাথ কলিকাতায় যে-অঞ্চলে, যে-সমাজে এবং যে-ভাবে বড় 
হইয়াছিলেন, তাহাতে এই সুন্দরীদের অস্তিত্বের কথা তাহার না-জান৷ 
থাকিবার কথা নয়। বাস্তববাদী হইলে এই ধরনের জীবন অবলম্বন 
করিয়া তিনি হয়ত একটি “মাদাম বোভারী” লিখিতেন, কিন্তু তাহার 
প্রতিভ। অন্য রকম হওয়াতে যে গল্পটা খাড়া করিলেন, তাহাকে পাপের 
ফুল বলা যাইতে পারে। 

“মানভ্জন'-ও এই ধনীসমাজেরই গল্প। উহাতে গিরিবালার 
প্রতিশোধের যেটুকু কাহিনী আছে, উহা কবির রচিত উপসংহার, 
[966০ 15501০০; আসলে গল্পটা বাডালীসমাজে এবং বিশেষ করিয়া 
কলিকাতার ধনীবাড়ীতে রূপের নৃশংস অপমানের কাহিনী । এই অব- 
মাননার কিছু আভাস দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে দিয়াছি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ 
এই ব্যাপারটাকে আটের উচ্চতম স্তরে ভুলিয়াছেন, কিভাবে 
ভুলিয়াছেন তাহার পরিচয় দিবার আগে কেন উহা! ঘটিত তাহার কথা 
বলা আবশ্যক । 

রূপবতী মেয়েদের প্রায়ই অল্পবয়সে বিবাহ হইয়া! যাইত। বিবাহের 
বাজারে উহাদের বেশ চাহিদা ছিল, আর পিতারাও কন্যার সাংসারিক 
ন্বখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথ! ভাবিয়! তাহাকে রূপের বাজারে বিক্রয় করিতেন। 
এই বড়লোকের ছেলেরা! সাধারণত বিবাহের পুর্ব হইতেই বেশ্থা৷ বা 
উপপত্বীর সংসর্গ করিয়া অভ্যস্ত থাকিত। সুতরাং সুন্দরী পত্বী কিছু 


১৫২ বাঙালী জীবনে রমণী 


দ্রিনের জন্য একটি অতিরিক্ত উপপত্বীর পদ পাইত। এই সাময়িক 
আকর্ষণ ঘুচিয়৷ গেলে ধনীপুত্র বারাঙ্গনার কাছে ফিরিয়৷ বাইত ও পত্বী 
কার্যত বিধবার জীবন যাপন করিত। 

'মানভগ্রন” রূপের এই অবমাননারই একটি নিদারুণ অথচ স্থন্দর 
গল্প। গিরিবালার রূপ সে কি! “শোবার ঘরে নানা বেশ এবং 
বিবেশ বিশিষ্ট বিলাতী নারীমূত্তির বাধানো৷ এনগ্রেভিং টাঙানো ; কিন্তু 
প্রবেশদ্বারের সম্মুখবর্তী বৃহ আয়নার উপরে ষোড়শী গৃহস্বামিনীর 
যে প্রতিবিম্বটি পড়ে, তাহা দেওয়ালের কোনো ছবি অপেক্ষা সৌন্দর্যে 
নুন নহে। গিরিবালার সৌন্দর্য অকম্মাৎ আলোকরশ্মির ন্যায়, বিস্ময়ের 
হ্যায়, নিদ্রাভঙ্গে চেতনার ন্যায় একেবারে চকিতে আসিয়া আঘাত করে 
এবং এক আঘাতে অভিভূত করিয়া দিতে পারে ।” 

কিন্তু এই সৌন্দর্যের উপাসক তাহার স্বামী নয়। সে "যাহাকে 
দাসখত লিখিয়া দিয়াছে, তাহার নাম লবঙ্গ_সে থিয়েটারে অভিনয় 
করে__সে স্টেজের উপর চমণকার মুছণ যাইতে পারে-সে যখন 
সানুনাসিক কৃত্রিম কীছুনির স্বরে, হীপাইয়া হাপাইয়া টানিয়া টানিয়া 
আধ-আধ উচ্চারণে প্রাণনাথ”, প্রাণেশ্বর” করিয়া ডাক ছাড়িতে 
থাকে, তখন ধুতির উপর ওয়েষ্টকোট পরা ফুলমোজামণ্ডিত দর্শকমণ্ডলী 
“এক্েলেণ্ট” “এক্সেলেণ্ট” করিয়া উচ্ছুসিত হইয়া উঠে 1৮ 

একদিন গিরিবালা তাহার স্বামীকে পাইল, ভাবিল তাহাকে জয় 
করিবে। কিন্তু গোপীনাথ “তাহাকে চাঁপিয়া ধরিল এবং তাহার হাত 
হইতে বাজুবন্ধ, গলা হইতে কণি, অঙ্গুলি হইতে আংটি ছিনিয়া লইয়া 
তাহাকে লাখি মারিয়া চলিয়া গেল 1৮” কাহারও নিদ্রাভঙ্গ হইল না । “কিন্তু 
আন্তরের চীুকারধ্বনি যদি বাহিরে শুনা যাইত, তবে সেই চৈত্র মাসের 
সথখস্ৃপ্ত নিশীথিনী অকস্মাৎ তীব্রতম আর্তত্বরে দীর্ণ-বিদীর্ণ হইয়া যাইত |” 

এর সঙ্গে সঙ্গে প্রসঙ্গত পাঠককে গিরিবালার ঘরের আসবাবপত্রের 
বর্ণনাও লক্ষ্য করিতে বলিব । উহাও গল্পটা বাডালীসমাজের কোন্‌ যুগের 
কোন্‌ স্তর হইতে আসিয়াছে তাহার সুচক। 


বাঙালী সমজি ও নৃতন ভালবাসা ১৫৩ 


অবশেষে মধ্যবতিনী' গল্পের একটু আলোচন! করিব। আগের হুইটি 
গল্প কলিকাতার ধনী সমাজের, এই গল্পটি কলিকাতার অতি-সাধারণ 
মধ্যবিদ্ত সমাজের । ইহাতে পাপ বা! পঙ্কিলতা ছিল না বটে, কিন্তু উহার 
একঘেয়ে, অবিচিত্র, অপরিবতিত, ও অপরিবত'নীয় সামান্যতা তেমনই 
মারাত্বক ছিল। একরাশি ধুল! চাঁপা দিয়! যদি কাহাকেও বাঁচিয়া৷ থাকিতে 
বলা হয়, এই সমাজে বাস করিতে বলা তাহারই মত । 

রবীন্দ্রনাথের জন্ম কলিকাতার সন্ত্াম্ত জমিদার-বংশে, তাহার 
সামাজিক জীবনও একেবারে ধনীসমাজে মাবদ্ধ না থাকিলেও সচ্ছল 
বা সম্পন্ন মধ্যবিদ্ত গৃহের বাহিরে যাইত বলিয়া মনে করি না। কিন্তু 
কেরানী-জাতীয় মধ্যবিত্ত গৃহস্থের বাড়ী ও জীবনের সহিত তিনি 
পরিচিত হইলেন কি করিয়া? অথচ এই ধরনের গৃহস্থবাড়ীর বাহিক 
ও মানসিক রূপের অতি নিখুঁত চিত্র মধাবতিনী গল্পে আছে। 
উহা রবীন্দ্রনাথের অন্তরূ্টি ও তীক্ষ বহিমুখীন দৃষ্টির সমন্বয়ে সম্ভব 
হইয়াছিল । 

এই মধ্যবিভ্ত জীবনে আপিস ও রোয়াকের, এবং রান্নাঘর ও শোবার 
ঘরের আবর্তন ভিন্ন কিছুই ছিল না। উহাতে মানসিক এশ্বর্য আসার 
কোনও সম্ভাবনাই ছিল না, মানসিক সম্পদের মধ্যেও যে জিনিসটা, 
কোনওক্রমে আসিতে পারিত তাহা শুধু একটা উচ্ছ্বাসহীন, জোয়ার 
ভাটাহীন, বর্ণহীন কিন্তু স্বচ্ছ ও নির্মল স্সেহ, স্বল্প হইলেও স্তুখের, ধারায় 
ক্ষীণ হইলেও প্রবহমাণ । নিবারণ ও হরন্ুন্দরীর জীবনে এই স্সেহটুকুই 
ছিল মূল্যবান মানসিক বস্তু । 

এই জীবনে একদিন হ্রস্ন্দরীর গুরুতর পীড়া হইতে একটা সঙ্কট 
উপস্থিত হইল, তাহার সহিত একট! মানসিক অসামান্যতাও দেখা দিল-_ 
সেটা হরম্থন্দরীর আত্মত্যাগের উচ্ছাস । পাশের বাড়ীর একটা অতি 
ভুচ্ছ বাগান দেখিয়া তাহার মনে একটা যেন আনন্দের সঙ্গীত উঠিতে 
লাগিল। সেই আনন্দের বশে তাহার মনে একটা আত্মবিসর্জনের ইচ্ছা 
বলবতী হইয়। উঠিল, আনন্দের উচ্ছ্বাসে সে নিজেকে একট মহত ত্যাগ 


১৫৪ বাঙালী জীবনে রমণী 


ও বৃহ হুঃখের উপর নিক্ষেপ করিতে চাহিল- নিজে নি সন্তান! বলিয়া 
প্রৌট স্বামীকে আবার বিবাহ করাইয়া । 
স্বামী অবশেষে বিবাহ করিল। তখন তাহাদের ঘরে আর একটা 
নৃতন জিনিসের সন্তাবন। দেখা দিল-__সেটা বঙ্কিমচন্দ্রের প্রবতিত নূতন 
ভালবাসা । ইহাতে নিবারণের মনের যে অবস্থা হইল উহা! বাল্যবিবাহের 
উপর স্থুপ্রতিষ্ঠ দাম্পত্যজীবনের ধারার বিসম্বাদী । রবীন্দ্রনাথ বলিতেছেন, 
“একেবারে পাঁকা আমের মধ্যেই যে পতঙ্গ জন্মলাভ করিয়াছে, যাঁহাঁকে 
কোনে কালে রস অন্বেষণ করিতে হয় নাই, অল্পে অঙ্গে রসম্বাদ করিতে 
হয় নাই, তাহাকে একবার বসন্তকাঁলের বিকশিত পুষ্পবনের মধ্যে ছাড়িয়া 
দেওয়া হউক দ্রেখি-_বিকচোন্বুখ গোলাপের আধখোঁলা নুখটির কাছে 
ঘুরিয়া ঘুরিয়া তাহার কী আগ্রহ |” 
কিন্তু না অন্ধ নিবারণ, না অন্ধ হরস্ুন্দরী, কেহই বুঝিতে পারে 
নাই যে তাহাদের জীবন যে ধরনের, উহার মধ্যে ত্যাগ বা ভালবাসার 
মত অসামান্যতার কোন স্থান নাই। এই সমাজের সামান্যতার শরীরিনী 
মৃত্তি হইয়া শৈলবালা দুজনেরই সর্বনাশ করিল। কলিকাতার জীবন- 
যাত্রার এক সামান্যত৷ হইতে হরস্থন্দরীর যে সর্বনাশ হইল, উহাকে সেই 
জীবনযাত্রার আর এক সামান্যতা উপহাস করিতে লাগিল 1 
“প্রদীপ নিভাইয়! দিয়া এই সধব! রমণী যখন অসহা হৃদয়ভার লইয়1 তাহার 
নৃতন বৈধব্য-শয্যার উপর আঁসিয়! পড়িল, তখন গলির অপর প্রান্তে একজন 
সৌখিন যুবা বেহাগ রাগিণীতে মালিনীর গান গাহিতেছিল; আর একজন 
বায়া-তবলায় সংগত করিতেছিল এবং শ্রোতৃবন্ধুগণ সমের কাছে হাঃহাঃ 
করিয়! চীৎকার করিয়! উঠিতেছিল।” 
শৈলবালা মরিয়া যাইবার পরও তাহার! আর আগের জীবন ফিরিয়া 
পাইল না। কলিকাতার জীবনে অসামান্যতা আনিবার প্রচেষ্টায় 
সামান্যতার স্বস্তিও জীবন হইতে নির্বাসিত হইল। শুধু নিদ্রাহীন 
অশান্তিকে দুর হইতে. নটাকণ্ঠের বেহাগরাগিণী আরও অসহনীয় করিয়! 


তুলিল। 


বাঙালী সমাজ ও নৃতন ভালবাসা ১৫৫ 


মানুষের মন ও জীবনের উপর কলিকাতার মারাত্মক প্রভাবের 
দৃষ্টান্ত হিসাবে রবীন্দ্রনাথের 'নষ্টনীড়' গল্লেরও উল্লেখ করিতে পারিতাম, 
কিন্তু উহা ইচ্ছা করিয়া করিলাম না। একসময়ে আমি উহাকে রবীন্দ্র 
নাথের সর্বশ্রেষ্ঠ গল্প না মনে করিলেও পাঁচ-ছয়টি শ্রেষ্ঠ গল্লের মধ্যে 
ধরিতাম। সেই মত পরিবতন করিয়াছি। এখন গল্পটাকে আমার 
কাছে এত অবিচ্ছিন্নভাবে পীড়াদায়ক মনে হয় যে, উহা আমি পড়িতে 
পারি না। উহার দোষ কেবলমাত্র নিষ্ঠ'রতা নয়। যে তিনটি গল্পের 
আলোচনা করিলাম সেগুলিও নিষ্ঠুর, কিন্তু এগুলির মধ্যে ট্রাজেডি? 
আছে, তাই এগুলি পাবক, এগুলির মধ্যে ক্যাথারসিস্” পাওয়া যায় । 
“নফ্টনীড়? ক্ট্রযাজেডি” নয়, নিরবচ্ছিন্ন মানসিক যন্ত্রণা । ম্যাথিউ আর্নল্ড 
এই ধরনের বিষয়বস্তুর আলোচন করিয়াছেন__ 


৬1700 002 25 0175 51005001755 (00100 215007650100500হ ০1 
71101) 11100217  20001260, 170 [90901591  601017701 ০০) 100 
9671%24 ?2 ]170 2০ 6০৭০ 11) 1710]. 076 5416011075 £1045 100 
01 2. 2:061010, 1 01/101৮ 2০070170003 50206 01 0002] 
0150055 13 [90101110) 01261106170 1770116106, 11076 01: 
1651569৮09) 11) 17101) 01)016 19 ০৮০৫0151106 009 1062 900754, 
/)011711/5 00109 00110, [0 97101) 51602010105 (11610 19 11765102015 
30761171725 07070105107 0116 99501100010 ০1 0106120 50107601211) 
0)01,0607,09035 ৮৮1) 01০ ০০০৮ 2 2০008] 1109, 076 276 
[21770017100 02210 5009 1510652110200 01 00 হয 0০০0০ 


15 102117010] 2150,1? 


'নষটনীড়' এই জাতীয় অভিজ্ঞতার বিবরণ। রবীন্দ্রনাথ গল্পটার 
বিষয় কলিকাতার জীবনের একটা সত্যকার ব্যাপার “হইতে পাইয়৷ 
থাকিলেও, উহাকে সাহিত্যের লোকোত্তর জগতে তুলিতে পারেন নাই, 
এইখানে কলিকাত৷ সাহিত্যকে পরাজিত করিয়াছে । 

এইবার পল্লীজীবনের দিকে মুখ ফিরাইয়া সেই জীবনের সহিত নৃতন 
ভালবাসাকে সমন্বিত করিবার কি সমস্তা, তাহার কথ! বিবেচনা করা যাক। 
বাংলার পল্লীজীবনে নীচতা, ক্ষুত্রতা, দ্বেষ, বিবাদ ছিল না! এ কথা কেহ. 
বলিবে না। বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র সকলেরই গ্রাম্যজীবনের এই 


১৫৬ বাঙালী জীবনে রমণী 


দিকটার সহিত ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল। তীহার! সাধারণ গ্রাম্জীবনের 
বাস্তব বর্ণনা দিতে গিয়া এই দ্িকটাকে মোটেই চাঁপা দেন নাই। শরৎ" 
চন্দ্রের পিল্লীসমাজ'ই উহার প্রমাণ । রবীন্দ্রনাথের বন্ধ গল্পে উহার স্পষ্ট 
উল্লেখ আছে-_দিদি' ও 'উলুখড়ের বিপদ গল্প ছুইটি গ্রামের পাপের উপর 
প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু "মেঘ ও রৌদ্র” পল্লীজীবনের ক্ষুদ্রতার আবেষ্টনেও 
উৎ্বলোকে পোৌছিয়াছে। তেমনই “সমস্াপুরণ' গ্রাম্জীবনের একটা 
অত্যন্ত ইতর দুর্বলতার উপর প্রতিষ্ঠিত হইলেও উচ্চন্তরে গিয়াছে। 
গ্রাম্জীবনের কোন্‌ দ্রিকের জন্য তাহা সম্ভব হইয়াছিল উহার আলোচনা 
করিব। আগে প্রথাগত পল্লীজীবনে ভালবাসার পথে আরও যে যে 
বাধা ছিল, তাহার অন্তত একটির বিশেষ উল্লেখ করিব । 

পল্লীজীবনে সামাজিক আঁচারবিরদ্ধ ভালবাসার জন্য স্থান করা 
প্রায় সম্তবই ছিল না। রবীন্দ্রনাথ যে করেন নাই তাহা নয়, কিন্তু 
তিনি উহার সঙ্কট সম্বন্ধেও অবহিত ছিলেন। ব্রাহ্মণের ছেলের সহিত 
কায়স্থের মেয়ের বিবাহ হওয়াতে কি সর্বনাশ উদ্ভত হইয়া আসিতে পারে, 
'ত্যাগ' গল্পে উহার একটি অতি করুণ বর্ণনা আছে। কুম্ুম পরিত্যক্তা 
হইবার অপেক্ষায় বসিয়া ভাবিতেছে,_ 

“যে ভালবাসাকে এতখাঁনি বলিয়া মনে হয়, এত আদর, এত গাঢ়তা, 

যাহার তিলমাত্র বিচ্ছেদ এমন মশ্মান্তিক, যাহার মুহূর্তমাত্র মিলন এমন 

নিবিড়ানন্মময়, যাহাঁকে অসীম অনন্ত বলিয়া মনে হয়, জন্মজন্মান্তরেও 

যাহার অবসান কল্পনা করা যায় না সেই ভালবাসা এই! এইটুকুর 

উপর নির্ভর! সমাঁজ যেমন একটু আঘাঁত করিল অমনি অনীম ভালবাসা 

র্ণ হইয়া এক মুষ্টি ধুলি হইয়া গেল ।” 

তবু পল্লীজীবনে ভালবাসাকে আনা কলিকাতার জীবনে ভাল- 
বাসাকে আনা অপেক্ষা অনেক সহজ হইয়াছিল। পল্লীজীবনের 
ধর্মের সহিত কলিকাতার জীবনের ধর্মের তুলনা করিতে হইলে 'মেঘ ও 
রৌদ্রে'র সহিত “নফটনীড়ে'র স্তুলন! করিতে হয়। ছুইটিই বিষাদ-পূর্ণ 
গল্প, কিন্তু প্রভেদ কত ! 


বাঙালী সমাজ ও নৃতন ভালবাসা $৫৭ 


এই প্রভেদের একটি কারণ পল্লীজীবনের আকাশ, বাতাস, জল 
_ ইহাদের কথা আগে বলিয়াছি। এখন আরও দুইটি জিনিসের 
কথা বলিব। উহাদের একটি পল্লীজীবনের স্বার্থ নিরপেক্ষ সামাজিক 
আচরণ । যেখানে স্বার্থের সংঘাত ছিল না, সেখানে গ্রামের লোকের 
পরস্পর সম্পর্কের মধ্যে একটা সহজ সরল হৃগ্ভতা ছিল। ইহার ফলে 
এই সামাজিক জীবনে একটা অনাবিল মাধুর্য দেখ যাইত। বৈষয়িক 
ক্ষুদ্রতাকে বাদ দিলে এই সমাজের একেবারে আর একটা রূপ 
প্রকাশিত হইত । 

বিষয়কর্ম ও বিষয়াসক্তি হইতে মুখ ফিরাইলেই পল্লীবাসী বাঙালীর 
মনের কি রূপ দেখা যাইত তাহার একটি অতি সুন্দর দৃষ্টান্ত শিবনাথ 
শাস্ত্রী দিয়াছেন । তিনি পল্লীজীবনের নীচতা কোথাও ঢাকা দিবার চেষ্টা 
করেন নাই। কিন্তু তিনি তাহার সংস্কৃতজ্ঞ ও শাস্্রজ্ঞ প্রপিতামহের 
যে-পরিচয় দিয়াছেন তাহা হইতে সেই জীবনের আর একটা দিক 
একেবারে উল্ভাসিত হইয়া উঠিয়াছে। 

তাহার প্রপিতামহের বয়স তখন প্রায় পঁচানববই ব্থসর। তিনি 
অন্ধ ও বধির। তবুতিনি জপতপ পুজায় ও পিতৃপুরুষের তর্পণে 
প্রতিদিন দেড়ঘণ্টা মত সময় দ্রিতেন। তারপর আধঘণ্টা মাটিতে 
মাথা ঠকিয়। ইউদেবতার চরণে প্রণাম করিয়া প্রার্থনা করিতেন। এই 
প্রণামের ফলে তীহার কপালের উপর একটা আবেব মত মাংসের 
গুলি জমিয়া গিয়াছিল। এই ধরনের প্রার্থনায় বুদ্ধ কি বলিতেন 
তাহার বিবরণও শিবনাথ দিয়াছেন) _- 


“একদিন মা শুনিলেন যে, তিনি মুখে মুখে বাংলা ভাষাতে তাহার 
ইঞ্টদেবতার চরণে আমার বিদেশবাসী পিতার জন্ প্রার্থনা করিতেছেন। 
বলিতেছেন, “ম] দয়াময়ি! সে বিদেশে পড়ে আছে, তাকে রক্ষা করো । 
সে কাহারও বারণ শোনে না, (তাকে সুমতি দেও, ইত্যাদি। সর্বশেষে 
উঠিয়া! দীড়াইয়। করতালি দিয়া নাচিতেন। নাচিবার সময় আমার 
ডাক হইত, “বাবা! আমি তখন দিগস্বরমূত্তি বালক, মা আমাকে 


১৫৮ বাঙালী জীবনে রমণী 


খেলার ভিতর হইতে ধরিয়া আনিতেন এবং প্রপিতাঁমহের হাঁতে হাতি 

দিয়া নাচিতে বলিতেন। অমনি ছুইজনে হাতে হা'ত ধরিয়া! নৃত্য আরম্ত 

হইত। তিনি তিনশত পয়ষটি দিন নাচিবাঁর সময় একই গান করিতেন, 

তাহার ছুই পংক্তি মাত্র আমার মনে আছে-_ 

“দুর্ণী দুর্গা বল ভাই 
দুর্গা বই আর গতি নাই ।৮ 

আমি নিজে গ্রাম্যজীবনের সহিত বাল্যকালে পরিচিত হই। তাই 
সেই জীবনের ক্ষুদ্র ও নীচ বিষর়াসক্তির সহিত আমার পরিচয় হয় 
নাই । আমি দেখিয়াছি অন্য জিনিস। সেটাও যে সত্য সে বিষয়েও 
সন্দেহ মাত্র নাই- আমার চোখের আড়ালে যাহাই থাকিয়া থাকুক । 
আমার অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির একটু পরিচয় দিব। 

আমার মনে হইত গ্রাম্যজীবনের প্রধান ধর্ম ছিল একটা অপার 
শান্তি ও নিরবচ্ছিন্ন স্থ্রৈ। এই সব গ্রামে সময়ের নদী যেন ক্রোত 
বন্ধ করিয়া দীঘিতে পরিণত হইয়া গিয়াছিল। এটা আমি যখনই 
গ্রামে গিয়াছি তখনই অনুভব করিয়াছি । সকালের খাওয়া-দাওয়া 
সারিয়া সকলে আমাদের সদরের বড় আটচালার ফরাঁশের বিছানায় 
কাত হইয়া বা বারান্দার ইজিচেয়ারে বসিয়া হয় গল্প করিত, না হয় 
সামনের মাঠের ওপারে গ্রামের দিকে তাকাইয়া চুপ করিয়৷ থাকিত। 
কাহারও কোন বিষয়ে ভাবনা-চিন্তা আছে তাহা কখনই মনে হইত 
না। তাহাদের মনের ভাব যেন এই-_কিছু করি আর না করি, 
সংসার তো নিজের মতেই চলিবে, নিরর্থক আকুপাকু কেন? 

এই আকুর্পাকুই আজকাল শহুরে বাঙালীর জীবনের রূপ। 
ইহাতে জীবিকা-নির্বাহ জীবনকে ছাপাইয়৷ উঠিয়াছে। তাই প্রতিটি 
বাড়ীতে স্ত্রী-পুরুষ-নিবিশেষে জীবিকার ধান্দা, ছুইটা পয়সা আনিবার 
অশোতন চাঞ্চল্য ও ব্যস্ততা মনকে তিক্ত করিয়া সুলে। ইহারা 
পেটের দাঁয়কে সেকালের পিতৃদায়ের মত করিয়। ভুলিয়াছে। ইহাতে 
না আছে গোরব, না আছে শান্তি । 


বাঙালী সমাজ ও নৃতন ভালবাসা ১৫৯ 


গ্রামে ষে দারিদ্র্য ছিল না তাহা নয়। সেখানে ধনী বা সম্পন্ন 
অবস্থার গৃহস্থ হইতে আরম্ত করিয়া সাধারণ মধ্যবিদ্ত, দরিদ্র ও অতি 
দরিদ্র গৃহস্থ পর্যন্ত সকল রকমের লোকই ছিল। কিন্তু ইহা সত্বেও 
পয়সার জন্য প্রকাশ্য ছুটাছুটি তো দেখা যাইতই না, এমন কি 
অর্থের তারতম্যঘটিত কোন উগ্রতা ব্যবহারেও প্রকাশ পাইত না। 
অর্থের অপেক্ষা না রাখিয়া সামাজিক মেলামেশা! অব্যাহত থাকিত। 
সকল ধরনের পরিবারেই একটা নিদিষ্ট কাঠামো ও বীধা ছন্দ ছিল। 
তাই বিভিন্ন অবস্থার লোকের একসঙ্গে থাকার ব্যাপারে বাধা থাকা 
দূরে থাকুক, বিবাহ হইবার পথেও বাঁধা হইত না। রবীন্দ্রনাথের 
'সমাপ্তি' গল্পে অপূর্বদের সংসার ধনীর বা সম্পন্ন গুহস্থের সংসার, 
মুন্ময়ীর মায়ের সংসার দরিদ্রের সংসার । তবু মৃন্মরীর সহিত অপূর্বের 
বিবাহে আধিক আপন্ডি উঠে নাই। অর্থগত জাতিভেদ ও অস্পৃশ্যত। 
বাংলার পল্লীজীবনে তখন একেবারেই ছিল না। 

তার পর হ্ৃগ্ভত ও আপ্যায়নের ক্রুটি ছিল না। ছেলে 
কলিকাতার মেস বা বাসাবাড়ী হইতে গ্রামে ফিরিলে ধুমধাম হইবারই 
কথা। আমিও খবর দিয়া বা না দিয়া যখন দুরের স্টেশন হইতে 
হাটিয়া বা সাইকেলে চড়িয়া বাড়ীর উঠানের কোণে দীঁড়াইতাম, 
তখন কি সাড়া পড়িত তাহা দ্েখিয়াছি। সুতরাং অপূর্বর মার 
বাস্ততার বর্ণনা পড়িয়া আশ্চর্য হই নাই। 

আত্মীয়-কুটুন্বের বাড়ী গেলে অবশ্য ধুমধাম আরও প্রকাশ্যে ও 
সশব্দে হইত, শুধু মার চোখের কোণের হাসি, মুখের স্সিগ্বতা, ও চঞ্চল 
গতির মধ্যেই আধ আত্মপ্রকাশ আধ-আত্মগোপন করিয়া থাকিত 
না। একটি আত্মীয়ের বাড়ীতে এক প্রখর শ্রীশ্মের মধ্যাহ্ন যে আদর 
পাইয়াছিলাম তাহার কথা বলি। যে গ্রামে গিয়াছিলাম, সেখানে 
একটিমাত্র ঘর ভদ্রগৃহস্থ। 

গৃহস্বামী আমার দূরসম্পর্কের দাদা, কিন্তু বয়সে আমার পিতারও 
বড়। দুইটি ছেলে, প্রত্যেকেই আমার চেয়ে অনেক বড়। খাইতে 


১৬০ বাঙালী জীবনে রমণী' 


বসিয়াছি, বাড়ির কনিষ্ঠ অবগ্গ্নবতী বধু কলিকাতা-প্রত্যাগত, 
আসন্ন বি-এ-পাস, যুবা এবং বয়সে ছোট খুড়র্খবশুরকে বলয়-বন্কত- 
হস্তে পরিবেশন করিতেছেন। খাইবার পর শুইতে অনুরোধ করা 
হইল। আমি দিনে ঘুমাই না বলা সত্বেও কনিষ্ঠ ভ্রাতুপ্পুত্রের শোবার 
ঘরেই লইয়া যাওয়া হইল। একটি ছোট চাঁর-চালা টিনের ঘর, 
দরমার বেড়া, ধবধবে বিছানা । যখন শুইলাম তখন টিনের চাল 
হইতে ভাপ নামিয়া ও কাছের মাঝারি গোছের একটা নদী হইতে 
ঠাণ্ডা হাওয়! আসিয়া ঘরের মধ্যে তাপ ও শৈত্যের টানাপোড়েন 
রচনা করিতেছিল। দেখি শিয়রের কাছে একটি শালুর ঝালর দেওয়া 
তালপাতার বোনা হাত-পাখা ও একটি উপন্যাস-_অন্ুরূপা দেবীর 
“পোষ্যপুত্র / পরজীবনে বিলাতী আঁতিথেয়তার বই-এ পড়িয়াছিলাম 
যে, অতিথির শোবার ঘরে উপন্যাস রাখিতে হয়। সেই অজ পাড়া- 
গায়েও উহা! ইংরেজী বই হইতে শিখিতে হর নাই। 

সব চেয়ে মধুর লাগিতেছিল বালিশের মৃতু স্থুগন্ধ__অবশ্য 
লন্মমীবিলাস তেলের । বাডালীসমাজে তখনকার দিনে ছুইটি ভাগ 
ছিল-_একদিকে শহুরে, ব্রার্ম ও ব্রাহ্মপন্থী উদ্ারনৈতিক লোক ও 
অন্যদিকে গ্রামের রক্ষণশীল অধিবাসী । তেমনই মাথার তেলেরও 
একটা উদ্ারনৈতিক ও একটা রক্ষণশীল মার্কা ছিল। প্রথম শ্রেণীর 
ভদ্রঘরের মেয়েরা জবাকুস্রম বা কুন্তলীন ব্যবহার করিতেন, দ্বিতীয় 
শ্রেণীর মেয়ের করিতেন লক্মমীবিলাস। আমার মা জবাকুস্থমের দলে 
হইলেও, গ্রামের কিশোরী বধূদের সহিত বালক দেবর হিসাবে যে 
সম্প্রীতি ছিল তাহার বশে আমি লক্গমীবিলাসকে কখনও তুচ্ছ করি 
নাই। ঝাঁপের পিছনের নববধূ, লক্মমীবিলাসের গন্ধ ও গ্রামের জীবন 
আমার স্মৃতি ও অনুভূতিতে একেবারে জড়াইয়া আছে। এই কারণেই 
বি-এ পরীক্ষা দিবার পর, অর্থাৎ দুই বশসর ধরিয়া ক্রমাগত 
ইম্পিরিয়্যাল লাইব্রেরীতে ইংরেজ, ফরাসী ও জার্মান এঁতিহাসিকদের দুরূহ 
বই পড়িবার পরও বালিশের মৃু সুবাস আমার খুবই ভাল লাগিতেছিল। 


বাঙালী সমাজ ও নৃতন ভালবাসা ১৬১ 

মনে রাখিবেন, সেই বৎসর আমি ইতিহাসে বি-এ অনার্সে 
প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হইয়াছিলাম ও এই ঘটনার তিন-চার মাস পূর্বে 
লিখিত এঁতিহাসিক গবেষণা সম্বন্ধে কঠিন কচকচিপূর্ণ ইংরেজি প্রবন্ধ 
আমার আত্মজীবনীর ৩৪৪ পুঃ হইতে ৩৫৩ পৃঃ পর্যন্ত মুদ্রিত আছে। 
এই ছুই জগতে বাস করিতে আমার কোন অসোয়াস্তি বোধ কখনও 
হয় নাই। তিন বসর অক্সফোর্ড বা কেন্বিজে পড়িয়া ধাহারা বিলাতি 
মেম ও দেশী বৌ লইয়া কাল্পনিক শখের সমস্যা সৃষ্টি করিয়া ইংরেজীতে 
নভেল লেখেন, অথচ দেশী স্ত্রীর সহিত সহবাস করিতে কোন সঙ্কৌোচ বোধ 
করেন না, তাহাদের জন্যই এই ভুচ্ছ কৃতিত্বের কথা উল্লেখ করিলাম । 

এই হইল গ্রাম্জীবনের সেই দিক যাহার সহিত নূতন 
ভালবাসাকে অঙ্গাঙ্গীভূত করা সম্ভব ছিল। ইহার আভাস রবীন্দ্রনাথ 
কয়েকটি অত্যন্ত স্ুন্দর কথায় দিয়াছেন--গ্রামের মধ্যে আর 
সকলেই দলাদলি, চক্রান্ত, ইক্ষুর চাষ, মিথা মোকদ্দমা এবং পাটের 
কারবার লইয়৷ থাকিত, ভাবের জালোচনা এবং সাহিত্যচগ৷ করিত 
কেবল শশিভূষণ এবং গিরিবালা।” 

গ্রাম্যজীবনের আর একটা স্থন্দর প্রবাহ বহিত পুজাপার্বণের 
বর্ষব্যাগী পরম্পরাকে অবলম্বন করিয়া । শান্ত গ্রাম্জীবনকে যদি 
হরি শৃম্পের আস্তরণ বলা যায়, তাহা হইলে পুজাপার্বণ ছিল যেন 
তাহা'র উপর রডীন ফুলের গাছ । উপমা বদলাইয়া বলা যাইতে পারে, 
পুজাপার্বণ যেন শাড়ীর সাদা খাপের উপর বুটি, দুর্গাপুজা তাহার 
জরিদার আচল । তাই গ্রামে যে-গৃহস্থের জীবনযাত্রাকে সম্পুর্ণ 
মনে করা হইত তাহার সম্বদ্ধেই বলা হইত এই যে, উহার বাড়ীতে 
বারে! মাসে তেরো পার্বণ লাগিয়া আছে। রথযাত্রাই হউক, ঝুলন- 
যাত্রাই হউক, সরম্বতী পুজাই হউক, আর দোলযাত্রাই হউক, এই 
পুজাপার্বণের প্রত্যাশাই বাঙালীর জীবনে সর্বেরাচ্চ আনন্দ ছিল, 
উৎসবের তো কথাহি নাই। আমার আত্মজীবনীতে এই আগ্রহের 
বর্ণনা দিয়াছি। | 


৯১ 


১৬২ বাঙালী জীবনে রমণী 


কিন্তু পাশ্চাত্য সোনার কাটিতে বাঙালীর মন জাগ্রত না হইয় 
উঠা পর্যন্ত সে-মনে গ্রাম্জীবনের সৌন্দর্যের কোনও অনুভূতি আসে 
নাই। মাছ যেমন জলে বাস করে, কিন্তু জলের সৌন্দর্যের কোন 
খবর রাখে না, জল হইতে স্ুলিলে মরিয়া যায় বটে, তবুও জলের 
অপরিসীম ও করুণ রূপের কথা স্মরণ করে না, বাঁডালীও তেমনই 
গ্রাম্জীবনে বাস করিয়াও উহার সৌন্দর্য অনুভব করিত না। 

কিন্তু অনুভূতি যাই আসিল, তখনই তাহার চোঁখ এবং মুখ ছুইই 
খুলিয়া গেল । সে গ্রামাজীবনের স্তুতি আরম্ভ করিল। অতিথি" 
গল্পের শেষের দিকে রথযাত্রার আসন্নতার যে বর্ণনা আছে তাহাকে 
একটা অপরূপ স্তোত্র বলা চলে,_ 

“কুড়ুলকাটায় নাগবাঁবুদের এলাকাঁয় বিখ্যাত রথধাত্রার মেলা হইবে। 

জ্যোৎন্সা-সন্ধ্যায় তারাপদ ঘাটে গিয়| দেখিল, কোনে! নৌকা নাগরদো লা, 

কোনো নৌকা যাত্রা্দল, কোনো নৌকা পণান্রব্য লইয়া প্রবল নবীন 

ন্োতের মুখে দ্রতবেগে মেলা অভিমুখে চলিয়াছে, -' সম্মুখে আজ যেন 

সমস্ত জগতের রথযাত্রা, চাকা ঘুরিতেছে, ধ্বজী উড়িতেছে, পৃথিবী 

কাঁপিতেছে;_মেঘ উড়িয়াছে, বাঁতাঁস ছুটিয়াছে, নদী বহিয়াছে, নৌকা! 

চলিয়াছে, গাঁন উঠিয়াছে-..৮” 

ইহার সবটুকু পড়িতে বলিব । 

রবীন্দ্রনাথ অসাধারণ কবি। তীহার মনের ভাবও অসাধারণ 
হইবারই কথা। কিন্তু নূতন অনুভূতি আসিবার পর সাধারণ বাঙালী 
লেখকের মনেও বাংলার গ্রাম্জীবন, পুজাপার্বণ লইয়া, কি মুতি 
ধরিয়া দেখা দিয়াছিল তাহার একটি দৃষ্টাস্তহিসাবে অন্য একজনের 
লেখা উদ্ধত করিব__এটি প্রায় সন্ভতর বগ্সর পূর্বে প্রকাশিত ষষ্ঠীপুজার 
একটি বিবরণ । সেটি এইরূপ-- 


“অধিকাংশ পল্লীর রমণীই উৎকৃষ্ট বর্ণালঙ্কারে সঙ্জিত হইয়। ধৃপদীপ 
নৈবেগ্াদি হস্তে লইয়া ষষ্টাতলায় সমবেত হইয়াছেন। পুরোহিত পুজার 
বনিয়াছেন, তাহার চতুর্দিকে পূজোপকরণ বিল্তৃত। 


বাঙালী সমাজ ও নৃতন ভালবাসা ১৬৩ 


"রমণীগণ নিকটে দাঁড়াইয়া পূজা দেখিতেছেন, তাহাদের মৃছু মধুর ওঞ্জনে 
বনপ্রাস্ত ধ্বনিত হইতেছে ; কেহ অবগ্তনবতী, কাহারও নাকে নোলক; 
কাহারো নািকায় নথ) বলয়চুড়ে ঠনন্ঠুন্‌ শব্দ হইতেছে, পট্রবস্ত্র বাযু- 
প্রবাহকম্পিত হওয়ায় খদ্থস্‌ শব্দ হইতেছে, কেশতৈলের মধুর গন্ধ সমীরণ 
হিল্লোলে ভাসিয়৷ যাইতেছে, দীপ্চ সূর্য অন্তরীক্ষ হইতে অশ্বখের নিবিড় 
পল্লব ভেদ করিয়া যুবতীজনের প্রীতিপ্রফুর সন্তোষ ৭ শান্তিপূর্ণ হান্ঠোজ্জল 
মুখের মে|হন ভাঁব নিরীক্ষণ করিতে পারিতেছেন না। 

“কাহার পাচ বৎসরের মেয়েটি শীলাম্বরী পরিয়া মায়ের পাশে দীড়।ইয়া 
কজ্জলরাঁগরজিত নোত্রে একদুষ্টে পূজা দেখিতেছে। কাহারও ক্রোডে এক 
বৎসরের শিশুপুত্র মাতৃস্তন্ঠ পান করিতে করিতে গাঢ় নিদ্রায় আচ্ছন্ন 
হইয়াছে, কোমল ওষাঁপর স্তনবৃন্ত পরিত্যাগ করে না, ঘর্মশোতে শিশুর 
নবনীন্ুকোমল দেহ প্রাবিত। শ্মেহময়ী জননী তাহাকে তদবস্থাতেই 
ক্রোঁড়ে প্ররিযাঁ বলয়বে্টিত স্ুগোল হন্তথাঁনি দ্বারা অঞ্চল ঘুরাইয়া শিশুর 
ঘর্্ নিবারণের চেষ্টা করিতেছেন, এক একবার পূজার দ্রিকে ও এক এক 
বার গভীর ন্েহে নিদ্রামগ্ন পুত্রের মুখের দিকে মতি সতৃষ্ণ করুণ নেত্রে 
চাহিয়া দেখিতেছেন, ন্নেহময়ী জননীর অন্ত স্তনবৃস্ত ভেদ করিয়া অমৃত 
উৎসের স্াঁয় ক্ষীরধারা নিঃসারিত হইতেছে ।” 


লেখক দীনেন্দ্রকুমার রায় । 

নারীর দেহ সম্বন্ধে পুরাতন কদধতা কোথায় গেল? আমিও 
কিশোরী মাতাকে বিনা সঙ্কোচে আমার সম্মুখে সন্তানকে স্তন্যপান 
করাইতে দেখিয়াছি । এই যে সমাজ, তাহার সহিত নুতন ভাল- 
বাসাকে মিলাইবার উপায় ছিল। 

তাই একদিকে যেমন এই ভালবাসা গ্রামাজীবনের স্থুন্দর দিকটাকে 
অবলম্বন করিল, তেমনই অন্যদিকে গ্রামে ভালবাসারও যে রূপ 
দেখা দিল তাহা কলিকাতার রূপ হইতে বিভিন্ন । স্থখে হউক আর 
দুঃখেই হউক, উহার ধর্ম ব্দলাইয়! গেল-_ ন্থুখে আসিল উচ্ছলত, দুঃখে 
আসিল করুণা । এই ভালবাসায় নিষ্ঠুরতার স্থান কোথাও রহিল না। 
রবীন্দ্রনাথের পল্লীজীবন সংক্রান্ত কয়েকটি গল্পের নাম বলিলেই প্রভ্দেটা 


১৬৪ | বাঙালী জীবনে রমণী 


স্পষ্ট হইয়া উঠিবে-_সমাণ্ডি”' “অতিথি, “মেঘ ও রৌদ্র 'দৃষ্টিদান, 
“শুভদৃষ্টি'; এগুলির সহিত কঙ্কাল" 'মানভগ্রান” ও "মধ্যবতিনী'র পার্থক্য 
কত! | | 
স্বামীর ভালবাসা হইতে বঞ্চিত হইবার দুঃখ 'মানভগ্জনেঃও আছে, 
'মধ্যবতিনী'তেও আছে। উহার পরিচয় দিয়াছি। এখন 'দৃষ্টিদানে' 
এই ছুঃখের রূপ কি দেখাইব। অন্ধ কুমু বলিতেছে_ 
“মনে আছে ফেদিন চৈত্রমাসের সন্ধ্যাবেলায় হাটের বারে .লোকজন বাড়ি 
ফিরিয়া যাইতেছে । দূর হইতে বুষ্টি লইয়া একটা ঝড় আসিতেছে, 
তাহারই মাঁটিভেজ৷ গন্ধ ও বাতাসের আর্দরভাব আকাশে ব্যাপ্ত হইয়াছে, 
_-সঙ্গচ্যুত সাথীগণ অন্ধকার মাঠের মধ্যে পরস্পরকে ব্যাকুল ভর্ধকঠে 
ডাকিতেছে। অন্ধের শয়নগৃহে. যতক্ষণ আমি একলা থাঁকি, ততক্ষণ প্রদীপ 
জালানো হয় না-পাছে শিখা লাগিয়! কাপড় ধরিয়া উঠে বা কোনো 
দুর্ঘটনা হয়।. আমি সেই নির্জন অন্ধকার কক্ষের মধ্যে মাটিতে বসিয়া ছুই 
হাত জুড়িয়া৷ আমার অনন্ত অন্ধ জগতের জগদীশ্বরকে ডাঁকিতে ছিলাম, 
“ প্রভু, তোমার দয়! যখন অনুভব হয় না, তোমার অভিপ্রায় যখন বুঝি 
না, তখন এই অনাথ ভগ্রহ্ৃদয়ের হাঁলটাকে প্রাণপণে ছুই হাতে বক্ষে 
চাপিয় ধরি, বুক দিয়া রক্ত বাহির হইয়া যায় তবু তুফাঁন সামলাইতে 
পারি না» আমায় আর কত পরীক্ষা করিবে, আমার কতটুকুই বা বল।" 
“এই বলিতে বলিতে অশ্রু উচ্ছৃসিত হইয়া উঠিল-_খাটের উপর মাথা 
রাখিয়া কাদিতে লাগিলাম ।” 
হেমাঙ্গিনী ঘরেই খাটের উপর শুইয়া ছিল। সে নামিয়া আসিয়া 
কুমুর গল! জড়াইয়া ধরিয়া নিঃশবে কপালে হাত ৪ দিতে 
লাগিল। কুমুর হৃদয়ে শাস্তি আসিল, 
“ইতিমধ্যে কখন মেঘ গঞ্জন এবং মুষলধারে বর্ষণের সঙ্গে সঙ্গে একটা ঝড় 
হইয়া গ্নেল বুঝিতেই পারিলাম না বহুকাল পরে একটি সুন্সিঞ্ধ শাস্তি 
আসিক্া! আমার জরদাহপগ্ধ হৃদয়কে জুড়াইয়! দিল ।” 
আঁবার “শুভদৃষ্টি, গল্লে জমিদার কান্তিচন্দ্'ষে গ্রামে এক অন্ত 
দরিদ্রের ঘরে বিবাহের প্রস্তাব করিতে গেলেন, কলিকাতাত্ন উচ্চ 


বাজলী সমাঁজ ও নৃতন ভালবাসা ডি 


কুটুষ্ষিতার . আকর্ষণ, অর্থের প্রলোভন, রূখখ্যাতির মোহ একেবারে 
কাটাইয়৮; কেলিলেন, তাহাও পল্লীজীবনের -শাস্ত সরল ছবির 
জন্যই সম্ভব হইয়াছিল _- 


"কান্তি তখন দলের লোকের হাতে বন্দুক রাখিয়া" সদর পথ দরিয়া সেই 

কুটিরের দ্বারে আর্সিয়া উপস্থিত হইলেন । দেখিলেন, একটি প্রৌটবযস্ক 

: মুগ্তিতমুখ 'শাত্তমৃত্তি 'ব্রাঙ্মণ: দীওয়ায় বসিয়! হরিভক্তিবিলাস পাঠ 

করিতেছেন। ভক্তিমণ্ডিত কাহার মুখের স্্রগভীর -নিগ্ধ প্রশাস্ত ভাতের 

সহিত কান্তিচন্দ্র সেই বালিকার দয়ার্্র মুখের সাদৃশ্য অনুভব .করিলেন।” 

মাথিউ আন্ড এক জায়গায় ফ্লোবেয়ারের “মাদাম বোভারী'র 
নিষ্ঠুর শূন্যতার সহিত টলন্টয়ের 'আনা কারেনিনা'র সকরুণ পূর্ণতার 
তুলন! করিয়াছিলেন। এখানেও সেই পার্থকা দেখিতে পাই সে 
যাহাই হউক, নিষ্ঠরভাবেই হউক বা করুণভাবেই হউক, নূতন 
ভালবাসা বাঙালী . সমাজে যে নিজের স্থান করিয়া লইয়াছিল তাহা 
এ পর্যস্ত দেখা গেল, কিন্তু ইহার পরও একটা'সামাজিক প্রশ্ব ছিল।। 

* এই যে .সমাজ, উহার মধ্যে প্রেম আবিভূতি হইবার" মূলগত 
স্যোগই ছিল কিনা উহাই প্রশ্ন। এখন সেটা বিবেচনা করিতে 
হইবে। শ্ত্রী-পুরুষের অবাধ, সহজ, এবং স্বাভাবিক মেলামেশ। যে- 
সমাজে নাই তাহাতে এই, ধরনের প্রেম বাপকভাবে অমুভূত হইতে 
পারে না। অথচ বাঙালী সমাজে যে ইহার প্রচলন ছিল ন৷ তাহা 
বলারই অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু একটা কৌতুহলজনক বিষয় এই 
যে, কলিকাতায় ইংরেজী জীবনযাত্রা! দেখা দিবার পর হইতে, বাঙালীর 
যাই এই জীবন দেখিবার সুযোগ দেখা দিল, তখন হইতেই স্ত্রী- 
পুরুষের সামাজিক মেলামেশার যে একটা সৌন্দর্য ও মাধুর্য আছে, তাহা! 
শিক্ষিত বাডালী অনুভব করিয়াছিল । একটি ঘটনার কথা বলিতেছি। 

১৮২৪ সনের ২১শে এপ্রিল কলিকাতার লর্ড কিশপ -হিবার 
বিয়ালিশ বৎসরে পদার্পণ উপলক্ষে পরিচিত সমস্ত ইংরেজ 'এবং 
কয়েকজন সন্ত্ান্ত বাঙালীকে নিমন্ত্রণ করেন। অভ্যাগতদের মধ্যে 


১৬৬ বাঙালী জীবনে রমণী 


গভর্ণর-জেনারেল লর্ড আমহান্টট এবং তাহার পত্বীও উপস্থিত 
ছিলেন। মিসেস্‌ হিবার নিজের হাতে বাঙালী 'বাবুদের পান, গুলাব, 
ও আতর দেওয়াতে উ হারা খুবই খুশী হইয়াছিলেন। 

ইহাদের অনেকেই ইধরেজী খুব ভাল বলিতে পারিতেন-__বিশপ 
লিখিয়৷ গিয়াছেন, “20 ০7] 110506191১6 £12,0200115- 
হরিমেহন ঠাকুর বিশপের সহিত বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন, রসায়ণ ও 
পদার্থ বিচ্য| সম্বান্ধে অন্য একদিন আলাপ করিয়াছিলেন; রাধাকান্ত 
দেব করিয়াছিলেন ধর্মসন্বন্ধে এবং ফী মেসনদের সম্বন্ধে, তিনি হিবারকে 
জিজ্ভাসা করেন, মেসনদের যে গোপন তত্ব, “1176 07090827076 
ড/৮2,3 2790171105 ৮৬101560 01 3৪,০0101151091-” তাহারা সকলেই 
ইউরোপের তদানীন্তন চিন্তাধার! সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল ছিলেন। 

হদ্রমোহন ঠাকুর উপশ্িত ইংরেজ রমণীদের দেখিয়া বিশপকে 
বলিলেন, “126 277. 1001652,560 10001-251 (176 70:5957/06 
1০072,109 ৬০5 6০0 ০11 [99,10165 15 

বিশপ তাহাকে স্মরণ করাইয়৷ দিলেন যে, মুসলমানরা ভারতবর্ষ 
জয় করার আগে রমণীদের সামাজিক জীবনে যোগ দেওয়ার প্রথা 
প্রাচীন হিন্দুদের মধোও ছিল। 

হরিমোহন হাসিয়া তাহা স্বীকার করিলেন, কিন্তু এও বলিলেন, “1 
15 0০0 1269 10705 10509192016 6০0 076 010 0051001000০ 

রাধাকান্ত দেব কাছে ছিলেন, কথাট! শুনিতে পাইয়া তিনি আসিয়া 
বলিলেন, “16 15 ৮০1৮ [715 1126 ৮৮০ ৫10 206 056 60 5111 
110 011] 01707 011] 0100 01005 01 006 $100521]72775- 306 
1051016 ৮৮০ ০01010 £1৮0 [10000 0170 52,106 11190911525 0176 
[11110192785 01) 77115017001950667- 2৫8109,50.৮ কিন্তু শুধু 
আগ্রহ জন্মিলে কি হইবে? ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠিত হইবার পরেও স্ত্রী- 
পুরুষের সতাকার সামাজিক মেলামেশা-ব্যক্তিগত পরিচয়ের কথা 
এখানে বলিতেছি না_ বাংলাদেশে প্রতিঠঠিত হয় নাই। 


বাঙালী সমাজ ও নৃতন ভালবাস ১৬৭ 


১৮৯৩ সনের ১৬ই মার্চ তারিখে লেখা রবীন্দ্রনাথের একটা চিঠিতে 
এ বিষয়ে একট! চমৎকার সাক্ষ্য আছে । তিনি লিখিতেছেন, 


“ম্'! সম্ভবত, সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর, আমি নিশ্চিত নই | বেশ রীতিমত 
পাকা ্টাইলে আলাপ চালাচ্ছিল। কাঁছে ঘেষে ঝুঁকে পড়ে খুব 
স্থমনোযোগ অথচ সপ্রতিভভাবে ঈবতহাস্ত-মুখে বক্রগ্রীবার় ইংরাজি 
ভাষায় কথোপকথন, আযালবম্‌ খুলে ছবি দেখানে! ইত্যাদি ঠিক দস্তরমত 
চাঁল চাল্ছিল। বাঁডালি ঘরের ছেলে এরকম অবস্থায় যেরকম লক্জাভিভভূত 
সংকুচিত ভাব ধারণ করে এতে তার তিলার্দমাত্র প্রকাঁশ পেল না ।” 
তারপর নিজের কথা লিখিতেছেন, 
“আমার দেখে ভারী কৌতুক এবং বিস্ময়বোঁধ হচ্ছিল। আ।মি বোধ হয় 
আমার এই প্রায় বত্রিশ বৎসর বয়সেও অমন নিতান্ত সহজ মধুর সুনিশ্চিত 
ভাবে অবলাজাতির সহিত বাঁক্যালাঁপ করতে পারি নে। চল্‌তে গেলে 
হু'চোট খাই, বলতে গেলে বেধে যায়, হাত ছুটো কোথায় রাখি ভেবে 
পাই নে, লম্বা! পা দুখাঁন! সম্বন্ধে একটা কোনো ব্যবস্থা কর! কর্তব্য বোধ 
করি অথচ কিছুই করে ওঠ যায় নাঁ_ছুটোকে গুটিয়ে রাখব তার 
মীমাংসা! করতে করতে ঠিক কথ|র ঠিক জবাবটা দিয়ে ওঠা হয় না। ঘরে 
তিনটে গ্যাসের শিখা এবং এক ঘর লোক থাকতে ঘে সট. করে চুম্বকাকুষ্ট 
লৌহখণ্ডবৎ বিন! দ্বিধায় কোনে! কিশোরীর পার্বসংলগ্ন হয়ে অটল প্রতিষ্ঠা 
লাঁভ করা সে আমাদের মতো সংশয়াতুর ভীরু প্রাণীদের ছারা হওয়া অসম্ভব।” 
শেষে তখনকার দিনের অন্য বাঙালী যুবকদের কথা লিখিলেন, 
“আমাদের ছেলেগ্ুলি কাহ্িকের মতো! চেহারা নিয়ে সসম্তরমে নেপথ্যে 
ঈাড়িয়ে ঈাড়িয়েই কেবল লজ্জায় রাঙা টকটকে হয়ে উঠছে--কচ্ছই দিয়ে 
ভিড় ঠেলে যে বেশ একটি নরম জায়গা বেছে গরম হয়ে বসবে সে যোগ্যতা 
তাদের আর রইল না। এর চেয়ে ধিক্কারের বিষয় অ।র কী হতে পারে ।” 
নিজের এই অক্ষমতা জানিয়াই রবীন্দ্রনাথ 'গোরা*তে শুচরিতার 
সহিত প্রথম দেখা হইবার পর বিনয়ের হতবুদ্ধি হওয়ার বর্ণনা একেবারে 
যথাযথভাবে দিতে পারিয়াছিলেন । নিঃসম্পকীয়া ভদ্র স্ত্রীলোকের 
সঙ্গে বিনয়ের কোনও দিন কোনও পরিচয় হয়, নাই। তাই গাড়ী 


১৬৮ বাঙালী জীবনে রমণী 


ছাড়িবার সময় স্থুচরিতা যখন তাহাকে ছোট একটি নমস্কার করিল, 
এই নমস্কারের জন্য প্রস্তুত হইয়া না থাকায় হতবুদ্ধি হইয়া সে প্রতি- 
নমস্কার করিতে ভুলিয়া গেল। 

“এইটুকু ক্রটি লইয়। বাঁড়িতে কিরিয়া সে নিজেকে বারবার ধিক্কার 

দিতে লাগিল। ইহাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হইতে বিদাঁয় হওয়] পর্য্যন্ত বিনয় 

নিজের আঁচরণ সমস্তটা আলোচনা করিয়! দেখিল--মনে হইল আগাগোড়া 

তাহার সমস্ত ব্যবহীরেই অসভ্যত। প্রকাশ পাইয়াছে।” 

পক্ষান্তরে গোরা নব্য হিন্দু হওয়াতে ভ্ত্রীজাতির সহিত ভদ্রতা 
করার কোনও কর্তব্যই স্বীকার করিল না। পরেশবাবুর বাড়ীতে 
গিয়া “মেয়েরা যে এখানে কোনে৷ এক জায়গায় আছে তাহা লক্ষ্য 
করা সে অশিষ্টতা বলিয়া গণ্য করিল।” দুইটা ব্যবহারই একই 
অনভ্যাসের এদিক আর ওদিক। পরেশবাবু অবশ্য তাহা বুঝিয়াছিলেন। 
তাই গোরার উপর চটিয়া হারানবাবু যখন বলিলেন যে, "মেয়েদের 
সঙ্গে কি রকম ব্যবহার করতে হয় সে ভদ্রতা এরা জানেন না” 
তখন পরেশ বলিলেন, 

“না, না, বলেন কি। ভদ্রতার অভাব আপনি যাঁকে বলছেন সে-একটা 

সঙ্কেচ মাত্র--মেয়েদের সঙ্গে না মিশলে সেটা কেটে যাঁয় না।” 

আমি বলিব, আমাদের সমাজে আজও এবং অনেক বেশী 
স্বাধীনতা সত্ত্বেও, সামাজিক জীবনের এই গুরুতর অসম্পূর্ণতা বেশ 
বতমান। নিঃসম্পকিত স্ত্রী-পুরুষের একই জায়গায় শুধু শারীরিক 
উপস্থিতির জন্যই মেলামেশা হইতেছে, উহা বন্ধুভাবে মেলামেশা নয়৷ 
কথাবাত, আচার-ব্যবহার, মনোভাব এখনও স্বাভাবিক, সাবলীল, 
বা ধাতস্থ হইয়াছে বলিতে পারি না। আমি এইরূপ মেলামেশার 
জায়গায় প্রায়ই যাই। কিন্তু দেশীয় স্ত্রী-পুরুষকে প্রীয় সর্বত্রই তেল- 
জলের মত ভাগ হইয়া পড়িতে দেখি । একদিন এক পার্টিতে গিয়৷ দেখি 
একটি আসনে দুইটি দেশীয়৷ এবং একটি ইংরেজ মহিল! বসিয়া আছেন। 
আমি ইংরেজ মহিলাটির কাছে গিয়! জিড্ঞাস। করিলাম, 


বাঙালী সমাজ ও নৃতন ভালবাসা ১৬৯ 


+1,2.0/ 2) ৮1760) ৫10 00 21116 1 10012, 69 

তিনি বলিলেন, 

00015 15561012170 তে 00725 010াত, 

আমি টিপ্লনী করিলাম, 

42০00 5691 60 17956 0101550. 810 006 001021 ৮০া 
5001). 

অবশ্য রহস্যটা তিনি তখনই বুঝিলেন, এবং একটি দেশীয়া ভ্র- 
মহিলাকে একটু হেলা দিয়া খানিকটা জায়গ! করিয়া দিয়া বলিলেন, 

+0০0906, 510 40৮1) 200 9192,1:2,06 09.৮ 

এই ব্যাপারটা খালি দেশী পার্টি হইলে আরও বেশী দেখি। 
একদিকে প্রৌট ব্যক্তিরা তৃষিতনেত্রে অন্য পারের যুবতীদিগের দিকে 
চাহিয়া আছেন, অথচ উঠিয়া গিয়। কথা কহিতে তরস৷ পাইতেছেন না। 
দেখিলে আমার কষ্ট হয়। 

কিন্তু ব্যাপারটা কোনও দেশেই সহজ নয়। ফ্রান্সের মত দেশেও 
উহা আয়ন্ত করিতে হয়। তখন গীঁবেতা রাজনৈতিক নেত! হিসাবে 
খুবই নাম করিতেছেন, তবু বৃদ্ধ তিয়র জিজ্ঞাসা করিলেন, “সে কি 
মেয়েদের কাছে লিখতে বা কথা কইতে পারে ? ফ্রান্সে ওই হল সব।” 

মাদাম আযডাম বলিলেন, গাঁবেতা ফরাসী সাহিতা ও ইতিহাসে 
একেবারে নিমগ্ন থাকেন, এবং আর্টের বিচার করিতে পারেন। 

তবু তিয়র আবার বলিলেন, “মেয়েদের কি তাকে ভাল লাগে? 
আমি মেয়েদের কথা জিজ্ঞেস করছি ।” 

মাদাম আডাম তখন উত্তর দিলেন, “আমি স্ত্রীলোক, আমার 
তো তাকে ভাল লাগে ।” 

কিন্তু গাবেতাও প্রথম দিনে একটা প্রকাণ্ড তুল করিয়া 
ফেলিয়াছিলেন। মাদাম আ্যাভামের বাড়ীতে সান্ধ্ভোজনে নিমন্ত্রিত 
হইয়। তিনি বাজে সথুট ও ফ্ল্যানেলের শার্ট পরিয়া উপস্থিত 
হইয়াছিলেন। আসিয়া দেখেন সকলেই ইভনিংড্রেসে। তখন 


১৭০ বাঙালী জীবনে রমণী 


তাহাকে উদ্ধার করিবার আর কোনও উপায় নাই দেখিয়৷ গৃহকর্রী 
নিজে গিয়। তাহার বাহু ধরিয়া খাইবার টেবিলে'গেলেন। গীবেত৷ 
তাহার কানে কানে বলিলেন, “মাদাম, এইভাবে শিক্ষা পাওয়া আমি 
জীবনে কখনও ভুলিব না ।” 

স্থতরাং যে-দেশে শ্ত্রী-পুরুষের মেলামেশার ধারাটা বহু শতাব্দী 
ধরিয়া একেবারেই নাই সেখানে যে ওট| সহজে বা শীঘ্র গড়িবে না 
তাহ! বলাই বাহুল্য । এই প্রসঙ্গে আর একটা মেলামেশার কথা বল৷ 
আমি প্রয়োজনই মনে করি না। সমপাণ্টী বা সহকর্মী যে সমপাঠিনী 
বা সহকমিণীর জন্য গাছ বা ল্যাম্প-পোন্টের নীচে সিক্ত মার্জারের 
মত দীড়াইয়া থাকে, তাহাকে আমি শ্্ী-পুরুষের স্বাভাবিক ও সামাজিক 
মেলামেশা বলি না, কারণ পিতার গৃহদ্বার দৃষ্টিগোচর হইলেই তরুণী 
আরক্তমুখী ও আনতলোচনা হন, এবং অপরপক্ষ চম্পট দেন। 

অথচ বিশপ হিবার ঠিকই বলিয়াছিলেন যে, প্রাচীন ভারতবর্ষে 
এই মেলামেশা ছিল। আমি সংস্কত সাহিত্যে ইহার বর্ণনা যতই পড়ি, 
ততই মুগ্ধ হই। একটি বর্ণনা উদ্ধত করিব । 

চন্দ্রাপীড় শিকার করিতে গিয়। শিবমন্দিরে মহাশ্বেতাকে গান করিয়া 
পুজা করিতে দেখিলেন। মহাশ্বেতা রাজা-রাজড়া দেখিয়াই দেবতাকে 
ছাড়িয়া নরদেবতার দিকে ছুটিয়া আসিলেন না ; তখনও বিবাহের নিমন্ত্রণ 
কার্ডে “50106 (551702] 10)110150519 2৩ 1১০ ০১১৪০6৪৫ ০ 
2,577,” এই কথা বসাইবার রেওয়াজ হিন্দুসমাজে হয় নাই। সেই 
সমাজে অতিথিমাত্রেই ছিলেন নারায়ণ, এবং নারায়ণ স্বয়ং রাজ-অতিথিরও 
উপরে ছিলেন। তবে অর্চনা শেষ হইবামাত্র মহাশ্বেতা উঠিয়া 
মহাদদেবকে প্রদক্ষিণ করিয়া প্রণামান্তে অতিথির কাছে আসিয়া বলিলেন, 

“ম্ব'গতম্‌ অতিথয়ে। কথম্‌ ইমাং ভূমিম্‌ অন্ুপ্রীঞ্ো মহাভাগঃ ? তৎ 

উত্তিষ্ঠ, আগম্যতাম্‌, অহুভূয়তাম অতিথিসৎক|রঃ1” 

(সংস্কতের বাগ বৈদ্য বাংলায় আনা কঠিন, তাই এইটুকু এবং 
আরও খানিকটা সংস্কৃতেই রাখিব। বুঝিবার সুবিধার জঙ্য সন্ধিবিচ্ছেদ 


বাঙালী সমাজ ও নৃতন ভালবাসা ১৭১ 


করিয়া দিলাম । ) চন্দ্রাপীড় মহাশ্বেতার সঙ্গে সঙ্গে গিয়া তাহার শয়ন- 
গুহার দ্বারে একটি শিলার উপর বসিলেন। মহাশ্বেতাও পর্ণপুটে 
করিয়া নিঝ'র হইতে অধ্য্যের জন্য জল আনিলেন, কুমার তখন বলিলেন, 

অলম্‌ অতিযন্ত্রণয়। ; কৃতম্‌ অতিপ্রসাঁদেন, ভগবতি! প্রসীদ, বিমুচ্তাম্‌ 

অত্যাদর। ত্দীয়ম আলোকনম্‌ অপি সর্বপাপপ্রশমনম্‌, অঘমধণম্‌ ইব 

পবিত্রীকরণালয়ম্‌--আস্ততাম্‌।” 

অনুবাদও দিতেছি-_“এত কষ্টের প্রয়োজন নাই; এত বেশী 
আপায়ন থাকুক, ভগবতি ! আপনি প্রসন্ন হউন, অতি আদর ছাড়িয়া 
দিন। আপনার দর্শনই সর্বপাপের প্রশমন, অধমর্ষণ সুক্তের ন্যায় 
পবিত্র করে । আপনি অনুগ্রহ করিয়। বসুন |” 

তবু মহাশ্বেতা যখন অনুরোধ করিলেন তখন রাজকুমার অতিথি 
পরিচধার সবটুকুই অতিশয়নতমস্তকে অতি আদরের সহিত গ্রহণ 
করিলেন। এই আচার-ব্যবহার ভারতবর্মে কোথায় গেল? আজ 
স্বন্দরী মেয়ে দেখিলেই জিবের লাল পড়িতে দেখি । 

ইহা অবশ্য সাহিত্যের বিবরণ। কিন্তু সাহিত্যের এই ধারা যে 
আসল জীবনযাত্রার ধারা হইতে আসিয়াছিল সে-বিষয়ে আমার মনে 
কোনও সন্দেহ নাই। 

কিন্তু বাঁডালী ওপন্যাসিক ও গল্পলেখকদের শুধু এই ভদ্রতা 
ব্যতীতই নয়, নরনারীর মেলামেশা ছাড়াই প্রেমের কাহিনী স্ম্টি 
করিতে হইয়াছিল। তবে দুই পক্ষকে একত্র করিবার কি উপায় 
ছিল? তাহাদিগকে বিপদে পড়িয়া কলিকাতায় পাশাপাশি ছাদ ও 
্রাহ্মমমাজের শরণাপন্ন হইতে হইল । রবীন্দ্রনাথের “নৌকাডুবি-তে 
রমেশ ও হেমনলিনীর অনুরাগ ছাদ হইতেই বিকশিত হইয়াছিল; 
আর একটি অতি স্থুন্দর গল্লের নায়ক-নাধিকাও ছাদ হইতে 
পরস্পরকে দেখিয়াই ভালবাসিয়াছিল, সেটি 'ত্যাগ*। 

ইহা! ছাড়া কলিকাত! ও গ্রামে আত্মীয়-কুটুত্বিতার মধ্যে এমন 
কতকগুলি সম্বন্ধ ছিল যেখানে বিবাহ চলে, স্থৃতরাং প্রেম আনিলে 


১৭২ বাঙালী জীবনে রমণী 


শুধু “চুটিয়ে পীরিত করে লম্ব' দিবার” কথা বা প্রশ্ন উঠিত না। 
ইহাদের মধ্যে দাদার শ্যালক বা শ্যালিকা, অথবা আরও মধুর করিয়া 
বলিতে হইলে বৌদিদির ভাই বা বোন অত্যন্ত পরিগ্রহক্ষম-বা-ক্ষমা 
ছিল। একটু আধুনিক পরিবার হইলে ভাই-এর বন্ধু ও ভগ্রিনীর 
বান্ধবীও আসিয়া পড়িতেন । 
কিন্তু ইহার পরেও সেকালের বাঙালী জীবনে একটি অতি- 
মধুরিমাময় সামাজিক সম্পর্ক ছিল, যাহার উপর প্রেমকে প্রতিষ্ঠিত করা 
যাইত। সেটি বাল্যসঙ্গীর সহিত বাল্যসঙ্গিনীর সম্পর্ক । শিবনাথ শাস্ত্রী 
তাহার আত্মজীবনীতে একটি সুন্দরী খেলার সঙ্গিনীর কথ! বলিয়াছেন,__ 
“একটি সুন্বর ফুটফুটে গৌরবর্ণ মেয়ে আমাদের পাশের বাড়ীতে তাহার 
মাসীর কাছে গাসিত। সে আমার সমবয়স্ক। এ মেয়ে আসিলেই আমার 
খেলাধূল! লেখাপড়া ঘূচিয়া যাইত। আমি তাহার পায়ে পায়ে বেড়াইতাম। 
আমরা পাড়ার বালক-বাঁলিকা মিলিয়া ্টাদ চাদ, কেন ভাই কীদ' প্রভৃতি 
অনেক খেলা খেলিতাম। তখন সে আমাদের সঙ্গে খেলিত। খেলার 
ঘটনাচক্রে যদি আমি তাহার সঙ্গে একদলে না পড়িতাম, আমার অসুখের 
সীমা থাকিত না। আমি তাহার হাত ধরিয়। খেলার সঙ্গীদ্িগকে বলিতাম, 
আমি এর সঙ্গে থাকব, তোমরা আমার বদলে এ-দল হতে ও-দলে আর 
কারুকে দাঁও।' বাঁলকেরা আমার অন্থুরোধ রাঁখিত না, বকিয়া, ঠেলিয়া, 
গল! টিপিয়া আমাকে আর এক দলে দিয়া আসিত।” 
শিবনাথ কলিকাতায় পড়িতে গেলেন এবং মেয়েটির বিবাহ 
হইয়া গেল। স্বতরাং দুজনের আর দেখা হইত না। পরে বড় হইয়া 
ব্রাহ্ষঘমাজে যোগ দিবার পর তিনি আবার মেয়েটিকে দেখিলেন,__ 
“দেখিয়! চমকিয়া উঠিলাম। সে প্রস্ষটিত পু্পসম কান্তি বিলীন হইয়াছে, 
সম্তানভারে ও সংপাঁরভারে সে অবসন্ন হইয়া পড়িয়াছে। তাহাকে দেখিয়। 
মনে যে ভাব হইয়াছিল তাহা “তুমি কি আমার সেই খেলার সঙ্গিনী ” 
নামে একটি কবিতায় প্রকাশ করিয়াছি ।” 
আমার বাল্যকাল পর্যন্তও এই বাল্যসঙ্গিনীরা৷ ছিল। সন্তর 
বশুসরে উপনীত হইবার পর গ্রাম্যজীবনের এই চিন্ত-চাঞ্চল্যকারী 


বাঙালী সমাজ ও নৃতন ভালবাসা ১৭৩ 


মাধুর্যের কথা চাপিয়া রাখিবার কারণ দেখি ন!। বাল্যসঙ্গিনীর সহিত 
এই সম্পর্কই ছিল আমাদের জীবনের বিকচোন্ুখ 'ফ্লার্টেশন', উহার 
মিষ্টতা বর্ণনা করা কঠিন। নয়, দশ, এগারো! বছরের বালিকারাই 
উহার মায়াজাল ছড়াইত। উহা! তাহাদের দিক হইতে আরও মায়াময় 
হইত কলিকাতায় শিক্ষিত, মাজিত। ও গ্রামের চুয়াড়ে ছেলেদের 
তুলনায় একেবারে অন্য জগতের কিশোর দেখিলে । 

বড় বড় কালো চোখে সারাদিন দেখিয়া, আশেপাশে ঘুরিয়া, 
সন্ধ্যার পর বালকের তন্দ্রা আসিলে তাহার মুখের উপর ঝুঁকিয়া, 
মাথার চুল এলাইয়া দিয়া, গালে অতি কোমল গাল রাখিয়া কানে 
কানে বলিত, “দাদা, খেতে এস।৮ তখন সমস্ত শরীরে শিহরণ 
উঠিত না বলিলে একেবারে নির্ভলা মিথ্য। কথা বলা হহবে । 

বন্কিমচন্দ্রের প্রতাপ ও শৈবলিনী বালাসঙ্গী ও বাল্যসঙ্গিনী। 
উপন্যাসে তাহাদের সম্পর্ক বিয়োগান্ত নাটকে পর্যবসিত হইয়াছিল। 
কিন্তু বহ্িমচন্দ্র জানিতেন জীবনেও উহা আগমনীতে বিসর্জনের মত। 
তাই তিনি লিখিয়াছেন, 


“বাল্যকালের ভালবাসায় বুঝি কিছু অভিসম্পাত আছে। যাহাদের 
বাল্যকালে ভালবাসিয়াছি, তাহাদের কয়জনের সঙ্গে যৌবনে দেখা 
সাক্ষাৎ হয়? কয়জন বাঁচিয়া থাকে? কয়জন ভালবাসার যোগ্য 
থাকে? বাদ্ধক্যে বাল্যপ্রণয়ের স্থৃতিমাত্র থাঁকে, আর সকল বিলুপ্ত হয়, 
কিন্তু সেই স্বৃতি কত মধুর !” 


ইহার মধ্যে বাল্যসঙ্গিনীর স্মৃতি আরও মধুর। বঙ্কিমচন্দ্র 
লিখিতেছেন, 

“বালকমাত্রেই কোঁন সময়ে না কোন সময়ে অনুভূত করিয়াছে যে, এ 

বালিকার মুখমণ্ডল অতি মধুর। উহার চক্ষে কোন বোধাতীত গুণ 

আছে। খেল! ছাড়িয়া কতবার তাহার মুখপাঁনে চাহিয়৷ দেখিয়াছে-_ 

তাহার পথের ধারে, অন্তরালে দীড়াইয়া কতবার তাহাকে দেখিয়াছে। 

কখন বুঝিতে পারে নাই, অথচ ভালবাসিয়াছে। তাহার পর সেই মধুর 


১৭৪ বাঙালী জীবনে রমণী 


মুখ- সেই সরল কটাক্ষ--কোথাঁয় কাঁলপ্রভাবে ভাসিয়! গিয়াছে। তাহার 

জন্ত পৃথিবী খুঁজিয়া দেখি-_-কেবল স্থতিমাত্র আছে।* বাল্যপ্রণয়ে কোন 

অভিসম্পাত আছে ।” 

রবীন্দ্রনাথের “একরাত্র এই নিদারুণ অভিসম্পাতেরই গল্প। 
তবে এই অভিসম্পাত নায়কের নিজের স্থষ্টি। ইচ্ছা করিলে সে 
বাল্যসঙ্গিনীকে বিবাহ করিতে পারিত, কিন্তু করে নাই । ' সংসারে প্রবেশ 
করিবার পর আবার তাহার সান্নিধ্যে পুরাতন স্মৃতি জাগিয়! উঠিল-_ 
“বিশ্বাস, সরলতা এবং শৈশবপ্রীতিতে ঢলঢল ছুখানি বড় বড় চোখ, 
কালো কালো তারা, ঘনকৃষ্ণ পল্লব, স্থিরসিদ্ধ দৃষ্টি |” তখন আর তাহাকে 
পাইবার উপায় নাই। পরিণাম কি হইল তাহার আলোচনা আগেই 
করিয়াছি, কেন এমন হইল তাহার কথা পরে বলিব । 

রবীন্দ্রনাথের আর একটি গল্লেও এই মধুরিমাময়ী বাল্যসঙ্গিনীর 
এক অপরূপ চিত্র আছে। গল্পটা অন্যদিক হইতে বিশেষ কিছু নয়, 
কিন্তু নায়কের চিঠির মধ্যে বাল্যসঙ্গিনীর কথা যেন একটা সাধারণ গহনার 
মধ একখান৷ উজ্জ্বল মণি। নায়ক কলিকাতায় ছাত্র, বি-এ ফেল্ও 
করিতে পারিয়াছে ; হয়ত বাল্যসঙ্গিনীকে শহরে আবিষ্ষার করার ফলেই 
ফেল্‌ করিয়াছে । তাহার সন্দেহ জন্মিয়াছে বাল্যসঙ্গিনীর স্বামী ছুশ্চরিত্র, 
এবং মেয়েটির জীবন স্থুখের নয়। তাই তাহার জীবনে সুখ আনিবার 
জন্য কিছু পরামর্শ দিবার উদ্দেশ্যে যুবক একখানা চিঠি লিখিল,__ 
“সুচরিতানু, 

হতভাগ্য মন্থর কথা তুমি বোধ করি এতদিনে ভুলিয়া গিয়াছ। 

বাল্যকাঁলে যখন কাঁজিবাড়ির মাতুলাঁলয়ে যাইতাম, তখন সর্বদাই দেখান 

হইতে তোমাদের বাঁড়ি গিয়া তোমার সহিত অনেক খেল! করিয়াছি। 

আমাদের সে খেলাঘর এবং সে খেলার সম্পর্ক ভাঙিয়া গেছে। তুমি 

জাঁনো কিনা বলিতে পারি না, এক সময় ধৈর্যের বাঁধ ভাঙিয়া এবং 

লজ্জার মাথা খাইয়া তোমার সহিত আমার বিবাহের সম্বন্ধ চেষ্টাও 

করিয়াছিলাম, কিন্তু আমাদের বয়স প্রায় এক বলিয়া উভয়পক্ষের কর্তারা 

কোনোক্রমে রাজি হইলেন না ।” 


বাঙালী সমাজ ও নৃতন ভালবাসা ১৭৫ 


কলিকাতায় বাল্যসঙ্গিনীর বাসা খুঁজিয়া বাহির করিবার পর সেকি 
করিয়াছে, তাহার বিবরণ সে পরে দিতেছে, 
“তোমার সহিত সাক্ষাতের দুরাঁশা. আমার নাই এবং অন্তর্যামী জানেন, 
তোমার গাহস্থ্যনুখের মধ্যে উপদ্রবের মত প্রবেশলাভ করিবার দুরভিসন্ধিও 
আমি রাঁখি না। সন্ধ্যার সময় তোমাদের বাসার সম্মুখবর্তী একটি 
গ্যাসপোষ্টের তলে মামি ুর্য্যোপাঁসকের ন্যায় দাঁড়াইয়া থাকি-তুমি ঠিক 
সাঁড়ে সাতটার সময় 'একটি প্রজ্জলিত কেরোঁসিনের ল্যাম্প লইয়! প্রত্যহ 
নিয়মিত তোঁমাঁদের দৌঁতালার দক্ষিণদ্িকের ঘরে কাঁচের জানাঁলাঁটির 
সম্মুখে স্থাপন কর,_সেই মূহূৰ্তকাঁলের ভন্য তোমার দীপালোকিত 
প্রতিমাথানি আমার দৃষ্টিপথে উদ্ভাসিত হইয়া উঠে__তোমাঁর সম্বন্ধে আমার 
এই একটিমাত্র অপরাধ ।” 
বাকীটুকু পাঠক গল্পটাতে পড়িবেন। উহার নাম যে “ডিটে কুভ' 
তাহা বলিয়া দিতে হইবে না। যেটুকু উদ্ধত করিলাম তাহা হইতেই 
বোঝা যাইবে, বাল্যসঙ্গিনীকে কোন্‌ দিবালোকে লইয়া যাওয়া 
বাঁডালীর মনে নৃতন প্রেমের উদ্ভবের পর সম্ভব হইয়াছিল। ইহাকি 
“ভিতা নুয়োভা' যে-লোকে তাহারই বাঁঙালীকৃত রূপ নয়? দান্তেও 
তো বেয়াত্রিচেকে নয় বৎসর বয়সেই দেখিয়াছিলেন। এই দেখার 
ফল কি হইয়াছিল তিনি পরজীবনে কৰি হইয়া লিখিয়াছিলেন__ 


“01011016৮10 100%2,12000 0৪৪ 1016107 770) 001 ৮৪1219779 
10101101100001 0111)1,)) 


(আজ হইতে নবজীবন আরম্ত হইল । দেখ, এই দেবতা আমার চেয়ে 
শক্তিমান। তিনি আসিয়। আমার উপর আধিপত্য বিস্তার করিলেন |) 


গঞ্ওন্ম পভ্রিক্ছেদ 
বাঁডালীর মন ও ভালবাস! 


ইতিহাসের অধিষ্ঠাত্রী দেবী আজ বাডালীর কাছে খেউক-খর্পরধারিনী 
করালী মুতিতে আবিভূ্তী। কিন্তু উনবিংশ শতাব্দীতে তিনি আমাদের 
কাছে জগদ্ধাত্রী অন্নপূর্ণা রূপে দেখা দিয়াছিলেন ৷ তাই প্রেমের প্লাবনে 
আমাদের হৃদয় ভাসিয়া গিয়াছিল। 

কিন্তু এই প্লাবন আসিয়াছিল কোন্‌ নদীতে ? নদী কি বাস্তবিকই 
ছিল? এই প্রশ্নগুলি ভুলিতেই হইবে। শান্তি যখন “এ যৌবন- 
জলতরঙ্গ রোধিবে কে?” গাহিতে গাহিতে নিজেদের কুটিরে প্রবেশ 
করিল তখন জীবানন্দ মাটিতে বসিয়া সারঙ্গ বাজাইতেছিলেন। তিনি 
জিত্ভাসা করিলেন, “এত দিনের পর জোয়ার গার্গে জল ছুটেছে কি ?” 
শান্তিও হাসিয়া উত্তর দিলেন, “নালা-ডোবায় কি জোয়ার গাঙ্গে জল 
ছুটে ?” 

সত্যই প্রাগ-ব্রিটিশ যুগে বাঙালীর হৃদয় নালা-ডোবা হইয়! গিয়াছিল। 
সে নালা-ডোবাও আবার কতখানি পঙ্কিল ছিল তাহার পরিচয় পাঠিক- 
পাঠিকা দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে পাইয়াছেন। কিন্তু পাশ্চাতা প্রভাবে তাহাতে 
বন্যা আসিয়া মনটির অবস্থা এমন দড়াইয়াছিল যে তাহাকে “সর্বতঃ 
সম্প্রতোদক” মন বলিতে পারা যায়। সে পাশ্চাত্য প্রভাব কি, ও কি 
ধরনের, তাহার পরিচয় পরে দিব। এই পরিচ্ছেদে শুধু সেই জোয়ারের 
দৃশ্য দেখাইব | 

ইংরেজী সাহিতা ও পাশ্চাত্য জীবন হইতে প্রেমের নৃতন রূপের 
সন্ধান পাইবার পর উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে বাঙালী ইহার 
আকর্ষণে ও আবেগে বিভোর হইয়া গিয়াছিল। তখন প্রায় প্রতিটি 
বাঙালী যুকককেই তাহার অদৃষ্ট জিজ্ঞাসা করিতে পারিত,- 

“ওগো, দেখি, আখি তুলে চাঁও-_ 
তোমার চোখে কেন ঘুমঘোর ?” 


বাঙীলীর মন ও ভালবাস! ১৭৭ 


সেও উত্তর দিত, 
“আমি কি যেন করেছি পান-- 
কোন্‌ মদিরা রসভোর, 
আমার চোখে তাই ঘুমঘোর ।” 
অদৃষ্ট ধিকার দিয়া বলিত,_ছি,ছি,ছি! কিন্তু সে লজ্ভিত না 
হইয়! উদ্তর দিত,_ 
“সখী, ক্ষতি কি! 
এ ভবে কেহ পড়ে থাকে, কেহ চলে যায়, 
কেহ বা আলসে চলিতে না চায়, 
কেহ বা আপনি স্বাধীন, কাহারো 
চরণে পড়েছে ভোর । 
কাহারো নয়নে লেগেছে ঘোর 1”. 


যেহেস্ত বাঙালী চরিত্র বাঙালীরই চরিত্র, তাই এই অনুভূতিতে 
খানিকট৷ দুর্বলতা ছিল। কেহই অস্বীকার করিতে পারিবে না যে, 
এই নুতন প্রভাবে সে অতিরিক্ত আত্মসচেতন হইয়া পড়িয়াছিল, তাহার 
ভাবুকতা৷ ও ভাবুকের মত চলাফেরা একটু লোকদেখানো হইয়াছিল, এমন 
কি ঢং এবং আদেখলেপনাও তাহার চরিত্রে ছিল। 

তখন বাভালী সবেমাত্র ব্যক্তিগত জীবনে কতকগুলি নৃতন ভাব, 
আবেগ, ও আবেশের খোজ পাইয়াছে। এই অনুভূতি তাহাদের 
মানসিক জীবনে এমনই একট। চাঞ্চল্য আনিয়াছিল যে তাহাদের স্ফির 
থাকিবার উপায় ছিল না, তাহাদের সমস্ত চেতন! উহার উপর বড় নদীতে 
ডিঙ্গি নৌকার মত দোল! খাইতেছিল। সেই প্রবল তরঙ্গে ক্ষীণপ্রাণ 
বাঙালী যুবককে ডিঙ্গি ভিন্ন আর কিছু বলা যাইত না। তাই তাহারা 
নিজেদের সম্বন্ধে উগ্রভাবে সচেতন হইয়া পড়িয়াছিল। তাহারা যেসব 
নৃতন ভাব অনুভব করিতে শিখিয়াছে, যেসব নূতন তব পাইয়াছে, সে 
সবই তাহার্দের মনের কপালে অনভ্যাসের ফৌটার মত চড়চড় করিতেছিল। 
সংক্ষেপে বল! যাইতে পারে, তাহার! ভাবজগতের নৃতন বড়লোক হুইয়। 

১২ 


১৭৮ বাঙালী জীবনে রমণী 


পড়িয়াছিল। সুতরাং তাহাদের পক্ষে একটু আদেখলে বা লোক- 
দেখানো হওয়া স্বাভাবিক । ইহা লইয়া একটু তামাশাও করা যাইত। 

নব্যবঙ্গের এই বাউলরা ছুই দিক হইতে অবতঞ্জা বা পরিহাসের পাত্র 
হইয়! দাড়াইয়াছিল। একদিকে ইংরেজ উহাদের অনুকরণশীল বানর 
বলিয়। মনে করিত, অন্যদিকে বিষয়ী ও রক্ষণশীল বাঙালীরা তাহাদের 
সং বলিয়া ভাবিত। সকলেই ধরিয়া লইত, এই মানসিক শৌখিনতা 
টিকিবার নয়, দুই এক ধোপ দিলেই উহার রং উঠিয়া দিব্য সাফ হইয়া 
যাইবে; তখন চাকুরি করিয়৷ বা ওকালতি ডাক্তারি করিয়া অল্প পয়সা 
গোনা ছাড়া আর কোনও বিষয়ে উৎসাহ থাঁকিবে না। অনেক ক্ষেত্রে 
তাহ! যে হইত, সে-বিষয়েও সন্দেহ নাই। 

সর্বোপরি তাহাদের 'লাভে' পড়িবার হুর্বলতা একটা পরিহাসের 
ব্যাপার ছিল। এ ধরনের 'লাভ' লইয়া মধুর পরিহাসের কাহিনী লেখা 
যায়। রবীন্দ্রনাথের “গোড়ায় গলদ” ও “চিরকুমার সভা*তে এই পবিহাস 
অতি মৃদু ও মধুর ভাবে আছে । প্রভাত মুখোপাধ্যায়ের গল্লেও ইহার 
অবতারণা করা হইয়াছে । তাহার তিনটি গল্পের কথা অনেকেরই মনে 
পড়িবে একটি “বৌচুরি+, একটি “মানিকের প্রেম”, ও তৃহীয়টি “আমার 
প্রেম । (শেষ গল্পটির নাম আমার স্পঞ্ট মনে নাই *)। রবীন্দ্রনাথ 
এই নব্যবঙ্গকে জানিতেন। নূতন বাঙালী চরিত্রের ছুর্বলতা তাহার 
অভ্ভ্াত ছিল না, ইহা যে পরিহাসের খোরাক যোগাইতে পারে ইহাও 
তিনি বুঝিয়াছিলেন। তাহার “অধ্যাপক গল্পে এই ছূর্বল আত্মস্তরিতা 
লইয়। একটু নির্মম ব্যঙ্গই তিনি করিয়াছিলেন । 

কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ইহাও জানিতেন যে, এই ছুূর্বলতাই নৃতন 
বাঙালী চরিত্রের সবটুকু নয়। এমন কি অধ্যাপক” গল্লেও উহার 
সবলতার দিক তিনি চাপ দেন নাই। নায়ক অহমিকার বশে 
নিজেকে একেবারে বোকা বানাইয়াও পরে নিজেকে উদ্ধার করিল । 


সপ পাপী পপ সস জজ পর 


* গল্পটির নাম “আমার উপন্া”। প্রায় পঞ্চাশ বৎসর পরে আবার 
পড়িলাম। অতি মধুর লাগিল।-_ ন, চ. (২1৪৬৯) 


বাঙালীর মন ও ভালবাসা ১৭৯ 


নিজের বোকামির কাহিনী সে নির্মমভাবে লিপিবদ্ধ করিয়া শেষে 
লিখিল, “রাত্রে বাড়ীতে আসিয়া আমার রচনাবলীর খাতাখানা 
পুড়াইয়া ফেলিয়া দেশে গিয়া বিবাহ করিলাম। গঙ্গার ধারে যে বৃহৎ 
কাব্য লিখিবার কথা ছিল তাহা লেখ! হইল না, কিন্তু জীবনের মধ্যে 
তাহ! লাভ করিলাম ৮ 

কিন্তু বাঙালী চরিত্রের স্বাভাবিক দুর্বলতার সহিত অসাধারণ 
শক্তির সমন্বয় রবীন্দ্রনাথ দেখাইয়াছেন সর্বোপরি “সমাপ্তি গল্পে, 
অপূর্বের চরিত্রে। এই গল্পটিতে কোন্‌ চরিত্র মুখা, কোন্টি গৌণ সে 
সম্বন্ধে ভলের অবকাশ আছে । আমি দেখিয়াছি, অনেকেই মনে করেন 
ৃন্ময়ীই প্রধান, শুধু তাহার উদ্দাম সরলতার লক্ষ্য হিসাবে শৌখীন 
অপুর্বের অবতারণা করা হইয়াছে। অর্থাৎ গল্পটা হাস্যরসের; এটা একটা 
মি পরিহাস ; খুব বেশী হইলে গ্রাম্য প্রাকৃত চরিত্রের একটা 'ঈডিল্‌” । 

অপূর্ব যেভাবে দ্রেখ। দিল এবং যেভাবে তাহার বিবাহ পর্যন্ত 
ব্যাপারটা চলিল, তাহাতে এই ধারণা করা অসঙ্গত নয়। শৌখীনতার 
ধাকা অবশ্য প্রথমে তাহার বেশভৃষা, প্রসাধন, ও অন্যান্য বাহিক 
আচারেও পোৌছিয়াছিল। তাই তাহার বাক্সে ষে এসেন্স, রুবিনির 
ক্যান্ষর, রঙিন চিঠির কাগজ, হার্মোনিয়াম শিক্ষা, ও কবিতার খাতা 
থাকিবে তাহা! মোটেই আশ্চর্য নয়। আমার বাল্যকালে কলেজে 
পড়া এক পিসস্ুতো দাদা শহর হইতে আমাদের বাড়ী আসিয়াছিলেন। 
তিনি যখন ট্রাঙ্ক খুলিলেন তখন দেখিলাম, উহাতে ল্যাভেগ্ার ওয়াটার, 
রুবিনির ক্যাম্ষর, রঙিন চিঠির কাগজ, ইত্যাদি সবই আছে । রুবিনির 
ক্যাম্ষর কি আজকাল অনেকেই বুঝিতে পারিবেন না। আমি অনেক 
দেখিতাম__উহা! কলেরার প্রতিষেধক । তখন আধুনিক ব্যক্তিমাত্রেই 
গ্রামে আসিবার সময়ে উহা! লইয়া! আসিত। 

কিন্তু রবীন্দ্রনাথ সমাপ্তি” গল্পে ভাবিলেন, এই যে চরিত্র__যাহা 
আপাতদৃষ্ভিতে বলহীন ও শৌখীন, তাহা লইয়াই দেখাইবেন উহার 
অন্তনিহিত শক্তি কতটুকু, এই চরিত্রই কিভাবে আদর্শের দৃঢ়তা, নিষ্ঠা 


১৮০ | বাঙালী জীবনে রমণী 


অবিচলিত বিশ্বাস, সর্বোপরি প্রেমের দ্বারা সকল অসামর্থ্য অতিক্রম 
করিয়া কোথায় উঠিতে পারে। অপূর্ব যে উঠিয়াছে তাহাতে সন্দেহ নাই। 

তাহার শৌখীনত! যে উপরের বানিশ বা রং মাত্র, ভিতরের পদার্থ 
নয়, তাহার পরিচয় গোড়াতেই পাওয়া গিয়াছিল। বলিষ্ঠতা না 
থাকিলে সে মুন্ময়ীর প্রেমে পড়িত না, কারণ সে ঝৌকের মাথায় 
মন্ময়ীকে বিবাহ করিবে স্থির করিলেও, আগে অবকাশের সময়ে, 
এমন কি অনবকাশের সময়েও তাহার মুখখানির কথা অনেক চিন্তা! 
করিয়াছিল। তার পর এই বিবাহের জন্য জেদেও তাহার মনের জোর 
দেখ! গিয়াছিল। তবু বলা যাইতে পারে, এ ছুইএর মধ্যে আবেগের 
প্রভাব ছিল। কিন্তু বিবাহের পর হইতে তাহার চরিত্র সন্ধন্ধে আর 
কোন সন্দেহের অবকাশ রহিল না। তাহার শক্তির উপর সত্যই 
টান পড়িল। 

বাংল৷ সাহিত্যে প্রেমের গল্পের নায়কের সাধারণত কাপুরুষ 
হয়। রবীন্দ্রনাথের নিজের “হৈমন্তী” ও “অপরিচিতা গল্পের এবং 
শরতচন্দ্রের 'পরিণীতা” ও 'অরক্ষণীয়া' গল্পের, চারিটি নায়কের মত 
কাপুরুষ কল্পনা করা শক্ত। তবু ইহার্দের মধ্যে অনুপম ও শেখর 
খানিকটা প্রায়শ্চিণ্ত করিয়াছিল, অন্য ঢুটির কাপুরুষতা একেবারে 
সীমাহীন। এই মাপে বিচার করিলে অপূর্বকে বীর বলিতে হয়। 
সে মায়ের ভ্সন! সত্বেও বৌকে বাপের কাছে লইয়া যাইতে পশ্চাঁ- 
পদ হয় নাই, বাঙালী যুবকের মত অভিভাবকের সম্মুখে পৃষ্ঠ-প্রদর্শনের 
দৃষ্টান্ত দেখায় নাই। 

কিন্তু সর্বোপরি তাহার বীরত্ব দেখ! গিয়াছিল মৃম্ময়ীর প্রতি 
তাহার ভালবাসা সম্পর্কে । বিবাহের পরই দেখা গেল, গ্রামের 
লোক. তাহার পছন্দের নামকরণ যে “অপূর্ব পছন্দ” করিয়াছিল তাহা 
মিথ্যা নহে। সত্যই তাহার বধূ তাহার মাতার বর্ণনার অনুরূপ-_ 
অর্থাৎ অস্থিদাহকারী দশ্থ্য মেয়ে। তখনকার দিনের বাঙালী সমাজে 
উপহাম্ত 'লাভে' পড়িয়া, নান! দিকে বোকা বনিয়! ও হাস্তাস্পদ হইয়। 


বাঁতালীর মন ও ভালবাসা ১৮১ 


দুর্বল বাক্তি আক্েলসেলামি দিতে প্রস্তুত থাকিলেও প্রেমে নিষ্ঠা রাখিতে 
পারিত না, কলিকাতায় ফিরিয়া ব্যর্থ ভালবাসার জ্বালা বেশ্যালয়ে মিটাইত, 
যদি সত্যই ভালবাসিয়া থাকিত তাহা হইলে আরও সেখানে যাইত । 

আপনাদের বলিয়! দিতে হইবে না যে, প্রাণ দিয়। ভালবাসা 
মনেক ক্ষেত্রেই জানিয়া শুনিয়। বিষপান করার মত। যাহার ভাল- 
বাসার ক্ষমতা যত বেশী তাহার বিপদও তত বেশী। তাই “গোরা'তে 
আনন্দময়ী বিনর সম্বন্ধে বলিয়াছিলেন, “ও যদি একবার আত্মসমর্পণ 
করল, তবে ও আর কিছু হাতে রাখতে পারে না। সেইজন্যে আমাকে 
বড় ভয়ে ভয়েই থাকতে হয়, ওর পাছে এমন জায়গায় মন যায় যেখান 
থেকে ওর কিছুই ফিরে পাঁবার কোন আশা নেই।” বেশীর ভাগ 
লোকের সৌভাগ্য এই ষে, তাহারা ভালবাসার অক্ষমতার জন্য, হৃদয়ের 
ক্ষুদ্রতার জন্যই জীবনের চরম দুঃখ হইতে অব্যাহতি পায় । 

/প্রেম খেলা নয়, ব্যর্থ প্রেম আরও ভয়ানক- হৃদয়দহনজ্বালা, সারা- 
জীবন না মরিয়া চিতানলে দগ্ধ হইবার মত। অতি অল্প লোকেরই এই 
জ্বালা সহিবার ক্ষমত। থাকে । তাই অসহনীয় হইলে কামের শরণাপন্ন 
হইয়! সেই দাহ নিভাইতে চাহে । ইহা যে স্বাভাবিক তাহাও আপনা- 
দিগকে বলিতে হইবে না। একমাত্র কামই বার্থ প্রেমের যন্ত্রণাকে 
নাইটি ক আসিডের মত পোড়াইয়া ফেলিতে পারে । কিন্তু হায়, এই 
আ্আসিডে সোনাই পুড়িয়া যায়, শুধু খাদ থাকে । / 

অপূর্ব প্রেমে নিরাশ এবং হাস্যাম্পদ হইয়াও এক মুহূর্তের জন্য 
নিজের উপর, সুম্মপনীর উপর, বা প্রেমের উপর আস্থা হারায় নাই। 
এমন কি কলিকাতায় যাইবার আগে সৃম্ময়ীর মনে বিরহব্যথা জাগাইবার 
চেষ্টা করিয়া অতিশয় হাস্যকর উত্তর পাইয়াও তাহার মনে হয় নাই যে 
সে ভুল করিয়াছে । শুধু পাশে ঘুমন্ত ম্ৃন্ময়ীর মুখের উপর চাদের 
আলো আসিয়! পড়ার পর সেদিকে চাহিয়া ভাবিল-_যেন রাজকম্যাকে 
কে রূপার কাঠি ছৌয়াইয়া অচেতন করিয়া! রাখিয়া গিয়াছে; এরপর 
সোনার কাঠি পাইলেই এই নিক্রিত আত্মাটিকে জাগাইয়া তুলিয়া মালা 


১৮২ বাঙালী জীবনে রমণী 


বদল করিয়া লওয়৷ যায়; রূপার কাঠি হাস্য, আর সোনার কাঠি 
অশ্র্জল। কলিকাতায় ফিরিবার পর মৃম্ময়ীর কাছে হইতে কোন চিঠি 
ন৷ পাইয়া বা কোন সাড়া না পাইয়াও তাহার ভালবাস! টলে নাই, 
এমন কি অভিমান ত্যাগ করিয়া সে নিজেই চিঠি লিখিতে প্রস্তৃত 
হইয়াছিল। এই দৃঢ়তা দূর্বল বা শৌখীন বাঙালী যুবকের ধর্ম নয়-_ 
ইহার জন্য শৌখীনতার পিছনে আরও কিছু থাকা প্রয়োজন- সে বীরত্ব। 
মনে রাখিবেন, যুদ্ধের অপেক্ষাও পুরুষের শক্তি ও সাহসের পরিচয় 
পাওয়া যায় ভালবাসিবার ক্ষমতার মধ্যে । যুদ্ধ পুরুষের আত্মপ্রকাশ, 
ভালবাসা পুরুষের আত্মবিস্মৃতি। তাই যুদ্ধে আত্মসমর্পণে কলঙ্ক আছে, 
প্রেমে আত্মসমর্পণে গৌরব ভিন্ন কিছু নাই। 

এর পর বাঙালী মেয়ের মনে প্রেমের বিকাশের কথা । “সমাপ্তির 
প্রসঙ্গেই উহার আলোচনা করিব। মৃন্ময়ী একটি ছুরম্ত, উদ্দাম গ্রাম্য 
বালিকা, ইংরেজীতে যাহাকে বলে “টমবয়” তাহার পাত্রাপাত্র জ্ঞান নাই, 
সে পাগলী, আচারব্যবহার ও কারধকলাপের জন্য একাধারে স্নেহ ও 
কৌতুকের পাত্রী, ইহাই তাহার চরিত্র নয়। অপূর্বের শৌখীনতা যেমন 
বাহক ব্যাপার, এগুলিও তেমনিই বাহিক ব্যাপার । মৃন্ময়ী যদি শুধু 
এরকমই হইত-_তাহা হইলে উহার সম্বন্ধে গল্প লিখিবার আবশ্যক হইত 
না। কি ধরনের গ্রাম্য মেয়ে দেখিয়া রবীন্দ্রনাথের মনে সুম্ময়ীর সুচনা 
হইয়াছিল, তাহার বর্ণনা রবীন্দ্রনাথের একটি চিঠিতে আছে। রবীন্দ্রনাথের 
বজরা ১৮৯১ সনের জুলাই মাসে সাজাদপুরের ঘাটে বাধা ছিল। 
তীরের অনেকগুলি 'জনপদ-বধূ'র মধ্যে তিনি একটি মেয়েকে দেখিতে 
পান। তিনি লিখিতেছেন-__ 


“ওদের মধ্যে একটি মেয়ে আছে, তার প্রতিই আমার মনোযোগটা সর্বাপেক্ষা 
আকু্ট হচ্ছে। বোধহয় বয়েস বারো-তেরে হবে, কিন্তু হষটপুষ্ট হওয়াতে 
চোদ্দপনর দেখাচ্ছে । মুখখানি বেড়ে । বেশ কালো অথচ বেশ দেখতে । 
ছেলেদের মত চুল ছাঁটা, তাঁতে মুখটি বেশ দেখাচ্ছে । এমন বুদ্ধিমান 
এবং সপ্রতিভ এবং পরিফ্ষার সরলভাব। একটা ছেলে কোলে করে এমন 


বাঙালীর মন ও ভালবাস! ১৮৩ 
নিঃসঙ্কোচে কৌতূহলের সঙ্গে আমাকে চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগল... 
বাস্তবিক, তার মুখখানি এবং সমস্ত শরীর দেখতে বেশ, কিছু যেন নির্কু্ধিতা 
কিন্বা অসরলতা কিম্বা অসম্পূর্ণতা নেই। বিশেষত আধা ছেলে আধা 
মেয়ের মত হয়ে আরও একটা বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করে। ছেলেদের 
মত আত্ম সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অচেতন ভাব তার এবং সঙ্গে মাধুরী মিশে ভারী 
নৃতন রকমের একটি মেয়ে তৈরি হয়েছে ।” 
সেই মেয়েটির মা বলিতেছিল- মেয়েটার বুদ্ধিন্দ্ধি নাই, “কারে 

কি কয়, কারে কি হয়, আপনপর জ্ঞান নেই। সে-ও শ্বশুরবাড়ি যাইতে 

চাহে নাই, টানিয়া-টুনিয়া নৌকায় তোলা হইয়াছিল। ইহাকে দেখিয়া 
রবীন্দ্রনাথ মুন্ময়ীর কল্পনা করিয়াছিলেন বটে, কিন্তু মৃন্ময়ী এ মেয়ে নয়। 
অমন মেয়ে বাংলাদেশে সহ সহত্র জন্মিত। 

আসলে মৃন্ময়ী অন্য চরিত্রের নায়িকা । তাহার প্রথম রূপ পুরুষের 
প্রেম সম্বন্ধে অসাড়হৃদয় একটি স্থৃপ্ুচৈতন্য কিশোরী বা যুবতীর । সেই 
অবস্থায় তাহার যে উদ্দাম চঞ্চলতা দেখানো হইয়াছে তাহা৷ শুধু তাহার 
বলিষ্ঠতা দেখাইবার জন্য । রবীন্দ্রনাথ একথা স্পষ্ট বলিয়া দিয়াছেন__ 

"সে মৃম্ময়ী আর নাই। এমন পরিবর্তন সাধারণত সকলের সম্ভব নহে। 

বৃহৎ পরিবর্তনের জন্য বৃহৎ বলের আবশ্যক ।৮ 
মৃন্ময়ী চরিত্রের মুলগত কথাটা ভূলিলে চলিবে না। “সমান্তি-তে 

ঢুইটি মুন্ময়ী পর পর দেখা দিল। প্রথম মৃম্ময়ী শিশু-_যৌবনের দেহগত 

প্রকাশেও শিশু; অপরটি কিশোরী হইয়াও পূর্ণ বিকশিত নারী। মুকুলের 
পরিণতি পুস্পে হইয়াছে, ইহা মনে না রাখিলে গল্পটা পড়াই বৃথা । এই 

কারণেই উহা আমার কাছে বাঙালী জীবনে ভালবাসার অনুপস্থিতি ও 

আবির্ভাব, এ ছুয়েরই প্রতীক । 
চেতনা পাইবার পর ও প্রেমের পিপাসা জাগিবার পর যে সৃম্ময়ী 

দেখ! দিল, আগেকার উদ্দাম সৃন্ময়ী সম্বন্ধে সে মৃম্ময়ীর কোন সমবেদনা 
বা প্রশ্রয় ছিল না। যে পরিতাপ ও লজ্জায় নৃতন স্ৃন্ময়ী নিজেকে 
ধিক্কার দিতেছিল তাহা! এই-ম্বামী তাহাকে দুরন্ত, চপল, অবিবেচক, 


১৮৪ বাঙালী জীবনে রমণী 


নির্বোধ বালিকা বলিয়া জানিল, পরিপূর্ণ হৃদয়াম্ৃতধারায় প্রেমপিপাসা 
মিটাইতে সক্ষম রমণী বলিয়৷ পরিচয় পাইল না। ইহার জন্য স্বামীর 
উপরও তাহার অভিমান হইল-_সে মনে মনে বলিতে লাগিল, “আমি 
আমাকে বুঝিতে পারি নাই বলিয়া তুমি আমাকে বুঝিলে না কেন ?” 

অপুর্ব তাহার সন্বন্ধে যে ধারণা করিয়া গেল তাহা স্মরণ করিয়া 
মিলনের প্রাক্কালেও মৃন্ময়ীর মনে একট! ভীতি রহিল। শাশুড়ী যখন 
তাহাকে কলিকাতা লইয়া যাইবেন বলিলেন, তখন সে স্থখে-আনন্দে 
অধীর হইয়৷ বিছানার উপর পড়িয়। বালিশখান! বুকের উপর চাপিয়া 
হাসিয়া নড়িয়া! মনের আবেগ উন্মুক্ত করিয়! দিল বটে; কিন্তু পরমুহূর্তেই 
অপূর্ব তাহাকে কি মনে করিয়াছে তাহা স্মরণ করিয়৷ উঠিয়া বসিয়া 
বিষণ, গম্ভীর এবং আশঙ্কায় পরিপূর্ণ হইয়া কীদিতে লাগিল_ পাছে 
অপূর্ব তাহার নূতন সন্তার পরিচয় পাইবার পূর্বেই তাহাকে প্রত্যাখ্যান 
করে। অথচ অপূর্বের দিক হইতে প্রত্যাখ্যান এড়াইবার জন্য তাহাকে 
যাহা করিতে হইবে, সেটাও কম সঙ্কোচের ব্যাপার নয়; প্রগল্ভা এমন 
কি ব্যাপিকা হইয়া তাহাকেই অগ্রসর হইয়া স্বামীকে আদর করিতে 
হইবে। ইহা দিনের বা প্রদীপের আলোতে তখনই ভীতা, সম্কুচিতা 
মুন্ময়ীর পক্ষে সম্ভব হইত না, তাই রবীন্দ্রনাথ এই গল্পের সমাপ্তি অন্ধকার 
ঘরে করিয়াছিলেন। গভীর অন্ধকারই মৃন্ময়ীকে যাচিয়৷ গিয়া আত্ম 
সমর্পণের সাহস দিয়াছিল। 

“সমাপ্তি” সৃন্ময়ীকে বাদ দিয়া এই ধরনের স্থৃপ্তচৈতন্য আরও তিনটি 
নায়িকার কথা আমি পড়িয়াছি। উহাদের একটি রবীন্দ্রনাথেরই 
“মাল্যদান' গল্পের কুড়ানি, একটি বঙ্কিমচন্দ্রের কপালকুগ্ডুল। ও আর 
একটি জোসেফ কনর্যাডের “রোভার উপন্যাসে আলেৎ। ইহাদের 
মধ্যে চেতনা জাগ্রত হইবার পর মুম্ময়ী ও আর্লদেতের জীবন নখের 
হইয়াছিল, কুড়ানির অদৃষ্টে প্রেমের ফল দীড়াইয়াছিল মৃত্যু, কপাল- 
কুগুলার প্রেম সম্বন্ধে কোন চেতনাই হয় নাই। কপালকুগুলা অবশ্য 
শুধু পুরুষ সম্বন্ধে স্ুগুচৈতম্য ছিল, নিজের সম্বন্ধে নয় । 


বাঙালীর মন ও ভালবাসা ১৮৫ 


আর, নায়কদের দিক হইতে তিনজন-_“সমাপ্তি'র অপুর্ব, 'কপাল- 
কুগুলা'র নবকুমার, ও 'রোভারে'র লেফটেনাণ্ট রেয়াল চেতনা জাগ্রত 
হইবার অপেক্ষা! না রাখিয়াই ভালবাসিয়া ফেলিয়াছিল; “মাল্যদানে'র 
যতীন ভালবাসে নাই শুধু এইজন্য যে, তাহার মনে হইয়াছিল এই অবস্থায় 
প্রণয়ের সম্ভাবনা তোলাই নিষ্ঠুরতা হইবে; লেফটেনাণ্ট রেয়ালেরও 
তাহাই মনে হইয়াছিল, এবং নিজেকে সংযত করিতে ন৷ পারার জন্য সে 
ধিক্কারে আত্মহত্যা করিতে অগ্রসর হইয়াছিল, কেবল যুদ্ধের সময়ে সেনানীর 
প্রাণ তাহার দেশের, নিজের নয় ; সেজন্য করে নাই। কুড়ানি তাহাকে 
ভালবাসে শুনিয়৷ পরে যতীন নিজেও তাহাকে ভালবাসিয়াছিল। 

এই প্রসঙ্গে একটা প্রশ্ন উঠিতে পারে । যে নারীর প্রেম বা পুরুষ 
সম্বন্ধে কোন চেতনাই নাই, তাহাকে ভালবাস কি করিয়া সম্ভব ? 
এ যেন পিগম্যালিয়নের গল্লের মত, নিজে মূতি গড়িয়া তাহাকে 
ভালবাস ।॥ কিন্তু তাই যদি হয়, সেটাও অস্বাভাবিক নয় । পিগম্যা- 
লিয়নের গল্পটাকে নরনারীর প্রেমের একট। রূপক বলিয়া ধরা যাইতে 
পারে। বেশীর ভাগ প্রণয়ীই বুঝিতে পারে না যে শরীর-ধারিণী 
প্রণয়িনী দেখা দিবার বহু পূর্বে তাহার মনে প্রীণয়িনীর একটা মানস- 
প্রতিমা গড়া থাকে, ভালবাসার জন্য শুধু এমন একটি জীবন্ত নারীর 
অপেক্ষা থাকে যাহার উপর মানস-প্রতিমাকে আরোপ কর! যায়। 
ইহাও বল! দরকার যে, এই আরোপণ খুব শক্ত নয়। যদি জীবন্ত 
নারীটি দেহে ও মনে মানস-প্রতিমার বিসম্ধাদী না হয়, এবং সে নিজে যদি 
রূপ, বিষ্ভা বা বাপের টাকার গুমোরে এই আরোপণে বাধা না জন্মায় 
তাহা হইলে অশরীরিণী ও শরীরধারিণীর এক্য অতি সহজেই হইয়া যায়। 

আসল কথা এই, পুরুষ নারীকে ভালবাসে সে নারী বলিয়াই_ 
সে অমুকের কন্যা, সে অমুক পরীক্ষা পাস, ৰা তাহার এত টাক! আছে 
বলিয়া নয়, এমন কি তাহার এত সব গুণ আছে বলিয়াও নয়। এ 
বৃত্তিটা প্রায় ষোল আনাই কোন ত্ন্দর জীব ব৷ দৃশ্য দেখিয়া মৃধ 
হইবার মত-_কাহারও বাঘ দেখিলে ভাল লাগে, কাহারও ময়ূর, 


১৮৬ বাঙালী জীবনে রমণী 


কাহারও বিড়ালছানা, কাহারও বা গাছ ও ফুল, কাহারও প্রভাত ও 
সন্ধ্যার আকাশ ও মেঘ মাত্র। তাই প্রণয়ী প্রণয়িনীকে শুধু সন্ধ্যার 
মেঘমালা মনে করিয়াও ভালবাসিতে পারে । 

তবে কিবুদ্ধি ও মনের সহিত ভালবাসার কোন সম্বন্ধ নাই? 
এরুটা আছে, সেকথা পরে বলিব। প্রথমে এইটুকু মাত্র বোঝা দরকার 
যে, প্রেমের প্রথম প্রকাশে মন অবর্জনীয় নয়, মনের পরিচয় না 
পাইলেও ভালবাসা সম্ভব। লেফটেনাণ্ট রেয়াল স্বপ্তচৈতন্য আর্লেৎকে 
ভালবাসিয়৷ নিজেকে সেই নিগড় হইতে মুক্ত করিবার জন্য অবজ্ঞাভরে 
কেবলই বলিতেছিল-_-1১০ ৮/1010906 701701 13009 ৬৮1000£ 
101.0.৮ শুধু তাই নয়, পিগম্যালিয়নের কথাও স্মরণ করিয়াছিল__ 


£[79,51)76 07616106218 01909 2 10001 06৮1] ৮170 1511 21) 10৮6 ৮101) 
2, 01060106 ০৫ 2 90009, 172 0580 10 ০ 2110 ০0769011012 1 
1119 17115001000 02700006 501702160. 101 28176 1 511, 
5111 £০ ০9 1001 26 1067 25 2 2 0100075 1০০, 2 01০0015 3 
1070010172,)16 25 1 10 1720 1968618 017007 19,55.% 


কিন্তু বৃথা বাক্যব্যয় ! পরমুহূর্তেই তাহাকে বলিতে হইয়াছিল-_ 


“বি 0, 10156 0 411 0 062 29 20550155600010175 010010270 
056176, 410. 01700-571020 00 1] 0219 27১00 1761 01750 21? 


প্রেমের জন্য যে জিনিসটার প্রয়োজন হয় (অবশ্া আমি পুরুষের 
কথাই বলিতেছি, নারীর দিক হইতে কিছু বলিবার অধিকার আমার 
নাই ), তাহা জীবন্ত নারীত্ব, দেহে ও প্রকৃতিতে । রূপ, দেহসৌন্টিব, 
কণ্ঠন্বর, মুখের ভাব, চলাফেরা সবেতেই উহার প্রকাশ হয়, কখনও 
এগুলির কোনও একটা, কখনও বা সবগুলি অল্পবিস্তর জড়াইয়া 
আকর্ষণের সৃষ্টি করে। নবকুমার রূপ দ্রেখিয়াই তালরাসিয়াছিল। 
তাই কপালকুণগ্ডলাকে বলি দিতে আসিয়া তাহাকে বলিতে হইয়াছিল, 
--ভুমি কি জানিবে, মৃম্ময়ি! তুমি তো কখনও রূপ দেখিয়া উম্মত 
হও নাই, তুমি তো কখনও আপনার হৃৎপিণ্ড আপনি ছেদন করিয়া 
শ্মশীনে ফেলিতে আইস নাই!” 


বাঙালীর মন ও ভালবাস। ১৮৭ 


অপূর্ব কি দেখিয়া মুম্ময়ীকে ভালবাসিয়াছিল তাহার কথা রবীন্দ্র- 
নাথ স্পষ্টভাষায় বলিয়া দিয়াছেন ।-_ 


“পৃথিবীতে অনেক মুখ চোখে পড়ে, কিন্তু একটি মুখ বলা কহা নাই 
একেবারে মনের মধ্যে গিয়া উত্তীর্ণ হয়। সে কেবল সৌন্দর্যের জন্থ 
নহে, আর একটা কি গুণ আঁছে। সে গুণটি বোধ হয় স্বচ্ছতা । অধিকাংশ 
মুখের মধ্যেই মা্ুষপ্রকৃতিটি আপনাকে পরিস্ুটরূপে প্রকাশ করিতে 
পারে না; যে মুখে সেই অন্তরগুহাবাসী রহস্যময় লোকটি অবাধে বাঁহির 
হইয়! দেখা দেয়, সে মুখ সহশ্রের মধ্যে চোঁখে পড়ে এবং পলকে মনে 
মুদ্রিত হইয়া যাঁয়। এই বালিকার মুখে চোখে একটি ছুরস্ত অবাধ্য 
নারীপ্রকৃতি উন্মুক্ত বেগবান অরণ্যমুগের মত সর্বদা দেখা দেয়, খেলা করে, 
সেইজন্য এই জীবনচঞ্চল মুখখানি একবার দেখিলে আর সহজে ভোলা 
যায় না।” 


তবে ভালবাসা এভাবে আরম্ত হইলেও পরিণতি পাইবার জন্য, 
এমন কি বাঁচিয়া থাকিবার জন্যও মন ও বুদ্ধির অপেক্ষা রাখে । কিন্তু 
সে বুদ্ধি অর্থোপার্জনের, দেশের নেতা হইবার, গবেষণা করিবার, 
এমন কি সামাজিক ও পারিবারিক জীবন নিপুণভাবে চালাইবার 
বুদ্ধি নয়। প্রেমের জন্য ( দাম্পত্যজীবন কেবলমাত্র প্রেম তাহা বলিব 
না) শুধু সেই বুদ্ধির প্রয়োজন যাহা নারীপ্রকৃতিকে আরও জীবন্ত 
করিয়া ভূুলে। আর প্রেমের জন্য যে মনের প্রয়োজন হয়, সে মন 
যাহা হইতে “মনীষা” কথাটার ব্যুৎপন্ডি হইয়াছে সে মন নয়। উহ! 
সেই মন যাহাতে জীবন ও প্রেম প্রতিফলিত হয়, যাহ জীবন ও 
প্রেমকে উপলব্ধি করিতে পারে । 

যে নারীর এই ধরনের মন আছে, পুরুষের কাছে তাহার 
শারীরিক সত্তার চারিদিকে আর একটা বিভাময় অশরীরী সন্তার 
সি হয়, ইহা ছাড়া নারীর দিক হইতে প্রেমের প্রতিদান দিবার 
ক্ষমতা বাড়িয়া যায়। প্রেম সম্পর্কে মন অনেকটা রেডিওর 
আযাম্পলিফায়ারের মত, যাহা! ভিতরে আসে তাহা বহুগুণ করিয়া 


১৮৮ বাঙাঁলী জীবনে রমণী 


বাহির করে। এই মন যদ্দি কোন ভালবাসার পাত্রীর প্রথম হইতেই 
জাগ্রত না থাকে, তাহা হইলেও কোনও পুরুষের ,ভালবাসা৷ সেই 
মনকে জাগাইতে পারে । ইহাই “মাপ্ডির মত গল্লের মূলকথা । 

এই তো গেল মর! গাঙ্গে বান ডাকিবার কথা। কিন্ত্বী সেই যুগের 
বাঙালী প্রেমের উচ্ছল রূপের সঙ্গে সঙ্গে আর একটা জিনিসেরও 
সন্ধান পাইয়াছিল-_উহা! সতীত্ব বা পাতিব্রত্য। হিন্দুর সতীত্ব ও 
পাতিব্রত্যের ধারণা বাঙালী নূতন করিয়া উনবিংশ শতাব্দীতে 
পাইয়াছিল, এ কথাটা অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্ত, এমন কি 
অশ্রদ্ধের মনে হইতে পারে। তবু কথাটা সত্য। কোনও একটা 
জিনিসের জিনিস হিসাবে অস্তিত্, আর লোকের মনে অস্তিত্বের 
অনুভূতি, একই ব্যাপার নয়। আমি এক্ষেত্রে অনুভূতির কথাই 
বলিতেছি। এ যেন শ্রুতিতে উক্ত ছুইটি পাখীর বিভিন্ন কাজের মত,-_ 

“দ্বা স্তপর্ণা সধুজা সখায়া সমানং বৃক্ষং পরিষস্বজাতে। 
তয়োরন্ঃ পিপ্ললং খাদ্বত্ত্যনশ্নন্নন্টো অভিচাঁকশীতি ॥” 

( ছুইটি ন্ুন্দর পক্ষী অবিচ্ছেগ্ক বন্ধুভাবে একই বৃক্ষে থাকে । ইহাদের 

একটি তৃপ্তির সহিত কল খায়, আর অন্যটি ন৷ খাইয়া শুধু দেখে ।) 

মানুষের মনও একই সঙ্গে দুইটি পাখী। মন কিছু করে কিনা 
সে-বিষয়ে মনস্তাত্বিকদের সন্দেহ আছে, কিন্তু মন যে দেখে ও 
দেখিয়। স্থুখী হয় সে বিষয়ে কোনও সন্দেহই নাই। 

তেমনই সতীত্ব ও পাতিব্রত্য বাঁডালী হিন্দুসমাজে থাকিলেও 
উহা! দেখিয়া স্থখ বা গর্ব অনুভব করিবার মত ক্ষমতা বাঙালীর মনে 
পাশ্চাত্য প্রভাব আসিবার পূর্বে আসে নাই। এখানে প্রাসঙ্গিক 
বলিয়া একটা সূত্র ধরাইয়া দেওয়া প্রয়োজন। উনবিংশ শতাব্দীতে 
বাঙালী যে নৃতন সংস্কৃতির সি করে তাহাতে সে পাশ্চাত্যের উচ্চতম 
জিনিসের সহিত প্রাচ্যের উচ্চতম জিনিসের সমন্বয় করিতে 
চাহিয়াছিল। কিন্ত যে স্বাদেশিকত৷ হইতে সমন্বয়ের ধারণাটা 
আসিয়াছিল সেই স্বাদেশিকতা, এবং সমন্বয়ের মধ্যে যে দেশী জিনিস 


বাঙালীর যন ও ভালবাসা ১৮৯ 


আনিতে হইবে উহার জ্ঞান পর্যন্ত বাডালীর কাছে সাক্ষাতভাবে 
প্রাচীন ভারতবর্ষ হইতে আসে নাই-_আসিয়াছিল ইউরোপ বা পাশ্চাত্য 
জগত ঘুরিয়া। অর্থাৎ প্রাচীন ভারতবর্ষের জীবন ও সংস্কৃতি সম্বন্ধে 
এঁতিহাসিক তথ্য আমরা পাইয়াছিলাম, ইউরোপীয় প্রাচ্যতত্বের গবেষকদের 
কাছ হইতে । স্যর উইলিয়ম জোন্স্‌ হইতে আরম্ত করিয়া ম্যাকসমূলার 
পর্যন্ত প্রাচ্যতত্ববিদরাই আমাদিগকে দেশের কথা শিখাইয়াছিলেন । 

কিন্তু দেশের সন্ধান পাইবার পরই আমরা ইউরোপ হইতে 
যাহা গ্রহণ করিয়াছিলাম তাহার সহিত ভারতবীয় জিনিসকে 
মিলাইবার চেষ্টাও আমরা করিয়াছিলাম। তাহা ছাড়া ইউরোপীয় 
ধ্যানধারণাকে আমরা একটা ভারতবর্ষীয় রূপ দিতে প্রয়াস 
করিয়াছিলাম, অন্ততপক্ষে উহার উপর একটা দেশী ছাপ 
, বসাইয়াছিলাম। ইহার ছুইটা দৃষ্টান্ত দিব। ক্রাঙ্মধর্ম ভারতবর্ষে 
বা বাডালী জীবনে খুষ্টীয় একেশ্বরবাদ আনিয়াছিল, কিন্তু উহার 
বাহিক রূপ খুষ্তীয় রাখে নাই, উহার উপর উপনিষদের ব্রচ্মের রূপ 
চাপাইয়াছিল-_ছুই ধরনের একেশ্বরবাদ সমধর্মী না হওয়া সত্তবেও। 
তেমনই ইউরোপ হইতে প্রেমের ধারণ! পাওয়৷ মাত্র উহাকে আমরা 
শকুন্তলা ও মহাশ্বেতার প্রেমের হ্বাচে ঢালিবার চেষ্টা করিলাম । কিঞ্তু 
আসলে যাহা করিলাম, তাহা এই ব্যাপারের উল্টা। বাংলার নৃতন 
সাহিত্যে শকুন্তল৷ ও মহাশ্বেতার প্রেম ইউরোপীয় রোমান্টিক রূপ 
ধারণ করিল। উহার আভাস আগেই দিয়াছি। 

প্রেমের সহিত সতীত্ব বা পাতিব্রত্যের সমন্বয়ের চেষ্টা এই বড় 
ব্যাপারটারই অন্তভুস্ত। নরনারীর সম্পর্কের রোমান্টিক পাশ্চাত্য 
রূপের সন্ধান পাইবামাত্র বাঙালীর মনে হইল এই 'থিসিস-এর একটি 
দেশী 'কাউন্টারথিসিস-এরও প্রয়োজন আছে । তাই বাংল! সাহিত্যে 
পাতিব্রত্যের ধারণাও নৃতন রূপ ও নূতন গৌরব ধরিয়া দেখা দিল। 

'দেবীচৌধুরানী'তে নিশি ও প্রফুল্ের মধ্যে কথা হইতেছিল। নিশি 
বলিল__ 


১৪) ০ 


বাঁজালী জীবনে রমণী 


“যা বলিতেছিলাঁম, শোঁন। ঈশ্বরই পরমস্বামী। স্ত্রীলোকের পতিই 
দেবতা, শ্রীকৃষ্ণ সকলের দেবতা । ছুটো! দেবতা কেন, ভাই? ছুই ঈশ্বর? 
এ ক্ষুদ্র প্রাণের ক্ষুদ্র ভক্তিটুকুকে ছুই ভাগ কাঁরলে কতটুকু থাকে?” 

প্রফুল্প উত্তর দিল, 

“দূর! মেয়েমানুষের ভক্তির কি শেষ আছে?” 

নি। “মেয়েমান্ুুষের ভালবাঁস|র শেষ নাই। ভক্তি এক, ভালবাসা আর ।” 
প্র। “আমি তা আজও জানিতে পারি নাই। আমার ছুই নৃতন।” 


বাডালীর কাছেও প্রেম ও পাতিব্রত্য ছুই ধারণাই নূতন ছিল। 
কিন্তু এই ভাবে পাতিব্রত্যকে ফিরিয়া পাইবার পর সে-যুগের 


বাঙালী উহাকে পুরাতন বলিয়া তুচ্ছ করা দূরে থাকুক, প্রেমের 
অপেক্ষাও উহার মহিমা বেশী করিয়া কীর্তন করিতে আর্ত করিল। 


ইহার প্রমাণ বঙ্িমচন্দ্রের মধ্যে পাই। তিনিই একই সঙ্গে নূতন 


প্রেমের প্রবর্তক ও নৃতন পাতিব্রত্যের ধারণার উপাসক। এইজন্যই 
নিশি ও প্রফুল্পের কথোপকথনের পরই বঙ্কিমচন্দ্রের এই উক্তি 
পাই-_“নিশি তখন বুঝিল, শ্বরভক্তির প্রথম সোপান পতিভক্তি।” 


বহ্কিমচন্দ্রের লেখার মধ্যে পতিভক্তির মহিমা জুড়িয়া আছে। 


তিনি ইন্দিরাকে দিয়। বলাইলেন,_- 


“যে বুদ্ধি কেবল কলেজের পরীক্ষা দিলেই সীমাপ্রান্তে পৌছে, ওকালতীতে 
দশটাঁকা আনিতে পারিলেই বিশ্ব-বিজয়িনী প্রতিভা বলিয়। স্বীকৃত হয়, 
যাহার অভাঁবই রাঁজদ্বারে সন্মানিত, সে বুদ্ধির ভিতর পতিভক্তিতত্ব 
প্রবেশ করান যাইতে পারে না। যাহারা বলে বিধবার বিবাহ দাও, 
ধেড়ে মেয়ে নহিলে বিবাহ দিও না, মেয়েকে পুরুষের মত নানাশাস্ত্রে 
পণ্ডিত কর, তাহারা পতিভক্তিতত্ব বুঝিবে কি?” 


সতীত্বের প্রতি এই ভক্তির জন্য বঙ্কিমচন্দ্র অসতীত্বের প্রতি প্রবল 


ঘ্পা, প্রকাশ করিয়াছেন'। উহার স্পটতম প্রকাশ দেখিতে পাই 
চন্দ্রশেখরে'। প্রতাপ ও শৈবলিনীর প্রেমের মধ্যে কলুষভাব তিল- 
মাত্র ছিল না। তবু, যেহেতু চন্দ্রশেখরের পত্রী হইয়াও শৈবলিনী 


বাঁঙালীর মন ও ভালবাসা ১৯১ 


প্রতাপের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন, সেজন্য বঙ্কিমচন্দ্র তাহার সম্বন্ধে 
তারকা কন্যাদের মুখে এই কথা বসাইয়াছিলেন,_ 


“নক্ষত্রস্ন্দরীগণ নীলাপ্বর মধ্যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুখগ্ডুলি বাঁহির করিয়া সকলে 
কিরণময় অঙ্কুলর দ্বারা পরম্পরকে শৈবলিনীর শব দেখাইতেছে-- 
বলিতেছে, “দেখ, ভগিনি, মন্তুষ্যকীটের মধ্যে আবাঁর অসতী আছে"! কোন 
তারা শিহরিয়া চক্ষু বুজিতেছে, কোন তারা লজ্জায় মেঘে মুখ ঢাঁকিতেছে ; 
কোঁন তারা অসতীর নাম শুনিয়! ভয়ে নিবিয়া যাইতেছে ।” 


আজকালকার পাঠক-পাঠিকারা হয়ত ইহাকে সেকেলে গৌড়ামি 
বলিবেন। কিন্তু সে-যুগের বাঙালীর পক্ষে ভালবাসার গৌরবের 
সহিত সতীত্বের গৌরবের অনুভূতিও পোষণ না করা সম্ভব ছিল না। 
এমন কি সেই '“সিন্বেসিস্'র হাওয়ায় বড় হওয়ার ফলে আমিও 
সতীত্ব সম্বন্ধে গর্বের কথাই বলিয়াছি। ১৯৫৯ সনে প্রকাশিত ইংরেজ 
জীবন সম্বন্ধে বই-এ আমি লিখিয়াছিং_ 


411 9050045 16115 95০08. 0706 075 17100014921 0£ ৬৮115]9 
৫০৮০1017) 15 20 11017905101010 077 2 70201200172] 5০০15, & 
00122]09 10:01009160 15 10916 1621905য, 80 100 1)6119%9 2, 
৮01৫ 01 16, ]1 51172091519 1706 0006, ৬107 05, 02720051021 
9.5 10 1719 500009 1 05 1170 /011617 5170 5০912 01) /117 
0৮ 0 015 59115 01 656 770505101705 5০ 00 2 10621 ০01 
19101110117655 17101 10 01017 00900 01161000952 2170 (170 59015 
01911000952], 10000 6০1) 0100 ৮0101) 010791০1100 ০015৪ 
0061709, [710010 ৮/01281) 5101160 11 00০ 1069 01 5261 (10101) 
15 7101 [115 50755 17175 95 005 20066 01 1172 157511512 
19775089256, 70561 05 %/0:0 15 105 9206), 8৪00 2৬০ 
0617 1055 17755060০6155 ০0£ 01512162100 076 16011019170 
1) 717101) 017512 06612100 19৮6 02109010091 0)0 02115 ০1 
0005 10৮০ 17 01115019710, 10101) 25 51560116015 /10100৫ 
£612167)0 €০ 01১6 ৬০:0৮ 0117021)০? 


কিন্তু প্রেম ও পাতিব্রত্য সমানভাবে গ্রহণ করিলেও বহ্কিমচন্দ্রের 
পক্ষেও গল্প-উপন্যাসে উহার সমন্বয় করা সহজ হয় নাই। আসলে 


১৯২ বাঙালী জীবনে রমণী 


বঙ্কিমচন্দ্র একই গল্পে এই ছুইটি জিনিসকে মোটেই মিলাইতে পারেন 
নাই। তাহার চৌদ্দটি গল্প-উপন্যাসের মধ্যে একটি-_“কুষ্ণকান্তের উইল", 
শুধু পাতিব্রত্য বা সতীত্বের গল্প; দশটি শুধু প্রেমের গল্প; তিনটি-_ 
“বিষবৃক্ষণ, “চন্দ্রশেখর', ও “আনন্দমঠ, দুই-এর সংঘাতের গল্প। 

জথচ দুইটি জিনিস যে স্বতন্ত্র এ দ্ুইএর সমন্বয়ের যে একটা প্রশ্ন 
আছে, সে সম্বন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র অবহিত ছিলেন। ইহার পরিচয় 
'আনন্দমঠে একস্থলে জীবানন্দ ও শান্তির কথাবার্তার মধ্যে পাই। 
সে জায়গাটা উদ্ধত করিব-_ 


“বিবাহ ইহকাঁলের জন্যঃ এবং বিবাহ পরকালের জন্য। ইহকালের জন্ত 
যে বিবাহ, মনে কর, তাহা আমাদের হয় নাই। আমাদের বিবাহ 
কেবল পরকালের জন্য । পরকালে দ্বিগুণ ফল ফলিবে। কিন্তু প্রার়শ্চিত্তের 
কথ কেন? তুমি কি পাপ করিয়াছ? তোমার প্রতিজ্ঞা স্ত্রীলোকের 
সঙ্গে একাসনে বসিবে না। কই, কোন দিন ত একাসনে বসো নাই। 
প্রায়শ্চিত্ত কেন? হান্স প্রত! তুমিই আমার গুরু, আমি কি তোমায় 
ধর্ম শিথাইৰ? তুমি বীর, আমি তোমায় বীরব্রত শিখাইব ? 

“জীবানন্দ আহ্লাদে গদগদ হইয়া বলিলেন, 'শিখাইলে ত+ | 

“শীস্তি প্রফুল্পচিত্তে বলিতে লাঁগিল' “আরও দেখ, গৌঁসাই, ইহকাঁলেই 
কি আমাঁদের বিবাহ নিষ্ষল? তুমি আমায় ভালবাস, আমি তোমায় 
ভালবাসি, ইহা অপেক্ষা ইহকাঁলে আর কি গুরুতর ফল আছে? ? 


বঙ্কিমচন্দ্রের সমস্ত উপন্যাসে স্পষ্ট ইঙ্গিত রহিয়াছে,__প্রেম প্রেম, 
পাতিত্রত্য পাতিব্রত্য । কিন্তু দুইটি কোথাও একেবারে মিলে নাই। 

আমার যতটুকু জানা আছে, সমগ্র বাংলা সাহিত্যে শুধু একটি 
মাত্র গল্পে প্রেম ও সতীত্বের মিল হইয়াছে । উহা রবীন্দ্রনাথের একটি 
গল্প। এই গল্পটির কোনও আলোচনা পড়িও নাই, শুনিও নাই। কেন 
এইরূপ হইল ভাবিয়াছি. কারণ গল্পটি সৌন্দর্যে অপরাজিত ; রবীন্দ্রনাথের 
“অতিথি”, 'সমাণ্ডি, “মেঘ ,ও রৌদ্র, ইত্যাদির সহিত তুলনা করিলেও 
অপূর্ব । কিন্ত্ত উহার সন্ধান দিতে ভয় হয়। তাহারও সঙ্গত কারণ 


বাঙালীর মন ও ভালবাসা ১৯৩ 


আছে, অন্তত আমার কাছে কারণটা সঙ্গত বলিয়াই মনে হয়। ভয়টা 
এই--আমার লেখার ফলে আবার কোন্‌ ঘরের মেয়েকে সিনেমার 
বাজারে বাহির করা হয়। তবে হয়ত এই ক্ষেত্রে ভয়ের কারণ কম। 
এই গল্পটির ঘটনাবলী শুধু একটি উনিশ-কুড়ি বৎসরের বাডালী বধূর 
মনের কথা, বাহিরের কিছুই নয় বলিলেই চলে। তবু সেই মানস জগৎ 
কর্মজগণ্কে ছাড়াইয়া ও ছাপাইয়া উঠিয়াছে। পড়িতে পড়িতে মনে হয়, 
এই ধুলিময় বা পঙ্কিল সংসার- যাহাতে বাস করিয়া নির্মল থাকিবার জন্য 
প্রতি মুহুর্তে যুদ্ধ করিতে হইতেছে, তবু যাহার র্রেদ সর্বাঙ্জে মাখিতে 
হইতেছে, তাহাকে অতিক্রম করিয়! ছাঁয়াপথে উঠিয়া গিয়াছি, উহার স্সিগ্ধ 
আলোতে এক অপরূপ প্রেমের আন্ুতি দেখিতেছি। 

কুমু, কুমু, কুমু! তোমাকে যৌবনে যদি দেখিতাম, ভালবাসিবার 
সাহস হইত না, দেবী বলিয়া পুজা করিতাম। ভুূমিই লিখিয়াছ কি করিয়া 
তোমার স্বামী তোমাকে দেবীপদে বসাইয়াছিল। “স্বামী কহিলেন-__ 
'কাজ তো দাসীতেও করে । আমি কি কাজের সুবিধার জঙ্য একট। দাসী 
বিবাহ করিয়া আমার এই দেবীর সঙ্গে একাসনে বসাইতে পারি ।-_ 
বলিয়া আমার মুখ ভুলিয়া ধরিয়া আমার ললাটে একটি চুম্বন করিলেন, 
_-সেই চুম্বনের দ্বারা আমার তৃতীয় নেত্র উন্মীলিত হইল, সেই ক্ষণে 
আমার দেবীত্বে অভিষেক হইয়া গেল ।” 

যে স্বামী তোমাকে এইভাবে দেবীপদে বসাইয়াছিল, সে-ই তোমাকে 
দেবীত্বের জন্যই মৃক্ক্যন্ত্রণারও অধিক যন্ত্রণা দিয়াছিল। তাই স্বামীকে 
ফিরিয়া পাইয়া তুমি বলিয়াছিলে, “না, আমার দেবী হইয়া কাজ নাই-_ 
আমি তোমার ঘরের গৃহিণী_ আমি সামান্য নারী মাত্র ।” তোমার স্বামী 
তখনও বলিয়াছিল, “তুমি আমার দেবী। আমার কাছেও ভূমি দেবী ।” 

আজি আমি পঁচিশ বসর বাংলা দেশ ছাড়া । স্ৃতরাং বলিতে পারি. 
না, এখনও বাঙালীর ঘরে কুমুর মত মেয়ে দেখা দেয় কিনা । বাঙালীর 
সবই গিয়াছে-_নদী, জল, প্রীস্তর, বন, আকাশ, কিছুই নাই। তবে 
কুমুর মত মেয়েই বা থাকিবে কেন? তবু বলিব, একদিন ষে আমাদের 


১৩ 


১৯৪ বাঙালী জীবনে রমণী 


মনে এমন একটি মেয়ের ধারণাও জন্মিয়াছিল, শুধু তাহাই আমাদের 
গার্বের কথা, স্খস্মৃতির অবলম্বন । 

গল্পটার নাম প্রথমেই বলিয়া দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু পাঠক- 
পাঠিকা হয়ত এতক্ষণে বুঝিয়৷ ফেলিয়াছেন। তাই নামটা এখনও উহ্যাই 
রাখিলাম । 

গল্পটির সহিত আমার পরিচয়ের উপলক্ষ্য একটু বিচিত্র । আমি 
তখন স্কুলের চতুর্থ শ্রেণীতে (আজকালকার সপ্তম শ্রেণীতে ) পড়ি, 
ও আমার দাদা দ্বিতীয় ( আজকালকার নবম ) শ্রেণীতে পড়েন। 
তিনি বাধিক পরীক্ষাতে ইংরেজী ভাষার প্রশ্নপত্রের প্রথম ভাগ লইয়৷ 
বাড়ী ফিরিলে দেখিলাম বাংলা হইতে ইংরেজীতে অনুবাদের জন্য 
যে গগ্ভাংশ দেওয়। হইয়াছে, তাহার প্রথমটির আরম্ত এইরূপ-_ 

“দাদ! সে-বছর বি. এল. দিবেন বলিয়া কলেজে পড়িতেছিলেন। তিনি 

একদ্দিন আসিয়া আমার স্বামীকে কহিলেন, “করিতেছ কি! কুমুর চোখ 

দুটো! যে নষ্ট করিতে বসিয়াছ ! একজন ভাল ডাক্তার দেখাও ।” 

সবটুকু পড়িয়৷ যে-গল্প হইতে উহা উদ্ধত করা হইয়াছে, তাহার সম্বন্ধে 
অত্যন্ত কৌতুহল জম্মিল। কিন্তু তখনই উহা৷ খুঁজিয়া পাইলাম না। 
ব্সর খানেক পরে গল্পগুচ্ছ" হাতে পড়াতে দেখিলাম অনুবাদের জন্য 
যে জায়গাটা দেওয়া হইয়াছিল, উহা 'দৃষ্টিদান” হইতে । 

শুধু ভাষা ও স্টাইলের দিক হইতেও এই গল্পটির বিশেষ মূল্য আছে, 
এর জন্যই উহা পড়া ও পড়ানো উচিত। ল্পগুচ্ছণ “গোরা”, ও 
'জীবনস্মৃতিতে বাংলা গগ্ভ যে সৌন্দর্যে বিকশিত হইয়৷ দেখা দিয়াছিল, 
কুড়ি বসরের মধোই তাহাতে বিকার দেখ! দেয়। ১৯২৭-২৮ সনে 
আমি “শনিবারের চিঠির দলে । এই কাগজের পক্ষ হইতে নুতন গন্ভের 
বিরুদ্ধে কলম ধরিলাম। আমার কাছে তখনকার অল্পবয়স্ক লেখকদের 
ধরন এরকমই অস্বাভাবিক মনে হইয়াছিল যে, তাহাদেরকে আমি 
অস্টাবক্র মুনি, হালেকিন, ব৷ পিয়েরো অর্থাৎ সং আখ্যা দিয়াছিলাম । 

এই সৌন্দর্ধবজিত ব্রিতজ-মুরারিদের বাংলার সহিত ভাল গণ্ভের 


বাঙালীর মন ও ভালবাসা ১৯৫ 


কি পার্থক্য তাহা বুঝাইবার জন্য একটি প্রবন্ধে আমি খানিকটা ইংরেজী 
গগ্ভ ও খানিকটা বাংলা গগ্ঠ উদ্ধত করিয়াছিলাম। ইংরেজীটা নিয়াছিলাম 
হাডসনের “ফার এওয়ে আযাণ্ড লং এগো” হইতে, আর বাংলাটুকু 'দৃষ্টিদান' 
হইতে । উহার প্রথমটুকু এই প্রবন্ধেও উদ্ধত করিতেছি ।__ 

'অগ্রহায়ণের শেষাশেষি আমর! হাসিমপুরে গেলাম । নূতন দেশ, 
চারিদিক দেখিতে কি রকম তাহা! বুঝিলাম না-_কিন্তু বাল্যকালের সেই 
গন্ধে এবং অনুভবে আমাকে সর্ববাঙ্গে বেষ্টন করিয়া ধরিল। সেই 
শিশিরে-ভেজ! নূতন চষা ক্ষেত হইতে প্রভাতের হাওয়া, সেই সোন-- 
ঢালা অড়'র এবং সরিষা ক্ষেতের আকাশভরা কোমল তুমিষ্ট গন্ধ, সেই 
রাখালদের গান, এমন কি, ভাঙা রাস্তা দিয়। গরুর গাড়ী চলার শব্দ 
পধ্যন্ত-_আমাকে পুলকিত করিয়া সুলিল। আমার সেই জীবনারন্তের 
অতীত স্মৃতি তাহার অনির্ববচনীয় ধ্বনি ও গন্ধ লইয়! প্রতাক্ষ বর্তমানের 
মত আমাকে ঘিরিয়া বসিল, অন্ধ চক্ষু তাহার কোন প্রতিবাদ করিতে 
পারিল না।”- ইত্যাদি । 

আমি প্যারাগ্রাফটির শেষ পর্যন্ত উদ্ধত করিয়াছিলাম, সবটুকু এখানে 
দিলাম না। গল্পগুচ্ছ” হইতে বাকাটুকু পড়িয়া লইতে পাঠককে 
অনুরোধ করিব । 

কিন্তু গগ্ভ ভাল হইলেই যে গল্পও ভাল হইবে তাহার অর্থ নাই। 
রবীন্দ্রনাথের নিজেরই বনু গল্প হইতে এই অসামঞ্জস্তের দৃষ্টান্ত দেওয়া 
যাইতে পারে। “দৃ্টিদান” কিন্তু যেমনই ভাষাতে উৎকৃষ্ট, তেমনই গল্প 
হিসাবেও । তাহার উপরেও কথা আছে, যাহার জন্য এই গল্পটির বিশদ 
আলোঢন! হওয়। প্রয়োজন। 

ৃষ্টিান' রবীন্দ্রনাথের সমস্ত গল্পের মধ্যে একক; বিষয়েই হউক, 
বা অনুভবেই হউক, বা আবেগেই হউক, ইহার সহিত এক পর্যায়ে ফেলা 
যাইতে পারে এমন আর একটিও গল্প নাই। উহার স্বাতন্ত্য ও বিশিষ্টতা 
স্পষ্ট । 

তবে তাহা কি? উত্তর এক কথায় দেওয়া যাইতে পারে। 


১৯৬ বাঁঙালী জীবনে রমণী 


গল্পটি রবীন্দ্রনাথের বাঙালী হিন্দুত্বের পরিচায়ক । একটা একেবারে 
বাজে কথা সর্বত্র শুনিতে পাই। তাহা এই- রবীন্দ্রনাথ ব্যক্তি হিসাবে 
“বিশ্বমানব, ও লেখক হিসাবে “বিশ্বমানবতার'ই প্রচারক । কথাটার 
অর্থ ইংরেজী বা বাংলা কোনও ভাষাতেই বুঝিতে পারি না। তবে 
অস্পষ্টভাবে ধোৌয়া-ধধোয়া যেটুকু বুঝি, তাহাতে অর্থহীন প্রলাপ 
বলিয়৷ মনে হয়। রবীন্দ্রনাথের অপেক্ষা বিশিষ্ট বাঙালী ও খাটি বাঙালী 
হিন্দু জন্মায় নাই। তিনি এমনই বাঙালী যে ভারতবর্ষের অন্য 
অঞ্চলের অধিবাসীরও তাহাকে ভাল করিয়া বুঝিবার ক্ষমতা নাই। 
সত্য কথা বলিতে কি, রবীন্দ্রনাথকে “গুরুদেব” বলিয়া উল্লেখ করার মত 
কপট ন্যাকামি আর কিছু হইতে পারে না । মহাত্মা গান্ধী অথবা নেহরু 
যে তাহাকে এই অভিধানে অভিহিত করিতেন, উহাকেই আমি অবাডালীর 
রবীন্দ্রনাথকে না বুঝিবার চুড়ান্ত প্রমাণ বলিয়া মনে করি । কাহাকেও না 
বুঝিয়। রাজনৈতিক স্তুবিধার জন্য ভক্তি দেখাইতে গেলে কৃত্রিমতা৷ এড়াইবার 
উপায় নাই। মহাত্মা গান্ধী ও নেহরু দুইজনেই এই দোষে দোষী । 
আসলে রবীন্দ্রনাথ মনেপ্রাণে বাঙালী হিন্দু ছিলেন, বাঙালী হিন্দু 
হিসাবেই নিজের কথা পৃথিবীর লোকের কাছে বলিয়াছিলেন। তাহার 
রচনার ইংরেজী অনুবাদে তাহার এই প্রকৃত রূপ প্রকাশ পায় নাই। 
তাই আজ পাশ্চাত্যে, এমন কি বাংলার বাহিরেও তীহার আন্তরিক 
সমাদর নাই। যে বাঙালী হিন্দুত্ব তাহার আসল ধর্ম, 'দৃষ্টিদান' সেই ধর্ম 
হইতেই উৎসারিত হইয়াছে । এই উতসার আবার এত স্বাভাবিক যে, 
উহা রবীন্দ্রনাথের মন হইতে অজ্ঞাতসারেই বাহির হইয়া আসিয়াছিল। 
অবশ্য একথা সত্য যে, একসময়ে রবীন্দ্রনাথ জ্ঞাতসারেই এক ধরনের 
হিন্দুত্বের দিকে ঝুঁকিয়াছিলেন। উহা! জাতির জীবনে স্বদেশী আন্দোলনের 
যুগ, ও তাহার ব্যক্তিগত জীবনে পর পর মৃত্যশোকের কাল। তাহার 
পত্তী মুণালিনী মার যান ১৯০২ সনের ২৩শে নভেম্বর ; তেরো বশসরের 
কন্যা রেণুকা বা রাণী মারা যায় ১৯০৩ সনের মে মাসে; প্রিয় শিষ্য 
সতীশচন্দ্র রায় মারা যান ফেব্রুয়ারী ১৯০৪ সনে; পিতা দেবেন্দ্রনাথ 


বাঙালীর মন ও ভালবাসা ১৯৭ 


বিগত হন ১৯০৫ সনের জানুয়ারী মাসে; কনিষ্ঠ পুত্র সমীন্দ্র তেরো 
বৎসর বয়সে ১৯০৭ সনের নভেম্বর মাসে মারা যায়। 

একদিকে বাঙালীর জাতিগত জীবনে রাজনৈতিক সঙ্কট, আর 
একদিকে তাহার ব্যক্তিগত জীবনের শোক, এই দুই মিলিয়। রবীন্দ্রনাথের 
মনে একটা নির্বেদের স্থষ্টি করিয়াছিল । হিন্দুর মনে ও ধর্মে অতি প্রাচীন 
কাল হইতেই একট! নিষ্ঠর বৈরাগ্য ওতপ্রোতভাবে জড়াইয়া আছে। 
সাংখা, বেদান্ত, এমন কি গীতাও এই বৈরাগ্যের দ্বারা অনুপ্রাণিত। 
এই বৈরাগ্য নিষ্ঠুর, তাই ইহা হইতে নিক্ষাম কর্মযোগের উৎপদ্ধি 
হইয়াছে । এই কর্মযোগের কথাও রবীন্দ্রনাথের মনে জাগিয়াছিল। 

কিন্তু এই পথ ধরিবার ইচ্ছা রবীন্দ্রনাথের জীবনে স্বদেশী আন্দোলন 
ও শোক দেখা দিবার আগেই আত্মপ্রকাশ করিয়াছিল। ইহাকেও 
স্বাভাবিক বলা যাইতে পারে। তখন বঙ্কিমচন্দ্রের চিন্তাধারা ও 
বিবেকানন্দের কর্মযোগ, এ ছুইয়ের প্রভাব বাঙালীর উপর অত্যন্ত প্রবল 
হইয়াছিল। রবীন্দ্রনাথের মত সজীব ব্যক্তির পক্ষে এই প্রভাব সম্বন্ধে 
অসাড় থাকা একেবারেই সম্ভব ছিল না। তাই তিনি উনবিংশ শতাব্দীতে 
বাঙালী জীবনের অন্য ধারায় অর্থাৎ উদারনৈতিক ব্রাহ্ম ধারায় বড় 
হইলেও, নব্য হিন্দুত্বের দিকে ঝুকিয়াছিলেন। ইহার পরিচয় তিনি 
পত্রীবিয়োগের পূর্বেই দিয়াছিলেন। ১৯০১ সনে শান্তিনিকেতনে 
্রহ্মচর্যাশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয় । পরে রবীন্দ্রনাথের হিন্দুত্ব আরও প্রকট 
হইয়া উঠে। 

কিন্তু ইহার ফলে রবীন্দ্রনাথ তাহার পরিবারের মানসিক ধারা 
একেবারে ছাড়িয়া যান নাই, এমন কি পরজীবনে আবার সেই ধারাতে 
নিঃসংশয়ে ফিরিয়া আসেন । এই আসার আগেও তীহার মনের মধ্যে 
বঞ্চিমচন্দ্র-বিবেকানন্দের নব্য হিন্দুত্ব ও উদ্ারনৈতিক ত্রান্গ হিন্দুত্বের মধ্যে 
একটা বিরোধ চলিতেছিল। “গোরা” এই মানসিক দ্বন্দেরই কাহিনী । 
এই উপন্যাসটি ১৯০৭ সন হইতে 'প্রবাসী'তে প্রকাশিত হইতে আরম্ত 
হয়। উহাতে একদিকে আছে নব্য বাঙালীর ত্রাহ্মণ্য হিন্দুত্ব, অন্যদিকে 


১৯৮ বাঙালী জীবনে রমণী 


আছে সেই নব্য বাঁডালীরই জাতি, বর্ণ ও আচারে আস্থা-বজিত ব্রা্গ 
হিন্দুত্র। রবীন্দ্রনাথের প্রকৃত যোগ এই দ্বিতীয় ধারার সহিত, তাই 
'গোরা'তে উহারই জয় দেখানো হইয়াছিল। 

কিন্তু যে-হিন্দুত্ব রবীন্দ্রনাথ এই সময়ে দেখাইয়াছিলেন, উহা 
বিচারবৃদ্ধির হিন্দুত্ব। “দৃষ্টিদান+ গল্পটি এই হিন্দুত্ব হইতে আসে নাই। 
উহা প্রকাশিত হইয়াছিল ১৮৯৮ সনের শেষের দিকে । তখনও রবীন্দ্র 
নাথ নব্য হিন্দুত্বের প্রতি কোন আকর্ষণ বোধ করিবার পরিচয় দেম 
নাই। স্থতরাং গল্পটি আসিয়াছিল বাঙালীর প্রাচীন হিন্দুত্বের আরও 
গভীর, অতিশয় অন্তনিহিত উত্স হইতে । সেই হিন্দুত্ব আমাদের 
অস্থিমভ্জায় রহিয়াছে, ধমনীতে প্রবহমাণ। যতদিন বাঁঙাঁলীর কোন 
সত্যকার ধর্ম থাকিবে, ষতদিন সে পদার্থে খাটি থাকিবে, যতদিন পর্যন্ত 
সে অন্তঃসারশূন্য ট্যাশ-ফিরিঙ্গি বনিয়৷ সব কুল না হারাইবে, ততদিন 
তাহার এই হিন্দুত্র বজায় থাকিবে, দেখিতে না পাইলেও উহা! অন্তঃসলিল৷ 
ফন্তুর মত বহিবে। ইহা হইতে বিচ্যুত হইবার ক্ষমত| সব ধর্ম হইতে 
ভ্রষ্ট হইবার আগে আমাদের হইবে না। আমি যে এই পঁচিশ বসর 
বাংলা দেশ ও বাঙালী সমাজ ছাড়া, এবং শুধু বাডালীর নয় প্রায় সমস্ত 
ভারতবাসীরই সম্পর্কবজিত, আমার মধ্যেও উহা রহিয়াছে। 'ষ্টিদানে' 
এই গভীর হিন্দুত্ব, প্রাণের হিন্দৃত্বই প্রকাশ পাইয়াছে। 

আর একটা কথাও মনে রাখিতে হইবে । 'দৃষ্টিদানে'র এই হিন্দুত্বে 
নিষ্টরত! বা কাঠিন্য নাই__এই হিন্দুত্বে আছে শুধু অপার স্সেহ, অপার 
করুণা, অপার শান্তি ও আনন্দ। উহা! আগমনীর স্তখ ও নবমীনিশির 
বিষাদের মত--বাংলার শিশিরে স্নাত, বাংলার উষা ও সন্ধ্যার বিভায় 
বিভাসিত, বর্ণে উজ্্বল,বৃষ্টি ও রৌব্রে ঝলমল। আজ সেই হিন্দুত্ব গিয়াছে 
বা যাইতে বসিয়াছে, উহ্য নির্মম সত্য । কিন্তু সেই জীবনের কথা স্মরণ 
করিলে, ছার অনিবার্ধ নির্বাণের কথাও ভাবিলে মনে যন্ত্রণ! হয় না, শুধু 
একটা সীমাহীন বিষাদের আচ্ছন্নতা আসে। কুমু! আজ ভূমি তাই 
আমার চোখের সম্মুখে নির্বাসিত সীতার মত দেখা দিতেছ-_ 


বাঙালীর মন ও ভালবাসা ১৯৯ 


“পরিপাওুছূর্বলকপোলনুন্দরং 
দধতী বিলোলকবরীকমাননম্‌। 
করুণস্ত মৃত্তিরথবা শরীরিণী 
বিরহব্যথেব বনমেতি জাঁনকী ॥৮-- 
“অতিশয় পাওু ও দুর্বল কপোঁলের জন্য আরও সুন্দর হইয়া, বিলোলকবরী 
মুখখানা লইয়া, করুণার মুত্তি অথবা শরীরধারিণী বিরহবাথার মত জানকী 
বনে আঁসিতেছেন ।” 
সংস্কত শ্লোকটা জোরে পড়িবেন, আমার বাংলা অনুবাদ মাত্র 
দেখিয়া উহার কবিত্ব বিচার করিবেন না। 
দৃষ্টিদান' গল্পের হিন্দুত্ব শুধু নায়িকার ভাব ও ব্যবহারেই নয়, 
তাহার সমস্ত বিবরণের ভাষায়, এবং তাহার উপরে শব্দের অর্থ ও 
ব্যপ্ননাতেও পরিস্ফুট হইয় উঠিয়াছে। এই লক্ষণটা সমগ্র কাহিনীটা 
জুড়িয়৷ মন্দিরে ধুপ ও ফুলের গন্ধের মত পরিব্যাপ্ত। প্রথমে ছুইটা 
স্পষ্ট উক্তি উদ্ধত করিয়া ইহার প্রমাণ দ্িব। 
সতীত্বের অহঙ্কার হিন্দু মেয়ের বিশিষ্ট চরিত্রধর্ম। স্বামীর অবহেলা, 
এমন কি বিশ্বাতঘাতকতা দেখিলেও তাহার! সতীত্বের অহঙ্কারে বলিত 
যে, তাহাকে সতী স্ত্রীর কাছে ফিরিয়া আমিতে হইবেই । তাই ভ্রমর 
বলিয়াছিল-_ 
“যদি আমি সতী হই, কায়মনোবক্যে তোমার পায়ে আমার ভক্তি 
থাঁকে, তবে তোমায়-আমায় আবার সাক্ষাৎ হইবে । আমি সেই আশায় 
প্রাণ রাখিব। এখন যাও, বলিতে ইচ্ছা! হয় বল যে, আর আসিব না। 
কিন্ত আমি বলিতেছি-আঁবার আসিবে, আবার ভ্রমর বলিয়া ডাকিবে, 
আবার আমার জন্য কীদিবে। যদ্দি একথা নিক্ষল হয় তবে জানিও-_. 
দেবতা! মিথ্যা, ধর্ঘ্ম মিথ্যা, ভ্রমর অসতী 1” 
এই ধরনের উক্তি বঙ্কিমচন্দ্রের নায়িকার মুখে স্বাভাবিক রর 
রবীন্দ্রনাথের কোনও নায়িকার কাছ হইতে আশা করি না; 'অ 
দেখি, স্বামী যখন তাহাকে ত্যাগ করিয়৷ হেমা্গিনীকে বিবাহ পু 


যাইতেছে, তখন কুমু বলিল, 


যি বাঙালী জীবনে রমণী 


“যদি আমি সতী হই, তবে ভগবান সাক্ষী রহিলেন, তুমি কোনোমতেই 
তোমার ধর্ম শপথ লঙ্ঘন করিতে পারিবে না। সে ,মহাঁপাপের পূর্ধে হয় 
আমি বিধবা! হইব, নয় হেমা্গিনী বাঁচিবে না ।” 


যে রবীন্দ্রনাথ কুমুর মুখে এই উক্তি দিয়াছিলেন, তিনি 'শ্্রীর পত্র 
গল্লের লেখক নন। 

ৃষ্টিদান, গল্পের হিন্দুত্বের আর একটি প্রমাণ সত্যরক্ষা সম্বন্ধে 
মনোভাব । যে সত্যরক্ষার জন্য দশরথ রামকে বনে পাঠাইয়া প্রাণ 
দিয়াছিলেন, সেই সত্য সম্বন্ধে কুমুরও অবিচল নিষ্ঠা । স্বামী বিবাহ 
করিবার জন্য জলপথে চলিয়াছেন, কালবৈশাখী ঝড়ে দালান কাপিতেছে, 
কুমু ঠাকুরঘরে বসিয়া স্বামীকে মহাপাতক হইতে বকাঁচাইবার জন্য 
পুজা করিতেছে । তবু 

“আমি বলিলাম না যে, “হে গাকুর, আমার স্বামী এখন নদীতে আছেন 

তাহাকে রক্ষা কর । আমি একান্ত মনে বলিতে লাগিলাঁম, ঠাকুর 

'মমার অদৃষ্টে যাঁভা হইবার তউক, কিন্তু মামার স্বামীকে মভাঁপাতক 

হইতে নিবৃত্ত কর; 1” 

শুধু ইহাতেই নয়, গল্পটার হিন্দৃত্ব সমস্ত উক্তিতে, ভাষার ভঙ্গীতে, 
ও শব্দের অর্থ ও ব্যপ্জীনায় প্রকাশ পাইয়াছে। ইহা! আগেও বলিয়াছি। 
একেবারে প্রথম ছত্র হইতেই উহার সুত্রপাত দেখিতে পাই। কুমু 
বলিতেছে-__ 

“শুনিয়াছি আজকাল অনেক বাঙালীর মেয়েকে নিজের চেষ্টায় স্বামী সংগ্রহ 

করিতে হয়। আমিও তাই করিয়াছি, কিন্তু দেবতার সহায়তায় । আমি 

ছেলেবেল! হইতে অনেক ব্রত এবং অনেক শিবপূজা করিয়াছিলাম 1” 


ইউরোপীয় সঙ্গীত যাহার! শুনিয়াছেন, তাহারা বুঝিবেন, এই 
কথাগুলি যেভাবে ব্যবহার করা হইয়াছে তাহা সিম্ফনীর প্রথমে 
কতকগুলি বিশিষ্ট ধ্বনির সহায়তায় “টোন্যালিটি” প্রতিষ্ঠিত করিবার 
মত। ইহার দ্বারা স্থুরের ধর্ম সূচিত হয়। তেমনই কুমুর প্রথম কয়েকটি 


বাঙ/লীর মন ও ভালব।সা ২০১ 


কথ দিয়াই গল্পটার বিশিষ্ট ধর্মের, সোজা কথায় হিন্দুত্বের পরিচয় 
দেওয়া হইয়াছে । 

তার পর ক্রমাগতই গল্পটাতে হ্বাগনারের 'লাইট-মোটিফে'র মত 
এই ধরনের কথা পাই । কতকগুলি দৃষ্টান্ত দিতেছি-_ 

১। “পূর্বজন্মের পাপবশত আমি আমার এমন স্বামী পাইয়াও সম্পূর্ণ 

পাইলাম না। মা! ত্রিনয়নী আমার ছুই চক্ষু লইলেন।” 

২। “ভবিতবাতা যখন খণ্ডে না, তখন চোখ তো আমার কেহই 
বচাইতে পারিত না ।” 
“যখন পূজার ফল কম পড়িয়া'ছল, তখন রামচন্দ্র তাহার দুই চক্ষু 
উতৎপাটন করিয়া দেবতাকে দ্রিতে গিয়াছিলেন। আমার দেবতাঁকে 
মাঁম।র দৃষ্টি দিল[ম |” 
“ইষ্টদেব গোঁগীনাথের শপথ করিয়। বলতেছি, আমি ঘেন ত্র্গহত্যা 
পিতৃহত্যার পাঁতকী হই 1” 
“সেই সঙ্গে আমার ছেলেবেলাঁকার ব্রত এবং ভোরবেলা ফুল 
তুলিয়া শিবপূজার কথা মনে পড়িল 1” 
৬। “পাঁড়াগায়ে আসিয়া আমার সেই শিবপূজার শীতল শিউলিফুলের 
গন্ধে হৃদয়ের সমস্ত মশা ৭ বিশ্বাস আমার সেই শশিশুকালের মতই 
নবীন এ উজ্জ্রল হইয়া উঠিল ।” 
“সংহারকারী শঙ্কর নীরব অঙ্গুলির ইঙ্গিতে তাহার সমস্ত প্রলয়শত্তিকে 
আমর মাথার উপরে জড করিতেছেন, তাহা আমি বুঝিতে 
পারিতেছিলাম |” 
“তোমাকে আঁমি এই মহাবিপদ মহাঁপাঁপ হইতে রক্ষা করিব। এ 
ঘর্দিনা পারি তবে আমি তোমার কিসের স্ত্রী; কি জন্তে আমি 
শিবপূজ। করিয়াছিলাম 1” 

উপমা ও শব্দচিত্রের সহায়তায় রচনাবিশেষের ভাবব্যঞ্রনা যে স্পষ্ট 
ব্যাখ্যার অপেক্ষাও ভাল করিয়৷ করা যায়, তাহার পরিচয় সাহিত্যের 
অধ্যাপকের! ক্যারোলাইন স্পার্জনের 'ইমেজারী অফ শেকস্পীয়াস 
ট্যাজেডিজ' প্রবন্ধে পাইয়াছেন। আমি উহারই অনুকরণে 'দুষ্টিদান' 
গল্পের স্ুরটা বুঝাইতে চেষ্টা করিলাম । 


৫ 


€ 


৭ 


৮ 


২০২ বাঙালী জীবনে রমণী 


কিন্ত 'দষ্টিদানে'র হিন্দুত্ব শুধু হিন্দুত্ব নয়, উহা বাংলার পল্লীজীবনের 
হিন্দুত্ব। তাই গ্রামের জীবন গল্পটির কাঠামো, গ্রাম্য.কথাবার্ত! উহার 
প্রাণ। বাংলা দেশের পল্লীবাসিনীর মনের সহিত প্রাণের যোগ ন৷ 
থাকিলে রবীন্দ্রনাথ দুইটি অল্পবয়স্কা মেয়ের মুখ হইতে এক ধরনের কথা 
শুনাইতে পারিতেন না । একটি মেয়ের বয়স চোদ্ৰ-পনেরো, অপরটির 
উন্নিশ-কুড়ি। ছোট মেয়েটি কুমারী । সে জিজ্ঞাসা করিল__ 

হেমাঙ্গিনী ।--“তোমার ছেলেপুলে নাই কেন ?” 

কুমু।--কেন তাহা কি করিয়। জানিব_ ঈশ্বর দেন নাই |» 

হে।-_“অব্ঠ তোমার ভিতরে কিছু পপ ছিল ।৮ 

কু।--তাহাও অন্তর্ধামী জানেন ।” 

হে ।__-“দেখ না, কাকীর ভিতবে এত কুটিলতা যে উহার গর্ভে 

সন্তান জন্মিতে পার না” 

এই কথাগুলি “লুপ” প্রচাবিণী বা “লুপ” ধারিণীর উক্তি হইতে পারে 
না। কিন্তু এই সরল বাঙালাত্ব কি সকল আধুনিকতার উপরে নয়? 
রবীন্দ্রনাথের মিথা। ও কৃত্রিম বিশ্বমানবতার কচকচির পাশে উহা 
শিশিরন্নাত ফুলের মত উজ্জ্বল। 'বিশ্বমানবত/ চুলায় যাক, আমবা 
বাঙালীত্ব ফিরিয়া পাইয়া মানুষ হই । 

এই হিন্দুত্বের প্রয়োজন ছিল। 'দৃষ্টিদান, গল্পের ভালবাসা আসলে 
বিদেশী অর্থাৎ ইউরোপীয় রোমান্টিক প্রেম । উহাকে বাঙালী জীবনে 
প্রতিষ্ঠিত করিতে হইলে “যে দেশী ছঁচে ঢালিতে হইবে, একথা আমি 
আগেই বলিয়াছি। 'দৃপ্টিদানে' রবীন্দ্রনাথ এই সমন্বয় অতি নিবিড়ভাবে 
করিয়াছেন। 

স্বামীর প্রতি কুমুর যে মনোভাব, তাহা একদিক হইতে দেখিলে 
বিশুদ্ধ হিন্দু পাতিব্রত্য, আর একদিক হইতে দেখিলে বিশুদ্ধ রোমার্টিক 
প্রেম । কুমু যে হিন্দু অর্থে সতী, পতিব্রতা, সে-বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ এতটুকু 
সন্দেহ রাখেন নাই। স্বামী গৌয়াভ্ূ'মি করিয় নিজে চিকিৎস! করিতে 
গিয়া তাহার চক্ষু ছুটি নষ্ট করিতে বসিয়াছে। তাহার দাদা উহা! দেখিয়া 


বাঙালীর মন ও ভালবাসা! ২০৩ 


অন্য ডাক্তার আনাইয়! চিকিৎসা করিতে উদ্যত হইয়াছে । এই ব্যাপারে 
স্বামী ও দাদার মধ্যে ঝগড়ার সূত্রপাত দেখিয়া! কুমু নিজের বিপদের কথা 
ভুলিয়া দাদাকে কিছুনা করিতে বলিল। আবার স্বামীর ভুলে চক্ষু 
যাইবার পরও তাহাকে দাঁদার ভণ্দনা হইতে বাঁচাইবার জন্য দাদাকে 
বলিল যে, তাহার দেওয়! খাইবার ওষুধ ভূলে চোখে দেওয়াতেই তাহার 
অনিষ্ট হইয়াছে । এই প্রসঙ্গে কুমুর নিজের উক্তি এই-_ 


'স্্রীজন্ম গ্রহণ করিয়া এত মিথ্যাও বলিতে হয়। দাদার মনেও কষ্ট 
দিতে পারি না, স্বামীর মনও ক্ষুপ্ন করা চলে না। মা হইয়া কোলের 
শিশুকেও ভূলাইতে হয়, স্ত্রী হইয়া শিশুর বাঁপকেণ ভূলচিতে হয়, 
মেয়েদের এত ছলনার প্রয়োজন ।” 

আর স্বামীকে সে বলিল, 

“বেশ করিয়াছ, তোমার জিনিস তুমি লইয়াছ। ভাবিয়া! দেখ দেখি যদি 
কোন ভাক্তীরের চিকিৎসায় আমার চোখ নষ্ট হইত তাহাঁতে আমার কি 
সান্বনা থাঁকিত। ভবিতবাতা যখন খণ্ডে না তখন চোখ তো আমার কেহই 
বাচাইতে পারিত না--সে চোখ তোমার হাতে গিয়াছে, এই আমার অন্ধতার 
একমাত্র মুখ |” 


ইহার পরে যখন এক বাল্যসখী আসিয়া তাহাকে বলিল, “তোর রাগ 
হয় নাকুমু? আমি হইলে এমন স্বামীর মুখ দেখিতাম না” তখন সে 
উত্তর দিল, “ভাই, মুখ দেখা তো বন্ধই বটে, সেজন্যে এ পোড়। চোখের 
উপর রাগ হয়, কিন্তু স্বামীর উপর রাগ করিতে যাইব কেন ? 

ইহা আমাদের পুরাতন পাতিক্রত্যের স্থুর। কুমুর মত বালিকার 
মুখে সেকেলে কথা শুনিয়া বাল্যসখী লাবণ্য রাগ করিয়া অবস্ঞাঁভরে 
মাথা নাড়িয়া চলিয়া গেল। এই পাতিব্রত্যের জন্যই যখন অবসাদ 
আসিত, নিষ্ঠার তেজ ম্লান হইয়া পড়িত, নিজেকে বঞ্চিত, হুঃখিত, 
ছুর্ভাগ্যদগ্ধ বলিয়া! মনে হইত, তখন সে সতীত্বের শান্তি ও ভক্তিকে 
অবলম্বন করিয়া নিজের দুঃখের চেয়েও নিজেকে উচ্চ করিয়া ভুলিতে, 
চেষ্টা করিত। 


২০৪ বাঙালী জীবনে রমণী 


এই পাতিব্রত্যের জন্যই আবার অন্ধ হইবার পর স্বামীর ভালবাসার 
উপর অধিকার আছে কিনা সে বিষয়ে তাহার মনে সন্দেহ জাগিত। এই 
সন্দেহেই সে স্বামীকে আবার বিবাহ করিতে বলিল। স্বামী তাহার 
উত্তরে বলিলেন, “নিজের হাতে তোমাকে অন্ধ করিয়াছি, অবশেষে সেই 
দোষে তোমাকে পরিত্যাগ করিয়! যদি অন্য স্ত্রী গ্রহণ করি তবে আমাদের 
ইফ্টদেব গোগীনাথের শপথ করিয়া বলিতেছি, আমি যেন ব্রঙ্গহত্যা পিতৃ- 
হত্যার পাতকী হই ।” 

এই কথা শুনিয়! কুমু বিপুল আন্দন্দের উদ্বেগে বালিশের মধ্যে মুখ 
চাপিয়া৷ কীদিয়া উঠিল, মনে করিল, “আমি অন্ধ, তবু তিনি আমাকে 
ছাড়িবেন না। দুঃখীর দুঃখের মত আমাকে হৃদয়ে করিয়া রাখিবেন 1৮ 
কিন্তু এই মানন্দের জন্য ও এই আনন্দের বশে স্বামীকে এত বড় শপথ 
করিতে বাঁধা না দিবার জন্য কুমু নিজেকে স্বার্থপর মনে করিল। 

ইহার পরও তাহার মনে একট! দ্বন্দ চলিতে লাগল। একদিকে স্বামী 
আর কোনমতেই দ্বিতীয়বার বিবাহ করিতে পারিবেন না এই আনন্দ, 
আর একদিকে এই ধারণা যে শপথ পালন না৷ করিয়। বিবাহ করিলেই 
স্বামীর মঙ্গল হইবে । এই দ্বন্দে সে তাহার নিজের যে দিকটাকে দেবী 
বলিয়া মনে করিয়াছিল, সেই দেবীর একটা নিরুপ্তর ভ্রুকুটি দেখিল, ও 
একটা ভয়ঙ্কর আশঙ্কার অন্ধকারে তাহার সমস্ত অন্তঃকরণ আচ্ছন্ন হইয়া 
গেল। এসবই পাতিকব্রত্যের কথা । 

তবে কুমুর হৃদয়ে প্রেমের, রোমান্টিক ভালবাসার পরিচয় কোথায়? 
গল্পটা জুড়িয়াই সেটা রহিয়াছে । প্রথমে এইটুকু বলিব, এই ভালবাসার 
প্রমাণ তাহার দেহানুভূতিতে। দেহোত্তর প্রেম বলিয়া কোন জিনিস 
নাই। লোকোন্তর হওয়া আর দেহোন্তর হওয়া! এক কথা নয়, কারণ 
দেহও লোকোন্তর হইতে পারে । নরনারীর আকর্ষণে দেহ যেমন জৈব 
কামের অবলম্বন হইতে পারে, তেমনই লোকোন্তর মানসিক অনুভূতির 
ব্যাপারও হইতে পারে। দেহের প্রতি ছুই আকর্ষণের স্বরূপ বুঝাইতে 
হইলে জড়পদার্থের দুই অবস্থার উপমা দিতে হয়। গ্রহ জড়পদার্থ, কিন্তু 


বাঙালীর মন ও ভালবাঁস। ২০৫. 


দাহমান নয়; কিন্তু সূর্য বা তার! সেই জড়পদার্থই, তবুও দাহামান । 
তেমনিই কামের আকর্ষণের বেলাতে দেহ ভৌতিক বস্তু মাত্র, কিন্তু, 
প্রেমের আকর্ষণে উহা! ভৌতিক থাকিলেও বিভাময় জ্যোতিক্ষে পরিণত 
হইয়া যায়। 

দেহই প্রেমের অবলম্বন, সেজন্য প্রেম জ্ঞানেক্দ্িয়ের অনুভূতি- 
সাপেক্ষ । না দেখিয়া, না শুনিয়া, না স্পর্শ করিয়া! ভালবাসা যায় না। 
কবি যে লিখিয়াছেন-_জন্ম অবধি দেখিয়াও নয়ন তৃপ্ত হইল না, লক্ষ 
লক্ষ যুগ বুকে রাখিয়াও বুক জুড়াইল না, ইহা প্রেমের গভীরতম সত্য। 
দৃষ্টি ছাড়! স্পর্শও যে ভালবাসার কত বড় অবলম্বন তাহা ভবভূতির মত 
আর কেহ এত গভীর ভাবে অনুভব করিয়াছে কিনা বলিতে পারি না, 
অন্ততপক্ষে এত স্পষ্ট করিয়া কেহ বলে নাই। 

সীতা রামকে অবলম্বন করিয়! শুইবামাত্র রাম বলিলেন, “প্রিয়ে, 
কিমেতৎ ।৮ 


“বিনিশ্চেতুং শক্যো ন স্ুখমিতি বা ছুঃংখমিতি বা 
প্রমোহো নিদ্রা বা কিমু বিষ-বিসর্পঃ কিমু মদঃ | 
তব স্পর্শেম্পর্শে মম হি পরিমুটেন্দ্রিয়গণো 
বিকারশ্চৈতন্তং ভ্রময়তি চ সংমীলয়তি চ ॥” 


_প্রিয়া, একি! এ সুখ না ছুঃখ তাহা বুঝিতে পারিতেছি না একি 

মৃছণ না নিদ্রা, বিষের আচ্ছন্নতা না আনন্দ? তোমার স্পর্শে স্পর্শে 

আমার ইন্দ্রিয়মূহ নিক্ষিয় হইয়া যায়, তোমার স্পর্শ আমাকে বিকল 

চৈতন্ত করিয়! একবার ভ্রান্ত ও একবার অবশ করিয়া ফেলে !” 

তাই পঞ্চবটাবনে রামের মুহমান হইবার সম্ভাবনা আশঙ্কা করিয়। 
তগবতী পৃথিবী ও ভাগীরথী তাহাকে সপ্ত্রীবিত করিবার জন্য 'মৌলিক 
এব._একেবারে মুলগত উপায়ের কথা চিন্তা করিয়াছিলেন, এবং এই 
উদ্দেস্টে সীতাকে পাঠাইয়া দিয়াছিলেন যাহাতে সীতা৷ রামকে স্পর্শ 
করিয়া আবার সচেতন করিতে পারেন। অদৃশ্য সীতার স্পর্শে রাম. 
জাগিয়া উঠিয়াও বলিলেন, 


২০৬ বাঙালী জীবনে রমণী 


“স্পর্শ; পুরা পরিচিতো৷ নিয়তং স এব 

সঞ্জীবনশ্চ মনসঃ পরিমোহনশ্চ। 

সন্তাপজাং সপদি যঃ পরিহত্য মৃচ্ছ4 

মানন্দনেন জড়তাং পুনরাতনোতি ॥” 
_-এই সেই পুরাতন পরিচিত স্পর্শ, যাহা আমার মনকে যেমন জাগায় 
তেমনই মুহামানও করে, যাহা এখনই আমার শোকজনিত মুচ্ছ1 তৎক্ষণাৎ 
ভাঙিয়! দরিয়া আবার শুধু আনন্দের জন্যই জড়ত৷ আনিয়া দিল ।” 


কুমুর ভালবাসা ও তেমনই স্বামীকে সমস্ত জ্ঞানেক্দ্িয় দিয়া পাইবার 
জন্য ব্যগ্র থাকিত। যখন দৃষ্টি ছিল তখন "স্বামী যখন কলেজে 
যাইতেন তখন বিলম্ব হইলে পথের দিকে জানালা একটুখানি ফাক করিয়া 
পথ চাহিয়া থাকিতাম।” কিন্তু দৃষ্টি যাইবার পর তাহার “দৃষ্টিহীন 
সমস্ত শরীর তাহাকে অন্বেষণ করিতে চেষ্টা করে ।৮ কুমু বলিতেছে,_ 


“এখন তাহার ও আমার মাঝখানে একটা ছুরস্ত অন্ধতা ;_এখন আমাকে 
কেবল নিরুপায় বাগ্রভাবে বসিয়া! থাকিতে হয়--কখন তিনি তাহার পার 
হইতে আমার পারে আসিয়া উপস্থিত হইবেন। সেইজন্য এখন যখন 
ক্ষণকাঁলের জন্যও তিনি আমাকে ছাড়িয়া চলিয়া! যান,তখন আমার সমস্ত অন্ধ 
দেহ উদ্ভত হইয়1 তাঁহাকে ধরিতে যায়, হাহাঁকার করিয়া তাঁহাকে ডাকে 1” 


এই অন্ধতাই চরম সুখ । আমার বিশ্বাস__জগতের প্রতি, সংসারের 
প্রতি অন্ধ না হইয়া ভালবাসা যায় না। বুঝি বা এই অন্ধত৷ দৈহিক 
হইলে ভালবাসার ক্ষমতা আরও বাড়ে। অন্ধ কুমুর ভালবাসার কথা 
বলিতে গিয়। অন্ধ রজনীর উন্মগ্ড ভালবাসার কথা সহজেই মনে পড়ে। 
_-ডাক্তারির কপালে আগুন জ্বেলে দিই। সেই চিবুক স্পর্শে আমি 
মরিলাম 1৮ 

কুমুর ভালবাসার দ্বিতীয় প্রমাণ, স্বামীকে বিচার করিবার ইচ্ছা 
ও ক্ষমতা । পাতিব্রত্য স্বামীকে বিচার করে না, কিন্তু ভালবাসা 
প্রণয়ীকে বিচার করে, প্রণয়ী স্বামী হইলেও করে। ভালবাসা বড় কঠিন 
বিচারক, কিন্তু স্বার্থবোধ হুইতে বিচারক হয় না, হয় পরার্থপরতা হইতে। 


বাঙালীর মন ও ভালবাসা ২০৭ 


ভালবাসিলে ভালবাসার পাত্র বা পাত্রীর বহু দুর্বলতা, বহু অপরাধ, এমন 
কি সাময়িক প্রবঞ্চনাও ক্ষমা করা যায়। কিন্তু ভালবাস! ভালবাসার 
পাত্র বা পাত্রীর নীচতা, ক্ষুত্রতা, বা সন্কীর্ণতা ক্ষমা! করিতে পারে না। 

ইহার সঙ্গত কারণ আছে। ভালবাসা নিজেকে দিবার, আত্ম 
বিসর্জনের ব্যাকুল আগ্রহ, পরের কাছ হইতে কিছু আদায় করিবার 
ইচ্ছা নয়। ইহার মধ্যে স্বার্থপরতা মাত্র এইটুকু থাকে যে, আত্মসমর্পণ 
কেহ প্রত্যাখ্যান করিলে কষ্ট হয়; ইহার বেশী কিছু নয়। কিন্তু উহা 
ভালবাসার পাত্র ব৷ পাত্রীর অনুদাঁরতা সহ করিতে পারে না, এতটুকু 
অনুদারতা দেখিলেই নিজের মধ্যে নিজেকে টানিয়া লইয়৷ অদৃশ্য হইয়া 
যাইতে চায়। সংসারের পাপ ও আবিলত। দেখিয়। স্থিতপ্রজ্জের যে 
অবস্থা হয়, ভালবাসারও সেই অবস্থাই হয়,_ 

“যদ সংহরতে চাঁয়ং কুর্মে|ইঙ্গানীব সবশঃ। 
ইন্জিয়া ীন্দি়াঘেভ্যস্তস্ত প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিতা ॥” 

তবে কুর্মত্ব-প্রাপ্ত স্থিতপ্রজ্জের মানসিক জীবনে শান্তি থাকিতে পারে, 
কিন্তু প্রেমে-_ভালবাসিয়া কুর্মত্বে শমগুণযুক্ত হওয়ার মধ্যে কোনও 
সাস্তুনা নাই। ভালবাসিয়া সাংসারিক ও সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ 
হইবার পর প্রণয়ী বা প্রণয়িনীর নীচত! দেখিলে মৃস্যুভয়ের অপেক্ষাও 
বড় ভয় দেখ! দেয়। 

আমি জানি বহু নরনারীর বিবাহিত জীবনে কিছুদিনের মধ্যে 
এই দুঃখ আসে । ইহার যন্ত্রণা, যন্ত্রণাবোধ থাকিলে, প্রিয় বা প্রিয়াকে 
হারাইবার অপেক্ষাও নিদারণ। আমি আমার পরিচিত ব্যক্তি, বন্ধু বা 
আত্মীয়ের মধ্যে অনেককেই স্ত্রীর নীচতার সংস্পর্শে নীচ হইয়া যাইতে 
দেখিয়াছি। এইভাবে নীচ হইয়া পুরুষ স্ত্রীর নীচতা অনুভব করার 
বেদনা হইতে নিষ্কৃতি পায়। কিন্ত্রী আমি স্বামীর নীচতায় ভ্ত্রীকে নীচ 
হইতে প্রায় দেখি নাই বলিলেই চলে। জানি না কোথা হইতে নারীর 
এই সংক্রামক ব্যাধি হইতে মুক্ত থাকিবার ক্ষমতা আসে, কিন্তু 
উহ| যে আসে, তাহা দেখিয়াছি। তাই স্বামীর চরিত্রে নীচতা 


২০৮ বাঙালী জীবনে রমণী 


দেখিলে স্ত্রীর ক্ট অনেক বেশী হয়। কুমুর রি যন্ত্রণা পাইতে 
হইয়াছিল । 

ডাক্তারিতে পসার হইবার সঙ্গে সঙ্গে তাহার স্বামীর চরিত্রে একটা 
বিষয়াসক্তি ও অর্থপরায়ণতা দেখা দিল। তিনি দরিদ্রকে চিকিৎসা 
করিতে কোন আগ্রহ প্রকাশ করিতেন না। এমন কি উহাদিগকে ব্যঙ্গ 
করিতেও আরন্ত করিলেন। ইহা দেখিয়া কুমুর মনে যে কষ্ট হইল তাহা 
পরে স্বামীর হেমাঙ্গিনীর প্রতি আসক্তি ও নিজের প্রতি বিশ্বাসহীনতা 
দেখিয়াও হয় নাই। সে তাবিত, অন্ধ হইবার পূর্বে সে যাহাকে শেষবার 
দেখিয়াছিল, তাহার সে স্বামী কোথায়-_ 

“একদিন একটা রিপুর ঝড় আসিয়া যাহাদের অকন্মাৎ পতন হয় তাহারা 

আর একটা হৃদয়াবেগে আবার উপরে উঠিতে পারে, কিন্তু এই যে দিনে 

দ্রিনে, পলে পলে মজ্জার ভিতর হইয়! কঠিন হইয়া যাওয়া, বাহিরে বাড়িয়া 

উঠিতে উঠিতে অন্তরকে তিলে তিলে চাপিয়। ফেল! ইহার প্রতিকার ভাবিতে 

গেলে কোনও রাস্তা খুঁজিয়া পাই না ।” 


ইহা কি পুর্বরাগের প্রণয়ী ও প্রণধিনী, যাহার! বিবাহের বন্ধনে 
পরস্পর শৃঙ্খলাবদ্ধ অবস্থায় আছে, তাহাদের অনেকেরই অপ্রকাশিত 
শোক নয়? এই শোকে কুমু নিজের অন্ধতার শোকও আর অনুভব 
করিতে পারে নাই। স্বামীর সঙ্গে যে চোখে-দেখার বিচ্ছেদ ঘটিয়াছে, 
সেটা তাহার কাছে কিছুই নয়, তাহার আসল ছুঃখ অন্য-_ 

“আমি অন্ধ, সংসারের আলোকবজিত অন্তরপ্রদেশে আমার সেই প্রথম 

বয়সের নবীন প্রেম, অক্ষপ্ন ভক্তি, অখণ্ড বিশ্বাস লইয়া! বসিয়া আছি, 

আমার দেবমন্দিরে জীবনের আরস্তে আমি বালিকার করপুটে যে 

শেফাঁলিকার অর্ধ্দান করিয়াছিলাম, তাঁদের শিশির এখনও শুকাঁয় নাই,_- 

আর আমার স্বামী--এই ছায়াশীতল চিরনবীনতার দেশ ছাড়িয়! টাকা! 

উপার্জনের পশ্চাতে সংসার-মরুভূমির মধ্যে কোথায় অদৃশ্য হইয়! 

যাইতেছেন 1” 

কুমু ইহা কেন হইল বুঝিতে পারে নাই। তাই বলিয়াছিল, 


বাঙালীর মন ও ভালবাসা ২৯৯ 
“প্রথম বয়সে আমরা একপথেই যাত্রা করিয়াছিলাম,--তাহার পরে কখন 
যে পথের ভেদ হইতে আরম্ভ হইতেছিল, তাহা তিনিও জানিতে পারেন 
নাই, আমিও জানিতে পারি নাই, অবশেষে আজ আমি তাহাকে ডাকিয়া 
সাড়া পাই না।” 


শুধু পতিব্রতা হইলে কুমুর মনে এত কষ্ট হইত না। কিন্তু প্রাণ 
দিয়া ভালবাসিয়াছিল বলিয়াই এই কষ্টে নির্জন অন্ধকার কক্ষে মাটিতে 
বসিয়া ছুই হাত জুড়িয়া তাহার অন্ধ জগতের জগদীশ্বরকে ডাকিয়া যাহ। 
বলিয়াছিল উহা আবার উদ্ধত করিব, 
“প্রভূ, তোমার দয়! যখন অনুভব হয় না, তোমার অভিপ্রায় ঘখন বুঝি 
না, তখন এই অনাথ ভগ্রহদয়ের হাঁলটাকে প্রাণপণে ছুই হাতে বক্ষে 
চাপিয়! ধরি, বুক দিয়া রক্ত বাহির হইয়া যাঁয় তবু তুফান সামলাতেই পারি 
না, আমায় আর কত পরীক্ষা করিবে, আমার কতটুকুই বা বল!” 


এই যন্ত্রণা যাহার ভালবাসা নাই, সে অনুভব করে না। 

এইবার আর একটা সংঘাতের কথা বলিতে হয়। পাশ্চাত্য জগৎ 
হইতে পাওয়া ভালবাসা ও পাশ্চাত্য জগতের মারফণ্ড পুনরাঁবিষ্কৃত 
সতীত্বের ধারণা, এই ছুইটির সম্পূর্ণ অঙ্গাঙ্গীভাব দেখা না দিলেও 
মোটামুটি ছুইটি সমান্তরাল খাতে পাশাপাশি বহিয়াছিল; উপমা 
বদলাইয়া বলিতে পারি, ছুইটি স্থুর সঙ্গীতে 'কাউণ্টারপয়েণ্টে'র মত 
বাজিয়াছিল। কিন্ত্ব ইউরোপ হইতে পাওয়া ভালবাসার সহিত সেই 
ইউরোপ হইতেই পাওয়া আর একটা জিনিসের সামর্ন্য কখনই হয় 
নাই। সে জিনিসট। দেশপ্রেম । প্রথম হইতেই দেশপ্রেমের সহিত 
ন'রীপ্রেমের বিরোধ বাধিল । ্‌ 

এ বিরোধটার রূপ একটু বিচিত্র । প্রেমের সন্ধান আমরা ভারতবর্ষে 
বিটিশ শাসন হইতে গৌণভাবে পাইলেও উহাকে ইংরেজের কাছে 
পরাধীনতার গ্লানির সহিত কখনও যুক্ত করি নাই। ইহার কারণ, ইংরেজ 
বা হাত দিয়াও এই ভালবাসা আমাদিগকে দেয় নাই, আমরা ইংরেজ 
জীবন হুইতে, ইংরেজের মানসিক রত্বভাগার লুট করিয়া কোহিনুরের মত 


১৪ 


২১০ বাঁঙালী জীবনে রমণী 


উহাকে আমাদের ঘরে আনিয়াছিলাম। সেই ভালবাসাকে আমরা 
স্বেচ্ছায় ও স্বাধিকারে নিজের করিয়। লইয়াছিলাম । * এই কারণে স্থানীয় 
ইংরেজের হাতে অপমানিত হইলেও সেই অপমান হইতে মুক্তি পাইবার 
জন্য ইংরেজী সাহিত্য হইতে পাওয়! ভালবাসার আশ্রয় গ্রহণ করিতে 
আমরা ইতস্তত করি নাই। শুধু বিদেশী শাসক কেন, সমাজই নিষ্ঠুর, 
সংসারই নিষ্ঠ'র, উহার পীড়ন হইতে মুক্ত হইবার একমাত্র উপায় ভাল- 
বাসা, তাহা আমরা ইংরেজী সাহিত্য হইতেই শিখিয়াছিলাম,_ 
5481) 105০) 161 05106 005 
০ 0176 27906] 1! 101: 00 ০11) 1107 566175 
[০ 139 09196 89 11155 2, 19720. 01 02621078, 
509 ৮911005, 50 1062,07111111) 50 176৮7, 
17901) 76211 0610100 109+ 207 10505 100111517, 
০: ০611/0005701 05209851501 18110 101 72,110... 
রবীন্দ্রনাথের “প্রেমের অভিষেক" কবিতাটি প্রথমে “সাধনা” পত্রিকায় 
এই কাঠামোর মধ্যেই স্থাপিত হইয়াছিল। গল্পটা ছিল এইরূপ-_-একটি 
বাঙালী কেরানী আপিসে সাহেবের দ্বারা অপমান্তি হইয়া বাড়ীতে 
আসিয়া পত্রীর ভলবাসায় সেই গ্রানি একেবারে ভুলিয়া গিয়াছিল। 
রবীন্দ্রনাথের বাল্যবন্ধু লোকেন্দ্রনাথ পালিত ইহাতে আপত্তি করেন। 
এই মতবৈষম্যের বিবরণ রবীন্দ্রনাথ নিজেই প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের 
কাছে ১৩০২ সনের ৬ই চৈত্র তারিখের একটি চিঠিতে দিয়াছিলেন। 
উহ! উদ্ধত করিতেছি_ 
“প্রেমের অভিষেক কবিতাটি “চিত্রা” কাব্যে যে আকারে বাহির হইয়াছে 
তাহাকে সংশোঁধন বল! চলে না_-কারণ ইহাই উহার আদিম রূপ। 
“সাধনা? যখন পরিবন্তিত ও পরিবদ্ধিত মৃত্তিতে দেখা দিয়াছিল তখন 
কাহারও কাহারও মনে এত আঘাত করিয়াছিল যে, বন্থুবিচ্ছেদ হইবার 
জো! হইয়াছিল। তাহারা বলেন, কোনও আঁপিসবিশেষের কেরানী- 
বিশেষের সহিত জড়িত না করিয়! সাধারণভাবে, আত্মন্ৃরয়ের অকৃত্রিম 
* উচ্ছাস সহকারে বাক্ত করিলে প্রেমের মহিমা ঢের বেশী সরল, উজ্জ্বল, 


বাঙালীর মন ও ভালবাসা ২১১ 


উদ্দার এবং বিশুদ্ধভাবে দেখানে! হয়--সাহেবের দ্বারা অপমানিত 
অভিমানক্ষুপ্ন নিরুপায় কেরানীর মুখে একথাগুলো৷ যেন কিছু অধিক- 
মাত্রায় আঁড়দ্বর ও আস্ফালনের মত শুনাঁয়_উহাঁর সহজ স্বতপ্রবাহিত 
সর্বববিস্বত কবিত্বরলটি থাকে না মনে হয়, সে মুখে যতই বড়াই করুক 
না কেন আপনার ক্ষুদ্রতা এবং অপমান কিছুতেই ভুলিতে পারিতেছে 
না। এ সমস্ত আলোঁচনাদি শুনিয়া আমি গোঁড়ায় যে ভাঁবে লিখিয়াছিল।ম 
সেই ভাঁবে প্রকাঁশ করিয়াছি ॥” 


কিন্তু আমার মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ এই আপপ্ডি গ্রাহ্থ করিয়া ভূল 
করিয়াছিলেন। লোকেন পালিত বাঙালী সাহেব ছিলেন । তাহার মত 
বাডালীরা দেহে সাহেব না হইলেও নিজেদের জন্য একটা বিলাতী সমাজ 
তৈরী করিয়াছিলেন। উহাতে তীহারা নিজেদের ইংরেজী পোশাক, 
ইংরেজী আসবাবপত্র, ইংরেজী খানা, ও ইংরেজী ধ্যানধাবণা লইয়া জীবন 
কাটাইতেন। স্থানীর ইংরেজের দন্ত ব। অভদ্রত| যেমন তীহাদ্রিগকে স্পর্শ 
করে নাই, তেমনই স্থানীয় বাঙালীত্বও তাহাদিগকে ছাড়িয়া গিরাছিল। 
তাই তাহাদের কাছে সাধারণ বাডাঁলী জীবনের একটা সমস্তা কখনই 
দেখা দেয় নাই। সেটা এই--কি করিয়া জীবিকার জন্য ইংরেজের অধীন 
হইয়াও ইংরেজের অভদ্রতা ও অবজ্ঞা গায়ে না মাখিয়া অপমানবোধের 
তামসিকতা হইতে মানসজগতে মুক্ত থাকা যায়। বহু বাঙালীই ইহার 
সমাধান করিতে পারিয়াছিল। বিলাতফেরত বাঙালীর কাছে সেটার 
খবর পৌছে নাই। 

এই বাঁডালীর চাকুরিজীবনের গ্রানকে ব্যক্তিগত জীবনের মহিমা 
দিয়া মুছিয়া ফেলিয়াছিল। তাহারা বড়াই করিয়া অশিক্ষিত সওদাঁগরী 
ইংরেজকে বলিতে পারিত, “আমরা দান্তের 'ভিতা নুয়োভা” পড়ি, 
বেয়াত্রিচের খবর রাখি । ভারতবর্ষে তোমাদের সভ্যতার বাহক ও 
প্রচারক তোমরা নও, আমরা 1” তাই ইংরেজের অসভ্যতা তাহাদের 
গায়ে সাময়িক ভিন্ন স্থায়ী কোনোও জ্বাল! ধরাইত না । পরযুগে মহাত্া 
গান্ধী রাজনীতির ক্ষেত্রেও এই মনোভাবের প্রবর্তন করিয়াছিলেন । তিনি 


২১২ বাঙালী জীবনে রমণী 


শিখাইয়াছিলেন, ইংরেজের লাঠি খাইয়াও নিজেকে, নিজের মনে ক্ষয় না 
মানিয়া মাথা উচু করিয়া থাকা যায় । 

প্রেমের অভিষেক কবিতাটির “সাধনায়” প্রকাশিত রূপ যদি 
রবীন্দ্রনাথ বজায় রাখিতেন তাহা হইলে আমর! উহাকে সে-যুগের 
বাডালীর সাংসারিক জীবনের কাঠামোর সহিত যুক্ত দেখিতাম। আমরা 
একদিকে ইংরেজ শাসনের ফলে বাঙালী জীবনের একট গীড়াদায়ক 
বাহক দ্বিত্বের পরিচয় পাইতাম, অন্যদিক হইতে দেখিতাম যে, এই দ্বিত্ব 
বাঙালীর নুতন জীবনে পূর্ণতার অনুভূতির পথেও বাধ! জন্মায় নাই। 
পরাধীনতার কষ্টের সহিত প্রেমের উচ্চতম গৌরব কি করিয়া একত্রে 
থাকিতে পারে তাহা আমাদের মনে স্পষ্ট হইয়া উঠিত। 

কিন্তু আর একটা সংঘর্ষ মহান হইলেও রহিয়াই গেল। আশ্চর্যের 
বিষয় এই যে, পরাধীনতার খারাপ দিকটার সহিত প্রেমের বিরোধ ন৷ 
ঘটিলেও ভাল দিকটার সহিত সংঘর্ষ বাধিতে লাগিল । বাঙালীর কাছে 
নারীর প্রেমও নূতন, দেশপ্রেমও নৃতন । এই ছুইটিকে এক করিবার 
কোনও উপায়ই সে পাইল না। বিবাহ না করিয়া দেশসেবা করিতে 
হইবে ইহা! প্রত্যেকটি দেশপ্রেমিক বাঙালী যুবকের আদর্শ হইয়া দ্াড়াইল। 

রবীন্দ্রনাথের “একরাত্র গল্পটি এই সংঘাতের গল্প । উহার নায়ক 
নাজির-সেরেস্তাদার হইবার জন্য কলিকাতা গিয়াছিল, কিন্তু মাৎসিনি- 
গারিবাল্দি হইবার প্রয়াসে লাগিয়া গেল। আঠারে৷ বৎসর বয়সে 
তাহার সহিত বাল্যসখী স্তুরবালার বিবাহের প্রস্তাব আসিল, কিন্তু সে 
তখন মনে মনে প্রতিজ্ঞা করিয়াছে আজীবন বিবাহ না করিয়া স্বদেশের 
জন্য মরিবে, তাই প্রস্তাবকে সে অগ্রাহা করিল। পরে যখন স্ুরবালার 
অন্যত্র বিবাহের খবর আসিল তখন সে পতিত ভারতের টাদা-আদায়-কার্ষে 
ব্যাপৃত থাকাতে সেটাকে অত্যন্ত ভুচ্ছ মনে করিল। ইহার ফল কি 
ধাড়াইয়াছিল, তাহার কথা তৃতীয় পরিচ্ছেদে বলিয়াছি। একটি রাত্রিতে 
স্থরবালার পাশে দীড়াইয়৷ তাহার মনে হইয়াছিল, সে যে সেরেস্তাদারও 
হয় নাই, গারিবাল্দিও হয় নাই, উহাতে তাহার ক্ষোভ নাই। দেশ ও 


বাডালীর মন ও ভালবাসা ২১৩ 


নারীর মধ্যে এই নিরর্থক দ্বন্দ ষে একটা নিষ্ঠুরতা ছিল, উহার অনুভূতি 
রবীন্দ্রনাথের মনে সম্পূর্ণ আসিয়াছিল। “গোরা” এই দ্বন্দেরই আরও 
বড় কাহিনী । এই দ্রিক হইতে উপন্যাসটির বিস্তৃত আলোচনা হওয়া 
আবশ্যক । আমি উহার প্রচেষ্টা করিব। 

'গোরা” বইখানা উপন্যাসই নয়, পুরাদস্তর সোশ্যোলজি, একথা অবশ্য 
কেহ বলে না; তবুবাঙালী সমালোচক ও পাঠক উহাকে লৌকিক 
উপন্যাস না৷ বলিয়! সুরীয়লোকের উপন্যাস বলিয়া মনে করে। ললিতা 
সম্বন্ধে বিনয়ের একদিন যে নৃতন উপলব্ধি আসিয়াছিল, “গোরা” সম্বন্ধে 
বাডালীর এখনও সেটা আসে নাই। সেদিন ললিতা বিনয়ের দিকে 
কটাক্ষপাত মাত্র না করিয়। ঘর হইতে বাহির হইয়! গিয়াছিল। ললিতার 
এই চাঁপা আগুনের মত ভাব বিনয় অনেকদিন দেখে নাই। সেকি 
ভুল করিয়াছিল একটু পরে সেটা বুঝিতে পারিল। ললিতা যে 
সমাজের কাছে অপমানিত হইতেছে, অথচ বিনয় সেই অবমাননা। হইতে 
তাহাকে রক্ষা করিবার কোনও চেষ্টা না করিয়া “কেবল সমাজতত্ব লইয়া 
সৃন্মন তর্ক করিতে উদ্ভত হইয়াছে, ইহাতে ললিতার মঠ তেজন্িনী রমণীর 
কাছে সে যে অবজ্ঞাভাজন হইবে তাহা বিনয়ের কাছে সমুচিত বলিয়াই 
বোধ হইল।” কাহারও অবজ্ঞাভাজন না হওয়াতে বাঙালী এখনও 
গোরা লইয়৷ সমাজতত্বের সুম্মম তর্কই করিতেছে । 

অপরপক্ষে যে কারণে বাঙালী পাঠকের মনে 'গোরা” সম্বন্ধে এই 
দণ্ডব হইয়া সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করিবার প্রেরণা আসে, ঠিক সেই 
কারণেই বইটার ইংরেজী অনুবাদ প্রকাশিত হইবার পর সেটাকে উপন্যাস 
হিসাবে গ্রাহ্য করিতে ইংরেজ সমালোচকের অন্থুবিধা হইয়াছিল। যতদূর 
মনে পড়ে, সমালোচনাটা প্টাইম্স্‌ লিটারারী সাগ্লিমেণ্টে পড়ি। প্রথম 
দেখাতেই ধর্ম, সমাজ, জাতিভেদ ইত্যাদি লইয়া ভদ্রসমাজে তর্ক, এমন কি 
ঝগড়া বাধিয়া উঠিতে পারে কিন! এই বিষয়ে ইংরেজ সমালোচক সন্দেহ 
প্রকাশ করিয়াছিলেন । স্বীকার করিতেই হইবে, প্রথম দিন পরেশবাবুর 
বাড়ী গিয়াই গোর! যেভাবে হারাণবাবুর সহিত তর্ক জুড়িয়া দিল তাহা 


২১৪ বাঙালী জীবনে রমণী 


শোভন নয়। .বরদাস্ুন্দরী “জাতি মানেন কিনা” এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা 
করিবার পর গোরা যে উত্তর দ্িল_+"জাত কি আমার নিজের তৈরী যে 
মানব না ?” উহা আরও অশোভন । 

তবু ইংরেজ সমালোচক ভুল করিয়াছিলেন। ইংরেজদের মধ্যে 
সামাজিক জীবনে যে-সব আলোচনা হয় না, তাহা বাঙালীদের মধ্যে হয় 
তাহা তে প্রতিদিনই দেখি । আমাদের একটা কচকচিপ্রিয়তা আছে, 
উহা আমাদের ইয়াকির ওপিঠ। কোনটাই খুব বৈদদ্ধপূর্ণ নয়, কিন্তু 
কোনটাই অস্বাভাবিকও নয় । গোরা উপন্যাস যে-সময়কার সেই যুগে ধর্ম 
ও সমাজ সম্বন্ধীয় আলোচনা বাঙালী স্ত্রী-পুরুষের পক্ষে স্বাভাবিক ছিল। 
কিন্তু জিত্ঞান্, এই আলোচনার বিষয়বস্তুই কি 'গোরা” উপন্যাসেরও 
প্রধান বিষয়বস্তর ? যে জিনিসটা বিচার করিতে হইবে তাহা এই-_ধর্ম ও 
সমাজ সম্বন্ধে এত আলোচন। সত্বেও বইটা উপন্যাসে দাড়াইয়াছে কিনা 
__অর্থাৎ উহাতে নরনারীর প্রেমই মুখ্য বস্তু কিনা । 

বর্তমান যুগের বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কতকগুলি বই বাঙালীর 
সমসাময়িক জীবনের সহিত জড়িত। এই উপন্যাসগুলি সব সময়ে 
লেখকের শ্রেষ্ঠ রচনা নয়। কিন্তু যুগধর্মের সহিত বিশেষ একটা 
আশ্রেষের ফলে সকলেরই মনে একটা সাড়া জাগাইয়াছিল। দৃষ্টান্ত 
হিসাবে শরতচন্দ্রের পথের দাবী'র কথা বলিতে পারি। “বিষবৃষ্ষণ 
বঙ্িমচন্দ্রের শ্রেষ্ট উপন্যাস নয় তবু উহা! তখনকার বাঙালী সমাজে একটা 
বিশেষ আলোচনার বস্তু হইয়াছিল। তাই ১৮৭৩ সনের ক্যালকাটা 
রিভিউ+এ এই মন্তব্য প্রকাশিত হইয়াছিল, 


41715 15081.. 5/28 60192 1000280 11) 0116 192119151)209, 01 ৩561 
73205211 8200. 00905100665 7101 ০01 1531 9921. 1625 
08166 ০4 9. 11667001 0112720661 1100 10 0:50605550175, 17115 
১5 007675 ৮০1০ 211 13151071091, 1006 200 25 01165 21, 8170 


1116 25 16 15+5 15 0176 170660 0£ (156 10559176016.) 


“গোরা? সন্বন্থধেও এই কথা বলা যাইতে পারে । উহাতে যেসব সমস্থা। 


বাঙালীর মন ও ভালবাসা ২১৫ 


তোলা হইয়াছে তাহা যখন উহা! প্রকাশিত হইয়াছিল তখনকার নয়, 
তাহার অন্তত ত্রিশ বসর আগের । কিন্তু ১৯০৭ সনে 'প্রবাসী'তে 
প্রকাশিত হইতে আরম্ত হইবার পর হইতে বই আকারে ১৯১০ সনে 
প্রকাশিত হওয়া পর্যন্ত সেই প্রশ্রগুলি সজীব ছিল। সুতরাং বইটার 
আলোচনা! জীবনের সহিত জড়িত থাকিত, শুধু সাহিত্যবিচারের মধ্যে 
আবদ্ধ থাকে নাই । 

আমি ১৯০৭ সনে পূজোর সময়ে বনগ্রামে সেই মাসের “প্রবাসী, 
আসার পর গোরা সম্বন্ধে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে আলোচনা শুনিয়াছিলাম 
তাহা এখনও মনে আছে। তখন আমার বয়স দশ পূর্ণ হয় নাই। 
আমি নিজে বইটা পড়ি ১৯১০ সনে, বারো বশর বয়সে । তখনও 
আমাকে উপন্যাস পড়িবার জন্য মাতা “লাইন ক্লীয়ার' দেন নাই, উহার 
দুই বশসর পরে লুকাইয়া মশারির পিছনে বসিয়া বঙ্কিমচন্দ্র পড়িতেছি 
দেখিয়া হাসিরা অনুমতি দিয়াছিলেন। স্থৃতরাং “গোরা” অবশ্য লুকাইয়া 
পড়িয়াছিলাম । 

আমার এক মামা কলিকাতায় আমাদের সাপ্পেন্টাইন লেনের 
বাসায় থাকিতেন। তিনি রবীন্দ্রনাথের কয়েকজন নায়কের মত ছিলেন, 
অর্থা প্রচুর সাহিত্যালোচনা করিতেন, কিন্তু বি-এ পরীক্ষায় ফেল 
হইতেন। তবে তীহার সাহিত্যিক রুচি বা জ্ঞানের অভাব কখনও দেখি 
নাই। বাংলা সাহিত্যের সব উল্লেখযোগ্য বই তাহার একটা বাক্কেটে 
ছিল। তিনি কলেজে গেলে আমি বাহির করিয়৷ পড়িতাম। 

একদিন বিকালে জানালার আলিসার উপর চড়িয়া “গোরা” পড়িতোছ, 
এমন সময় অপ্রত্যাশিতভাবে মামা আসিয়া পড়িলেন। আমি চট, 
করিয়৷ বইটার উপর বসিয়া পড়িলাম। তারপর তিনি হাতমুখ ধুইতে 
যাই গেলেন তখনই আবার বাক পুরিয়৷ রাখিলাম।% 

কিন্তু বইটা বুঝিতে আমার কোনও কষ্ট হয় নাই। “গোরা*তে 
..» দেই জানাল! ১৯৬৮ সমের জাহধারী মাসে কলিকাতা গিয়া আনার আটার বৎসর পরে 
দেখিয়৷ আসিয়াছি। 


১১৬ বাঁডালী জীবনে রমণী 


যে ধরনের আলোচন! আছে উহা! শৈশব হইতে শুনিয়া অত্যন্ত ছিলাম । 
কাচাঁভাবে সমপাঠীদের সঙ্গে আমিও এইসব প্রশ্নের আলোচন! করিতাম। 
তাই গুরুজনদের মধ্যে আলোচনাও কান পাতিয়৷ শুনিতাম। একদিন 
সন্ধ্যাবেলায় খাওয়ার পর বাবা, মা, এবং মামার মধ্যে কথ! উঠিল যে, 
ললিতার ঘা বয়স তাহাতে সে এত পাকা কথা বলিতে পারে কিনা । 

মনে রাখিতে হইবে ললিতার বয়সের হিসাব বর্তমান সংস্করণের 
বয়স দিয় করিলে হইবে না। গোড়ার দিকে যেখানে স্ুচরিতার বয়সের 
উল্লেখ আছে তাহাতে এখন পাই-গাড়ী হইতে সতেরো-আঠারো 
বৎসরের একটি মেয়ে নামিয়া পড়িয়াছে।”৮ উহা প্রথম সংস্করণে ছিল 
(যতদুর মনে পড়ে ) চৌন্দ-পনেরো বছরের মেয়ে, অর্থাৎ তিন বৎসরের 
তফা। সে-বয়সে তিন বসরের তফাত অনেক তফাৎ । 

তাই স্থচরিতার বয়স দিয়া-_লাবণ্য স্থচরিতার অল্প ছোট ও ললিতা 
তাহার পর, এই হিসাব করিয়া মা ললিতার বয়স বড় জোর বারো-তেরো 
ধরিয়াছিলেন। স্তবতরাং তিনি ললিতার কথাবাতত1 সম্বন্ধে প্রশ্নটাও 
ূলিয়াছিলেন। আমার মামা উত্তর দিয়াছিলেন যে, কোনও কোনও 
ক্ষেত্রে মানসিক পরিণতি আগেও হইতে পারে, বিশেষত ব্রাঙ্গসমাজে | 
কিন্তু মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ পরে এত কম বয়স রাখা সঙ্গত মনে করেন 
নাই। প্রথমে উপন্যাসের ঘটনাকালের কথা মনে রাখিয়া তিনি বয়সটাকে 
কমই করিয়াছিলেন। 

কিন্তু উপন্যাসের ঘটনাকাল কি? এ প্রশ্নটা বিচার করিবার 
প্রয়োজন আছে। 

নিজের রচিত উপন্যাসের ঘটনাক্রম ও তারিখ সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ 
একটু বেহিসাবী ছিলেন। “নৌকাডুবি-তে সময়ের হিসাবের একটা 
গুরুতর ভূল আছে। “গোরা'তেও ব্যাপারটা গোলমেলে। রবীন্দ্রনাথ 
“গোরা লেখেন পঁয়তাল্লিশ-ছেচল্লিশ বগসর বয়সে, কিন্তু “গোরা"র 
সমস্ত ব্যাপার-_ঘটনা ও চিন্তাভাবনা তীহার যৌবনকালের, অর্থাৎ 
১৮৮০ সনের কাছাকাছি সময়ের । ইহার আগেকার নয়, কিন্তু ১৮৮৫ 


বাঙালীর মন ও ভালবাসা ২১৭ 


সনের পরেকারও নয়। “গোরা'র ঘটনাকালও এর মধ্যে ফেলা উচিত, 
কিন্তু ঠিক কবে ইহা লইয়া গণ্ডগোল আছে । হিসাবটা দিব। ঘটনার 
কালের ইঙ্গিত কয়েকটা উত্তিতে আছে । একটা একটা করিয়৷ ধরি-__ 

(১) প্রথম দিন বিনয়কে দেখিয়৷ বরদান্তুন্দরী বলিলেন, “মনে হচ্ছে, 
আপনাকে যেন ছুই-একবার সমাজে দেখেছি ?” বিনয় অনাবশ্যক লঙ্জা 
প্রকাশ করিয়া কহিল, “হা, আমি কেশববাবুর বন্তৃতা৷ শুনতে মাঝে মাঝে 
যাই ।৮ 

কেশববাবুর সহিত কুচবিহার বিবাহ লইয়া! ব্রাহ্মসমাজের এক 
অংশের সহিত বিরোধ হয় ১৮৭৮ সনে। ইহার পর ব্রাঙ্গসমাজ 
সাধারণ ও িববিধান” এই ছুই ভাগে বিভক্ত হইয়! যায়। পরেশ- 
বাবুর পরিবার নববিধানভূক্ত হইতে পারে না, উহা স্পষ্ট । স্থৃতরাং 
কেশববাবুর বত শুনিবার সময়ে বরদান্থন্দরীর পক্ষে বিনয়কে দেখা 
' সন্তব হইতে পারে শুধু ব্রাহ্মদমাজ বিভক্ত হইবার আগে । আর এক 
জায়গায় এও আছে যে, পরেশবাবুদের ঘরে একদিকে যীশুর ছবি ও 
অন্যদিকে কেশববাবুর ছবি । তিনি হিন্দ্রমতে মেয়ের বিবাহ দিবার পর 
বরদাস্থুন্দরী নিশ্চয়ই কেশববাবুর ছবি ঘরে রাখিতেন না। স্থতরাং 
“গোরা*র প্রারস্ত ১৮৭৮ সনের আগে হওয়া উচিত। 

তখন গোরার বয়স হইবে একুশ বৎসর, কারণ তাহার জন্ম মিউটিনির 
প্রথম দিকে, অর্থাৎ ১৮৫৭ সনে । বিনয়ের বয়সও সমান বলিতে হয়। 
তাহাদের যে আচরণ ও কার্যকলাপ উপন্যাসে দেখানো হইয়াছে গোরা 
ব৷ বিনয়ের পক্ষে একুশ বৎসর বয়সে তাহ অসম্ভব নয়, তবে বয়স যেন 
একটু কম-_-২৪।২৫ হইলে ভাল হইত মনে হয়। ইহা ছাড়া অন্য 
মুশকিলও আছে। 

(২) সতীশ একদিন বিনয়ের সম্মুখে বলিল, “মাসিমা, জান ? 
রাশিয়ানরা ভারতবর্ষ আক্রমণ করতে আসছে । ভারি মজা হবে।” 

বিনয় জিজ্ঞীসা করিল, "সুমি কার দলে ?” 

সতীশ কহিল, “আমি রাশিয়ানদের দলে ।” 


২১৮ বাঙালী জীবনে রমণী 


বিনয় কহিল, “তাহলে রাশিয়ানদের আর ভাবনা! নাই ।% 

ভারতবর্ষের উপর রুশ আক্রমণের সম্ভাবনা, কবেকার কথা ? 
১৮৭৮ সনের শেষে আফগানিস্থানের সহিত ব্রিটিশ গভর্ণমেণ্টের যুদ্ধ 
আরম্ত হয়__উহ! দ্বিতীয় আফগান যুদ্ধ। এই যুদ্ধ রুশ প্রভাব বিস্তার 
উপলক্ষেই হইয়াছিল, স্থতরাং এটাকে রুশ আক্রমণের সম্ভাবন। বলিয়া 
ধরা একেবারে অমূলক নয়। কিন্তু আসলে তখন রুশিয়ার দ্বারা 
ভারতবর্ষ আক্রমণের কথা উঠে নাই, এই কথা উঠিয়াছিল ১৮৮৪ সনের 
শেষে পেঞ্জদে দখলের পর। রবীন্দ্রনাথের বয়সও তখন তেইশ বগুসর, 
তাই এই ঘটনাটার কথা মনে করিয়াই সতীশের মুখে উক্তিটা 
বসাইয়াছিলেন এটা অনুমান করা বাইতে পারে। ১৮৭৮ সনে 
রবান্দ্রনাথের বয়স সতেরো স্থতরাং আগেকার ব্যাপারটা এত প্রবলভাবে 
অনুভব ন! করিয়া থাকিতে পারেন । কিন্তু ১৮৮৪ সন ধরিলে গোরা ও 
বিনয়ের বয়স সাতাশ হইয়া ঘায়-_-উহা৷ একটু বেশী। আর কেশববাবুর 
সহিত সঙ্গতি তো হয়ই না। 

(৩) 'গোরার কাল সন্ধন্ধে আর একটা ইঙ্গিত যে আছে, সা 
আরও গোলমেলে । ব্রাঙ্মমতে বিবাহ করিতে বিনয়ের যেসব আপত্তি 
ছিল তাহার মধ্যে একটা এই,-“কিছুকাঁল হইল সিভিল বিবাহের আইন 
পাস হইয়া গেছে । সেসময়ে গোরা ও বিনয় কাগজে ওই আইনের 
বিরুদ্ধে তীব্রভাবে আলোচনা করিয়াছে । আজ সেই সিভিল বিবাহ 
স্বীকার করিয়৷ বিনয় নিজেকে “হিন্দু নয়” বলিয়া ঘোষণা করিবে, এও তো 
বড় শক্ত কথা ।” এই আইন ১৮৭২ সনের তিন আইন (4০111 
91872) তখন গোরার বয়স পনেরো । স্বতরাং গোরা ও 
বিনয়ের পক্ষে কাগজে এই বিষয়ে লেখা সম্ভব নয়। তবে ১৮৭৮ সনে 
কুচবিহাঁর বিবাহ উপলক্ষে এই আইনের আলোচনা আবার উঠিয়াছিল। 
রবীন্দ্রনাথের মনে দুইটা আলোচনা মিশিয়। গিয়। থাকিতে পারে । 

এই প্রসঙ্গে এ কথাটাও মনে রাখ৷ দরকার যে, রবীন্দ্রনাথ ১৮৭৮ 
সনের মাঝামাঝি হইতে ১৮৮০ সনের ফেব্রুয়ারী পর্যস্ত কলিকাতায় 


বাঙালীর মন ও ভালবাঁসা ২১৯ 


ছিলেন না, আইন পড়িবার জন্য বিলাত গিয়াছিলেন। সুতরাং সাধারণ 
ও নববিধানের ঝগড়ার কথা তিনি ফিরিয়া আসিয়! শুনিয়া থাকিবেন, 
এবং সেজন্য ঘটনাগুলির কালক্রম সম্বন্ধে তাহার ধারণা একটু অস্পষ্ট 
হইয়া! থাকিতে পারে। 

মোটের উপর বিশেষ উক্তি বা ঘটনার কথা ন! ভাবিয়। যদি 'গোরা'র 
কালকে ১৮৮০ হইতে ১৮৮২ সনের মধ্যে দেখা যায়, তাহা হইলে 
চিন্তাভাবনা, তর্কবিতর্ক, সমস্যা, ও সমাজের সংঘাত-__সকলের সঙ্গেই 
খাপ খায়। 

এই যুগটা বাংলার হিন্দুসমাজের মধ্যে একটা আভ্যন্তরীণ 
সংঘাতের কাল। এই সংঘাতে একদিকে ব্রাহ্ম ও ব্রাহ্গপন্থী হিন্দু, 
অন্যদিকে রক্ষণশীল হিন্দু। এই হিন্দুরা কিন্তু গতানুগতিক পুরাতন 
পন্থা অবলম্বনকারী হিন্দু নন। ইহারা নব্য হিন্দু, ব্রাহ্ম আন্দোলনের 
আবির্ভাবে যে হিন্দু কাউণ্টার-রিফর্সেশন আসিয়াছিল সেই পথের 
হিন্দু। স্থৃতরাং দুই দিকেই একটা করিয়া স্পষ্ট থিওরি ছিল। পরেশ- 
বাবু নৃতন ব্রাঙ্মমতের প্রতিনিধি (ব্রাহ্ম সমাজের নন ), গোরা নূতন 
হিন্দুমতের প্রতিনিধি, কিন্তু পুরাতন হিন্দু সমাজের নয়। এই ছুই 
উপলব্ধিই গল্পট!র কাঠামো জুটাইয়াছে। 

কিন্তু 'গোরা*র প্রকৃত বিষয় বুঝিতে হইলে এই দুইটি উপলব্ধির 
মধ্যে যে দ্বন্দ্ব ছিল তাহার প্রকৃতিও বিশ্লেষণ করা দরকার। নব্য 
হিন্দুত্বের মধ্যে একটা অত্যন্ত ছেলেমানুষি দিক ছিল। উহাকে 
একেবারে বুজরুকি বলা যাইতে পারে। এই হিন্দুত্ব টিকি রাখার ও 
একাদশী পালনের বৈজ্ঞানিক যুক্তি বাহির করিয়াছিল। এই দলের 
নেতা ছিলেন শশধর তর্কচূড়ামণি, এবং উকীল ছিলেন তীহারা ধাহাদের 
রবীন্দ্রনাথ হিং টিং ছট, কবিতা লিখিয়া ব্যঙ্গ করিয়াছিলেন। অবিনাশের 
হিন্দুত্ব অনেকট! সেই পর্যায়ের । এই হিন্দুত্ব শুধু ধর্মের ব্যাপার 
কখনই ছিল না। নৃতন হিন্দুত্ব সব স্তরেই ইংরেজ-বিরোধী জাতীয়তা- 
বাদের সহিত জড়িত হইয়া গিয়াছিল। তাই অবিনাশ বলিয়াছিল, 


২২, বাঙালী জীবনে রমণী 


“পৃথিবীতে কেবল আমাদের দেশের ষড়খতু আছে, আমাদের দেশেই 
কালে কালে অবতার জন্মেছেন এবং আরও জন্মাবেন,। ” 

শশধর তর্কচুড়ামণির জাতীয় ধর্ম প্রচার আরও উগ্র ছিল। তিনি 
বক্তৃতা করিতে গিয়া হিন্দুর ভগবানের সহিত খুষ্টানের ভগবানের 
পার্থক্য বুঝাইবার জন্য তারস্বরে শ্রোতাদের জিজ্ঞাসা করিতেন, 
“খুম্টানের ভগবানের কি নাম, আপনারা বলুন ৷” 

শ্রোতারা চীগুকার করিত, _-“00)])” 

তর্কচুড়ামণি বলিতেন, “উহা! উল্টান্‌।” 

শ্রোতারা বলিত, “[)033.% 

শশধর বলিতেন, “তবে! এইবার আমাদের ভগবানের নাম 
বলুন।” পূর্বে শিক্ষাপ্রাপ্ত দুচারজন শ্রোতা বলিতেন,_“নন্দনন্দন !” 

শশধর বলিতেন, “আবার উপ্টান। কি হইল ?” 

চতুদিক কীপাইয়া ধবনি উঠিত, “নন্দনন্দন 1” 

শশধর আবার বলিতেন, “তবে !” 

হিন্দুধর্মের শেস্টত্ব নিঃসংশয়ে প্রমাণ হইয়৷ যাইত। 

গোরার নব্য হিন্দুত্ব এই পর্যায়ের হিন্দুত্ব নয়, কিন্তু উহাও জাতীয়তা- 
বোধের উপর প্রতিষ্ঠিত, ধর্ম বোধের উপর নয়। জত্যকার ধর্মবোধ 
গোরার ছিল না। হিন্দুধর্মের উপর গোরার যে শ্রদ্ধা উহা! জাতীয় 
ধারার উপর শ্রদ্ধা। এই শ্রদ্ধা হইতে ব্রাঙ্মমতের উপর তাহার ষে 
বিদ্বেষ দেখা দিল, উহা জাতিকে রক্ষা করিবার ইচ্ছা হইতে প্রসূৃত। 
পাশ্চাত্য সংঘাত, পাশ্চাত্য অবশ্ঞ। হইতে জাতিকে রক্ষা! করিতে হইলে 
আগে হিন্দু সমাজকে রক্ষা করিবে ইহাই গোরার প্রথম কথা । এই 
সমাজকে রক্ষা করিতে হইলে, উহার যে-সব প্রথা বা বিশ্বাসকে 
খারাপ বলা হইত তাহারও জমর্থন করিতে হইবে, ইহাই দড়াইল 
গোরার যুক্তি। বইটার সর্বত্র এইটা একেবারে স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা 
করা হইয়াছে। আমি ছুইটি মাত্র উক্তি উদ্ধৃত করিব। সে হারাণ- 
বাবুকে বলিতেছে_ 


বাঙালীর মন ও ভালবাসা ২২১ 
“আপনি যাকে কুপ্রথ বলছেন সে কেবল ইংরেজি বই মুখস্থ করে বলছেন ; 
নিজে ও-স্বন্ধে কিছু জানেন না। ইংরেজের সমস্ত কুপ্রথাকেও যখন 
আপনি ঠিক এমনি করেই অবজ্ঞা করতে পারবেন তখন এ সম্বন্ধে কথা 
কবেন।” 
আর একটা উক্তি পরের ঘটন! সম্বন্ধে । বিনয় আসিয়া ললিতার 

সহিত তাহার হিন্দুমতে বিবাহ সম্বন্ধে পরেশবাবুর সম্মতি আনিয়া 

যখন বলিল, “পরেশবাবু তার দিক থেকে যেমন সম্মতি দিয়েছেন, 

তেমনি তোমার দিক থেকেও, গোরা, তোমাকে সম্মতি ধিতে হবে।” 

তখন গোর! উত্তর দিল, 
পিরেশবাবু সন্মতি দিতে পারেন, কেন-না নদীর যে-ধারা কুল ভাঙছে 
সেই ধারাই তাঁদের । আমি সন্দতি দিতে পারি নে, কেন-না আমাদের 
ধারা কৃলকে রক্ষা করে। আমাদের এই কুলে কত শতসহত্র 'বৎসরের 
অন্রভেদী কীর্তি রয়েছে, আমরা কোঁনোমতেই বলতে পারব না, এখানে 
প্রকৃতির নিয়মই কাজ করতে থাঁক। আমাদের কুলকে আমরা পাথর 
দিয়েই বাঁধিয়ে রাখব--তাতে আমাদের নিন্দাই কর আর যাঁই কর ।” 
আরও পরে সে পরেশবাবুকে বলিল, 


“আমার কথাটা! এই যে, আগে সমাজকে সব দিক থেকে সম্পূর্ণ মেনে 
চললে তবেই সমাজের যথার্থ উদ্দেশ্য সম্বন্ধে আমাদের চেতনা নির্মল হতে 
পাঁরে। তাঁর সঙ্গে বিরোধ করলে তাঁকে যে কেবল বাঁধা দিই তা নয়, 


তাকে তুল বুঝি 1” 


স্থতরাং যদি হিন্দুসমাজ অচলায়তনও হয়, তাহা হইলে জাতীয়তা- 
বোধ, হ্যাশনালিজম্‌, এবং পেটিয়টিজম্এর খাতিরে, উহার মধ্যেই 
থাকিতে হইবে, ভাঙিয়া বাহির হইবার অধিকার নাই, ইহাই হইল 
গোরার নিজের কথা। 

উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে বাঙালী জাতির মানসিক জীবনে 
নব্য হিন্দুত্বের ছুইটা ধারার মধ্যে, অর্থাৎ রক্ষণশীল ও উদারনৈতিক 
হিন্দুত্বের মধ্যে, যে সংঘাত চলিতেছিল, “গোরা” উপন্যাসে তাহার 


২২২ বাঙালী জীবনে রমণী 


একেবারে খাঁটি বিবরণ আছে। কিন্ত্ব উপন্যাসটিতে দুই পশ্থারই 
উচ্চতম রূপ দেখানো হইয়াছে । গোরার কথা ও কার্যকলাপের মধ্যে 
যাহা পাই তাহা রক্ষণশীল হিন্দুত্বের উচ্চতম আদর্শ আবার 
পরেশবাবুর মধ্যে যাহা পাই তাহা ব্রাহ্ম পন্থার উচ্চতম আদর্শ । এই 
বইটিতেই একদিকে অবিনাশ ও অন্যদিকে হারাণবাবুর মধ্যে দুই 
ধারারই সঙ্কীর্ণতম রূপ দেখানো হইয়াছে । স্তরাং আমাদের মানসিক 
জীবনের ইতিহাস লিখিবার একটা উপাদান এই উপন্যাসে পাওয়া 
যায়। এই দিক হইতে “সোস€বুক' হিসাবে গোরা" মূল্য খুবই বেশী । 

কিন্তু ইতিহাসের উপকরণ হিসাবে একটা উপন্যাসের মূল্য যতই 
হউক না কেন, উহা! সাহিত্যবিচারের দিক হইতে যথেষ্ট হওয়া দুরে 
থাকুক, প্রাসঙ্গিকও নয়। উপন্যাঁসকে উপন্যাস হিসাবে উত্রাইতে 
হইবে। “গোরা” উপন্যাস উত্রাইয়াছে কি? যতদিন আমি মনে 
করিতাম যে গোরার পন্থা! ও পরেশবাবুর পন্থার মধ্যে দন্ব, ও অবশেষে 
অন্তনিহিত শ্রেষ্ঠত্বের জন্য পরেশবাবুর পন্থার জয়_এই দুইটি ব্যাপারই 
“গোরা” উপন্যাসের বিষয়, ততদিন আমি বইটাকে উপন্যাস হিসাবে 
বড় বলি নাই-___বরঞ্চ বলিয়াছি যে, এটা একটা ব্যর্থ প্রয়াস। 

বহু বাঙালী পাঠক এটাই “গোরা” উপন্যাসের বিষয় মানিয়া লইয়া 
বা বিশ্বাস করিয়া বইটাকে অতি উৎকৃষ্ট সাহিত্যস্থষ্টি মনে করেন। 
জীবনকে ছাড়িয়া তত্বকে ধরিবার যে একটা স্বাভাবিক ঝৌক আমাদের 
আছে, ইহা তাহার ফল। সেজন্য আমি এইদিক হইতে বইটাকে 
কেন অসার্থক বলি তাহার একটু পরিচয়.দেওয়া দরকার। 

ছুই আদর্শ, ছুই ধর্ম বা ছুই মতবাদের সংঘাত এবং এ ছুই-এর 
একটির জয় যর্দি উপন্যাসে গ্রাহ্া করিতে হয়, তাহা হইলে দেখাইতে 
হইবে যে, লেখক যাহাকে উচ্চতর পন্থা মনে করেন তাহার জয় স্বাভাবিক 
ভাবে হইয়াছে, অর্থাৎ যে নায়ক বিরোধী পন্থার সহিত যুদ্ধ করিতেছে 
সে পরে নিজের অনুভূতি এবং যুক্তি দিয়াই অপর পক্ষের শ্রেষ্ঠত্ব 
বুঝিতে পারিয়া পরাজয় স্বীকার করিয়াছে । “গোরা” উপন্যাসে অবশ্য 


বাঙালীর মন ও ভালবাগা ২২৩ 


নায়ক শেষ পর্যন্ত পরেশবাবুর কাছেই আসিয়াছে, তাহার শ্রেষ্ঠত্ব মানিয়া 
লইয়া তাহাকেই গুরু বলিয়৷ মানিয়া লইয়াছে। কিন্তু তাহার এই সব 
পরিবত'ন অনিবার্ষ মানসিক কারণে হয় নাই। 

হইয়াছে একটা সম্পূর্ণ বাহিক কারণে গোরা হিন্দু নয় বলিয়া, 
গোরা আইরিশ পিতামাতার সন্তান বলিয়া, হিন্দুসমাজে আর তাহার 
স্বান নাই বলিয়া। ইহা গোরার আগেকার হিন্দুত্বের পরাজয় মোটেই 
নয়। কারণ গোরা কখনই বলে নাই যে, হিন্দুর ধর্ম সকলের ধর্ম। 
একমাত্র হিন্দুর কাছেই হিন্দুপন্থা। শ্রেষ্ঠ, ইহাই সে বলিয়াছে। স্ৃতরাং 
অহিন্দু বলিয়া প্রমাণিত হওয়া মাত্র যদি সে পরেশবাবুর কাছে গিয়া 
থাকে, তাহা হইলে সেটা হইয়াছে অবস্থার চাঁপে, নিজের অনুভূতির বা 
যুক্তির জোরে নয়। এইভাবে সঙ্কটের সমাধানকে প্রাচীন সাহিত্য- 
সমালোচকেরা [)০৮$ 6ম. 072,011 বলিতেন। স্বতরাং -এই কথা 
বলিতে পারি, যে উপায়ের দ্বারা গোরাকে রবীন্দ্রনাথ পরেশবাবুর কাছে 
হার মানাইয়াছেন, উহা গৌজামিল। গল্প বা নাটকের সঙ্কটমোচন যখন 
গৌজামিলের দ্বারা হয়, তখন তাহাকে বড় সাহিত্ ট্রি বল! চলে না। 
তাই আমিও হিন্দু রক্ষণশীলতা ও হিন্দুর উদীরতার দ্বন্দ সম্পকিত 
উপন্যাস হিসাবে “গোঁরা”কে বড় কিছু মনে করি নাই। 

এই ধারণা আমার বন্ছদিন ছিল। কিন্তু বসর কয়েক আগে আমি 
আবার পরিণত বয়সে “গোরা” পড়িতে আরম্ত করি । এর পর আজ 
পর্যন্ত প্রায় বার পঞ্চাশেক পড়িয়াছি। এই পড়ার ফলে আমার ধারণা 
জন্মিয়াছে যে, 'গোরা*র বিষয়বস্ত্র সম্পূর্ণ অন্য, অর্থাৎ হিন্দু রক্ষণশীলতা 
ও হিন্দু উদারতার সংঘাত নয়, আর একটা ব্যাপার । আসলে 'গোরা”র 
বিষয়বস্তর দেশপ্রেমের সহিত নারীর প্রতি প্রেমের সংঘাত। অর্থাৎ 
“গোরা” একটা প্রেমের গল্প । ধর্মগত সংঘাত উহার কাঠামো মাত্র । 

যে পাশ্চাত্য প্রভাব ধর্মগত সংঘর্ষের পিছনে, দেশপ্রেম এবং প্রেমের 
সংঘর্ষের পিছনেও সেই ইউরোপীয় প্রভাবই ছিল, কারণ দেশপ্রেম ও 
নারী-সম্পকিত প্রেম দুইট৷ বিষয়ই বাডালী ইউরোপীয় সভ্যতা হইতেই 


২২৪ বাঙালী জীবনে রমণী 


গ্রহণ করিয়াছিল। সংঘাতটা কেন ঘটিল, তাহা বুঝাইবার চেষ্টা 
করিব। 

সনাতন হিন্দু ধর্ম (অর্থাৎ সমগ্র হিন্দু পন্থা ) সম্বন্ধে গোরার যে 
শ্রদ্ধা, নিষ্ঠা এবং ভক্তি দেখা যায়, তাহ! যে তাহার দেশপ্রেমের ফল 
এ বিষয়ে সন্দেহ নাই। সে-যুগের বাডালী যখন দেশপ্রেম তীব্রভাবে 
অনুভব করিত তখন সে হিন্দুধারার প্রতিও শ্রদ্ধাবান হইত, হিন্দুপন্থাই 
ধরিত। বঙ্কিমচন্দ্র ও বিবেকানন্দের মধ্যে এই যোগাযোগের সর্বোচ্চ 
রূপ দেখা গিয়াছিল। সাধারণ বাঙালীর মধ্যেও উহা! দেখা যাইত। 
পক্ষান্তরে এটাও দেখা গিয়াছিল যে, ব্রাহ্মরা হিন্দুর সনাতন ধর্ম ছাড়ার 
ফলে দেশের প্রতি ভালবাসাও এত তীব্রভাবে অনুভব করেন নাই, 
তাহারা ইংরেজের জীবনযাত্রাকে উচ্চতর বলিয়। মানিতেন। ইহাকে যদি 
বিশ্বজনীনতা বলা যায়, তাহা হইলে দেশপ্রেমের সহিত বিশ্বজনীনতার 
একটা বিরোধ আছে বলিতে হইবে । নব্য হিন্দু ও ব্রাহ্মদের আচরণ ও 
মতামতের মধ্যে এই বিরোধ কার্ধক্ষেত্রেও দেখা গিয়াছিল। ব্রাহ্মরা 
হিন্দুসমাজকে অচলায়তনই বলুন কিংবা আর যা কিছুই বলুন না কেন, 
দেশপ্রেমিক নব্য হিন্দু মনে করিত এই অচলায়তন হইতে বাহির হইবার 
অধিকার তাহার নাই; যদ্দি অচলায়তনের কোন জিনিস তাহার কাছে 
অবাঞ্ছনীয় মনে হয়, তবে শুধু উহা! সরাইয়া অচলায়তনকে নির্মল করিতে 
হইবে ; যে-জিনিস একেবারে বাহিরের তাহাকে এই অচলায়তনের মধ্যে 
আনা যাইবে না। 

এই বিশ্বাসের জন্য নব্য হিন্দুরা মনে করিতে বাধ্য হইয়াছিল যে, 
তাহাদের নূতন অচলায়তনেও ইউরোপীয় রোমান্টিক প্রেমের স্থান নাই। 
ইহাও তখন পাশ্চাত্য জগৎ হইতে এদেশে দেখা দিয়াছিল। আশ্চধের 
বিষয় এই যে, নব্য হিন্দু বঙ্কিমচন্দ্র নরনারীর সম্পর্কের এই নূতন অনু- 
ভূতিরও প্রবর্তনকর্তা। তিনিই বাঙালী জীবনে রোমান্টিক প্রেমের 
জোয়ার প্রথমে আনিয়াছিলেন। কিন্তু তাহার লেখার মধ্যে নব্য হিন্দুত্ 
ও রোমান্টিক প্রেমের বিরোধের কোনও পরিচয় পাওয়া যায় না। তবে 


বাঙালীর মন ও ভালবাসা ২২৫ 


সাধারণ বাঙালীর মনে একটা ধারণ! ছিল যে রোমার্টিক প্রেমটা খুব 
কাম্য ব্যাপার নয়। 

উপন্যাস সম্বন্ধে নীতিবাদীদের যে একটা বিরূপ ভাব ছিল, উহা 
আসিয়াছিল এই অনুভূতি হইতেই। প্রভাত মুখোপাধ্যায়ের একটি 
হাস্তরসাত্মক গল্প আছে, তাহাতে এই মনোভাব ফুটিয়৷ উঠিয়াছে। 
এই গল্লে বৃদ্ধ রায়বাহাদুরকে বস্কিমচন্দ্রের সহপাঠী বলিয়া দেখানো 
হইয়াছে। রায়বাহাদুর বলিলেন, “বস্কিমকে বলতুম দেশের ভালর জন্যে 
কিছু লেখো, না তার বই-এ খালি ল আর লড়াই ।” (শ্মৃতি হইতে 
উদ্ধত করিলাম, কারণ বইটা কোথায় হারাইয়া গিয়াছে ; তবে তাৎপর্য 
ঠিক আছে 

বন্কিমচন্দ্রের প্রেমের গল্প যে রক্ষণশীল বাঙালী ভাল চোখে দেখে 
নাই, তাহার এতিহাসিক প্রমাণও আছে। কবি নবীন সেন পর্যস্ত 
বঙ্কিমচন্দ্রের কাছে এই অভিযোগ করেন যে, প্রেমের অবাধ প্রচারের 
দ্বারা তিনি দেশের অহিত করিয়াছেন; অর্থাৎ “বিদ্য।স্থন্দর' দ্বার যে 
অহিত হয় নাই, কপালকুগুলা, বিষবুক্ষ, রজনী ইত্যাদির দ্বারা সেই অহিত 
হইয়াছিল। 

পাশ্চাত্য রোমান্টিক প্রেমের প্রতি গোরার আপত্তি এত স্থুল না 
হইলেও তেমনই স্পষ্ট এবং উগ্র। বিনয়কে পরেশবাবুর বাড়ির দিকে 
আকৃষ্ট হইতে দেখিয়া এই কারণেই সে বন্ধুকে সাবধান করিয়া দিয়াছিল। 
তাহার উক্তি উদ্ধত করিব । ্‌ 
“বিনয় । দেখো, গোরা, আমি স্ত্রীজাতিতে ভক্তি করে থাকি-__আমাদের 
শাস্েও-. 
গোরা । স্্বীজাঁতিকে যে ভাবে ভক্তি করছ তার জন্তে শাস্ত্রের দোহাই 
পেড়ো না । ওকে ভক্তি বলে না, যা বলে তা যদি মুখে আনি মারতে 
আসবে। 
বিনয়। এ তুমি গায়ের জোরে বলছ। 
গোরা । শাস্ত্রে মেয়েদের বলেন, পুজার্থা৷ গৃহদীপ্য়ঃ। তারা পুজার 
গৃহকে দীপ্চি দেন ব'লে, পুরুত্বমান্ছষের হৃদয়কে দীপ্ত করে তোলেন ব'লে 


৯ ৫ 


২২৬ বাঙালী জীবনে রমণী 


বিলিতি বিধানে তীদের যে মান দেওয়া হয় তাকে পুজা না বললেই 
ভালো হয়। 

বিনয়। কোঁনো কোনো স্থলে বিকৃতি দেখা যাঁয় বলে কি একটা বড়ো 
ভাবের উপর ওরকম কটাক্ষপাঁত কর উচিত? 

গোরা। বিন, এখন ঘখন তোমার বিচার করবার বুদ্ধি গেছে তখন 
আমার কথাটা মেনেই নাও--আমি বলছি, বিলিতিশাস্ত্রে স্ত্রীজাতি স্বন্ধে 
যে-সমস্ত অত্যুক্তি আছে তাঁর ভিতরকাঁর কথাটা হচ্ছে বাঁসন1। স্ত্রীজাতিকে 
পূজো করবার জায়গা হল মার ঘর, সতীলম্ষ্মী গৃহিণীর আঁসন-_সেখাঁন 
থেকে সরিয়ে এনে তাদের যেস্তব করা হয় তার মধ্যে অপমান লুকিয়ে 
আছে। পতঙ্গের মত তোমাঁর মনটা যে-কাঁরণে পরেশবাঁবুর বাঁড়ির 
চারিদিকে ঘুরছে, ইংরিজিতে তাঁকে বলে থাকে “লাভ'-_কিন্তু ইংরেজের 
নকল ক'রে ওই “লাভ” ব্যাপারটাকেই সংসারের মধ্যে একটা চরম পুরুষার্থ 
বলে উপাঁসন! করতে হবে, এমন বাদ্রাঁমি যেন তোমাকে পেয়ে না বসে!” 


দেশপ্রেমিক নব্য হিন্দুর রোমান্টিক প্রেমের প্রতি বিমুখতা এর চেয়ে 
স্পষ্ট করিয়া প্রকাশ কর! যাইত না। যতদিন বিনয়ের বিবাহ না হইল, 
ততদিন গোরা এই আপণ্ডি বজায় রাখিয়াছিল। প্রেমের জন্য হিন্দু 
সমাজকে ত্যাগ, এই ব্যাপারটা গোরার কাছে আরও বড় অপরাধ বলিয়া 
মনে হইয়াছিল । তাই সে নিজে বিনয়ের বিবাহে বন্ধুভাবেও যোগ দেয় 
নাই, মাকেও বিবাহে যোগ দেওয়৷ হইতে নিবৃণ্ত করিবার চেষ্টা করিয়া- 
ছিল, পরে বিনয়ের সহিত সম্পর্ক ত্যাগ করিয়াছিল । 

জেলখাঁন! হইতে ফিরিয়া--তখনও বিনয়ের বিবাহ একেবারে স্থির 
হইয়া যায় নাই-_গোরা এই কথা বলিয়াছিল,_ 

'ত্রাঙ্গ মেয়েকে বিয়ে করে তুমি দেশের সর্বসাধারণের সঙ্গে নিজেকে যে 

পৃথক করে ফেলতে চাও সেইটেই আমার কাছে অত্যন্ত বেদনার বিষয় । 

এ কাজ তুমি পার, আমি কিছুতেই পারি নে-_এইখানেই তোমাতে আমাতে 

প্রভেদ, জ্ঞানে নয়, বুদ্ধিতে নয় । আমার প্রেম ঘেখানে তোমার প্রেম 

সেখানে নেই। তুমি যেখানে ছুরি মেরে নিজেকে মুক্ত করতে চাঁ্ছ 

সেখানে তোমার দরদ কিছুই নেই। আমার সেখানে নাড়ীর টান ।” 


বাঙালীর মন ও ভালবাসা ২২৭ 


এই তর্কের পর গোরার মনে একটা প্রবল অবসাদ আসিল। সে 
নিজেকে প্রশ্ন করিতে লাগিল, 

“হায়, আমার দেশ কোঁথীয়। দেশ কি কেবল আমার একলার কাঁছে। 

আমার জীবনের সমস্ত সংকল্প যাহার সঙ্গে আলোচন! করিলাম সেই আমার 

আশৈশবের বন্ধু আজ এতদিন পরে কেবল একজন ক্ত্রীলৌককে বিবাহ 

করিবাঁর উপলক্ষে তাহার দেশের সমস্ত অতীত ও ভবিষ্ততের সঙ্গে এক 

মুহূর্তে এমন নির্শশমভাবে পৃথক হইতে প্রস্তুত হইল ।” 

“কেবল একজন স্ত্রীলোক!” গোর! কি 'ভিতা নুয়োভা” বা “দিভিনা 
কম্মেদিয়া” পড়ে নাই? 

গোরার আপত্তির উত্তর বিনয় এক নূতন তাষাতে দিয়াছিল। 
প্রথম দিন গোরার ব্যঙ্গের পর নে অবশ্য কষাহত তাজা! ঘোড়ার মত 
লাফাইয়া উঠিয়াছিল, কিন্তু ললিতাকে পূর্ণভাবে ভালবাসিবার পর তাহার 
আর কোনও সক্কোচ ছিল না, প্রেমের মহিমা এবং মুল্য যে কি তাহা 
নিজের বিবাহের দিনে স্পষ্ট ভাষায় গোরাকে বলিতে সে দ্বিধা করে 
নাই। তাহার উক্তি এই; 

“গোরা, আমি তোমাঁকে নিশ্চয় বলিতেছি, মান্ষের সমস্ত প্রকৃতিকে এক 

মুহূর্তে জাগ্রত করিবার উপাঁয় এই প্রেম যে কারণেই হউক আমাদের 

মধ্যে এই প্রেমের আবির্ভাব দুর্বল, সেইজন্তই আমরা প্রত্যেকেই আমাদের 

সম্পূর্ণ উপলব্ধি হইতে বঞ্চিত, আমাঁদের কী আছে তাহা! আমরা জানি না, 

যাহা গোপনে আছে তাহাকে প্রকাশ করিতে পাঁরিতেছি না, যাঁহ। সঞ্চিত 

আছে তাহাকে ব্যয় করা আমাদের অসাধ্য; সেইজন্তই চারিদিকে এমন 

নিরাঁনন্দ, এমন নিরানন্দ ।” 

কিন্তু ততদিনে গোরার নিজের মনেও সন্দেহ এবং প্রশ্ম জাগিয়াছিল। 
তাই বিনয় যখন বলিল, “কোনো কোনো মাহেন্দ্রক্ষণে নরনারীর প্রেমকে 
আশ্রয় করিয়া একটি অনির্বৰচনীয় অসামান্যতা উদ্ভাসিত হইয়া উঠে”, 
তখন গোর! পূর্বের হ্যায় সে কথাকে হাসিয়া উড়াইয়! দিতে পারিল 
না। গোরা মনে মনে স্বীকার করিল, “তাহা সামান্য মিলন নহে, 
তাহা পরিপূর্ণতা, তাহার সংশ্রবে সকল জিনিসেরই মূল্য বাড়িয়া 


২২৮ বাঙালী জীবনে রমণী 


যায়; তাহা কল্পনাকে দেহদান করে ও দেহকে প্রাণে পুর্ণ করিয়া 
তোলে ।” 

প্রেমের মহিমার এই স্বীকৃতিই “গোরা' বইটার “ক্লাইমেক্স্ঠ, শেষে 
গোর! ও স্থচরিতার মিলন নয়। কিন্তু তখনও গোরার আত্মসমর্পণ 
করিবার কোনও আগ্রহ ছিল না। প্রেমের মহিমা স্বীকার করিয়াও 
হিন্দুত্বের জন্য উহাকে ত্যাগ করিতে হইবে, এই সংকল্প তাহার একেবারে 
শেষ ঘটনার আগেও টলে নাই । 

নিজের সহিত নিজের এই যে যুদ্ধ গোরা চালাইয়াছিল, সেটাকেই 
“গোরা' উপন্যাসের প্রধান বিষয়বস্তু বলা চলে । যদি শেষের 1)০85 
৪৮. 12920171172, না আসিত তাহা হইলে এই দ্বন্দের পরিণাম হইত 
একটা ট্র্যাজেডি । দন্্টার ধাপগুলির হিসাব লওয়া দরকার । 

গোরা যেদিন বুঝিতে পারিল যে, স্ুচরিতার প্রতি তাহার মন 
আকৃষ্ট হইয়াছে,.সেই দ্রিনই সে নিজের মনকে একটা প্রচণ্ড আঘাত 
করিয়া বলিল, “না, এসব কিছু নয়; এ কোনোমতেই চলিবে না।৮ 
তার পর সে লক্ষ্হীনভাবে বাংলা দেশের মফ£ম্বলে ভ্রমণ করিবার জন্য 
বাহির হইয়াছিল। ইহার পর যে তাহার জেল হইয়াছিল সে ঘটনা 
সকলেরই জানা । কিন্ত কারাগার হইতে বাহির হইয়াও স্ুচরিতা সম্বন্ধে 
তাহার কৌতৃহল বা আগ্রহ কিছুই কমিল না। বরঞ্চ সে কিছুদিন পর পর 
স্থচরিতার বাড়ী যাইতে লাগিল। 

এইখানে গোরার কাছে স্ুচরিতার আকর্ষণ কি তাহ! বোঝানে৷ 
আবশ্যক । আমি ইতিপূর্বে “দষ্টিদান' গল্পের আলোচনা প্রসঙ্গে বলিয়াছি 
যে, প্রেমের একটা বড় উপাদান দেহানুভতি, অর্থাৎ দেহবজিত প্রেম 
নাই। গোরার বেলাতেও ঠিক তাহাই দেখিতে পাই। গোরা অবশ্য 
স্থচরিতার মানসিক সৌন্দর্যের পরিচয় পাইয়া আকৃষ্ট হইয়াছিল, কিন্তু 
এই অনুভূতির সহিত প্রথম হইতেই স্চরিতার দেহের অনুভূতিও 
একেবারে জড়াইয়! গিয়াছিল। যেদিন প্রথম গোর! বুঝিতে পারিল যে, 
সুচরিতার প্রতি তাহার মন আকৃষ্ট সেইদিন হইতেই স্তুচরিতার দেহের 


বাঙালীর মন ও ভালবাসা ২২৯ 


অনুভূতিও অন্য আকর্ষণের সহিত একেবারে অঙ্গাঙ্গীভাবে মিশিয়া 
গিয়াছিল। ছুই-চারিটি উদাহরণ দিতেছি__ 


(১) “মুখের ভৌলটি কি সুকুমার । ভ্রয্গলের উপর ললাটটি যেন 
শরতের আকাশখণ্ডের মত নির্মল ও শ্বচ্ছ।” 
(২) “নবীনা রমণীর বেশভৃষার প্রতি গোঁরা পূর্বে কোনোদিন ভালো 
করিয়া চাহিয়া দেখে নাই এবং ন! দেখিয়াই সে-সমন্তের প্রতি তাহার একটা 
ধিক্কার ভাঁব ছিল-_আজ সুচরিতার দেহে তাহার নৃতন ধরণের শাড়ি পরার 
ভঙ্গী তাহাঁর একটু বিশেষভাবে ভালো লাগিল। সুচরিতার হাত টেবিলের 
উপর ছিল, তাঁহার জামার আস্তিনের কুঞ্চিত প্রীস্ত হইতে সেই হাতখানি 
আজ গোরাঁর চোঁখে কোমল হৃদয়ের একটি কল্যাণপূর্ণ বাণীর মতো 
বৌধ হইল।” 
(৩) “গোরার কানে শুচরিতাঁর মৃছু কর্ঠের এই প্রশ্ন বড়ে৷ মধুর লাঁগিল। 
সুচরিতার বড়ো বড়ো দুইটি চোখের মধ্যে এই প্রশ্নটি আরও মধুর করিয়। 
দেখা দিল।” 
(৪) “সংগ্রাম করিয়া ইহাকে কি পরাস্ত করিতে হইবে ?-_ এই বলিয়া 
গোরা মুষ্টি দৃঢ় করিয়া যখনই বদ্ধ করিল, অমনি বুদ্ধিতে উজ্জল, নত্রতায় 
কোমল, কোন্‌ দুইটি স্গিপ্ধ চক্ষুর জিজ্ঞানু দৃষ্টি তাহার মনের মধ্যে জাগিয়া 
উঠিল--কোন্‌ অনিন্যন্তন্দর হাতখানির আঙ্গুলগুলি স্পর্শসৌভাগ্যের 
অনাম্বা দিত অমৃত তাহার ধ্যানের সম্মুখে তুলিয়া ধরিল।” 
আশা করি স্থচরিতার সম্বন্ধে গোরার মনোভাবের পরিচয় হিসাবে 
এই যথেষ্ট হইবে । কিন্তু স্থচরিতার প্রতি আকর্ষণ তাহার যতই বাড়ুক, 
এই আকর্ষণ যে তার হিন্দু জীবনব্রতের বিরোধী এই জ্ঞান গোরা কখনই 
হারায় নাই। কিন্তু দুইএর সমন্বয়ের জন্য সে একটা আত্মপ্রবঞ্চনা 
আরম্ত করিল। সে আত্মপ্রবঞ্চনা এই-_মুচরিতাকে হিন্দুত্থে দীক্ষ। দিয়া 
শিষ্তা কর! । সচরিতাও তাহাদের দুইজনের প্রেমের এই রূপান্তর স্বীকার 
করিয়া শিব্যা হিসাবেই অনেকদূর অগ্রসর হুইয়া গেল। এই অবস্থায় 
গোরা সহজেই গুরু-শিত্য। সম্বন্ধের মধ্যে প্রণয়ী-প্রণয়িনীর সম্পর্ককে 
ছদ্মবেশে লুকাইয়। রাখিতে পারিত ৷ কিন্তু গোরার এইটুকু সত্যপরায়ণতা 


২৩০ বাঙালী জীবনে রমণী 


ছিল যে, সে এই সন্বন্ধও প্রায়শ্চিন্তের সঙ্গে সঙ্গে ছিন্ন করিতে উদ্ভত 
হইল। 

তবু একদিন প্রলুব্ধ হইয়া সে শেষবারের মত স্থচরিতার সহিত 
সাক্ষাৎ করিতে আসিল। কিন্তু আসিয়৷ দেখিল সে নাই। “গোরার 
একটি সংস্কার তাহার মনের মধ্য দৃঢ় হইয়াছিল যে তাহার জীবনের 
অধিকাংশ ঘটনাই আকন্বিক নহে, অথবা কেবলমাত্র তাহার নিজের 
বাক্তিগত ইচ্ছার দ্বার সাধিত হয় না। সে তাহার স্বদেশবিধাতার 
একটি কোনো অভিপ্রায় সিদ্ধ করিবার জন্যই জন্মগ্রহণ করিয়াছে ।” 

তাই শ্ুচরিতার বাড়ী গিয়া যখন গুনিল সে বাড়ী নাই, তখন 
তাহার মনে হইল, যিনি গোরাঁকে চালনা করিতেছেন তিনি নিষেধ 
জানাইলেন যে, এ জীবনে সুচরিতার দ্বার তাহার পক্ষে রুদ্ধ। তাই 
সে নিজেকে বলিল, 

“বিধাতা আসক্তির রূপটা আমার কাছে স্পষ্ট করিয়া দ্রেখাইয়! দিলেন) 

দেখাইলেন তাহা শুভ্র নহে, শীস্ত নহে, তাহা মদের মতো! রক্তবর্ণ ও 

মদের মতো তীব্র; তাহা! বুদ্ধিকে স্থির থাকিতে দেয় না, তাহা এককে আঁর 

করিয়। দেখায়--আঁমি সন্ধ্যাসী, আমার সাধনার মধ্যে তাহার স্থান নাই 

গোরা বুঝিল--“সে ভারতবর্ষের ব্রাহ্মণ, ভারতবর্ষের হইয়া দেবতার 
আরাধনা তাহাকে করিতে হইবে, ভারতবর্ষের হইয়৷ তপস্যা তাহারই 
কাজ।” পাশ্চাত্য প্রেম ও পাশ্চাত্য দেশপ্রেমের মধ্যে যে সংঘাত 
তাহাকে ইহার চেয়ে স্পষ্ট করা যাইত না। 


ভি পছিচ্ছ্েছি 
ন্্্রষ্টা বঙ্কিম 


সর্বশেষে একেবারে গোড়ার প্রশ্নে ফিরিয়া যাইতে হইবে । এই যে নৃতন 
ভালবাসা, যাহাকে বাঙালী জীবনে অঙ্গীভূত করিবার কথা এতক্ষণ পর্স্ত 
বলিলাম, উহা কোথা হইতে আসিল, কে আনিল? 

কোথা হইতে আসিল সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ মাত্র নাই। 
গ্রাম্য মথুরের গ্রাম্য ভাষায় বলা যাইতে পারে- আসিল রাডামুখোর 
শ্রাদ্ধের মন্ত্র পড়িয়া, ছু'পাত ইংরেজী উপ্টাইয়া, অর্থাৎ ইংরেজী শিক্ষার 
মারফৎ ইংরেজী সাহিত্য ও পাশ্চাত্য জগণ্ড হইতে । আমি কবিত্বের 
চেষ্টা করিয়৷ বলি, ইউরোপের স্বণকুন্তলা, নীলনয়না গোলাপবালারা 
নরওয়ের ফিয়র্ড হইতে উড়িয়া আসিয়৷ বাংলার গভীর জলের কালিন্দীতে 
কালিন্দীতে নাহিয়া মেঘকুন্তলা, কৃষ্ণতারকা যুথিকাবালা হইয়৷ দেখা 
দিল। কথাটা] সোজা! ভাষায় আমার ইংলগু সম্বন্ধীয় বইটাতেও 


বলিয়াছি_- 


41178115601 ০01 1০৮০ 1] 767£211 1711700) 50016519151] 
9৮০11 65621911516, 1 25 17700900000 80] 1116 ৬৮/55 17001 
1291 0172 0902000 ০10০0190965, 1001 1025 112101)51 10621 2১০০1 
11221260 2১9 98000951011, 1১01 1725 91561 2.9 0661 10015, ৪9 
11056 £/০ [019,705 

৬০ 17 35022106521) 00 86291 জা1ঠ) 10৮6 02 0061166121৩ 
60, 01720 15 10 58, 26 11156 16 5 02005161765009 86776217 
11151260510 12081551106 055 20 01560 21507 0৩2 
0 11612360010 3 2 65016 ০ 02150081016 002198- 
7121150077 10156 01500 7510915906110966) 200 2 13000956 
8:07705011675 19 15856060107 165 510৮121,1 


(4 6585596 0০ 57/619750, 9, 110-716 ) 


২৩২ বাঁালী জীবনে রমণী 


দশ বতসর আগে লিপিবদ্ধ এই মত আমি পরবর্তী চিন্তার ফলে 
খানিকটা বদলাইয়াছি। “আ্যাক্রাইমেটাইজেশ্টন' "সম্বন্ধে যে সন্দেহ 
প্রকাশ করিয়াছিলাম তাহা আজ আর নাই। কিছুকালের জন্য পূর্ণ 
'আ্যাক্রাইমেটাইজেশ্যন” যে ঘটিয়াছিল তাহার পরিচয় আগের তিনটি 
পরিচ্ছেদেই দিয়াছি। কিন্ত উহা! পুরামাত্রায় ব্যাপক এবং গভীর হয় 
নাই। অনুভূতির যে গভীরতা ও শক্তি থাকিলে নূতন ভালবাসা 
বাঙালীর একেবারে ধাতস্থ হইয়৷ চিরস্থায়ী হইতে পারিত, তাহা বাঙালী 
চরিত্রের স্বাভাবিক ধর্ম নয়। তাহার উচ্ডাসপরায়ণতা আছে কিন্তু 
আবেগের জোর নাই। শুধু ভালবাসা কেন, বাডাঁলী জীবনে উনবিংশ 
শতাব্দীর শেষে যাহা কিছু বড় জিনিস আসিয়াছিল, যেমন দেশপ্রেম, ধর্ম 
পরায়ণতা৷ বা নৈতিক বোধ, সকলের সন্বদ্ধেই এই কথাটা বলা যাইতে 
পারে। এ সবই আসিয়াছিল একটা প্রবল জাতীয় আয়াসের ও উদ্ভমের 
ফলে, অথচ আয়াসসাধ্য কাজমাত্রেই বাঙালীর কাছে কষ্টকর ও 
অপ্রীতিকর । 

স্থতরাং নূতন ভালবাস বাঙালী সমাজে তামাক ও আলুর মত 
ঘরোয়া না হইয়া! বাংলা দেশে অকিড ফুল ফুটাইবার মত হইয়াছিল । 
তবে উহাঁও স্বাভাবিকই হইয়াছিল । বাঙালীর বাড়ীতে অফিডের গৌরব 
আমি দেখিয়াছি; চেষ্টা করিলে, যত্বু করিলে উহার পুর্ণ সৌন্দর্য যে 
এখানেও হইতে পারে তাহা আমি জানি। কিন্তু সে চেষ্টাও যত্ব 
কোথায়? মানুষের মনের উচ্চতম বিকাশ যে সর্বদেশে সর্বকালে 
আয়াসসাধ্য তাহা এতিহাসিক মাত্রেরই জানা! আছে। বাঙালী চরিত্রের 
মধ্যে হাল ছাড়িয়৷ দিয়া শ্রোতে গা ভাসাইবার যে একটা হুবলতা 
আছে, তাহার জন্য আয়াস ও যত্বের প্রয়োজন আমার্দের মধ্যে আরও 
বেশী। তাই নূত্তন ভালবাস! জোয়ারের মুখে যেমনই প্রাণবন্ত ছিল, 
তেমনই ভাটার মুখে যাইতে বসিয়াছে। কিন্তু উহ লইয়া এখানে 
তর্ক তুলিব না। ভালবাসার অবসান আমি যে-যুগের কথা বলিতেছি 
তাহার পরবর্তী যুগের কথা । এখানে এটুকু বলিলেই যথেষ্ট হইবে যে, 


মন্দা বঙ্কিম ২৩৩ 


পাশ্চাত্য জগৎ হইতে মানসিক জীবনের নূতন সম্পদ সংগ্রহ করিবার 
শক্তি বাঙালীর উনবিংশ শতাব্দীতে হইয়াছিল। স্তুতরাং পাশ্চাত্য 
জগতের ভালবাসাঁও আমাদের জীবনে বিকশিত হইয়াছিল । 

কিন্তু যে রোমান্টিক প্রেমের কথা এই বইএ বলিতেছি উহা পাশ্চাত্য 
জগতেও একটা বিশিষ্ট কালের স্থপতি এবং বিশিষ্ট ধারা । সমগ্র পাশ্চাত্য 
ইতিহাসে ও পাশ্চাত্য সভ্যতায় উহা! ছিল না। ব্যাপারটা একটু 
বুঝাইয়া বলা দরকার । 

প্রাচীন গ্রীক সাহিত্য ও গ্রীক জীবনে, প্রাচীন ল্যাটিন সাহিত্য ও 
রোমান জীবনে নরনারীর সম্পর্কের যে রূপ দেখিতে পাই উহা! সংস্কৃত 
সাহিত্যের রূপের মতই কামাবলম্বী। ইহার পরিচয় গ্রীক ও ল্যাটিন 
কাব্যে প্রচুর পাওয়া যায়। ইহার অতিরিক্ত নরনারীর আকর্ষণ ও 
আসক্তির আর একটা রূপও গ্রীক সাহিত্যে, বিশেষ করিয়া আযটিক 
নাটকে আছে। তাহা এই-__নরনারীর পরস্পর আকর্ষণ একটা 
বিপজ্জনক, দুঃখজনক ব্যাপার, ইহাতে ছ্ুইএরই জীবন বিষাদে ছাইয়া 
যায়, এমন কি অনেক ক্ষেত্রে একজনের বা আর একজনের সর্বনাশ 
হইয়া যায়। নরনারীর আকর্ষণ একটা আস্থরিক শক্তি, মানুষের জীবন 
ইহার আঘাতে টুটিয়৷ যায়, স্তখ ভাসিয়৷ যায়__এই ধারণাটা গ্রীক 
সাহিত্যের প্রায় সবটুকু জুড়িয়া আছে। এই ধারণার বশেই গ্রীক 
চরিত্র লইয়! কাব্য লিখিতে গিয়া! স্ুইনবার্ন লিখিয়াছিলেন,_ 


£]702 আছে 511 010995012 725 10001) 

01 562-692 2170 076 12001010501 101999) 
1310০9৫-:20 2170 17016066101 17010 

/ঠ170 005 566 ০01 10120517661 200 (6215, 
4180. 006 15263 04 26 02005955200 50011) 
4 10166628106 81012 005 0000, 

5127506 01 005 562, 10508 0০, 


90006 10006 £56 ০05 006 5918০? 


২৩৪ বাঙালী জীবনে রমণী 


'আটালাণ্টা ইন্‌ ক্যালিডনে, এই কবিতাটির সবটুকু পড়িয়া লইতে 
পাঠককে অনুরোধ করিব, তাহা হইলে গ্রীকের কাছে প্রেমের কি 
ভীতিজনক মুতি ছিল, তাহা স্পষ্ট হইয়া উঠিবে। 

এই ধারা সপ্তদশ শতাব্দীর ফরাসী সাহিত্যেও অনুবতিত হইয়াছিল। 
রাসিনের নাটকে প্রেমের স্ুখদায়ক রূপ নাই, এগুলিতেও প্রেম কষ্ট 
ও যন্ত্রণার হেতু । দৃষ্টান্ত্বরূপ শুধু “ফিড়া'রই উল্লেখ করা যাইতে 
পারে। রাসিনের নিজের জীবনেও প্রেম স্থখের অবলম্বন হয় নাই, 
এরূপ মনে করিবার কারণ আছে। ফ্রান্সে সপ্তদশ শতাব্দী যেমন 
চতুর্শি লুইএর রাজসিক আড়ম্বরের যুগ, তেমনই প্রেমেরও যুগ । তখন 
পুরুষের কাজ ছিল শাসন, যুদ্ধ ও নারীচর্চা; স্ত্রীলোকের কাজ ছিল, 
রূপচর্চা ও ভালবাসা । কিন্ত্ব এই ভালবাসার আদানপ্রদানে রাঁজা হইতে 
আরম্ভ করিয়া লুইজ দ্য লা ভালিয়েরের মত মুগ্ধা কুমারী পর্যস্ত কাহারও 
জীবনই স্থখের হয় নাই। কামনার জ্বালা, মিলনের অসারতা, ও 
বিচ্ছেদের যন্ত্রণা মিলিয়া৷ ভালবাসার একটা “ইনফাণে স্ষ্টি হইয়াছিল । 

তাই সেই যুগ হইতে যে প্রেমের উপন্যাসটি আসিয়াছে, যাহাকে 
আজ পর্যন্ত পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আট-দশটি গল্লের মধ্যে গণ্য করা হয়, তাহাতে 
প্রেমের দুঃখ ভিন্ন আর কিছু দেখানো হয় নাই-__-শেষ পর্যন্ত নায়িকা 
প্রেমের জ্বালা হইতে মুক্তি পাইল প্রেমকে প্রত্যাখ্যান করিবার পর 
কঠিন বৈরাগ্যের আশ্রয় লইয়া । যখন সে প্রেমের মোহে অভিভূত 
তখনই তাহার মাতা মৃস্ুশয্যায় তাহাকে এই সর্বনাঁশকারী প্রবৃপ্তি হইতে 
হৃদয়কে ক্ষান্ত করিতে উপদেশ দিয়াছিলেন। কথা কয়টা ফরাসী হইতে 
অনুবাদ করিয়া দিতেছিত_ 


“মা, তোমাকে ছাড়িয়া যাইতে হইবে। ইহার যে যন্ত্রণা তাহা! আরও বেশী 
অনুভব করিতেছি এই জন্ত যে, তোমাকে ঘোর বিপদে ফেলিয়া যাঁইতেছি 
এবং আমাকে তোমার প্রয়োজন আছে। তুমি মসিয় ছা নেমুরের প্রতি 
অন্থ্রক্ত। এই কথাটা তোমাকে স্বীকার করিতে বলিব না, কারণ আমার 
আর সেই অবস্থা নাই যাহাতে তোমার সারল্যের উপর নির্ভর করিয়। 


ন্ট বঙ্কিম ২৩৫ 


তোমাকে আমি চালাইতে পারি। অনেক দিন হইতেই আমি তোমার এই 
অঙ্গরাগ বুঝিয়া আসিতেছি। কিন্তু প্রথমে এই বিষয়ে তোমাকে কিছু 
বলিতে চাই নাই এই ভয়ে যে, উহার ফলে তুমি নিজে এই অন্রাঁগ সম্বন্ধে 
সচেতন হইয়া উঠিবে। এখন তোমার কাছে ব্যাপারটা অতি সুস্পষ্ট হইয়া 
উঠিয়াছে। এখন ইহ! হইতে নিজেকে নিবৃত্ত করিতে হইলে বিশেষ চেষ্টা 
ও বিশেষ শক্তির প্রয়োজন হইবে । তোমার স্বামীর প্রতি তোমার যাহ! 
কর্তব্য উহার কথা চিস্তা করিও; তোমার নিজের প্রতি যাহা কর্তব্য উহার 
কথাও ভাবিও; ইহাঁও ভাবিও, যে-সুনাম তুমি অর্জন করিয়াছ এবং যাহা 
তোমার হউক এই বাঁপনা আমি এত করিয়াছি, সেই সুনাম তুমি হাঁরাইতে 
গার। শক্তি এবং সাহস রাঁখিও+ মা আমাঁর। রাঁজসভা হইতে চলিয়া 
যাইও) তোমার স্বামীকে তোমাকে নিয়ন্ত্রিত করিবার জন্য বাধ্য করিও ; 
অতি বন্ধুর ও দুঃখজনক পথ ধরিতে ভয় পাইও না; এই পথ প্রথমে যত 
ভীতিজনকই মনে হউক না কেন, শেষে দেখিবে উহু! প্রণয়ের দুঃখ হইতে 
নুখজনক। আমি তোমাকে যাহা করাইতে ইচ্ছা করি, তাহা করিতে বাধ্য 
করিবার জন্য যদি তোমার নিজের সতীত্ব ও কর্তব্যবোধ ছাড়া আর কিছুর 
প্রয়োজন থাকে তবে এইটুকু মাত্র বলিব, এই সংসার ত্যাগ করিয়া গেলে 
আঁমি যে সুখ পাইব মনে করিতেছি তাহার ব্যাঘাত যদ্দি কোঁন কিছু করিতে 
পারে তাহা এই জিনিসট৷ দেখ! যে অন্য নারীর মত তুমিও ধর্ত্রষ্ট হইয়াছ; 
কিন্তু এই দুর্ভাগ্য যদি তোমার হয়ই, তাহা হইলে উহা! না দেখিবার জন্ট 
আমি সানন্দে মৃত্যুকে বরণ করিয়! লইব।” 
এই কথাগুলি বলিয়া মাতা কাদিতে কাদিতে মুখ ফিরাইয়া কন্যার কাছ 
হইতে বিদায় নিলেন। ইহার পর দুই দিন তিনি বাঁচিয়া ছিলেন, কিন্তু নিজের 
জীবনের একমাত্র সম্বল কন্টাকে আর একবারও দেখিতে চাহিলেন ন|। 
প্রেমের এই ভয়াবহ চিত্র পরবর্তী অষ্টাদশ শতাব্দীর একটি বিখ্যাত 
উপন্যাস 'মান্নো ল্যস্কোতেও আকা হইয়াছিল। 
বাংলাদেশে যে পাশ্চাত্য প্রেম আসিয়াছিল, উহা! এই প্রেম নয় 
তাহা বলাই বাহুল্য । উহা! সুখের বন্যার মত আসিয়াছিল। উহার উৎস 


ইউরোপের আর এক ধার! । 
আশ্চর্যের কথা এই, স্থখের প্রেমের ধার! ছুঃখের প্রেমের ধারার 


২৩৬ বাঙালী জীবনে রমনী 


অপেক্ষা ইউরোপীয় জীবনে প্রাচীন। উহার স্পষ্ট সুচনা পাই আমরা 
ত্রয়োদশ শতাব্দী হইতে । ১২৭৪ খুষ্টাব্ে এক নয় বগুসর বয়ন্ক বালক 
এক রূপসী যুবতীকে দেখিয়া যাহা অনুভব করিয়াছিল, তাহার কথা পর- 
জীবনে কবি হইয়া লিখিয়াছিল,__ 
£11701010 ৮162, 0৬2 15095 25815 £001011 106, 
0011 %9110105 ৫0101151120 1011)11? 

(আজ হইতে নবজীবন আরম্ভ হইল। এই দেবতা আমার চেয়ে 

শক্তিমান, তিনি আসিয়৷ আমার উপর আধিপত্য বিস্তার করিলেন । ) 

প্রণয়িনীর সহিত মিলন এই প্রণয়ীর কখনই হয় নাই। কিন্তু তাই 
বলিয়৷ প্রেম তাহার কাছে কখনই দুঃখের কারণও হয় নাই। বরঞ্চ এই 
কবির শ্রেষ্ঠ কাব্যে উহা! গৌরবের বস্তু ও দিব্য আনন্দেরই অবলম্বন 
হইয়াছিল ইনি যে দান্তে তাহ! বলিয়া দেওয়ার অপেক্ষা রাখে না। 
প্রেমের এই নূতন রূপ প্রাচীন গ্রীস ও রোমের কামাবলম্থী প্রেম যে নয়, 
উহার ধর্ম যে বদলাইয়াছে, উহা! যে আর নরনারীকে উন্মাদগ্রস্ত করিয়া 
তাহাদের সর্বনাশ করে না, পক্ষান্তরে তাহাদিগকে পবিত্র মানুষিক 
প্রেমের জগৎ হইতেও ভগবন্তক্তির জগতে উন্নীত করে, তাহার স্পহ্ট 
অনুভূতি দান্তের মহাকাব্য “দিভিনা কশ্মেদিয়া' জুড়িয়া আছে। 
'পারাদিজো*র অষ্টম সর্গের গোড়াতে দান্তে, ভিনাসের পুরাতন পুজাকে 
42,1)0100 917০91৮৮- প্রাচীন ভ্রম বলিয়াছেন । 

বেয়াত্রিচের প্রতি দাস্তের যে ভালবাসা, তাহার লোকোত্তর 
পরিণতির কথা মনে রাখিলে “কৃষ্ণকান্তের উইল'-এর শেষে গোবিন্দ- 
লালের কথা কয়টি বুঝিতে কোনও কষ্ট হইবে না। ভাগিনেয় 
শচীকান্ত যখন গোবিন্দলালকে সম্পন্তি ফিরাইয়৷ নিতে অনুরোধ 
করিলেন, তখন গোবিন্দলাল উদ্ভতর দিলেন, 

“ বিষয় সম্পত্তির অপেক্ষা ও যাহা! ধন, যাহা কুবেরেরও অপ্রাপ্য, তাহা! আমি 

পাইয়াছি। এই ভ্রমরের অপেক্ষাও যাহ! মধুর, ্রমরের অপেক্ষাও যাহা 

পবিত্র, তাহা পাইয়াছি। আমি শাস্তি পাইয়াছি।? 


মনত্র্টা বঙ্কিম | ২৩৭ 
“শচীকাস্ত বিনীতভাবে বলিলেন, “সঙ্গ্যাসে কি শাস্তি পাওয়া যায়? 
“গোবিন্দলাল উত্তর করিলেন, “ক্দীপি না। কেবল অজ্ঞাতবাসের জন্ত 
আমার এ সন্নযাসীর পরিচ্ছদ । ভগবৎ-পাঁদপদ্মে মন:স্থাপন ভিন্ন শাস্তি 
পাইবার আর উপায় নাই। এখন তিনিই আমার সম্পত্তি--তিনিই আমার 
ভ্রমর, ভ্রমরাধিক ভ্রমর 1” 

এই স্থুর হিন্দু ভক্তিবাদের নয়, আসিয়াছিল মধ্যযুগের খৃষ্ঠীয় তক্তিবাদ 
হইতে, হিন্দুভক্তির বেনামীতে। 

রোমান্টিক প্রেমের যে লোকোন্তর রূপ দান্তের মধ্যে দেখিতে পাই, 
ক্রবাছুরদের কাব্যে ও গানে উহারই লৌকিক রূপ প্রকাশ পাইয়াছিল, 
এবং শিভাল্রি'র মধ্যে উহার কর্মকাণ্ড প্রকাশিত হইয়াছিল। সংক্ষেপে 
বলা যাইতে পারে, এই নৃতন প্রেম ইউরোপীয় মধ্যযুগের বিশিষ স্থ্টি। 

তাহা ছাড়। ইহার উদ্তবের মধ্যে হয়ত কোথাও না কোথাও দেশ 
এবং জাতিগত একটা ধর্মও ছিল। ভূমধ্যসাগরের পারে পারে বায়ুর 

তণ্ততায় ও আলোর প্রাখর্ষে প্রেমের মধ্যে আসিয়াছিল একটা জ্বালা ও 

অনির্বাণ তৃষণ ; উত্তর ইউরোপের তুষার, শৈত্য ও মৃছ আলোতে উহাতে 

আসিল তৃপ্তি, পূর্ণতা, ও স্সিগ্ধ উচ্ছলতা ; তাহারও উপর রহিয়! রহিয়া 
উহার ভিতর দিয়া 'অরোরাবোরিয়ালিস+_মেরুছ্্যতির বিভা খেলিয়া 
যাইতে লাগিল। জাতিগত ধারার কথা বিবেচনা করিলে উহার মধ্যে 
জার্মাণ গোষ্ঠীর নারীর প্রতি শ্রদ্ধা-_যাহার কথা তাসিতাস লিখিয়াছিলেন 

_-উহাও যে আপিয়াছিল সে বিষয়ে সন্দেহ কর! চলে না। টেনিসন, 

আমার মনে হয়, এই জিনিসটা অনুভব করিয়াছিলেন, তাই তিনি 

লিখিয়াছিলেন,_- 
50 9%21107, 952,110, 11910571151 50505, 
ঢা] ০1767, 0৭ 211 5091 1562 811904 9265, 
4150 05111561051] 1751) 1726 2 1100 01765, 
0 511 1561, 95%/91109/, 00০0. 01820 10105/6510 22.013, 
00790 1071506 21501067195 212৫ 11915 25 005 5000), 
180. 09115 800. 009 250 0618061 15 €175 ০:01), 


২৩৮ বাঙালী জীবনে রমণী 
ইহার সহিত স্থইনবাণে'র দক্ষিণের সঙ্গীতের তুলনা করিতে বলিব, 


44150 06101051108 1515705521৩ 2200055 
151)911 5,5502560 107 [0105 
701 0765 11012012 515105 00. 075 1091615 19955, 


1170 975961055 ৮1511) 2100 21] 01767022127 

দান্তে হইতে শুরু হইয়া প্রেমের নৃতন ধারা পেক্রার্ক ও বসার 
প্রভৃতির কাব্যে প্রকাশিত হইয়া সেকস্গীয়রে গিয়া! পুবিণ কশিত রূপ ধারণ 
করিল। তবু ইহার পরেও পুরাতন গ্রীক ও রোমান ধারা আবার কিছু 
দিনের মত অংশত ফিরিয়া আসিল । ইহার কারণ রিণেসেন্নের প্রভাব। 
গ্রীক ও ল্যাটিন সাহিত্যের পুনরাবিষ্ষার রিণেসেন্সের একটা বড় দিক। 
ইহার ফলে ইউরোপীয় সাহিত্য ও জীবনে একটা নৃতন 'ক্ল্যাসিসিজম, 
দেখা দ্রিল, এবং এই 'ক্ল্যাসিসিজমে”র সঙ্গে সঙ্গে প্রায় ছুই শত বৎসর 
ধরিয়া প্রেমের পুরাতন ধারণা ফিরিয়া আসিয়া নৃতন ধারণাকে কোণঠাস৷ 
করিতে না পারিলেও বেশ খানিকটা ছাপাইয়! উঠিল । রাঁসিনে যে উহার 
একট! দিক প্রকাশ পাইয়াছিল তাহার কথা বলিয়াছি। অন্য ধরনের 
প্রকাশ দেখা গেল চটুল আদিরসাত্মক রচনায়। ভল্তের জোয়ান-অফ- 
আর্ককে লইয়! অত্যন্ত বদ্রকমের রসিকতা করিতে ছাড়েন নাই। কিন্তু 
রোমান্টিক সাহিত্য আবার রোমান্টিক প্রেমকে ইউরোপীয় জীবনে পুনঃ 
প্রতিষ্ঠিত করিল। 

বাংলাদেশে নূতন প্রেম যে সেক্সগীয়র ও রোমান্টিক কাব্য হইতে 
আসিয়াছিল তাহাতে সন্দেহ মাত্র নাই। বঙ্কিমচন্দ্রের সমস্ত লেখার 
মধ্যে সেক্সপীয়রের প্রতি শ্রদ্ধা স্থপরিস্ফুউট। তিনি 'কপালকুগুলা+-র 
একটি বজিত পরিচ্ছেদে সেক্সপীয়রকে “দর্বভ্ সেক্সপীয়র বিশেষণ 
দিয়াছিলেন, “বিষবৃক্ষেণ প্রেমের কৰি হিসাবে বাল্মীকি ও শ্রীমন্তাগবৎ- 
কারের সহিত যুক্ত করিয়াছিলেন। উদ্ভতরচরিত সম্বন্ধে প্রবন্ধে 
সেক্সপীয়রের সম্বন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র লিখিয়াছিলেন,_ 

“সেক্ষপীয়র অদ্বিতীয় কবি। তিনি স্বীয় শক্তির পরিমাণ বিলক্ষণ বুবিতেন 

-কোন্‌ মহাত্মা না বুঝেন ? 


মন্তরদ্রষ্ট] বহ্কিম | ২৩৯ 


ইহার অপেক্ষাও বঙ্কিমচন্দ্রের এই শ্রদ্ধার বেশী পরিচয় পাওয়া 
যায় 'রজনী” উপন্যাসের একটি জায়গায় । ইহাতে অমরনাথ একটি বই-এ 
সেকৃসগীয়রের নায়িকাদের চিত্র দেখিয়া শচীন্দ্রনাথকে কি বলিলেন তাহার 
বিবরণ দেওয়। হইয়াছে । শচীন্দ্রনাথের জবানীতে কথাগুলি এই, 

“সেক্ষপীয়র গেলেরির পাতা! উন্টান শেষ হইলে অমরনাথ নিজ প্রয়োজনের 

কথা কিছু না বলিয়া এ পুস্তকস্থিত চিত্রসকলের সমালোচনা আ'রম্ত 
করিলেন । আঁমাঁকে বুঝাইয়া দিলেন যে, যাহা বাক এবং কাধ্যদ্বারা 
চিত্রিত হইয়াছে, তাহা চিত্রফলকে চিত্রিত করিতে চেষ্টা পাওয়া ধৃষ্টতাঁর 
কাজ। সে চিত্র কখনই সম্পূর্ণ হইতে পারে না) এবং এ সকল চিত্রও সম্পূর্ণ 
নহে। ডেন্ডিমনার চিত্র দেখাইয়া কহিলেন, আপনি এই চিত্রে ধৈর্য্য, 
মাধু্য, নত্রতা পাইতেছেন, কিন্তু ধৈষ্যের সহিত সে সাহস কই? নম্রতা 
সঙ্গে সে সতীত্বের অহঙ্কার কই? জুলিয়েটের মৃত্ি দেখাইয়া কহিলেন, 

এ নবযুবতীর মৃতি বটে, কিন্তু ইহাতে জুলিয়েটের নবযৌবনের অদমনীয় 

চাঞ্চল্য কই ?" 

'সেক্সপীয়র গ্যালারি, উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে প্রকাশিত, 
উহাতে সেক্সপীয়রের নাটকের অন্তনিহিত মানসিক এশর্য প্রকাশ না 
পাইয়৷ থাকিতে পারে, কিন্তু বহ্কিমচন্দ্র অমরনাথের মুখ দিয়া নিজের ষে 
বক্তব্য বলিলেন তাহার অর্থ আরও গুরুতর । কথাটা এই-_চিত্র মাত্রই 
মনুষ্যচরিত্র বণ'নার ব্যাপারে সাহিত্য অপেক্ষা হীন। ইহা! সাহিত্য এবং 
সেক্সপীয়র, ছুইএরই প্রতি শ্রদ্ধাপ্রসূত সাহিত্যের প্রতি এই শ্রদ্ধা 
রোমান্টিক ধারার একটা মূলগত ব্যাপার, তাই রোমান্টিক যুগের চিত্রও 
অনেকাংশে সাহিত্যধ্মী । 

চিত্রের মধ্য দিয়া যে সেক্সপীয়রের নাটকের মাহাত্ম্য প্রকাশ করা 
যায় না, উহা! আমি নিজেও স্ট্যাটফোর্আপন্‌.এভন-এর মিউজিয়মে 
নাটকগুলির ঘটন৷ ও চরিত্র লইয়৷ যে চিত্রাবলী আছে, সেগুলি দেখিয়া 
বুঝিয়াছিলাম। এই গ্যালারিতে স্যর জন্থুয়া রেনল্ডস্‌ ও রমনে হইতে 
আরম্ত করিয়া ফোর্ড ম্যাডকস্‌ ফোর্ড ও মিলে পর্যস্ত বন্ছ বিখ্যাত চিত্রকরের 
চিত্র ছিল। কিন্তু নাটকে যে মনোজগতের পরিচয় আছে তাহার 


২৪০ বাঙালী জীবনে রমণী 


তুলনায় উহার চিত্রে প্রকাশ আমার কাছে অত্যন্ত তুচ্ছ মনে হইয়াছিল। 
বঙ্কিমচন্দ্র সে-যুগে মানুষের মনের অপরিসীম বিস্তার ও গভীরতার ষে 
পরিচয় পাইয়াছিলেন সেই মনোজগৎকে তাহার কাছে “সেক্সপীয়র 
গ্যালারি'র চিত্রের মত চিত্রে দেখাইবার চেষ্টাকে ধুষ্টতা বলিয়া মনে 
হওয়৷ স্বাভাবিক । 
বঙ্কিমচন্দ্র নৃতন ভালবাসার সন্ধান যে সেক্সপীয়র হইতে প্রধানত 
পাইয়াছিলেন তাহার প্রমাণ এই শ্রদ্ধা ছাড়া অন্যন্রও আছে। 
'কৃষ্ণকান্তের উইলের শেষে যেখানে গোবিন্দলালের শুকানে৷ বাগান 
আবার প্রস্তুত করিবার কথা আছে সেখানে দুই-চারিটি গাছের নাম 
আছে যাহার এই প্রসঙ্গে বিশেষ তাৎপর্য আছে। শচীকান্ত মাত্তুলের 
জীবনের ছুঃখময়ী কাহিনী শুনিয়া গোবিন্দলালের প্রমোদোগ্ভান আবার 
তৈরী করিল। বঙ্কিমচন্দ্র লিখিতেছেন,__ 
“আবার বিচিত্র রেলিং প্রস্তুত করিল-_-পুক্করিণীতে নাঁমিবার মনোহর 
কষ্ণপ্রস্তরনিপ্সিত সোঁপানাবলী গঠিত করিল। আবার কেয়ারি করিয়া 
মনোহর বৃক্ষশ্রেণী সকল পুঁতিল। কিন্তু আর রঙ্গিল ফুলের গাছ বসাইল 
না। দেশী গাছের মধ্যে বকুল, কাঁমিনী, বিদেশী গাছের মধ্যে সাইপ্রেস্‌ 
ও উইলো! ৷” 
বাঙালী জমিদারের বাগান্বাড়ীতে ( বাগানবাড়ী-_যাহার সহিত 
কলিকাতার বাঙালীর মনের কোন্‌ ইতরতা জড়িত নাই ?) সাইপ্রেস 
ও উইলো৷ গাছকে দুঃখের প্রতীক হিসাবে আনিবার ধারণ কোথা 
হইতে বঙ্কিম পাইলেন? পাইয়াছিলেন সেক্সপীয়র হইতে; সে- 
বিষয়ে তিলমাত্র সন্দেহ নাই। সাইপ্রেস সম্বন্ধে এই গানটি 'টুএল্ফথ 
নাইটে'র দ্বিতীয় অঙ্কের চতুর্থ দৃশ্বে আছে;_ 
50010625725, ০০7 2৬৪ 06520), 
50 2 320. ০5075531916 1206 096 1520. 
[1 2৮০, 115 22৮, 19:62.0 8 
1 2]? 51211) 105 2, 1912 07061 00210. 


2 517:050 ০1 10105, 30401 21] 101) ৩, 


মন্প্রষ্টা বঙ্কিম ২৪১ 


01 10:61021০ 11, 
1৬5 1027 01 ৫6201), 190 07 50 106 
[10 91210 11, 


আর উইলো সম্বন্ধে ডেসডিমোনার গান সকলেরই জানা,_ 


£11)6 00902 509] 59. 5121)1156 0 
2, 5০2,270: 056, 
91755 211 2, 5221) 11107 9 
1721 17200 01 170 1305010, 
1167 17620 01 176] 10166) 
91105 11107, ড/1110/, ৬1110 £ 
[175 12551) 506205 2 9৬ 1561, 
210 াএারাািন 10611710205 8 
91175 5/1110৩%) 11105, 1110 : 
ঢৃতা 5216 0525 2011 [0] 006], 
চে] 50106110 0189 5601065 ১-৮ 


98175 81107, 1110, /1110৮.৮ 


_ইত্যাদি। 

কোথা হইতে নূতন ভালবাসা আসিল তাহার খানিকটা আভাস 
দিলাম। এখন দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর দিবার চেষ্টা করিব। কে 
আনিল? আনিলেন বঙ্কিমচন্দ্র, যুবক বঙ্কিমচন্দ্র, পঁচিশ-ছাবিবশ বয়ঙ্ক 
বঙ্কিম, সে বিষয়েও সন্দোহের অবকাশ তিলমাত্র নাই। এই তরুণ যুবা 
প্রায় রাতারাতি বাঙালীর মনে এই ভাববিপ্লব কি করিয়া আনিল তাহা 
মনে করিলে বিস্ময় বোধ হয়। এখানে একটিমাত্র দৃষ্টান্ত দিয়া এই 
ভাববিপ্লবের নূতনত্ব ও গৌরব বুঝাইবার চেষ্টা করিব। বস্কিমচন্দ্রের 
'রাজমোহনের স্ত্রী” ১৮৬৪ সনে প্রকাশিত হয়, “ছুর্গেশনন্দিনী” প্রকাশিত 
হয় পরের বশুসর, ১৮৬৫ সনে। প্রথম বইটিতে স্ত্রীলোকের রূপ 
সম্বন্ধে বাডালী সমাজে যে ধারণা প্রচলিত ছিল তাহার পরিচয় 
পাইয়াছি। দ্বিতীয় বইটি খুলিলেই দেখা যায়, এক বগুসরের মধ্যে 


১৬ 


২৪২ বাঙালী জীবনে রমণী 


কি নূতন ধারণা দেখা দিয়াছিল। তিলোন্তমার রূপ সম্বন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র 
লিখিলেন,_- 
“তিলোত্তম! সুন্বরী। পাঠক! কখন কিশোর বয়সে কোন স্থির, ধীর, 
কোমলপ্রকৃতি কিশৌরীর নবসঞ্চারিত লাবণ্য প্রেমচক্ষুতে দেখিয়াঁছেন? 
একবার মাত্র দেখিয়া চিরজীবন মধ্যে যাহার মাধুর্য বিস্বৃত হইতে পারেন 
নাই) কৈশোরে, যৌবনে, প্রগল্ভবয়সে, কার্য্যে, বিশ্রামে, জাগ্রতে, 
নিন্্ায়, পুনঃপুনঃ যে মনোমোহিনী মৃত্তি স্মরণপথে স্বপ্নবৎ যাতায়াত করে, 
অথচ তৎম্বন্ধে কখনও চিত্তমাঁলিন্তজনক লালসা জন্মায় না, এমন তরুণী 
দেখিয়াছেন? যদি দেখিয়া থাকেন, তবেই তিলোত্তমার অবয়ব মনোমধ্যে 
স্বরূপ অনুভূত করিতে পারিবেন |” 
ইহার পর আর ভারতচন্দ্রের ধারায় রমণীর রূপ বর্ণনা করা_ 
“কে বলে শারদ শশী এ মুখের ভুলা, পদনখে পড়ে তার আছে 
কতগুলা”, বা “মেদ্দিনী হইল মাটি নিতম্ব দেখিয়া” এই সব অতিশয়োক্তি 
অলঙ্কার ছড়ানো হাস্যরসের অবতারণা কর! ছাড়া অন্য কোনও 
উদ্দেশে কর! সম্ভব রহিল না। তাই বঙ্কিমচন্দ্র এই ন্টাইলে শুধু 
যে আশমানির রূপ বর্ণনাই করিলেন তাই নয়, পুরাতন সরন্বতীর 
এই ব্যাজজ্তরতিও করিলেন, 
“হে বাগ দেবি 1."'হে বিশাল রসাল দীর্ঘ-সমাঁস-পটল-ন্প্টিকারিণি ! একবার 
পদনখের এক পার্খে স্থান দাও, আমি রূপ বর্ণনা করিব। সমাসপটল, 
সন্ধিবেগুণ, উপমা-কীচকলার চড়চড়ি র'ধিয়া এই খিচুড়ি তোমায় ভোগ 
দিব ।-..হে বটতলা-বিগ্যাপ্রদীপ-তৈলপ্রদায়িনি! আমার বুদ্ধির প্রদীপ 
একবার উজ্জল করিয়া দিয়া যাঁও। মা! তোমার ছুই রূপ, যে রূপে তুমি 
কালিদাসকে বরপ্রদ! হইয়ছিলে, যে প্রকৃতির প্রভাবে রঘুবংশ, কুমারসম্ভব, 
মেঘদূত, শকুস্তলা জন্মিয়াছিল, যে প্রকৃতির ধ্যান করিয়া বাল্ীকি রামায়ণ, 
ভবভৃতি উত্তমরাঁমচরিত, ভাঁরবি কিরাতার্জনীয় রচনা করিয়াছিলেন, সে 
রূপে আমার স্বন্ধে আরোহণ করিয়! পীড়া জন্মাইও না) যে মৃত্তি ভাবিয়া 
শরীহ্য নৈষধ লিখিয়াঁছিলেন, ধে প্রৃতিপ্রসাঁদে ভারতচন্ত্র বিস্তার অপূর্ব রূপ 
বর্ণনা করিয়া বঙ্গদেশের মনোমোহ্ন করিয়াছেন, যাহার প্রসাদে দাশরখি 


মনদ্রষ্টা বহ্কিম ২৪৩ 


রায়ের জন্ম, যে মৃত্তিতে আজও বটতলা আলো! করিতেছ, সেই মৃদ্তিতে 
একবার আমার স্কন্ধে আবিভূর্তি হও, আমি আশমানির রূপ বর্ণনা করিব ।” 


এই কথ! কয়টি পড়িয়া মনে হয় তাহার কাছে বাংলাদেশের পণ্ডিত- 
সমাজে প্রচলিত সংস্কৃত কাব্য সম্বন্ধে একটি বুক্নী বেরসিকের উক্তি 
বলিয়া! মনে হইয়াছিল, তাই উহাকে ব্যঙ্গ করিয়াছিলেন । উক্তিটি এই 
_-“উদিতে নৈষধে কাব্যে ক চ মাঘঃ ক ভারৰি ?” 
ব্কিমচন্দ্র বাঙালীকে রমণীর রূপ নৃতন চক্ষে দেখিতে শিখা ইয়াছিলেন, 
সেই রূপকে নৃতনভাবে পুজা করিতেও শিখাইয়াছিলেন। কিন্তু তিনি 
ইহাও জানিতেন রূপোম্মাদে যেমন স্বথখ আছে, তেমনই দুঃখ এবং 
বিপদও আছে। নবকুমার, প্রতাপ, ভবানন্দ রূপের জন্য মৃত্যু বরণ 
করিয়া! লইয়াছিল। রূপোনম্মাদের ভয়াবহ রূপ যে কি, তাহ! বঙ্কিমচন্দ্র 
ভবানন্দের মুখ দিয়া যেভাবে বলাইয়াছেন, এত স্পস্ট করিয়া আর 
কোথাও নিজে বলেন নাই। ভবানন্দ কল্যাণীকে বলিতেছেন, _ 
“দেখ, মনুষ্য হউন, খষি হউন, সিদ্ধ হউন, দেবতা হউন-_চিত্ত অবশ; 
" সন্তানধর্্ম আমার প্রাণ, কিন্তু আজ প্রথম বলি, তুমিই আমার প্রাণীধিক 
প্রীণ! যে দ্দিন তোমায় প্রাঁণদান করিয়াছিলাম, সেই দিন হইতে আমি 
তোমার পদমূলে বিক্রীত। আমি জানিতাম না যে, সংসারে এ রূপরাশি 
আছে। এমন রূপরাশি আমি কখন চক্ষে দেখিব জানিলে, কখন সন্তানধর্্ম 
গ্রহণ করিতাঁম না। এধন্ম এ আগুনে পুড়িয়া ছাই হয়। ধর্ম পুড়িয়া 
গিয়াছে, গ্রাণ আছে । আজি চারি বৎসর প্রাণও পুড়তেছে, আর থাকে 
না! দাহ! কল্যাণি, দাহ! জাল! কিন্তু জলিবে, যে ইন্ধন, তাহা! আর 
নাই। প্রাণ যাঁয়। চারি বৎসর সহ করিয়াছি, আর পারিলাম না । তুমি 
আমার হইবে ? 


ইহার পরিণাম দেখিয়া বস্কিমচন্দ্র রমণীর রূপকে ভয়ের বশে ধিকার 


দিয়াছিলেন। কোন্‌ পুরুষের, সে যদি মানুষ হয়, রূপের ভয় নাই? 
তয় কি শুধু পুরুষেরই, নারীর কি নাই? এই যন্ত্রণার কথাও বঙ্কিম 


রমণীর মুখে দিয়াছেন, 


২৪৪ বাঙালী জীবনে রমণী 


"বহুমৃত্তিময়ি বসুন্ধরে |: বল মা, তোমার হৃদয়ের সারভৃত, পুরুষজাতি 
দেখিতে কেমন ? দেখাও মা, তাহার মধ্যে, যাহার করম্পর্শে এত সুখ, 
সে দেখিতে কেমন ? দেখা মা» দেখিতে কেমন দেখায়? দেখা! কি? দেখা 
কেমন? দেখিলে কিরূপ সুখ হয়? এক মুহূর্ত জন্য এই সুখময় স্পর্শ 
দেখিতে পাই না? দেণা মা! বাহিরের চক্ষু নিমীলিত থাকে, থাকুক মা! 
আমার হৃদয়ের মধ্যে চক্ষু ফুটাইয়া দে, আমি একবার অন্তরের ভিতর অন্তর 
লুকাইয়াঃ মনের সাধে রূপ দেখে নারীজন্ম সার্থক করি। সবাই দেখে__ 
আমি দেখিব না কেন? বুঝি কীট-পতঙ্গ অবধি দেখে আমি কি 
অপরাধে দেখিতে পাই না? শুধু দেখা-_কাঁরও ক্ষতি নাই, কারও কষ্ট 
নাই, কারও পাঁপ নাই, সবাই অবহেলে দেখে-কি দোষে মামি কখনও 
দেখিব না? 
“না! না! অঘৃষ্টে নহি । হৃদয়মধ্যে খুঁজিলাম। শুধু শব্দ স্পর্শ গন্ধ। 
আর কিছু দেখিতে পাইলাম না । 
“আমার অন্তর বিদীর্ণ করিয়া ধ্বনি উঠিতে লাগিল, কে দেখাবি দেখা 
গো-আমায় রূপ দেখা! বুঝিল না! কেহই অন্ধের ছুঃখ বুঝিল না 1” 
আমি অবাক হইয়া ভাবি, বঙ্কিমচন্দ্রকে এই অনুভূতি কে দিয়াছিল। 
শুধু ইউরোপ হইতে আসিয়াছিল বলিলেই চলিবে না- গ্রহণের, আয়ত্ত 
করিবার, একেবারে নিজের করিয়া লইবার জন্য অসামান্য মানসিক শক্তির 
প্রয়োজন। এই শক্তি বাঙালীর ক্ষুদ্রপরিসর, অগভীর, গতানুগতিক, 
সাধারণ মানসিক জগতে একজনের মধ্যে কি করিয়া আসিল? বৈষয়িক 
ব্যক্তিরা, জড়চেতন ব্যক্তিরা বলিবে, ইহা কল্লিত অনুভূতি, মিথ্যা অনুভূতি। 
মুর্খের দল! লোকোত্তর অনুভূতি আর মিথ্যা অনুভূতি এক নয়। 
যদি আমরা মানসিক জীবনে আটপৌরেকে ছাড়াইয়াই না উঠিতে 
পারিলাম, তাহা হইলে দেহের উপর পোশাকী শাড়ী ও ফিন্ফিনে 
ধুতি চাপাইবার মুঢ়তা কেন? বঙ্কিমচন্দ্র বাঙালী হইয়া মানসিক জীবনে 
রূপের যে অনুভূতি আনিয়াছিলেন, তাহা যদি সমস্ত বাডালী, এমন কি 
ছয় আনা! বাঙালীও গ্রহণ করিতে পারিত, তাহা হইলে বাঙালী জীবনের 
মানসিক কাঠামে৷ চিরতরে বদলাইয়া যাইত। 


মন্ষ্টা বঙ্কিম ২৪৫ 


রূপের পুজা বহ্কিমচন্দ্র যেভাবে বাঙালী জীবনে আনিয়া দিয়াছিলেন 
তাহা বজায় থাকে নাই, তাহার যুগেও অন্যের দ্বারা একান্তভাবে অনুভূত 
হইয়াছিল কিনা সন্দেহের বিষয় । আমি অনেক সময়েই ভাবি বঙ্কিমচন্দ্র 
ও রবীন্দ্রনাথ বাডালীর জন্য যাহা লিখিয়াছিলেন তাহার সত্যকার গ্রহীতা 
তাহাদের মধ্যে ছিল কিনা । কিন্তু বাঙালী জীবনে রূপপুজার অস্থায়িত্বের 
কাহিনী পরযুগের ইতিহাস । এই বই-এ তাহার আলোচনা! করিব না। 
এখানে শুধু বঙ্কিমচন্দ্রের রূপা নুভূতির আর ঢুই-একটি মাত্র দৃষ্টান্ত দিব। 
একটি তাহার পরিণত বয়সের রচনা “আনন্দমঠ' হইতে । তিনি শাস্তির 
রূপ বর্ণনা করিতেছেন, 


“নবীন যৌবন; ফুল্লকমলতুল্য তাঁহার নববয়সের সৌন্দধ্য ; তৈল নাই, 
বেশ নাই-আহার নাই--তবু সেই প্রদীপ্ত, অনন্থমেয় সৌনাধ্য সেই 
শতগ্রন্থিযুক্ত বসনমধ্যেও প্রস্ফুটিত । বর্ণে ছায়ালোৌকের চাঞ্চলা, নয়নে 
কটাক্ষ, অধরে হাসি, হৃদয়ে ধৈর্য। আহার নাই-_তবু শরীর লাবণ্যময়, 
বেশভৃষা নাঁই, তবু সে সৌন্দর্য্য সম্পূর্ণ অভিব্যক্ত। যেমন মেঘমধ্যে বিদ্যুৎ, 
যেমন মনোমধ্যে প্রতিভা, যেমন জগতের শব্দমমধ্যে সঙ্গীত, যেমন মরণের 
ভিতর সুখ তেমনই রূপরাশিতে অনির্ববচনীয় কি ছিল! অনির্বচনীয় মাধুর্য, 
অনির্বচনীয় উন্নত ভাব, অনির্বচনীয় প্রেম, অনির্বচনীয় ভক্তি ।” 


ইহাকে এই বই-এর ৮৪1৮৫ পৃষ্ঠায় উদ্ধত নারীদেহের বর্ণনার সহিত 
তুলনা করিতে বলিব; তাহা হইলে বঙ্কিমচন্দ্র রূপানুভূতিকে কোথা 
হইতে কোথায় ুলিয়াছিলেন তাহা স্পষ্ট হইয়া উঠিবে। 

এই রূপানুভূতির পরিচয় বঙ্কিমচন্দ্রের সমগ্র উপন্যাসে আছে। 
এখানে শুধু আর এক ধরনের দ্বিতীয় একটি দৃষ্টান্ত দিয়া বঙ্কিমচন্দ্র কি 
করিয়। রূপপুজার প্রবর্তন করিলেন সে প্রসঙ্গ শেষ করিব। এ পর্য্ত যে 
কয়টি উপন্যাস হইতে রূপের বর্ণনা উদ্ধৃত করিয়াছি, সেগুলিকে সমসাময়িক 
বাঙালী জীবনের কাহিনী বলা যায় না। “রজনী” সমসাময়িক জীবনের 
আবেষ্টনীতে স্থাপিত হইলেও নায়িকার অন্ধতার জন্য অন্য রকমের কাহিনী 
হইয়া ঈাড়াইয়াছে। সেজন্য বাঙালী জীবনে ইন্ড্রিয়পরতন্ত্রতার যে দ্বণ্যতম 


২৪৬ বাঙালী জীবনে রমণী 


রূপের মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্র নৃতন ভালবাসার গৌরব দেখাইয়াছিলেন (৪৬-_ 
৪৭ পৃষ্ঠা দ্রষব্য ), সেই কাঠামোর মধ্যেই রূপানুভূতির গৌরবের দৃষ্টান্তও 
দিব। এই গল্পে বহ্কিমচন্দ্র রূপের নৃতন উপাসনাকে এমনভাবে দেখাই- 
লেন, এমন জায়গায় রূপপুজার প্রতিষ্ঠ। করিলেন, যেখানে এই ব্যাপার 
কল্পন! করাও কঠিন। 

ইন্দিরা ডাকাতির পর আশ্রয়হীনা হইয়! রামরাম দত্তের বাড়ীতে 
পাচিকাবুত্তি করিতেছে । এক সন্ধ্যায় পরিবেশন করিতে আসিয়৷ 
অপরিচিত স্বামীর প্রতি কটাক্ষ নিক্ষেপ করিল, পরে আত্মসমর্পণের ইচ্ছ! 
জানাইয়! পত্রও লিখিল। তাহার স্বামীও পাচিকা মাত্র ভাবিয়া তখনকার 
দিনের রেওয়াজ মত এই প্রস্তাব গ্রহণ করাই স্থির করিলেন। তিনি 
ইন্দিরার রূপের একটা আভাস পাইয়াছিলেন। 

কিন্তু সে যখন রাত্রিতে আসিয়! উপস্থিত হইল, তখন দেখা গেল 
কমিস্যারিটের ঠিকাদারের রূপমোহও ঠিক পুরানো ঠিকাদারী 
স্টাইলের নয়, অর্থাৎ তাহার মধ্যে শিখযুদ্ধে বাঙালী কনট্র্যাকৃটরের 
মুসলমানী তবায়িফ-সাধনার ছোয়াচমাত্র নাই। 

ইন্দিরা বলিতেছে,__ 

“বড় বড় কথায়, উত্তর দ্রিবার তীহার অবসর দেখিলাম না। আমি 

উপযাচিকা, অভিসারিকা হইয়া আসিয়াছি,_আমাকে আদর করিবারও 

তাহার অবসর দেখিলাম না। তিনি সবিন্ময়ে আমার প্রতি চাহিয়া রহিলেন। 

একবার মাত্র বলিলেন, “এমন রূপ ত মানুষের দেখি নাই?” 

তারপর ইন্দিরা যখন চলিয়া যাইতে উঠিল, স্বামী তাহার মল্লিকা 
কোরকের বাল! পরা হাতখানা ধরিয়া যেন বিন্কিতের মত হাতের পানে 
চাহিয়! রহিলেন। ইন্দিরা জিজ্ঞাসা করিল, “দেখিতেছ কি?” তিনি 
উত্তর দিলেন, “এ কি ফুল? এ ফুল ত মাথায় নাই। ফুলটার অপেক্ষা 
মানুষট! সুন্দর । মল্লিকা ফুলের চেয়ে মানুষ সুন্দর এই প্রথম 
দেখিলাম ।” 

তাহারও পরে ইন্দিরা যখন চলিয়া যাইতে সত্যই উদ্যত হইল, 


মনত্্রষ্টা বঙ্কিম ২৪৭ 


তখন স্বামী__ আপাতদৃষ্টিতে জার বা উপপতি হইয়াও হাতজোড় করিয়া 
বলিলেন, 

“আমার কথা রাখ, যাইও না । আমি তোমার রূপ দেখিয়! পাগল হইয়াছি। 

এমন রূপ আমি কখন দেখি নাই । আর একটু দেখি। এমন আর কখন 

দেখিব না। 

আমাদের সমাজের পুরাতন পরিচারিকা-গ্রীতির এই রূপান্তর কি কেহ 
প্রত্যাশাও করিতে পারিত? কিন্তু দেখিবার পর সকলেই কি এই নায়কের 
মত বলিবে না, “এমন কখনও দেখি নাই, এমন আর দেখিব না ?” 

বাভালীর মানসিক জগৎ বঙ্কিমচন্দ্র রূপের বিভায় এমনই বিভাসিত 
করিয়া ভুলিয়াছিলেন যে সে তখন বলিতে পারিত,-_ 

“তমেব ভান্তমন্ুভাতি সর্ববং | 
তস্য ভাঁসা সর্ধবমিদং বিভাঁতি ॥” 

ইহার পর বস্কিমচন্দ্রের নৃতন প্রেমানুভূতির কথা বলিতে হয়। 

ইহার একটি দৃষ্টান্ত “ইন্দিরা উপন্যাস হইতেই ইতিপূর্বে দিয়াছি, 
আর একটি দৃষ্টান্ত দিয়াছি “রাধারাণী” হইতে। (এ দুইটির জন্য 
৪৬1৪৭ পৃষ্ঠা দেখিবেন ) কিন্তু ইহার উপরও একটু বিস্তারিত আলোচনার 
আবশ্যক আছে। 

প্রকৃত ভালবাসা শ্রদ্ধা ভিন্ন আসিতে পারে না। প্রণয়ী বা প্রণয়িনী 
মাত্রেই অনুভব করিয়া থাকে যে, অন্য পক্ষের মধ্যে নীচতার আভাসমাত্র 
দেখিলেও প্রেম যেন সঙ্কুচিত হইয়া যায়। কিন্তু ব্ক্তিবিশেষের উপর 
শ্রদ্ধা ছাড়াও ব্যষ্টিমুখীন শ্রদ্ধারও প্রয়োজন আছে । ভালবাসিবার জন্য, 
এমন কি ভালবাসার মাহাত্ম্য বুঝিবার জন্যও পুরুষের দিক হইতে নারীকে 
শ্রদ্ধা করিবার একান্ত আবশ্যক আছে । ইহ ছাড়৷ প্রেম বা প্রেমের 
অনুভূতি আসিতে পারে না। তাই বঙ্কিমচন্দ্রের মধ্যে এই শ্রদ্ধা পূর্ণরূপে 
দেখিতে পাই। 

প্রচলিত ধারণ! এই যে, ব্রাহ্মসমাজই বাঙালী সমাজে নারীজাতি 
সম্বন্ধে নৃতন শ্রদ্ধা আনিয়াছিল। কিন্তু বহ্কিমচন্্র মূলত রক্ষণশীল এবং 


২৪৮ বাঙালী জীবনে রমণী 


হিন্দুভাবাপন্ন, এমন কি উনবিংশ শতাব্দীর নবহিন্দুত্বের অষ্টা হইলেও 
যেভাবে এই শ্রদ্ধা ব্যক্ত করিয়াছেন তাহা পড়িলে বিস্মিত হইতে হয়। 
প্রাচীন ও প্রথাগত বাঙালী সমাজে ভ্ত্রীজাতি সম্বন্ধে যে অবজ্ঞা ও অশ্রদ্ধা 
ছিল তাহার কঠিন সমালোচনা করিতে বস্কিম কিছুমাত্র ইতস্তত করেন 
নাই। এই সমালোচনার আরও উল্লেখযোগ্য দিক এই যে, উহার লক্ষ্য 
হইয়াছিলেন যিনি, তিনি তীহারই নিজের সাহিত্যগুরু, ঈশ্বর গুপ্ত। 
গুপ্তকবির কবিতাসংগ্রহে বঙ্কিমচন্দ্র তাহার স্ত্রীলোক-সন্বন্ীয় কথা কমই 
উদ্ধত করিয়াছিলেন, এবং উহার কারণ দিয়াছিলেন এই,__ 
“অনেক সময়ে ঈশ্বর গুপ্ত স্ত্রীলোক সম্বন্ধে প্রাচীন খষিদরিগের ন্যায় মুক্তক্ঠ 
অতি কদর্য ভাঁষ! ব্যবহার না করিলে গালি পুর! হইল মনে করেন না । 
কাঁজেই উদ্ধত করিতে পারি নাই 1” 
ইহার কারণ কি, বঙ্কিম সে-প্রশ্নেরও আলোচনা করিয়াছেন। তিনি 
লিখিয়াছিলেন,_ 
“যে শিক্ষাটুকু স্ত্রীলোকের নিকট পাইতে হয়, তাহা তাহার হয় নাই। 
যে উন্নতি স্্ীলোকের সংসর্গে হয়, স্ত্রীলোকের গ্রতি ন্েহভক্তি থাঁকিলে 
হয়, তাহার তাহা হয় নাই। স্ত্রীলোক তাহার কাছে কেবল ব্যন্গের পাত্র। 
ঈশ্বর গুপ্ত তাহাদিগে আঙ্গুল দেখাইয়া হাসেন, মুখ ভেঙ্গান, গালি পাড়েন, 
তাহারা যে পৃথিবীর পাপের আকর তাহা নাঁনাপ্রকার অশ্লীলতার সহিত 
বলিয়া দেন__তাহাঁদের সুখময়ী, রসময়ী,ঞ্চপুণ্যময়ী করিতে পারেন না। 
এক-একবার স্ক্রীলৌককে উচ্চ আসনে বসাইয়া কবি যাত্রার সাধ মিটাইতে 
যাঁন__কিস্তু সাধ মিটে নাঁ। তাহার উচ্চাসনস্থিতা নায়িকা বাঁনরীতে 
পরিণত হয় 1” 
কিন্তু স্ত্রীলোকের কাছ হইতে পুরুষ সভ্য আচার-ব্যবহার শিক্ষা 
করিতে পারে, এই ধারণাই বা বঙ্কিমচন্দ্র কোথা হইতে পাইলেন ? 
বাডালী সমাজে উন্নত চরিত্রের স্ত্রীলোক সেকালে ছিল না, এ কথা কেহই 
বলিবে না। কিন্তু সেই সব চরিত্রে গুণ থাকিলেও বৈদগ্ধ্য ছিল না, আর 
সাধারণ বাঙালী নারীর চরিত্র অতিশয় রুক্ষ এবং অমাজিত যে ছিল 
তাহাতেও সন্দেহ করা চলে না। 


মনতদ্র্টা বন্ধিম ২৪৯ 


ইহার একটি চমণ্ডকার বর্ণনা রবীন্দ্রনাথে আছে। ফকিরঠাদ 
মাখনলালের ছুই স্ত্রীকে মাতৃসম্বোধন করিল, “অমনি ফকিরের নাকের 
সম্মুখে একটা বালা-পরা হাতি খড়গের মত খেলিয়া গেল এবং একটি 
কাংস্যবিনিন্দিত কণ্ঠে বাজিয়া উঠিল, 'ওরে ও পোড়াকপালে মিন্সে, তুই 
মা বল্লি কাকে' ? আর একটি কণ্ঠও “আরও দুই স্থুর উচ্চে পাড়। 
কাপাইয়া ঝঙ্কার দিয়া উঠিল, “চোখের মাথা খেয়ে বসেছিস। তোর 
মরণ হয় না” ?” এই ধরনের শ্রীলোকের কাছ হইতে পুরুষের শিক্ষা 
হওয়া সম্ভব নয় । তবে ফকিরটাদও বিভিন্ন রকমের স্ত্রীলোক দেখিয়াছিল, 
তাই রবীন্দ্রনাথ লিখিয়াছিলেন, "নিজের জ্ত্রীর নিকট হইতে এরূপ চলিত 
বাংলা শোনা [ফকিরের ] অভ্যাস ছিল না।” ফকিরের স্ত্রী হৈমবতী 
সম্পূর্ণ অন্য ধরনের ভ্ত্রীলোক। 

“সে বঙ্কিমবাবুর নভেল পড়িতে চায় এবং স্বামীকে ঠিক দেবতার ভাবে পৃজা 

করিয়! তাহার তৃপ্তি হয় না। সে একটুখানি হাসিখুপী ভালবাসে ; এবং 

বিকচোন্ুখ পুষ্প যেমন বাঁযুর আন্দোলন এবং প্রভাতের আলোকের জন্ট 

ব্যাকুল হয়, সে-ও তেমনই এই নবযৌবনের সময় স্বামীর নিকট হইতে আদর 

ও হাস্ামোঁদ ষথাঁপরিমাণে প্রত্যাশ! করিয়া থাঁকে ।” 

আসল কথাটা এই যে, শ্ত্রীলোককে শ্রদ্ধা করিতে হইবে এই ধারণা, 
এবং স্ত্রীলোককে যে শ্রদ্ধা করা যায় এই ধারণা, ছুইটি নৃতনত্বের আবির্ভাব 
বাঙালী সমাজে প্রায় একই সঙ্গে হইয়াছিল। এই আবির্ভাবের মূলে 
অন্যেরা থাকিলেও বঙ্কিমচন্দ্র একাই যে উহার পুরোধা তাহাতে সন্দেহ 
নাই। উহা বাঁঙালী জীবনে পাশ্চাতা প্রভাব বিস্তারের ফলে 
আসিয়াছিল। 

সভ্যতা যে স্বয়ন্তু নয়, এই কথা সভ্য হইবার পর সভ্য নরনারীরা 
সহজেই ভুলিয়৷ যায়। আজকাল যে সকল তরুণীরা সঞ্চারিণী পল্পবিনী 
লতার মত ঘুরিয়৷ বেড়ান তাহাদের অনেকেই জানেন না যে, দেড়শত 
বসর আগে তীহাদের সমবয়স্কারা শুধু যে মাতা হইয়! সাত দিকে সাত 
বেটাকে ট্যা-্'া করিয়া ঘুরিতে দেখিতেন তাহাই নয়, নিজেরাও মাটির . 


২৫০ বাঙালী জীবনে রমণী 


হাঁড়ির মত কালিমাখা রূপ লইয়া উন্ুনের উপর চড়িয়৷ থাকিতেন। 
তাহাদের লেখাপড়া সম্বন্ধে সেই যুগের একটি মত উদ্ধত করিতেছি । 
“হেদে দেখ দিদি । বাহির পানে তাকাইতে দেয় না। যদি ছোট ছোট 
কনার! বাটার বালকের লেখাপড়া দেখিয়! সাধ করিয়া কিছু শিখে ও পাত- 
তাড়ি হাতে করে তবে তাহার অধ্যাতি জগৎ বেড়ে হয় । সকলে কহে যে__ 
এই মন্দা টেঁঠি ছুঁড়ি বেটাছেলের মত লেখাপড়া! শিখে, এ ছূড়ি বড় অসৎ 
হবে। এখনই এই, শেষে না জানি কিহবে। যেগাছ বাড়ে তাহার 
অঙ্কুরে জানা যায় ।” 
আমার বাল্যকালেও এই পুরাতন ধারণা লোপ পায় নাই। 
কিশোরগঞ্জে আমাদের বাহিরের অঙ্গনে একদিন আমার ছোট বোন 
আমাদের সহিত ব্যাডমিণ্টন খেলিতেছিল। পাশের রাস্তা দিয়া কয়েকটি 
স্কুলের ছেলে যাইতেছিল। তাহার! ব্যাপার দেখিয়া গাহিয়া উঠিল,_ 
“মন্দা মাগী, বেজায় ঘাঘী 
বেহাদ্দ বেল্লিক 1 
ইহারা অবশ্য নারী সম্বন্ধে ধ্যানধারণা রসরাজ অমুতলাল বস্তুর 
খাস-দখল” হইতে পাইয়াছিল। নুতন ধারা কোথা হইতে আসিয়াছিল 
তাহার ইঙ্গিতও আছে, যে পুরাতন বাংলা বই হইতে মেয়েদের শিক্ষা 
সম্বন্ধে অভিমতটি উদ্ধত করিয়াছি তাহাতেই । একটি শিক্ষাথিনী মেয়ে 
বলিতেছে,__ | 
“তবে মন দিয়! শুন, দ্রিদি। সাহেবেরা এই যে ব্যাপার আরস্ত করিয়াছেন, 
ইহাতেই বুঝি এত কালের পর আমারদের কপাল ফিরিয়াছে, এমন 
জ্ঞান হয় ।” 
বইটি ১৮২২ সনে প্রকাশিত হইয়াছিল। এই যে নূতন ধারা 
গ্রাম্যজীবন হইতে অতি গ্রাম্যভাবে আরম্ত হইয়াছিল, তাহাই বঙ্কিমচন্দ্র 
পূর্ণবিকশিত রূপ ধরিয়া দেখা দিয়াছিল। 
স্্রীজাতির প্রতি বঙ্িমচন্দ্রের শ্রদ্ধা কিরূপ ছিল তাহার আরও ভাল 
পরিচয় পাই, ঈশ্বর গুপ্ডের বিবাহিত. জীবন সম্বন্ধে তাহার মন্তব্যে । 


মন্ত্রষ্টা বন্ধিম ২৫১ 


পনের বৎসর বয়সে ছুর্গামণি দেবীর সহিত ঈশ্বরের বিবাহ হয়। বধু' 
তীহার পছন্দ হইল না। তিনি দেখিলেন, কন্যাটি হাবা-বোবার মত, 
প্রতিভাশালী কবির স্ত্রী হইবার উপযুক্ত নয়। তাই ঈশ্বর তাহার সহিত 
কথাও কহিলেন না কিন্ত আর একবার বিবাহও করিলেন না। স্বামী- 
গৃহেই ছুর্গামণির সম্পূর্ণ ভরণপোষণের ব্যবস্থা করিলেন; দুর্গামণিও 
সচ্চরিত্র থাকিয়৷ ঈশ্বরের মৃত্যুর কয়েক বৎসর পরে দেহত্যাগ করেন। 
এই সার্থকতাহীন দাম্পত্যজীবন সম্বন্ধে বন্ধিমের উক্তি অপরূপ । তিনি 
বলিলেন, 
“এখন আমরা ছুর্ীমণির জন্য বেশী দুঃখ করিব, না ঈশ্বরচন্দ্রের জন্য বেশী 
বেশী ছুঃখ করিব? দুর্গীমণির দুঃখ ছিল কি না তাহা জানি না। যে আগুনে 
ভিতর হইতে শরীর পুড়ে, সে আগুন তাঁহার হৃদয়ে ছিল কি না জানি না। 
ঈশ্বরচন্দ্রেরে ছিল__-কবিতাঁয় দেখিতে পাই, অনেক দাহ করিয়াছে 


দেখিতে পাই ।*** 
“এখন দুর্গামণির জন্য দুঃখ করিব, না ঈশ্বর গুপ্তের জন্য ? ভরসা করি, পাঠক 


বলিবেন, ঈশ্বর গুঞ্চের জন্য ।” 

স্রীলোকের প্রতি কি শ্রদ্ধা থাকিলে এই ধরনের কথা বলা যায়, 
তাহা সহজেই অনুমেয় । বঙ্কিমচন্দ্রের এই শ্রদ্ধা ছিল বলিয়াই তিনি, 
বুঝিয়াছিলেন, শুধু নারীর ভালবাসা হইতে বঞ্চিত হওয়াই পুরুষের 
দুর্ভাগ্য নয়, ইহার উপরেও আর একটা দুর্ভাগ্য আছে-_তাহা 
ভালবাসিবার ক্ষমতা হইতে বঞ্চিত হওয়া । নহিলে তিনি ঈশ্বর গুপ্তের 
জন্যই বেশী দুঃখ করিতেন না৷ 

ইহা ছাড়। এই শ্রদ্ধ৷ প্রকাশের মধ্যেই প্রসঙ্গত আর একটা ইঙ্গিতও 
ফুটিয়। উঠিয়াছে, সে ইঙ্গিত ভালবাসার তীব্রতম অনুভূতির | বঙ্কিমচন্দ্রের 
মধ্যে এই অনুভূতির পরিচয় দিবার আগে আর একটা প্রশ্ের আলোচনা 
করার প্রয়োজন আছে। বঙ্কিমচন্দ্র এই অনুভূতি কি করিয়া পাইলেন? 
এই ধরনের অনুভূতি স্ত্রীলোকের কাছে আসিয়া তাহাকে না৷ ভালবািলে 
কাহারও সাধারণত আসিবার কথা নয়। কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র এইরূপ 


২৫২ বাঙালী জীবনে রমণী 


কোনও বাস্তব অভিজ্ঞতা যৌবনে হইয়াছিল, তাহার জীবনীতে এই 
ধরনের কোন সংবাদ নাই। 

বঙ্ষিমের সামাজিক ও বিবাহিত জীবন সেকালের গতানুগতিক 
ধারার বাহিরে যায় নাই। তাহার প্রথম বিবাহ হয় ১৮৪৯ সনে, 
নিজের এগার বসর বয়সে, এবং পাঁচ বছর বয়সের একটি মেয়ের 
সহিত। এই পত্বী ১৮৫৯ সনের শেষের দিকে পনের বগুসর বয়সে 
মারা যান। তখন বঙ্কিমচন্দ্রের বয়স একুশ । ইহার পর পত্বীবিয়োগের 
ছয়-সাঁত মাসের মধ্যেই, ১৮৬০ সনের জুন মাসে তিনি আবার বিবাহ 
করেন। এই দ্বিতীয় পত্বীর সহিতই বঙ্কিমের প্রকৃত দাম্পত্য জীবন 
যাপিত হইয়াছিল। ই'হার কথা পরজীবনে বঙ্কিম এইভাবে লিখিয়াছিলেন, 

“আমার জীবন অবিশ্রীস্ত সংগ্রামের জীবন। একজনের প্রভাব আমার 

জীবনে বড় বেশী রকমের-_মাঁমার পরিবারের । আমার জীবনী লিখিতে 

হইলে তীহাঁরও লিখিতে হয়। তিনি না থাকিলে আমি কি হইতীম, 

বলিতে পারি না।” 

এই বিবরণ স্থুখী ও সার্থক বিবাহিত জীবনের বিবরণ । কিন্তু 
ইহাতে পতিপত্বীর মধো একাত্মতা, স্নেহ, ও পরম্পর-নির্ভর যতই 
থাকুক না কেন, ভালবাসার অবকাশ, যে-ভালবাসাকে বঙ্িমচন্দ্রই 
প্রথমে বাডালীর জীবনে ও অনুভূতিতে আনিয়াছিলেন সেই ভালবাসার 
অবকাশ আছে কিন! তাহা প্রশ্সের বিষয়। এমন কি ইহাঁও আমি 
বলিব, এই স্তরের দাম্পত্য জীবনেও, যদি উহ! প্রথাগত ধারার মধ্যে 
আবদ্ধ থাকে তাহা হইলে, পাতিব্রত্যের নৃতন অনুভূতি পর্যন্ত আসিতে 
পারিত কিনা তাহাও সন্দেহের বিষয়। পাতিব্রত্যের এই অনুভভূতিও 
বহ্কিমচন্দ্রই যে বাঙালী জীবনে আনিয়াছিলেন ইহা আমি ৮৪ 
“বিষবৃক্ষে” সূর্যমুখী চরিত্রে উহার প্রথম প্রকাশ। 

কেহ কেহ বলিয়াছেন, বঙ্কিমচন্দ্র সূর্যমুখী চরিত্র তাহার দ্বিতীয়া 
পত্ী রাজলন্নী দেবীকে দেখিয়াই আকিয়াছিলেন। ইহা অসম্ভব নয়, 
কারণ বঙ্কিম যখন “বিষবৃক্ষ' লেখেন, তখন তিনি দশ-বারে! বশুসর 


মন্্দ্র্া বন্কিম ২৫৩, 


দ্বিতীয়া স্ত্রীর সহিত গাহ্‌স্থ্য-ধর্ম পালন করিয়াছেন। কিন্তু ইহাও 
সম্ভব যে, রাজলন্মনী দেবীকে সূর্যমুখীর অনুরূপ বন্িমচন্দ্রই করিয়াছিলেন, 
অর্থাৎ এই ক্ষেত্রে তিনি তীহার নিজের চেষ্টায় কল্পনার আদর্শ পত্তী 
ও সংসারের জীবিত পত্বীকে এক করিয়াছিলেন । যে সূর্যমুখী সত্য- 
ভামার তুলাব্রতের ছবির নীচে এই কথা লিখিয়া রাখিয়াছিল,_ “যেমন 
কর্ম তেমনি ফল। স্বামীর সঙ্গে সোনার্‌পার ভুল! %-_সেই সূর্যমুখীর 
পাতিত্রত্য সেকালের বাঙালী সমাজে প্রচলিত পাতিব্রত্যের গতানুগতিক 
ধারা হইতে আসে নাই। 

যে সমাজে বঙ্কিম বড় হইয়াছিলেন, যাহাতে তিনি বাস করিতেন, 
তাহাতে যদি হিন্দু পাতিব্রত্যের অনুভূতিই না থাকিয়৷ থাকে, তবে 
তাহাতে নূতন ভালবাসার বীজ পর্যস্ত থাকিবার কথা নয়। তাহার 
উপর ইহাও মনে রাখা দরকার, স্ত্রীলোকের সহিত ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত 
সম্পর্ক বঙ্কিমচন্দ্রের বালাবিবাহের মধ্য দিয়া হইয়াছিল। এই ধরনের 
বিবাহের ভিতর দিয়া দাম্পত্য জীবন যেভাবে গড়িয়া উঠিত, তাহাতে 
প্রেম দেখ! দিবার অবকাশ যে কত কম, তাহা রবীন্দ্রনাথ “মধ্যবতিনী, 
গল্পে বলিয়াছেন। তিনি লিখিয়াছেন- নিবারণচন্দ্র “যখন প্রথম 
বিবাহ করিয়াছিল তখন বালক ছিল, যখন যৌবন লাভ করিল তখন 
স্ত্রী তাহার নিকট চিরপরিচিত, বিবাহিত জীবন চিরাভ্যস্ত। হরম্ুন্দরীকে 
অবশ্যই সে ভালবাসিত, কিন্তু কখনই তাহার মনে ক্রমে ক্রমে প্রেমের 
সচেতন সঞ্চার হয় নাই।” অথচ এই সচেতন সঞ্চারই প্রেমের 
স্থখের প্রধান অবলম্বন । 

ইহা! ছাড়া বাল্যবিবাহের ফলে প্রেমের সঞ্চারে বাঁধা ঘটিবার 
একটা মূলগত কারণও ছিল। ইহার কথা বলিলে পাঠক-পাঠিকা 
হয়ত আশ্চর্য হইবেন। কিন্তু একটু ভাবিয়া দেখিলেই বুঝিতে পারিবেন, 
কথাটা অসঙ্গত নয়। প্রথম পরিচ্ছেদে বুঝাইবার চেষ্টা করিয়াছি 
যে, কাম ও প্রেম অবিচ্ছেছ্ধ, কামই প্রেমের প্রকাশে দৈহিক বা জৈব 
প্রেরণা । কিন্তু এই প্রেরণার ধাক্কায় কাম আর নির্জল! কাম থাকে না 


২৫৪ বাঙালী জীবনে রমণী 


আরও গভীর, আরও বড়, আরও মধুর একটা জিনিসে রূপান্তরিত হয়। 
এই রূপান্তরের জন্য দেহকে দৈহিক উপভোগ হইতে কিছুকাল বঞ্চিত 
থাকিতে হয়। কিন্ত্ব বাল্যবিবাহে দেহ বিবাহের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই উপ- 
ভোগের জন্য সম্পূর্ণ আয়ন্ত হইয় যায়, তাই প্রেমের প্রেরণ যোগাইবার 
আগেই উহা কামের অবলম্বন হইয়৷ দ্রাড়ায়। ইহাতে বিবাহিত 
জীবনে সত্যকার প্রেমানুভূতির পথে বাধা জন্মে বা জন্মিতে পারে। 

বাঙালী জীবনে ভালবাসার পরবর্তী ইতিহাস বিবেচনা করিলে 
এখানে একটা আপণ্তি উঠিতে পারে। উহাতে ভালবাসা ষে দেখা 
দিয়াছিল তাহাতে সন্দেহমাত্র নাই। অথচ এই ভালবাস! বিবাহিত 
জীবনেই, অর্থাৎ বিবাহ হইবার পরেই স্বামী-্ত্রীর মধ্যে বিকশিত 
হইয়াছিল, দেহসম্পর্ক-বজিত পূর্বরাগের মধ্যে হয় নাই। এটা কি করিয়া 
সম্ভব হইল? দেহের উপভোগ গোড়া হইতে হইলে যদ্দি ভালবাসার 
পথে বাঁধাই জন্মে, তাহা হইলে বাঁডালীর বিবাহিত জীবনে দেহভোগের 
সম্পূর্ণ অবকাশ ও স্বাধীনতা থাকা সত্বেও কি করিয়৷ সেই ভালবাসা, 
যাহা পুর্ণ বিকশিত হইবার জন্য বিপ্রলস্ত বা বিচ্ছিন্ন থাকার অপেক্ষা 
রাখে, তাহার আবির্ভব সম্ভব হইল? 

এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সহজ নয়, কারণ বাস্তব ক্ষেত্রে নবযুগের 
বাঁডালীর বিবাহিত জীবন সম্বন্ধে যতটা সাক্ষ্য ও স্পষ্টোক্তি থাকিলে 
এ বিষয়ে আলোচনাও সম্ভব হইত তাহা নাই, পাওয়াও যাইবে না। 
উপন্যাসে এবং গল্লেও এই প্রসঙ্গের, অর্থাৎ সহবাসের সহিত ভালবাসার 
সংঘাত বা মিল এই প্রশ্নের, অবতারণা কর! হয় নাই। সাধারণত 
বিবাহের পরবর্তী ভালবাসাকেও পুর্বরাগ বা “কোর্টশিপে'র মতই 
দেখানো হইয়াছে । দুইটি দৃষ্টান্ত দিয়া আমার কথাটা পরিক্ষার করিতে 
চেষ্টা করিব। 

'দেবীচৌধুরাণী'তে প্রফুল্ল ও ব্রজেশ্বর একরাত্রি একসঙ্গে যাপন 
করিয়াছিল। প্রফুল্লের বয়স তখন আঠারো, ব্রজেশ্বরের বাইশ। 
ছইজনের সম্পর্ক স্বামী-স্ত্রীর, একপক্ষে পুর্ণ আসক্তি আছে, আর এক 


মন্দা বঙ্কিম ২৫৫ 


পক্ষে আসক্তির সঞ্চার হইতেও দেরি হয় নাই। এ অবস্থায় দুই 
পক্ষের একত্র রাত্রিযাপন কতদূর গিয়াছিল ? পরবর্তী যেসব কথা আছে, 
দুইজনের ভালবাসার যে বিবরণ আছে, তাহা হইতে এই অনুমান করা 
যুক্তিযুক্ত যে সহবাস হয় নাই। 

দ্বিতীয় দৃষ্টান্তটি রবীন্দ্রনাথের “নৌকাডুবি হইতে। রমেশ যখন 
কমলাকে নিজের স্ত্রী বলিয়৷ জানিয়াই বাড়িতে লইয়া আসিল, তখন 
কমলা বালিকা নয়। তাহাঁদের দুইজনের ব্যবহারও স্বামী-্ত্রীর মত। 
যেমন, "রমেশ পিছন হইতে হঠাৎ বালিকার চোখ টিপিয়া ধরে, তাহার 
মাথাটা বুকের কাছে টানিয়া আনে”-_ইত্যাদি। এই আচরণ কতদূর 
গিয়াছিল ? যদি “কোর্টশিপে'র সীমা অতিক্রম করিত, তাহা হইলে 
কমলার আসল পরিচয় পাইবার পর তাহাকে পত্বীভাবে না৷ দেখিবার 
চেষ্ট| রমেশ নিশ্চয়ই করিত না, কমলার প্রকৃত স্বামীকে বাহির করিবার 
চেষ্টাও করিত না, কতবব্যবোধে দুর্ঘটনার ব্যাপারটাকে অবান্তর মনে 
করিয়! কমলাঁকে শ্রী বলিয়াই গ্রহণ করিয়া লইত। কিন্তু এই প্রশ্নের 
আভাসমাত্র বইটার এই স্থল